প্রদর্শনীর একটি চিত্রকর্ম অবলম্বনে
প্রদর্শনীর একটি চিত্রকর্ম অবলম্বনে

প্রদর্শনী

আগুনমুখো ছবি নিয়ে ‘অনল কাব্য’

গ্যালারি চিত্রকে শিল্পী শেখ মেহেদী কামালের একক চিত্র প্রদর্শনী ‘অনল কাব্য’ চলবে আগামী ২২ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা তিনটা থেকে রাত আটটা অবধি।

দুনিয়াজুড়েই চারুশিল্পীর চিত্রপটে কত শত পরীক্ষা–নিরীক্ষার ঢল! বাংলাদেশের চারুশিল্পও এর বাইরে নয়। আমাদের দেশের নবীন ও তরুণদের মধ্যে নানা নিরীক্ষার প্রবণতা আমরা লক্ষ করছি গত শতকের শেষের তিন দশক থেকে।

গত শতকের নব্বই দশকের শিল্পী মেহেদী কামাল নিরীক্ষাপ্রবণ এই শিল্পীদলেরই একজন। ১৯৭৩ সালে জন্মগ্রহণকারী মেহেদী গত শতকের শেষার্ধ্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। কর্মজীবনে গ্রাফিক ডিজাইনের নানাবিধ কাজ শিখেছেন, কাজ করেছেন বিজ্ঞাপনী সংস্থা থেকে মিডিয়ায়। দেশ টিভির শিল্পনির্দেশক ছিলেন ১০ বছরাধিককাল। এসবের পাশাপাশি ছবি আঁকায় প্রায় নিয়মিতই নিয়োজিত থেকেছেন!

জলরঙে চিত্রাঙ্কনে মেহেদী কামালের বিশেষ দক্ষতা দেখেছি। এ ক্ষেত্রে নিজেকে তৈরি করতে তিনি জলরঙের দক্ষ শিল্পী অলোকেশ ঘোষের সঙ্গে দিনের পর দিন বহিরাঙ্গনে গিয়ে জলরঙে প্রকৃতির ছবি এঁকেছেন। ফলে নিসর্গ চিত্র আঁকায় তাঁর সাবলিলতা আমাদের চোখে পড়েছে দলীয় প্রদর্শনী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেওয়ায়।

জলরঙে চিত্রাঙ্কনে মেহেদী কামালের বিশেষ দক্ষতা দেখেছি। এ ক্ষেত্রে নিজেকে তৈরি করতে তিনি জলরঙের দক্ষ শিল্পী অলোকেশ ঘোষের সঙ্গে দিনের পর দিন বহিরাঙ্গনে গিয়ে জলরঙে প্রকৃতির ছবি এঁকেছেন। ফলে নিসর্গ চিত্র আঁকায় তাঁর সাবলিলতা আমাদের চোখে পড়েছে দলীয় প্রদর্শনী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেওয়ায়।

শিল্পী এখন যে দুটি মাধ্যমে নিরীক্ষা করছেন ও আঁকছেন, সে দুটি আমাদের দেশে তেমন প্রচলিত নয়। এর একটি শক্ত বা মোটা কাগজে বিশেষ রাসায়নিক প্রয়োগ করে লোহার চাতাল বা নিডল দিয়ে রেখাঙ্কনে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতে হয়। এই মাধ্যমটিকে বলে পাইরোগ্রাফ। এটি সাধারণত নরম কাঠ ও চামড়ায় নকশাঙ্কনে ব্যবহার করা হয় শত শত বছর আগে থেকে।

অনলে প্রকৃতি/ কাগজে পোড়া পদ্ধতি

আরেকটি মাধ্যম আরও অপ্রচলিত, অনেকটা জলরঙের কায়দায় তাতে চিত্রাঙ্কন এবং ওয়াশ দিয়ে টোনের বিভিন্নতা তৈরি করতে হয়। অদ্ভুত ব্যাপার, ওই দুটি ক্ষেত্রেই গোটা প্রক্রিয়াটি দৃশ্যমান হয় কাগজে আগুনের আঁচ প্রয়োগ করার পর। পরিমার্জনার সুযোগ ওতে প্রায় নেই বললেই চলে, ফলে চিত্রপটে যতটা ইফেক্ট এবং রেখার গতিবিধি দেখা যায় তাই নিয়ে চিত্রের পূর্ণতা আসে। খানিকটা পুরু কাগজে আগ্নেয়তাপে পোড়া পোড়া ইফেক্টে যে রূপ ফুটে ওঠে এর সঙ্গে খানিকটা মিল পাওয়া যায় মনোক্রম রঙে এচিং অ্যাকোয়াটিন্ট প্রিন্টের বর্ণাভার, তবে আগুনের উত্তাপে দৃশ্যমান ছবির যে অবয়ব গড়ে ওঠে তা একেবারেই আলাদা!

‘অনল কাব্য’ শিরোনামেই তাঁর অধিকাংশ চিত্রকর্ম প্রদর্শন হচ্ছে। এই শিরোনাম তিনি বেছে নিয়েছেন, কারণ আগ্নেয়তাপে চিত্রপটে ক্রমান্বয়ে প্রস্ফুটিত হওয়া চিত্ররূপ তাঁর কাছে কবিতার মতো অনুভূতি নিয়ে এসেছে। আবার ‘আগুনপাখি’ নামের চিত্রকর্ম যেন রূপকথার গল্পের সেই ‘শুকশারি’র কথা মনে করিয়ে দেয়।

চিত্রমাধ্যমের এই অভিনবত্বের সঙ্গে শিল্পবোদ্ধা ও দর্শকের পরিচয় আরও ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ হচ্ছে আসন্ন ১৪ অক্টোবর থেকে নয় দিনব্যাপী গ্যালারি চিত্রকে ‘অনল কাব্য’ শিরোনামে সপ্তাহব্যাপী আয়োজিত শিল্পী মেহেদী কামালের দ্বিতীয় একক প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে। বিশিষ্ট শিল্পী অধ্যাপক নিসার হোসেন এ প্রদর্শনীর কিউরেটর।

মুখাবয়ব/ কাগজে পোড়া পদ্ধতি

আগুন তাপের মাধ্যমে প্রায় কাছাকাছি করণকৌশলে ছবি এঁকে হাত পাকিয়েছেন শিল্পী রেজাউল হক লিটন। তবে মেহেদীর ভাষ্যানুযায়ী তাঁদের দুই শিল্পীর ব্যবহৃত উপকরণ ও প্রয়োগ কৌশল অনেকটাই আলাদা।

‘অনল কাব্য’ শিরোনামেই তাঁর অধিকাংশ চিত্রকর্ম প্রদর্শন হচ্ছে। এই শিরোনাম তিনি বেছে নিয়েছেন, কারণ আগ্নেয়তাপে চিত্রপটে ক্রমান্বয়ে প্রস্ফুটিত হওয়া চিত্ররূপ তাঁর কাছে কবিতার মতো অনুভূতি নিয়ে এসেছে। আবার ‘আগুনপাখি’ নামের চিত্রকর্ম যেন রূপকথার গল্পের সেই ‘শুকশারি’র কথা মনে করিয়ে দেয়।

‘অনলে প্রকৃতি’ নামে শিল্পী মানুষ, প্রকৃতি ও পরিবেশ এঁকেছেন, যেখানে প্রকৃতি আমাদের দেখার অভিজ্ঞতার চেয়ে ভিন্ন রকম, মানুষও সেখানে ঠিক কাঠামোগত নয়, মানবাকৃতির ন্যায়। পোড়া পদ্ধতিতে করা কাজ বলেই মানুষে ও নিসর্গে এরূপ ভিন্নতা ধরা পড়েছে মেহেদীর এসব চিত্রভাষ্যে।

শিল্পী পোড় খাওয়া মানুষের দেহ মনের কষ্টের অনুভূতি খিন্ন শরীরে এবং অবয়বে ধারণের চেষ্টা করেছেন একের পর এক চিত্রপটে। ‘পোড়া দেহ’ ও ‘পোড়া মন’ শিরোনামের চিত্রকর্মে আমরা শিল্পীর এই অনুভবকে স্পর্শ করতে পারি।

অবয়ব/ কাগজে পোড়া পদ্ধতি

‘আগুনের পরশমণি’ শীর্ষক চিত্রকর্মে পিঠে ভারী বোঝাসহ গ্রীবা উঁচু এক ঘোড়ার প্রতীকে মেহনতি মানুষের নিত্যদিনের জীবনসংগ্রামকে চিত্রিত করেছেন শিল্পী। এই কষ্টকল্পনায় মানুষের আবেগকে স্পর্শ করার শৈল্পিক দৃঢ়তাই তো রবীন্দ্রনাথের গানের ভাষায় প্রাণের আবেগে সেই মাঙ্গলিক আওয়াজে নিহিত হয়ে আছে—

‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে

এ জীবন পুণ্য করো দহন–দানে।।’

চারুশিল্পের সমকালীন পরিসরে শিল্পী মেহেদী কামালের নতুন ধরনের এই নিরীক্ষামূলক নিবেদন—আগুনমুখো ছবিগুলো দর্শক ও শিল্পবোদ্ধাদের কাছে আদরণীয়ই হোক। কারণ, শিল্প সব সময় চির নূতনের পথেই তার মুক্তির অনুসন্ধান করে।

‘অনল কাব্য’ শিরোনামের এই প্রদর্শনী চলবে আগামী ২২ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা তিনটা থেকে রাত আটটা অবধি।