‘জলাভূমির মহিষ’, জলরং
‘জলাভূমির মহিষ’, জলরং

প্রদর্শনী

শহর-গ্রামের সংলাপে অপরূপ বাংলাদেশ

প্রতিভাবান, প্রতিশ্রুতিশীল, অধ্যবসায়ী এবং শিল্পের প্রতি ভালোবাসাপূর্ণ ১০ জন তরুণ শিল্পীর চিত্রপ্রদর্শনী চলছে গ্যালারি ‘ভূমি’তে। তাঁরা প্রত্যেকেই যেন প্রকৃতির প্রত্যক্ষদর্শী—সৌন্দর্যের নিবিড় পূজারি। দৃষ্টিনন্দন চিত্রের ভেতর দিয়ে ষড়ঋতুর বৈচিত্র্য, গ্রামবাংলার নিসর্গ, অতীত ঐতিহ্য এবং শহরের অলিগলির দৃশ্য এঁকে কখনো ব্যক্তিগত অনুভূতি, কখনো চিরায়ত চেতনা, কখনোবা মানবসৃষ্ট পরিবেশদূষণের বয়ান তুলে ধরেছেন। প্রত্যেকের কাজেই রয়েছে স্বকীয়তা, তবু যেন মিলেছে একাত্মতার সুর। সেই সুর মূলত গ্রাম-শহরের সংলাপে অপরূপ বাংলার রূপকথা।

‘অধ্যবসায়’, জলরং

শৈলী নির্মাণেও দেখা যায় মোটামুটি বাস্তবধর্মী আবেশ কিংবা বাস্তবের অনুষঙ্গ নিয়েই চেতনার বিন্যাস। এই শিল্পীদের মধ্যে অনুকূলচন্দ্র মজুমদারের কাজে সরলীকরণের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। রং ও রেখায় নিজস্ব ঢঙে তিনি ‘বর্ষার সবুজ’, ‘ঢাকার গল্প’ ও ‘চাঁদনী রাতের গল্প’ সিরিজে রঙের কৃপণতায় বিষয়রূপের অকৃপণ সম্ভার উপস্থাপন করেছেন। সৌরভ চৌধুরী তাঁর স্বপ্নময় স্মৃতিগুলো বাস্তবানুগ ড্রয়িংয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।

‘লাউয়াছড়া বন’, অ্যাক্রিলিক

ঋতুবৈচিত্র্য এবং গ্রাম ও শহরের দৃশ্য নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁদের মধ্যে শাহানুর মামুন অন্যতম। জলরঙেই তাঁর পারদর্শিতা। তাঁর জলরংচিত্রে গোলকধাঁধাময় আলো-ছায়ার প্রক্ষেপণে শহরের অলিগলি ও ইমারতের অস্তিত্ব রহস্যময় রূপ পায়। তবে অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে আঁকা কৃষ্ণচূড়া, জারুল ও সোনালি ফুলের দৃশ্যে এসেছে বিশেষ দ্যোতনা। চোখধাঁধানো রঙের ফুটকিতে মন মাতোয়ারা হয়ে যায়।

‘জারুল’, অ্যাক্রিলিক

সাদেক আহমেদের চিত্রে পুরান ঢাকার অলিগলি, বাজার, মসজিদ ও মানুষের আনাগোনার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে সমাজবাস্তবতার অন্তর্লিখিত বার্তা। কামাল উদ্দিনের চিত্রে পুরান ঢাকার হারানো ঐতিহ্যের সুর যেমন আছে, তেমনি ‘শ্রাবণ ধারা’ সিরিজে রয়েছে বর্ষার রোমান্টিকতা। আকাশজুড়ে সাদা–কালো মেঘরাশি ও ছাতা মাথায় ঘরে ফেরা পথচারীর দৃশ্য যেন বর্ষাকাব্যের সচিত্র অনুবাদ। 

শিল্পী আজমীর হোসেনের কাজ একেবারেই আলাদা—বুদ্ধের মুখাবয়বে ধরা পড়েছে অধ্যবসায় ও প্রশান্তির ঔজ্জ্বল্য। নিজস্ব সিগনেচার স্টাইলের জন্য তিনি সহজেই আলাদা হয়ে উঠেছেন। সোহাগ পারভেজ রেখার দোলনে গড়ে তুলেছেন অপার্থিব আবেশ।

‘ভোরের আলো’, অ্যাক্রিলিক

কামরুজ্জোহা ‘জলাভূমির মহিষ’ চিত্রে তুলে এনেছেন বাংলার প্রাণপ্রকৃতির সৌন্দর্য। তাঁর হাওর-বাঁওড় ও দুপুরের নিস্তব্ধতা যেন দর্শকের হৃদয়ে এক বিপুল নীরবতা এনে দেয়। 

আব্দুল্লাহ আল বশিরের ‘ঘনত্ব’ সিরিজ রূপক ব্যঞ্জনায় পরিপূর্ণ। তাঁর উচ্চতলা দালানে ঘেরা শহরে বন্দী প্রাণ আর কাগজের পাখির উড়ান—প্রকৃতির প্রতি এক প্রতীকী হাহাকার। 

শহিদ কাজীর চিত্রে সূর্যমুখী, কৃষ্ণচূড়া, মেঘলা দিনের জলছবিতে ফুটে উঠেছে অনুভবের এক ঘনিষ্ঠতা—ক্লোজআপ রচনার মতো।

‘জলাভূমির মহিষ’, জলরং

তবু একটি প্রশ্ন মনে জাগে—শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, হামিদুজ্জামান খানের মতো পূর্বসূরি শিল্পীদের রং ও কম্পোজিশনের শৈল্পিক খেলায় যে স্বাধীনতা ও আবেগ ছিল, তার ধারাবাহিকতা কি এই তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে রয়েছে? নাকি আলোকচিত্রনির্ভর চিত্রনির্মাণ ও মাত্রাতিরিক্ত বাস্তবানুগতার অনুশাসনে নিসর্গের নিখুঁত রূপায়ণে শিল্পরসের ব্যাঘাত ঘটছে?

‘ঘনত্ব’, অ্যাক্রিলিক

এসব প্রশ্নের উত্তর, অপরূপ বাংলার সৌন্দর্যের গতিপ্রকৃতির ও তরুণ শিল্পীদের শিল্পসম্ভারের রসাস্বাদন করতে গ্যালারিতে যাওয়াই উত্তম। 

১ আগস্ট শুরু হওয়া ‘দ্য ট্রেন্ডসেটার্স’ শিরোনামের এই প্রদর্শনী ভূমি গ্যালারিতে ১২ আগস্ট পর্যন্ত দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।