নকশিকাঁথা বুনন
নকশিকাঁথা বুনন

প্রদর্শনী

মুর্তজা বশীর, তাঁর বহুযাত্রা ও মাত্রার স্বর

এই মোহগ্রস্ত পৃথিবীর স্রোতের বিপরীতে আপসহীন বয়ে চলা এক শিল্পীর নাম মুর্তজা বশীর। যিনি কঠিন বাস্তবতার কোনো প্রকার আঘাতেও নিজেকে বিক্রি করেননি সময়ের কাছে। তাঁর মতে, নাম, যশ খ্যাতির পেছনে ছুটে অনেক প্রতিভাই হুট করে জ্বলে ওঠা ফানুসের মতো দুপ করেই নিভে যায়। এই খ্যাতির মোহকে পদদলিত করতে না পারলে আর্টিস্ট হওয়া যায় না। আরও বলেছেন, যে জীবনে মোহই মুখ্য সে জীবনে সিদ্ধলাভ হয় না।

রঙের প্যালেট–১৩

তাই তো মুর্তজা বশীর অবিরাম কাজ করে গেছেন পাগলের মতো, এমনকি জীবন–মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেও কেবল কাজ নিয়েই ভেবেছেন। আমাদের মাঝে কাজের মধ্যেই বেঁচে থাকতে চেয়েছেন মৃত্যুঞ্জয়ী মুকুট মাথায় নিয়ে। এটাই ছিল তাঁর শেষ ইচ্ছা। তাঁর এই ইচ্ছাকেই প্রতিষ্ঠা করতে সম্প্রতি একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে গ্যালারি কায়া। বহুমাত্রিক এই প্রদর্শনীতে রয়েছে মুর্তজা বশীরের আঁকা অনেক চিত্রকর্ম, লিনোকাট, তাঁর সংগ্রহ করা মুদ্রা, তাঁকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন চিঠি, ভাস্কর্য, বই ইত্যাদি।

রঙের প্যালেট–৯

গ্যালারিতে ঢুকলেই মনে হবে শিল্পীর যাপিত জীবনের ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা অনুষঙ্গের স্মৃতিগুলো কুড়িয়ে এনে দেয়ালে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। গ্যালারি যেন স্মৃতির জাদুঘর, শিল্পীর রেখে যাওয়া জীবনের ফসিল পেয়ে মেলে ধরেছে তাঁর আপন স্রষ্টাকে।

শিল্পী মুর্তজা বশীর এমন একজন মানুষ, যিনি শুধু চিত্রশিল্পী নয় একজন ভাষাসংগ্রামী, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক আর গবেষকও। অনুভূতির প্রকাশে যখন যেমন তৃষ্ণা পেয়েছে তখন তেমন শিল্প শাখায় দ্বারস্থ হয়েছেন। তবে প্রথমত তিনি একজন চিত্রকর। ছবি এঁকেছিলেন আত্মমগ্ন হয়ে, নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন কাজে, রোজ যেমন প্রার্থনা করে মানুষ তেমন করে।

মুখ ও অবয়ব–৩

শিল্পী বহুবিধ গুণের অধিকারী। সাহিত্য সাধনায় লিখেছেন উপন্যাস, কবিতা, আত্মজীবনী। পাশাপাশি মুদ্রার ইতিহাস নিয়েও শিল্পী বেশ কৌতূহলী ছিলেন। এ বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বইও লিখেছেন। ইতিহাসের গভীর অরণ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন আলোর দিশা।

মুদ্রা নিয়ে জানতে গিয়ে একসময় শিল্পী নিজেই শৌখিন মুদ্রা সংগ্রাহক হয়ে উঠেছিলেন। বিভিন্ন দেশ থেকে তাঁর সংগ্রহ করা সেইসব সংগৃহীত মুদ্রা ও চাবির নান্দনিক রিং গ্যালারিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আত্মপ্রতিকৃতি

শিল্পী কালি ও কলমে এঁকেছেন নারীর কয়েকটি অবয়ব। রেখা দিয়েই নারীকে নন্দিত করেছেন সহজ ও সাবলীল ভঙ্গিতে। কিন্তু ‘সে’ নামক সিরিজটিতে বোঝা গেল না মুখগুলো একই নারীর নাকি বিভিন্ন জনের। হয়তো একই নারীকে বারবার এঁকেছেন ভিন্নভাবে।

আবার সেই রেখাতেই কী দুর্দান্ত গতিতে আঁচড় কেটে তৈরি করেন পুরুষের দেহ, তাঁর ‘ফিগার স্টাডি’ নামক ছবিটিতে।

মুচি বালক

ছাপচিত্রের বিভিন্ন মাধমেও তিনি কাজ করেছেন। লিনোকাট মাধ্যমে করা ‘মুচি বালক’ এবং ‘বিড়িওয়ালা’ নামক ছবিতে নিম্নশ্রেণির মানুষের কঠিন অস্তিত্ব ও সমাজের প্রতি তাদের আকুল আবেদন প্রকাশিত হয় তাদের মুখের অভিব্যক্তিতে।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে কাজ করা প্রথম দিকের শিল্পীদের মধ্যে মুর্তজা বশীর উল্লেখযোগ্য। তাই তো তাঁকে ভাষাসৈনিকও বলা হয়। ভাষা আন্দোলন নিয়ে ‘ব্লাডি ২১’ নামক ছবিটিও দেখা যায় এই প্রদর্শনীতে।

রক্তাক্ত ২১

তাঁর ছবির বিষয়গুলোর প্রকাশ বরাবরই সোজাসাপটা। জটিলতা এড়িয়ে গেছেন সব জায়গায়। তাঁর পাবলো পিকাসোকে নিয়েও বেশ কিছু কাজ এই প্রদর্শনীতে দেখা যায়।

প্রদর্শনীতে শিল্পীর আরেকটি মাত্রা যোগ হয়েছে। তা হলো ভাস্কর্য। শিল্পী পাথরের তৈরি ‘ফেস অ্যান্ড ফর্ম’ নামক একটি সিরিজ করেছেন ভাস্কর্যের। এ যেন একই মানুষের বহুমাত্রিক নন্দন প্রয়াস।

বিড়িওয়ালা

প্রদর্শনীতে তিনটি রঙের প্যালেটও প্রদর্শিত হয়েছে, মনে হচ্ছে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি, অভিজ্ঞতা এবং চিন্তাধারায় প্রকৃতি এবং এর রহস্য ধারণ করেছেন। প্যালেটে বিমূর্ততার স্বতন্ত্র প্রকাশ একটা আলাদা ভাষা তৈরি করেছে।

স্মৃতির গভীর অরণ্যে প্রতিফলিত হয় শিল্পীর আবেগ। তাঁর রংগুলো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে সেখানে। নরম রংতুলির স্ট্রোকে এমন একটি ভাষা প্রতিষ্ঠা করে, যা আমাদের কাছে অপরিচিত বলে মনে হয়।

সে–৩

তেজস্বী কণ্ঠে সর্বদা সত্য কথা বলা শিল্পী মুর্তজা বশীর নির্দ্বিধায়, নির্ভয়ে অন্য শিল্পীদের কাজ বা মানসিকতা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করতেন। কোনো প্রকার তোষামোদ ছাড়াই শিল্প রচনা করে গেছেন। যা কিছু সত্য তাকেই ধ্রুব মেনেছেন তিনি।

সে–৪

বাংলা একাডেমির স্বপ্নদ্রষ্টা, ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন তাঁর বাবা। কখনো সেই দম্ভও দেখাতেন না তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সুন্দরের ভেতর খুঁজেছেন সত্যকে।

ফিগার স্টাডি–১

গ্যালারি কায়া শিল্পভুবনে ব্যক্তিগত সফরে যা যা শিল্পী মুর্তজা বশীর অর্জন করেছেন, সেসব বহুমাত্রিক শিল্পকর্মগুলোর আংশিক—দর্শকদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।

চিত্র–২৫

পেইন্টিং, প্রিন্ট, ভাস্কর্য, কালার প্যালেট, ড্রয়িং, সংগৃহীত স্ট্যাম্প, মুদ্রা, কিছু বই যা তিনি লিখেছেন সেসব দর্শনে মুর্তজা বশীরকে আরেকবার আমরা ধারণ করলাম আমাদের মনে, সেই সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্কের উর্বর মাটিতে রোপিত হলো মুক্তির চারা গাছ।

নকশিকাঁথা বুনন

মুর্তজা বশীরের সৃষ্টিসম্ভার শিল্পের প্রভায় স্থান-কালের সীমানা ছাড়িয়ে কালজয়ী শিল্পের কাতারে স্থান করে দিয়েছে তাঁকে। ২২ আগস্ট থেকে শুরু এই প্রদর্শনী চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।