রাগা রহমানের শিল্পকর্ম অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
রাগা রহমানের শিল্পকর্ম অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

দৃশ্যকলা

দূরত্ব ও আত্মীয়তার মধ্যবর্তী ভূগোল

রাগা রহমানের একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনীটি দেখতে গিয়ে মনে হলো, এর মূল বিষয় পরিচয় নয়, বরং পরিচয়ের সঙ্গে দূরত্ব। শিল্পী যে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করেন এবং যে বাস্তবতায় বেড়ে উঠেছেন, এ দুইয়ের মধ্যে একটি ব্যবধান রয়েছে। তাঁর কাজের অনেক প্রশ্ন সেই ব্যবধানকে ঘিরেই।

রাগা রহমানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা জার্মানিতে। শিল্পশিক্ষা ও বৌদ্ধিক বিকাশও মূলত ইউরোপীয় পরিসরে। বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক পারিবারিক সূত্রে। তাঁর বাবা একজন বাংলাদেশি শিল্পী। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর সংযোগ সরাসরি বসবাসের অভিজ্ঞতার নয়, বরং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সাংস্কৃতিক স্মৃতি, গল্প ও কল্পনার মধ্য দিয়ে নির্মিত। তবে এই দূরত্ব সত্ত্বেও বাংলাদেশের সাহিত্য, শিল্প ও দর্শনচিন্তার সঙ্গে তাঁর পরিচয় বিচ্ছিন্ন নয়। পারিবারিক পরিবেশে, বিশেষত তাঁর বাবার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্য, শিল্প-ঐতিহ্য ও বাঙালি বৌদ্ধিক পরম্পরার নানা ধারার সংস্পর্শে এসেছেন। ফলে তাঁর কাজে বাংলাদেশ কোনো পরিচিত ভূগোল হিসেবে নয়, বরং আংশিকভাবে জানা, আংশিকভাবে কল্পিত ও উত্তরাধিকারসূত্রে অনুভূত এক সাংস্কৃতিক পরিসর হিসেবে উপস্থিত হয়। প্রদর্শনীর নাম ‘আনফ্যামিলিয়ার অ্যাফিনিটি’ (অপরিচিত আত্মীয়তা’ এ অবস্থানকেই ধারণ করে।

‘ডের হিমেল উবার ঢাকা’ আলোকচিত্রমালার একটি, রাগা রহমান

প্রদর্শনীতে আলোকচিত্র, চলচ্ছবি, শব্দ ও স্থাপনাশিল্প একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এই বহুমাধ্যমিক বিন্যাসের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিল্পীর দেখার পদ্ধতি। তিনি বিষয়কে ব্যাখ্যা করেন না; বরং পর্যবেক্ষণ করেন। ঘোষণা করেন না; বরং প্রশ্ন তোলেন। তাঁর শিল্পচর্চা মূলত সম্পর্ক অনুসন্ধানের—মানুষ ও প্রকৃতির, স্মৃতি ও শরীরের, কিংবা উত্তরাধিকার ও অভিজ্ঞতার সম্পর্ক।

এই প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্ট ‘ডের হিমেল উবার ঢাকা’ আলোকচিত্রমালায়। ছবিগুলোতে ঢাকা শহরকে রাস্তার স্তর থেকে দেখা হয়নি। ক্যামেরা অবস্থান করছে ছাদের ওপর বা উঁচু কোনো পর্যবেক্ষণবিন্দুতে। ফলে মানুষগুলো আর ছবির প্রধান চরিত্র থাকে না; বরং বৃহত্তর নগর-পরিসরের ক্ষুদ্র উপাদানে পরিণত হয়। কোথাও শিশুর খেলা, কোথাও শুকাতে দেওয়া কাপড়, কোথাও বিকেলের অবসর। ছবিগুলোর আকর্ষণ ঘটনাবহুলতায় নয়, বরং দূরত্বে।

‘লগ লেডি অ্যান্ড আদার টেলস’ ভিডিওচিত্রের অংশ, রাগা রহমান

এই আলোকচিত্রমালার ক্ষেত্রে ভলফগাং টিলমান্সের সঙ্গে একটি ফলপ্রসূ তুলনা করা যেতে পারে। টিলমান্সের মতোই রাগা রহমানও শহরকে কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনার স্থান হিসেবে নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনযাপনের বহুমাত্রিক পরিসর হিসেবে দেখেন। তবে টিলমান্স যেখানে নিজের পরিচিত জগতের অন্তর্গত পর্যবেক্ষক, রাগা রহমান সেখানে এমন এক ভূগোলের দিকে তাকান, যার সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তা রয়েছে, কিন্তু সম্পূর্ণ অন্তর্ভুক্তি নেই। এই দ্বৈত অবস্থানই তাঁর ছবিগুলোকে একই সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও দূরবর্তী করে তোলে।

‘দ্য উডেন কয়্যার’ স্থাপনাশিল্পের অংশ, রাগা রহমান

প্রদর্শনীর অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ ‘মশা মারার জন্য কামান দাগা’। শিরোনামেই একটি অসম অনুপাতের ইঙ্গিত রয়েছে—একটি ক্ষুদ্র প্রাণীকে হত্যা করতে কামান ব্যবহার করার ধারণা। কাজটি নির্মিত হয়েছে ঢাকার মশকনিধন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে। ফগিং মেশিনের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রাস্তা, গলি ও আবাসিক এলাকা এমনভাবে ধারণ করা হয়েছে যে পরিচিত নগরদৃশ্য ধীরে ধীরে স্বপ্নময় ও ভুতুড়ে অভিজ্ঞতায় রূপ নিতে শুরু করে। কাজটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এর অদৃশ্য প্রতিপক্ষ। মশা এখানে প্রায় অনুপস্থিত; কিন্তু সেই অনুপস্থিতিই পুরো কাজটিকে নিয়ন্ত্রণ করে। বৈদ্যুতিক মশার ব্যাট, যুদ্ধকলার ভঙ্গি ও ভিডিও গেমের নান্দনিকতার প্রতি ইঙ্গিত মশকনিধনের প্রক্রিয়াকে একধরনের পারফরমেটিভ সংঘর্ষে রূপান্তরিত করে। মানুষ যেন এমন এক শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করছে, যাকে দেখা যায় না, কিন্তু যার উপস্থিতি সর্বত্র অনুভূত। এ কাজের ক্ষেত্রে থাই শিল্পী ও চলচ্চিত্রকার আপিচাতপং উইরাসেতাকুলের কথা মনে পড়ে। ফগিং মেশিনের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন নগরদৃশ্য, অদৃশ্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই এবং দৈনন্দিন বাস্তবতার ধীরে ধীরে স্বপ্নময় ও অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতায় রূপান্তর—এসব উপাদান আপিচাতপংয়ের কাজের কিছু পরিচিত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সংলাপ তৈরি করে।

‘মাই বডি ইজ আ ব্ল্যাঙ্কেট’ ভিডিওচিত্রের অংশ, রাগা রহমান

তবে রাগা রহমানের আগ্রহ নগর ব্যবস্থাপনা বা জনস্বাস্থ্যনীতির সমালোচনায় নয়। বরং তিনি মশকনিধনের মতো একটি পরিচিত নগর-অনুশীলনকে এমন এক অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করেন, যেখানে মানুষ অদৃশ্য উপস্থিতির সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করছে। এই অদৃশ্য উপস্থিতি প্রদর্শনীর অন্যান্য কাজেও ফিরে আসে—কখনো স্মৃতি হিসেবে, কখনো উদ্ভিদের ভাষা হিসেবে, কখনো উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত কিন্তু সম্পূর্ণভাবে জানা যায় না—এমন এক সাংস্কৃতিক জগতৎ হিসেবে।

প্রদর্শনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘লগ লেডি অ্যান্ড আদার টেলস’। এখানে গাছকে কেবল প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে দেখা হয়নি। চলমান বয়ান, শব্দ, স্মৃতি ও উদ্ভিদবিষয়ক চিন্তার সমন্বয়ে গাছ একধরনের সক্রিয় উপস্থিতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। অ্যাড্রিয়েন মেরি ব্রাউনের ইমার্জেন্ট স্ট্র্যাটেজি এবং জগদীশচন্দ্র বসুর উদ্ভিদ-সংবেদনবিষয়ক গবেষণার সূত্র ধরে শিল্পী মানুষ ও অমানবিক জগতের সম্পর্ককে নতুনভাবে ভাবার চেষ্টা করেন। জগদীশচন্দ্র বসুকে তিনি কোনো জাতীয় গৌরবের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন না; বরং তাঁর ভাবনাকে সমকালীন প্রশ্নের মধ্যে পুনর্বিন্যস্ত করেন। ফলে ঐতিহ্য এখানে স্মারক নয়, চিন্তার উপাদান।

একই প্রবণতা দেখা যায় ‘দ্য উডেন কয়্যার’ কাজটিতেও। কাঠ, শব্দ ও প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্পী উদ্ভিদের সম্ভাব্য উপস্থিতিকে শ্রাব্য অভিজ্ঞতায় রূপ দেন। দর্শককে যেন আমন্ত্রণ জানানো হয় এই প্রশ্ন ভাবতে—যদি উদ্ভিদও একধরনের ভাষা বহন করে, তবে আমরা কি তা শুনতে প্রস্তুত?

এই দুই কাজকে জুমানা মান্নার শিল্পচর্চার আলোকে পড়া যেতে পারে। মান্নার মতোই রাগা রহমান উদ্ভিদ, পরিবেশ ও জ্ঞান উৎপাদনের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে আগ্রহী। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, লোকজ অভিজ্ঞতা ও অমানবিক সত্তার সম্ভাব্য উপস্থিতিকে তিনি একই আলোচনার পরিসরে নিয়ে আসেন। তবে তাঁর কাজ কোনো নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে চায় না; বরং মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা কল্পনা করার ক্ষেত্র তৈরি করে।

অন্যদিকে ‘মাই বডি ইজ আ ব্ল্যাঙ্কেট’ প্রদর্শনীর সবচেয়ে সংযত অথচ আবেগঘন কাজগুলোর একটি। একটি কম্বল ভাঁজ করার পুনরাবৃত্ত ক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্ছবিতে ঘটনাপ্রবাহ প্রায় অনুপস্থিত। কিন্তু সেই অনুপস্থিতিই কাজটির শক্তি। কম্বলটি কখনো শরীরের সম্প্রসারণ, কখনো স্মৃতির বাহক, কখনো আবার গৃহস্থালি জীবনের নীরব চিহ্নে পরিণত হয়। ধীর গতি, পুনরাবৃত্তি ও শরীরের অঙ্গভঙ্গি ধীরে ধীরে স্মৃতি ও উত্তরাধিকারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।

এ কাজের ক্ষেত্রে শাঁতাল আকারমানের কথা মনে পড়ে। আকারমান যেমন গৃহস্থালি জীবনের পুনরাবৃত্ত ও আপাত সাধারণ ক্রিয়াকলাপের মধ্যে স্মৃতি, সময় ও মানসিক অভিজ্ঞতার স্তরগুলো উন্মোচন করেন, রাগা রহমানও একটি কম্বল ভাঁজ করার অঙ্গভঙ্গিকে শরীর, উত্তরাধিকার ও ভাষাহীন অনুভূতির বাহকে পরিণত করেন। এখানে স্মৃতি কোনো আর্কাইভ বা দলিল নয়; বরং শরীরে বহন করা এক অনুভূত অভিজ্ঞতা।

সমকালীন শিল্পে এমন বহু শিল্পী আছেন, যাঁদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও ব্যক্তিগত জীবন-অভিজ্ঞতা একই ভূগোলে অবস্থিত নয়। রাগা রহমানের কাজ সেই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ। তবে তিনি পরিচয়ের কোনো সরল ঘোষণা নির্মাণ করেন না। তাঁর কাজে বাঙালিত্বের উদ্‌যাপন নেই, আবার শিকড়ের রোমান্টিক অনুসন্ধানও নেই। বরং দেখা যায় এমন একজন মানুষের প্রচেষ্টা, যিনি একটি উত্তরাধিকার বহন করছেন, কিন্তু সেই উত্তরাধিকার তাঁর কাছে একই সঙ্গে পরিচিত ও অপরিচিত।

‘আনফ্যামিলিয়ার অ্যাফিনিটি’ শিরোনামের এই একক প্রদর্শনী শেষ পর্যন্ত পরিচয় সম্পর্কে কোনো প্রস্তুত বক্তব্য দেয় না। বরং আত্মীয়তা, দূরত্ব, স্মৃতি, শরীর ও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের ধারণাগুলোকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। রাগা রহমানের আগ্রহ শিকড় খুঁজে পাওয়ার মধ্যে নয়; বরং শিকড় সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করার মধ্যে। প্রদর্শনীটির গুরুত্বও সম্ভবত সেখানেই।

প্রদর্শনীটি গত ১৩ জুন লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে শুরু হয়েছে। ওয়াকিলুর রহমানের কিউরেট করা এই প্রদর্শনী চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এটি দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে।