আকাশজুড়ে কালো মেঘের ঘনঘটা। জল থই থই বরষা। নাগরিক জীবনের সুবিধা–অসুবিধার মাঝেও মানুষ মেতে উঠছে জলের ছোঁয়ায়। কবির হাতে আসছে বর্ষার পঙ্ক্তিমালা। নৃত্যের তালে তালে বরষাযাপন। শিল্পীর কণ্ঠে বৃষ্টিমুখর সুর—বরিষ ধরা–মাঝে শান্তিরও বারি…।
সংস্কৃতি অঙ্গনের এই নানা আয়োজনের ভিড়ে পিছিয়ে নেই চিত্রশিল্পীরাও। তাঁদের চিত্রপটে বর্ষার ঘনঘটা কেমন ফোটে, দেখতে হলে আসতে হবে লালমাটিয়ার ভূমি গ্যালারিতে। ১০ জুলাই শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে বর্ষার পটভূমিকায় নবীন ও প্রবীণ চিত্রকরদের আঁকা চিত্রকর্মের দুই সপ্তাহব্যাপী এক চিত্র প্রদর্শনী। শিরোনাম ‘রেইনস্কেপ’ বা বৃষ্টি-দৃশ্য। ভূমি গ্যালারির মতে, এটি শুধু বর্ষার দৃশ্যাবলি নয়; বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের সঙ্গে বর্ষার সম্পর্কের গভীরতা উপলব্ধির শিল্পিত উপায়; আর নানা প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গে শিল্পচর্চার ধারাবাহিকতা, সৃজনশীল ভাববিনিময়ের মূল্যবান এক আয়োজন।
শত শত বছর ধরে গানে গানে, কবিতায়, লেখাজোখায় বাংলার বর্ষা উঠে এসেছে। সমকালীন কবি–সাহিত্যিকেরাও লিখে চলেছেন সেই বর্ষাবন্দনা।
আজও কাগজের সাময়িকীতে মুদ্রিত হয় সমকালের কবিদের বর্ষা-বিষয়ক কবিতাগুচ্ছ। আমাদের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পীরাও তাঁদের চিত্রপটে বর্ষাকে তুলে এনেছেন। এবার সেই বর্ষা যেন নেমেছে চিত্রশালার চার দেয়ালে! আবদুল মান্নান, রনজিৎ দাস, জামাল আহমেদ, রেজাউন নবী—এই ৪ বর্ষীয়ান শিল্পীর সঙ্গে আরও ২১ জন তরুণ শিল্পীর অংশগ্রহণে এই দলগত প্রদর্শনীতে ৭৫টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে।
২৫ জনের প্রথমেই আছেন অগ্রজ শিল্পী আবদুল মান্নান। ‘বর্ষা’ শিরোনামে তাঁর আঁকা তিনটি চিত্রের প্রথমটির পটজুড়ে পাতার ফাঁকে একগুচ্ছ বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল। অন্য দুটির একটিতে আকাশজুড়ে মেঘ ভেদ করে নদীতে নেমেছে ঢল। কাছে–দূরে দুটি নৌকা চলছে এই দুর্যোগে। কালচে রঙের আকাশ আর নদী প্রায় একাকার করে ঢেউয়ের দুলুনি ও বর্ষণের সময়কার অনুভূতি সুদক্ষ হাতে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী।
জামাল আহমেদ অনেক দিন ধরেই পুরান ঢাকা, বুড়িগঙ্গা নদীর দুই পারের মানুষ ও জলযানের হাঁকডাক–ব্যস্ততা থেকে আরম্ভ করে নদী কিংবা সাগরপাড়ের ভেজা বস্ত্রে বালিয়াড়ি পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফেরা, গ্রামবাংলার হলুদ শর্ষেখেত ধরে হেঁটে যাওয়া পরিবার—এসব বিষয় নিয়ে আঁকছেন। এবারও তিনি আঁকলেন বৃষ্টি মাথায় করে হেঁটে কিংবা ছাতাসহ নগরবাসীর নৌকাযোগে ঘরে ফেরার ছবি। কালচে আকাশ থেকে নেমে আসা বৃষ্টির তোড় আর ছাতার কালো উপরিভাগের নকশা তার নিচে গাঢাকা দেওয়া মানুষ—সব মিলিয়ে বর্ষণের অসামান্য এক স্মারক হয়ে উঠেছে শিল্পীর এই চিত্রকর্ম।
রনজিৎ দাসের আঁকা বর্ষার তিনটি চিত্রকর্মের মধ্যে ব্যতিক্রমী কাজটি হলো বজ্রপাতের আকাশ, গ্রামবাংলার মানুষ যাকে ঠাডা পড়া বলে! সাহস করে সেই বিস্ময়কর ভীতিমিশ্রিত সময়ের ছবি তিনি অবলীলায় এঁকে ফেলেছেন!
রেজাউন নবী বর্ষাকালের অনুভূতিকে ধারণ করে মূর্ত-বিমূর্তের ধারায় এঁকেছেন ‘মাটিতে বৃষ্টির চুম্বন’ ও ‘বর্ষণের সুর’।
এরপর ২১ জন তুলনামূলক তরুণ শিল্পীর তিনটি করে কাজ। এগুলোর প্রায় সবই বাস্তবানুগ ধাঁচে আঁকা। আমাদের চোখে দেখা বর্ষণের আগে–পরের গ্রাম, নগরের নদী, নৌকা, রিকশায় ভিজতে ভিজতে মানুষের যাতায়াত, বৃষ্টিতে বিলীয়মান দূর নিসর্গ, বর্ষার কদম ফুল, ভেজা কাক, পুরান ঢাকার বর্ষণসিক্ত এঁদো গলি, ভবনের সারি।
নব্বইয়ের দশকের শিল্পী রবিউল ইসলামের আঁকায় নগরে বৃষ্টির তোড় অনুভব করা যায়। শূন্য দশকের শিল্পী দামাসুস হাচ্চা বর্ষণে নেয়ে ওঠা প্রকৃতির সতেজতা তুলে ধরেছেন। বৃষ্টির পর নগরের মহল্লা ও রাজপথে জল জমে থাকার বাস্তবতা শনাক্ত হয়েছে আনিসুর রহমানের চিত্রকর্মে।
নদী ও নগরে বাতাস লাগা বর্ষণের তোড়জোড় পাওয়া যায় প্রদ্যুৎ ভট্টের জলরং চিত্রকর্মে। সুমন বৈদ্য গ্রামীণ পটভূমি বেছে নিয়েছেন বৃষ্টির ছবি আঁকতে। আঁখি সরকার বৃষ্টিতে রিকশার ছুটে আসা ও পাখির চোখে দেখা পথচারীদের ছাতার মিছিল এঁকেছেন। বৃষ্টি নিয়ে প্রতীকী ছবি এঁকেছেন রাশেদ কামাল।
বৃষ্টি–বিরতিতে গরু নিয়ে রাখালের ঘরে ফেরার আগে ধুয়ে যাওয়া প্রকৃতির অসামান্য একটি ছবি এঁকেছেন কামরুজ্জোহা। বৃষ্টিবিধৌত নিসর্গ এঁকেছেন আরিফুল ইসলাম। মনজুর রশিদ বৃষ্টির জলে ক্রীড়ারত মাছরাঙা আর পায়রার ছবি এঁকে প্রদর্শনীকে বৈচিত্র্যের খোরাক দিয়েছেন। ওয়ারিয়র রহমান সামির ছবিতে বর্ষার অনুভূতি এসেছে। সুবর্ণ চক্রবর্তী বৃষ্টির রাতে ঢাকার যানজট চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছেন। সম্পা জোহার চিত্রপটে গ্রাম আর নগর দুই–ই চিত্রিত হয়েছে সার্থকতার সঙ্গে।
আমানুজ জাহিদ রিকশা ও কদম ফুল এঁকে বৃষ্টিবন্দনা করেছেন। তামান্না লিজা, কারিদুল ইসলাম, রুবেল খান, হেলাল শাহর চিত্রকর্মে বর্ষণমুখর সময়ের অনুভূতি পাওয়া যায়। জয়ন্ত মণ্ডলের ‘অবিরাম বর্ষণে’ বৃষ্টিভেজা ভেড়ার দল এঁকেছেন। ফাইরুজ এমরান নগরে বৃষ্টিতে যাত্রীসমেত রিকশা ও চালকের ছুটে চলাকে তুলে ধরেছেন তাঁর চিত্রপটে। ঝলক সাহা বৃষ্টিতে ছাতার নিচে জড়সড় যাত্রীসহ নদী পারাপারের ছবি এঁকে বর্ষণমুখর বাংলার এই বিশেষ সময়টিকে তুলে ধরেছেন।
এ প্রদর্শনী আমাদের বর্ষা মৌসুমের নানা দিক তুলে ধরলেও এ সময়টিতে ফসল নিয়ে আমাদের কৃষকদের সেই তুমুল সংগ্রাম উপেক্ষিত হয়েছে মূলত শিল্পীদলের নাগরিক মনোভঙ্গির কারণে।
প্রদর্শনী চলবে ২২ জুলাই পর্যন্ত।