‘দীনেশচন্দ্র সেন ও লোককাহিনীর মঞ্চ–পরিবাহণ’ বইয়ের প্রচ্ছদ অবলম্বনে
‘দীনেশচন্দ্র সেন ও লোককাহিনীর মঞ্চ–পরিবাহণ’ বইয়ের প্রচ্ছদ অবলম্বনে

লোক–ঐতিহ্যের আলোকমঞ্চে নতুন পাঠ

বাংলার সমৃদ্ধ লোকজ জীবনের অন্যতম উপাদান লোককাহিনি বা পালাগান। সামাজিক, পারিবারিক বা ব্যক্তিক আনন্দদানের পাশাপাশি এতে যুক্ত থাকে প্রাচীন লোকশিক্ষা ও নীতিকথার উপাদান। লোককাহিনির বিষয়ে বেদনা, হাস্যরস, অলৌকিকতা, প্রেমের প্রগাঢ়তাসহ লোকজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নানা বিষয় থাকতে পারে। বাংলার আদি গ্রাম্য রূপকে তুলে ধরে বলে দীনেশচন্দ্র সেনের মৈমনসিংহ গীতিকা সংকলন বিস্মিত করেছিল সবাইকে। সময়ের ধারাহিকতায় গীতিকার পালাগুলো নিয়ে নানা রকম নিরীক্ষা হয়েছে। লোকজজীবনভেদে এগুলোর মঞ্চায়ন ছিল গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী। হাজার বছর ধরে লোকসমাজে চর্চিত কৃষ্টি ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহন করলেও নাগরিক মঞ্চে পালাগুলোর মঞ্চায়নে এসেছে পরিবর্তন। মৈমনসিংহ গীতিকার সম্পাদক দীনেশচন্দ্র সেন এবং তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য তিনটি পালাগানের মঞ্চ পরিবাহণের ধারাবাহিক প্রকাশ আলোচ্য গ্রন্থটি।

গ্রন্থটিকে পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে লেখক দীনেশচন্দ্র সেনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। ভুলতে বসা বাঙালিয়ানার স্বকীয় চিহ্ন পালাগুলোকে সুধী সমাজের আগ্রহের বিষয় করে তোলায় তাঁর অবদান সর্বাগ্রে। দীনেশচন্দ্র সেনের বেড়ে ওঠার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল সাহিত্য ও লোকসাহিত্যের নানা উপাদান। ফলে পরবর্তী জীবনে তিনি বাংলার ইতিহাস ও সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

গ্রন্থটিকে পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে লেখক দীনেশচন্দ্র সেনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। ভুলতে বসা বাঙালিয়ানার স্বকীয় চিহ্ন পালাগুলোকে সুধী সমাজের আগ্রহের বিষয় করে তোলায় তাঁর অবদান সর্বাগ্রে। দীনেশচন্দ্র সেনের বেড়ে ওঠার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল সাহিত্য ও লোকসাহিত্যের নানা উপাদান। ফলে পরবর্তী জীবনে তিনি বাংলার ইতিহাস ও সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে দীনেশচন্দ্র সেনকে ‘নাবিকের বাতিঘর’ বলে আখ্যায়িত করে বাংলা ভাষা, লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতিতে লেখকের অবদানকে স্পষ্ট করেছেন। তবে আলোচ্য গ্রন্থে তাঁর লোক-গবেষণাবিষয়ক কর্মকীর্তির তাৎপর্যপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে মৈমনসিংহ গীতিকা, পূর্ববঙ্গ গীতিকা নামের চার খণ্ডের বইটি সম্পর্কে আলোচনা করে তাঁকে আধুনিক, বঙ্গদরদি ও বিজ্ঞানমনস্ক গবেষক বলেছেন। তবে সংগ্রহের সীমাবদ্ধতার কারণে এসব পালাগানের উপস্থাপনরীতির অনুপস্থিতির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ ছিল লেখকের অন্যতম লক্ষ্য।

তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে মলুয়া লোককাহিনির নগরকেন্দ্রিক পরিবেশনারীতি। পরিবেশনায় ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থীরা। প্রযোজনা পাণ্ডুলিপি রচনা করা হয় বন্দনা, কাহিনি ও সমাপনী—তিন অংশে। এ ক্ষেত্রে এর সম্পাদনা, ভাষাশৈলী, পোশাক, সংগীত নির্মাণে শহরকেন্দ্রিক মঞ্চনাটকের অভ্যস্ততাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

চতুর্থ অধ্যায়ে চন্দ্রাবতী পালাগানের গায়েন ও উপলক্ষভেদে পরিবেশনার ভিন্ন রূপ দৃষ্টিগোচর হয়। মূল পাণ্ডুলিপি ও প্রযোজনা পাণ্ডুলিপির মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে তিনজন গবেষকের সংগ্রহ গ্রহণ করায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৮ সালে যখন এর মঞ্চায়ন করা হয়, তখন ইউরোপীয় রীতির থিয়েটারচর্চার আলো, পোশাক ও চরিত্রের প্রবেশ-প্রস্থান নেওয়া হয়েছে শহরকেন্দ্রিক।

পঞ্চম অধ্যায়ে মহুয়া পালার তিনটি পাঠ সংগ্রহ করে তা থেকে নবনাটলিপি তৈরি ও প্রযোজনার নানা পর্যায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নবনাটলিপিতে দৃশ্য ও চরিত্রের পরিবর্তন আনা হয়েছে। মহুয়া পালার মঞ্চ পরিবাহণে পোশাক ও আলোর ব্যবহারে আধুনিক থিয়েটারের করণকৌশলকে আশ্রয় করা হয়েছে।

পঞ্চম অধ্যায়ে মহুয়া পালার তিনটি পাঠ সংগ্রহ করে তা থেকে নবনাটলিপি তৈরি ও প্রযোজনার নানা পর্যায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নবনাটলিপিতে দৃশ্য ও চরিত্রের পরিবর্তন আনা হয়েছে। মহুয়া পালার মঞ্চ পরিবাহণে পোশাক ও আলোর ব্যবহারে আধুনিক থিয়েটারের করণকৌশলকে আশ্রয় করা হয়েছে।

বইটির পরিশিষ্ট অংশে আলোচিত তিনটি পালাগানের প্রযোজনার আলোকচিত্র যুক্ত  করা হয়েছে। ইতিহাস ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও উপাত্তের নির্ভরযোগ্য উৎস মলুয়া, মহুয়া কিংবা চন্দ্রাবতীর পালা। এসব কাহিনি ঘিরে গড়ে ওঠা পালাগানগুলো যুগে যুগে বাংলার প্রাকৃত মানুষকে বিনোদনের খোরাক জুগিয়েছে। বর্তমানে পালাগানগুলোর নাট্য পরিবেশনা শহুরে জীবনের অবকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিনোদনক্রিয়ায় রূপ নিয়েছে। প্রযোজনা, পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা, চরিত্র সংযোজন-বিয়োজন, আলোর ব্যবহার এবং মঞ্চ নির্দেশনায় ব্যবহৃত হয় দর্শককে আকৃষ্ট করার কায়দা। সেসব সূক্ষ্ম দিকের পরিমিত বর্ণনায় লেখক পারদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন। আধুনিক যুগেও মানুষের আগ্রহের বিষয় হয়ে আছে লোককাহিনি বা পালাগানের মঞ্চায়ন। অদূর ভবিষ্যতেও নব নব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে লোকসাহিত্য মানুষের মনে স্বতন্ত্র জায়গা করে নেবে—এ আশা করাই যায়।

দীনেশচন্দ্র সেন ও লোককাহিনীর মঞ্চ–পরিবাহণ

লেখক: ইউসুফ হাসান অর্ক

প্রকাশক: বাংলা একাডেমি

প্রকাশ:এপ্রিল ২০২৫

প্রচ্ছদ: অভিজিৎ চৌধুরী

পৃষ্ঠা: ১৬৮, মূল্য: ৪৪০ টাকা