
দৃশ্যের বাইরে অনুভূতির যে জগৎ, সেখান থেকেই বিমূর্ত শিল্পের জন্ম। শিল্পী এই
অদৃশ্য অনুভবকে দৃশ্যমান করে তোলেন রেখা, রং ও আকৃতির মাধ্যমে। তখন
ক্যানভাস হয়ে ওঠে অন্তর্জগতের এক উন্মুক্ত ভাষা।
বিমূর্ত শিল্পের মূল ভাবনা নিহিত রয়েছে দৃশ্যমান বাস্তবতার সরাসরি অনুকরণ থেকে
সরে এসে সৃজনশীল গঠন বা ফর্মের মাধ্যমে অনুভূতি, চিন্তা ও অন্তর্জগতের প্রকাশে।
উনিশ শতকের শেষ ভাগ থেকে বিশ শতকের সূচনালগ্নে ইউরোপীয় আধুনিক শিল্পে
বিমূর্ত তার যে বিকাশ, তা ধীরে ধীরে বিশ্বশিল্পের ভাষাকে আমূল পরিবর্তন করে।
বাস্তবতার অবয়বকে ভেঙে শিল্পী যখন অনুভূতি ও চিন্তার স্বাধীন প্রকাশের দিকে
অগ্রসর হন, তখনই বিমূর্ত শিল্প তার স্বতন্ত্র নন্দনতাত্ত্বিক পরিসর নির্মাণ করে।
বাংলাদেশের শিল্পচর্চায়ও বিমূর্ত তার এই প্রবাহ নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও সামাজিক
বাস্তবতার সঙ্গে মিশে একটি স্বতন্ত্র শিল্পভাষা তৈরি করেছে। সেই ধারার
উত্তরাধিকারকে ধারণ করে সমকালে নিজস্ব অভিজ্ঞতা, অনুভব ও সৃজনশীলতার
মাধ্যমে নতুন মাত্রা যোগ করছেন বহুমাত্রিক শিল্পী মো. আজহারুল ইসলাম শেখ।
‘মুক্তির সংগ্রামে অনুভবের বৈভব’ শিরোনামে একক প্রদর্শনীতে শিল্পী তাঁর শিল্পকর্মের
মাধ্যমে বঞ্চনা, নিপীড়ন ও মানবিক যন্ত্রণার অভিঘাতকে রূপ দিতে চেয়েছেন এবং
সেই অনুভূতির মধ্য দিয়ে মানুষের মুক্তি ও মানবিক মর্যাদার আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ
করেছেন।
এই প্রদর্শনী বিমূর্ততাকে শুধু দেখার নয়, অনুভব করারও এক নতুন পথ তৈরিকরে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আজহারুল ইসলাম শেখের শিল্পচর্চা বাংলাদেশের বিমূর্তশিল্পের ধারায় একটি অসামান্য সংযোজন। সিরামিকের মাটি, টেক্সচার ও বস্তুগতঅভিজ্ঞতা যেমন তাঁর শিল্পচেতনাকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি চিত্রকলার রং, রেখা ওস্পেস তাঁকে দিয়েছে অনুভূতি প্রকাশের আরও বিস্তৃত পরিসর।
চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে ঢুকলে চোখে পড়বে অ্যাক্রিলিক ও মিশ্র মাধ্যমে নির্মিত
তীব্র এবং ঘন রঙের স্তরে আঁকা পেইন্টিংগুলো শিল্পীর অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও সময়ের
চিহ্ন বহন করছে। বিশেষ করে ঢেউখেলানো রেখাগুলো স্থিরতার মধ্যে একধরনের
অস্থির গতি তৈরি করেছে, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি ভেতর থেকে ক্রমাগত প্রতিরোধ
গড়ে তুলছে। পৃষ্ঠের ঘর্ষণ, রঙের জমাট স্তর এবং আঁচড়ের প্রবাহ–বিস্তৃত উপস্থিতি
তৈরি করেছে এক গভীর মানসিক পরিসর। কিছু শিল্পকর্মে বিন্দুর মতো ছড়িয়ে থাকা
রঙের ক্ষুদ্র বিস্ফোরণ যেন নৈঃশব্দ্যের গভীরে নিজের অস্তিত্ব প্রকাশ করে চলেছে।
প্রদর্শনীর বিভিন্ন শিল্পকর্মে লাল, কালো ও কমলার তীব্র ব্যবহার যেন উত্তাপ, ক্ষত,
বেদনা, প্রতিবাদ ও জীবনের প্রবল স্পন্দনকে ধারণ করে মুক্তির অভিলাষে উত্তরণের
এক রক্তিম মুহূর্ত সৃষ্টি করে। বিশেষ করে তাঁর বিমূর্ত চিত্রে রঙের গাঁথুনি, স্তরবিন্যাস,
আবহ, রেখার গতিশীলতা এবং পৃষ্ঠের বৈচিত্র্য ক্যানভাসে এক ভিন্নতর নান্দনিক ক্ষেত্র
তৈরি করে। ফলে তাঁর বিমূর্ত তা কেবল আকৃতি ও রঙের নান্দনিক বিন্যাসে সীমাবদ্ধ
থাকে না; বরং এর অন্তর্গত স্তরে অনুভব, সময় ও সমাজের মানবিক সংকট থেকে
পরিত্রাণের নানা প্রতিধ্বনি অনুভূত হয়। কম্পোজিশনের ছন্দে প্রকাশ পায় ভাঙন,
প্রতিরোধ এবং পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা।
প্রদর্শনীর আরেকটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো, চিত্রকর্মে সাদা রেখা ও উজ্জ্বল অংশগুলো
অন্ধকারের ভেতর থেকে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক অন্তর্গত যাত্রা প্রকাশ
করে।
এই প্রদর্শনী বিমূর্ততাকে শুধু দেখার নয়, অনুভব করারও এক নতুন পথ তৈরি
করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আজহারুল ইসলাম শেখের শিল্পচর্চা বাংলাদেশের বিমূর্ত
শিল্পের ধারায় একটি অসামান্য সংযোজন। সিরামিকের মাটি, টেক্সচার ও বস্তুগত
অভিজ্ঞতা যেমন তাঁর শিল্পচেতনাকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি চিত্রকলার রং, রেখা ও
স্পেস তাঁকে দিয়েছে অনুভূতি প্রকাশের আরও বিস্তৃত পরিসর।
প্রদর্শনীতে তাঁর ক্যানভাসের মুখোমুখি হয়ে দর্শক যেন শিল্পীর রঙের সঙ্গে এক নীরবসংলাপে যুক্ত হন, সেই সংলাপ ধীরে ধীরে দৃশ্যের সীমানা পেরিয়ে তাঁকে পৌঁছে দেয়অনুভূতির গভীরে। সেখানে বিমূর্ত তার উন্মুক্ত পরিসরে দর্শককে নিজের উত্তর খুঁজেনেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। ১ অক্টোবর শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি দর্শকদের জন্য ৭অক্টোবর পর্যন্ত খোলা থাকবে।
শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে আরও একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে, শিল্পীর দ্বিমাত্রিক
ক্যানভাসে ত্রিমাত্রিক ফর্মের অবয়বের অনুভব। রং, রেখা, স্তর ও পৃষ্ঠের বিন্যাসে
কোথাও কোথাও ফর্ম যেন ক্যানভাসের সমতল থেকে উঠে এসে একটি ত্রিমাত্রিক
উপস্থিতি তৈরি করে। এই ফর্ম–চেতনার পেছনে তাঁর দীর্ঘদিনের সিরামিক ও
ভাস্কর্যচর্চার প্রভাবও স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। মাটির গঠন, আয়তন, পৃষ্ঠ ও টেক্সচারের
সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিবিড় সংলাপ তাঁর চিত্রকলায়ও ফর্মকে শুধু দৃশ্যমান নয়, প্রায়
স্পর্শযোগ্য করে তুলেছে। ফলে দ্বিমাত্রিক চিত্রপটেও তাঁর সিরামিক শিল্পচর্চার সেই
ত্রিমাত্রিক ভাবনা এক স্বতন্ত্র নান্দনিক মাত্রা লাভ করেছে।
প্রদর্শনীতে তাঁর ক্যানভাসের মুখোমুখি হয়ে দর্শক যেন শিল্পীর রঙের সঙ্গে এক নীরব
সংলাপে যুক্ত হন, সেই সংলাপ ধীরে ধীরে দৃশ্যের সীমানা পেরিয়ে তাঁকে পৌঁছে দেয়
অনুভূতির গভীরে। সেখানে বিমূর্ত তার উন্মুক্ত পরিসরে দর্শককে নিজের উত্তর খুঁজে
নেওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। ১ অক্টোবর শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি দর্শকদের জন্য ৭
অক্টোবর পর্যন্ত খোলা থাকবে।