প্রাচীনকাল থেকে বংশানুক্রমে গড়ে ওঠা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশবান্ধব মৃৎশিল্প আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। গ্রামে গ্রামে বা হাটবাজারে মাটির তৈজসপত্রের আর পসরা বসে না। কেননা, পণ্য অর্থনীতির যুগে উৎপাদিত পণ্য যদি বাজারে না বিকায়, তবে তা অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। মুনাফা যেখানে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে; নিয়ন্ত্রণ করে সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্বরাষ্ট্র ও জীবন—সেখানে উৎপাদক বঞ্চনার শিকার হবেনই। তাই বেঁচে থাকার মতো অর্থের জোগান না পেলে শিল্পী বা উৎপাদক উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হবেন। তবে বর্তমান দ্রব৵মূল্যের ঊধ্ব৴গতির সঙ্গে যুদ্ধ করে এখনো কিছু জরাজীর্ণ কুমার পরিবার বাপ-দাদার এই পেশাকে ধরে রাখার অক্লান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কুম্ভকারের নিপুণ ছোঁয়ায় কাদামাটি আগুনে পুড়ে রূপ নেয় শিল্পে। লোকশিল্প–গবেষক ও সংগ্রাহক ইমরান উজ-জামানের গবেষণায় এবং ড. শওকাত আরা হায়দারের কিউরেশনে লোকজ মাটির পণ্যের প্রচার ও প্রসারে আয়োজিত হচ্ছে প্রদর্শনী।
‘পোড়ামাটির রূপবৈচিত্র্য’ শীর্ষক এ প্রদর্শনী চলছে ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে। ১৮ মে শুরু হয়েছে প্রদর্শনী, চলবে আজ শুক্রবার পর্যন্ত। প্রদর্শনীর আয়োজক বলেন, ‘পোড়ামাটির রূপবৈচিত্র্য মেলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমাদের পোড়ামাটির শিল্পের গুণগান করা, এককথায় বিজ্ঞাপন দেওয়া। কাজেই আমরা প্রত্যেকে হব আমাদের ভূমির কাঁচামালের তৈরি পণ্যের দূত। নিজ দেশের পণ্য নিজে ব্যবহার করব এবং ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করব মানুষকে।’
প্রদর্শনীর ডিসপ্লেতেও আনা হয়েছে নতুন মাত্রা। আকার ও ধরন অনুযায়ী এখানে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
শিল্পরসিকজন শুধু মৃৎপাত্রই দেখবেন না, অবলোকন করবেন সৌন্দর্যের পাশাপাশি অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও বাস্তব অভিজ্ঞতা। সেই সঙ্গে উপভোগ করবেন পালাগান আর লোকজ সংগীত।
কুম্ভ
কুম্ভ মানে গোল, কুম্ভাকৃতি মানে গোলাকৃতি। কুম্ভ সংস্কৃত শব্দ, যার বাংলা মাটির কলসি। কুম্ভ হলো মানুষের দেহের প্রতিরূপ। মৃন্ময় পাত্র, মটকা, মটকি, আধার, কলস, কলসি, ঘড়া, গাগরা, ঘাগরি, ভাণ্ড, গজকুম্ভ, কোষ, ডালা, ঘট—এই রকম বিভিন্ন নাম নিয়ে উৎপাদকেরা হাজির হয়েছেন এ প্রদর্শনীতে।
ইমরান উজ-জামান বলেন, ‘ঘট থেকে ঘটকালি, নাকি ঘটকালি থেকে ঘটের উৎপত্তি! এমন প্রশ্ন মনে আসার কারণ আছে। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী বিয়ে পড়াতে ঘট লাগে। আবার সেই বিয়েতে যে মধ্যস্থতা করেন, তিনি ঘটক। ঘট আর ঘটির মধ্যেও আছে পার্থক্য। ঘট মানে আরাধনায় ব্যবহৃত হয় যে কুম্ভপাত্র আর ঘটি মানে পানি খাওয়ার পাত্র; যেমন ঘটি-বাটি।’
ব্যবহারিক মৃৎপাত্র
মাটি, পাথর ও কাঠ—এই তিন ছিল প্রাচীন বঙ্গদেশের মানুষের বাসনকোসন তৈরির উপাদান।
হাঁড়ি, পাতিল, কলসি, কুঁজো, সরা, মালশা, জগ, শিল-নোড়া, হাঁড়ি, তন্দুর, বিড়া, হাতা, বেড়ি, ঝাঁঝরি, তাওয়া, কড়াই, পিঁড়া, নুনপাত্র, তেলের বাটি, মসলার থালাসহ অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে এসব মাটির উপকরণের নাম পাওয়া যায়। এসব সনাতন ব্যবহার্য মৃৎপাত্রগুলো ছোট থেকে বড়—এমন চমৎকার ও নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করার ফলে এর শৈল্পিক মান বেড়ে গিয়েছে অনেক গুণ। মাঝখানের বড় মটকাটি সবাইকে আশ্রয় দিচ্ছে মাথা উঁচু করে যেন। নব্য এ সময়ে এসে সনাতন কুমারদের জায়গা অনেকটাই দখল করে নিয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল মৃৎশিল্প।
ঘর সাজানোর শোপিস থেকে পটারি, ল্যাম্প, সন্দেশ, আমসত্ত্ব বা পিঠা তৈরির ছাঁচ, ঘণ্টা, পাখির বাসা, কাপ-পিরিচ, ফুলের টব, কয়েলদানি, পানির ফিল্টার, চায়ের কেটলি পর্যন্ত। আন্তর্জাতিক মানের ডিনার সেট যুক্ত হয়েছে মাটির তৈরি পণ্যের নবধারায়। এগুলোও আরেক পাশে সুন্দরভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে এবং শিল্পরসিকদের আকর্ষণ করছে।
নন্দন ঘট
শাস্ত্রমতে ঘট দেহের প্রতিরূপ। ঘট লোকাচারের উপাদান হিসেবেও ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে, ঘটকে চিহ্নিত করা হচ্ছে গর্ভবতী নারীগর্ভের প্রতীক হিসেবে। চিত্রিত এসব মনসা বন্দনার ঘট ও চালির শিল্পগুণ অসাধরাণ। যার কারণে যুগপৎ শিল্প ও ঘরসজ্জার বস্তু হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে আজকাল।
লক্ষ্মীসরা
মাটির তৈরি গোলাকার, অগভীর ও প্রসারিত পাত্রকে স্থানীয় ভাষায় সরা বলা হয়। এই সরায় যখন লক্ষ্মীকে উপলক্ষ করে ছবি আঁকা হয়, তখন একে লক্ষ্মীর সরা বলে। সম্পদের দেবী হিসেবে লক্ষ্মী ফসলের দেবীর স্থান দখল করে নিয়েছে ধীরে ধীরে। লক্ষ্মীসরার সমতল অংশের ওপর লক্ষ্মীদেবী এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য উপাদান যেমন প্যাঁচা, ধানের শিষসহ অন্য দেব–দেবীর ছবি আঁকা হয়। আবার বৈষ্ণবরা লক্ষ্মীর পরিবর্তে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি, শাক্তরা সরাতে যুক্ত করেন দুর্গার ছবি। লক্ষ্মীসরাকে কয়েক প্রকারে বিশেষায়িত করেছেন লোকগবেষকেরা। ঢাকাই সরা, ফরিদপুরি সরা, সুরেশ্বরী সরা, গণকী সরা ও আচার্যী সরা। কি অসাধারণ সূক্ষ্ম রেখার কাজ করেছেন শিল্পীরা।
টেপাপুতুল
নারী ও শিশুরা হাত দিয়ে টিপে মাটির পুতুল তৈরি করে বলে এ পুতুলকে টেপাপুতুল বলে। খেলনা পুতুল বউ-জামাই, কৃষক, নথ পরা বউ—এমন নানা নকশার টেপাপুতুল স্থান করে নিয়েছে এই প্রদর্শনীতে। এ ছাড়া রয়েছে মাটির তৈরি নানা রকম খেলনা ব্যাংক, ফল ও সবজি।
আমাদের লোকজ মাটির পণ্যের প্রচার ও প্রসারে আয়োজিত এই প্রদর্শনী মুগ্ধ করবে সবাইকে—এটা বললে অত্যুক্তি হবে না।
মোহাম্মদ শামীম রেজা: শিক্ষক ও শিল্প–গবেষক, চারুকলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।