
বই নিয়ে যে কত কিছু জানার আছে, তা সবার কাছে সহজবোধ্য করে তুলে ধরার কাজটি সম্ভবত বাংলাদেশে এভাবে আগে কেউ করেননি। বইয়ের সঙ্গে যেসব পক্ষ জড়িত—লেখক, প্রকাশক, বিক্রেতা, গ্রন্থাগারিক, ভোক্তা ও পাঠক, বইপাঠ আন্দোলনের সংগঠক ও সংগঠন, বইয়ের প্রদর্শনী বা বইমেলা, সরকার ও বেসরকারি নীতিনির্ধারক—সবার ভূমিকার বিবরণ ও বিশ্লেষণ আছে এতে। এমন তিনটি ধারাবাহিক বইয়ের সর্বশেষ অর্থাৎ তৃতীয় বইটি প্রকাশ পেয়েছে। বইবিষয়ক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বিচারে বইটির লেখক গ্রন্থবিশারদ বদিউদ্দিন নাজির তাঁর যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। আগের দুটির মতোই তাঁর তৃতীয় বই বাংলাদেশে গ্রন্থ উন্নয়ন প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ।
বদিউদ্দিন নাজিরের প্রথম বই বই লেখায় লেখকের প্রস্তুতি, যা লেখালেখিতে আগ্রহীদের থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠিত লেখকদের কাছেও দারুণ সমাদৃত হয়েছে। লেখকের লেখার কৌশল বা ভঙ্গি, ভাষার ব্যবহার ও অজানা তথ্যসম্ভার—এগুলোই হয়তো পাঠককে আকৃষ্ট করে থাকবে।
বদিউদ্দিন নাজিরের দ্বিতীয় বই বাংলাদেশে গ্রন্থ প্রকাশনা আমাদের দেশের প্রকাশনা খাতের একটি অনন্য দলিল। অনেকেই এই খাতকে শিল্প হিসেবে বর্ণনা করলেও বইটি পড়লেই বোঝা যাবে এত বছরেও কেন এটি শিল্প হয়ে উঠতে পারেনি। লেখক আমাদের ভূখণ্ডে বাংলা ভাষায় বই ছাপানোর ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলোর ওপর আলোকপাত করে ঢাকায় কবে, কীভাবে এর সূচনা হয়েছে—তা বলেছেন গল্পের মতো করে। এই বইয়ে ব্রিটিশ আমলের পূর্ব বাংলা, পরে পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের বই প্রকাশের ইতিহাসের খুঁটিনাটি উদ্ধৃত হয়েছে প্রকাশনা শিল্পের দুর্বলতা, সংকটের উৎস, প্রকৃতির ব্যাপ্তি ও গভীরতা বোঝাতে। বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের চার পথিকৃৎ হাজী মহিউদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ মোসলেম খান, চিত্তরঞ্জন সাহা ও মহিউদ্দিন আহমদের উদ্যোগ ও সাফল্য–ব্যর্থতার অনেক অজানা কথা আছে বইটিতে।
বইবিষয়ক ধারাবাহিক বই তিনটি যেমন একেবারে নিখাদ গবেষণা গ্রন্থ নয়, তেমনি স্মৃতিচারণাও নয়। বরং এ দুইয়ের চমৎকার মিশ্রণ। গবেষণার তথ্যভান্ডারের সহায়তায় এটি এতটাই সমৃদ্ধ যে এর কোনো তথ্যই শুধু স্মৃতিনির্ভর নয়, যাতে বিস্মৃতি ও বিকৃতির ঝুঁকি থাকে। আবার বর্ণনার ধারা এমনই যে জীবনীগ্রন্থের স্মৃতিবর্ণনার মতো তা সুখপাঠ্য।
সদ্য প্রকাশিত বাংলাদেশে গ্রন্থ উন্নয়ন বইটিতে এমন অনেক কাহিনিই আছে, যা না পড়লে সরকারের নানা সিদ্ধান্তের নেপথ্যের অনেক চমকপ্রদ তথ্য অজানাই থেকে যাবে। জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র সেগুনবাগিচায় মৎস্য ভবনের জায়গায় না হয়ে গুলিস্তানে কেন হলো? এই প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারি জমি পেতে বহু বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা প্রয়াত রাজনীতিক তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের ভূমিকা কতটা ছিল? বাংলা একাডেমির ওপর আমলাদের যে গভীর নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং তাঁদের মধ্যে দাপুটে দু-একজন যে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রকে একাডেমিতে আত্তীকৃত করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন, তা-ও আমাদের জানার কথা নয়। সেটা ঠেকাতে আটরশির পীরের সহায়তার দরকার পড়েছিল কেন? শেষ পর্যন্ত সামরিক শাসক এরশাদের ‘কনক প্রদীপ জ্বালো’ কবিতা কীভাবে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় কাজে এসেছিল, তারও প্রত্যক্ষ বিবরণ মেলে বইটিতে। জাতীয় গ্রন্থনীতি তৈরি কিংবা লাইব্রেরিকেন্দ্রিক পাঠাভ্যাস চর্চার আন্দোলন গড়ে তোলার মতো বিষয়গুলোয় সরকার, নীতিপ্রণেতা, শিক্ষাবিদ ও প্রকাশনা শিল্পের বিশিষ্টজনদের নানা রকম ইতি ও নেতিবাচক ভূমিকার প্রত্যক্ষদর্শী অথবা একজন অংশগ্রহণকারীর ভাষ্য মিলবে এই বইয়ে।
এখন প্রতিবছর একুশের বইমেলা যে আবেগের প্রতীক হয়ে উঠেছে এবং রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার জন্ম দিচ্ছে, সেই বইমেলার শুরু ও রূপান্তরের ধারাবাহিক চিত্রও বইটিতে পাওয়া যায়। বইমেলায় দলবদ্ধ দঙ্গলবাজির হুমকি নিয়ে এখন যে ধরনের আলোচনা শোনা যায়, তা যে স্বাধীনতার প্রথম দিকেও ছিল, তা–ও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি। আমেরিকাবিরোধী রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টলে হামলা, কিংবা বইমেলায় কবিতাপাঠের আসরে কোন কবির আমন্ত্রণ পাওয়া বা না পাওয়ায় কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, সেসবের কিছু নজির আছে বইটিতে।
উপজেলা স্তরে গণগ্রন্থাগারগুলো নিয়ে সরকারের প্রকল্প পরিত্যক্ত হওয়ায় লেখকের হতাশার কথাও এতে আছে। মানুষকে বইমুখী করা এবং একই সঙ্গে দেশের প্রকাশনাশিল্পকে উৎসাহিত করার প্রয়োজনীয়তার একটা তাগিদ বদিউদ্দিন নাজিরের বইয়ে অনুভূত হয়। নতুন সরকার বইয়ের প্রসারের জন্য কিছু উদ্যোগ নিচ্ছে বলে যখন ইঙ্গিত মিলছে, তখন নীতিনির্ধারকদের এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
...
বাংলাদেশে গ্রন্থ উন্নয়ন
বদিউদ্দিন নাজির
প্রকাশক: কথাপ্রকাশ
প্রকাশ: এপ্রিল ২০২৬
প্রচ্ছদ: হাশেম খান
পৃষ্ঠা: ২৫৬; মূল্য: ৬০০ টাকা