বইপত্র

যুগান্তকারী নেতৃত্বের প্রস্তুতিপর্বের খতিয়ান

তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক মানস গঠনে ছাত্রজীবন থেকেই যে চিন্তার বীজ রোপিত হয়েছিল, তা পরবর্তীকালে জাতির প্রয়োজনে মহিরুহে পরিণত হয়। এস ওয়াজেদ আলীর মতে, জনগণের মধ্যে আত্মীয়তাবোধ ও আদর্শ না থাকলে বড় কোনো জাতীয় কর্মসাধন সম্ভব নয়—এই বোধ তাজউদ্দীনের চিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিকে কেবল সংগ্রামের মাধ্যম নয়, বরং মানুষের মুক্তি ও আত্মবিকাশের পথ হিসেবে দেখেছিলেন। জাতির মননে মিলন-বিরোধ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, পতন ও নবজাগরণের যে চিরন্তন ধারা, তাজউদ্দীন তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাই পরবর্তী সময়ে তিনি জনগণের মধ্যে চেতনার নবজাগরণ ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে রূপ দেন গণমানুষের সংগ্রামে। তাঁর বুদ্ধিমত্তা, সুশৃঙ্খল মনন ও দৃঢ় কর্তব্যবোধ তাঁকে করে তোলে এক অতুলনীয় নেতা। তাঁর ভাষণগুলো জাতির অপরাজেয় মনোবলের কাব্যিক প্রকাশ, যা একান্তভাবেই একজন চিন্তাশীল ও আত্মপ্রত্যয়ী ছাত্রনেতা থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠা মানুষের নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি ১৯৪৭-১৯৪৮-এ সোয়া ৯ মাসের প্রাত্যহিক ঘটবাবলির আধারে তাজউদ্দীনের রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার প্রস্তুতিপর্বের নিবিড় চিত্র পাওয়া যায়।

গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি 

১৯৪৭-৪৮ (প্রথম খণ্ড)

অনুবাদ: বেলাল চৌধুরী

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন

প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল; মূল্য: ৫০০ টাকা

পৃষ্ঠা: ২১৬; প্রকাশ: ডিসেম্বর ২০২০

এই ডায়েরিতে উঠে এসেছে এক ২২ বছর বয়সী স্বল্পবিত্ত ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মীর নিবিষ্ট জীবনের প্রতিদিনের খতিয়ান। প্রত্যুষে ওঠা, পড়াশোনার অগ্রগতি, দিন কেমন কাটল—সবকিছুই তিনি নিয়মিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। শত ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁর শিক্ষা বিষয়ে নিষ্ঠা ও সতর্কতা গভীরভাবে অনুধাবনযোগ্য। ডায়েরির পাতায় রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনের বিবরণ যেমন রয়েছে, তেমনি স্থান পেয়েছে ছাত্ররাজনীতির ঘটনাপঞ্জি ও সময়ের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ। এতে ধরা পড়ে সেই সময়কার ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মীদের জীবনযাত্রা, আন্তসম্পর্ক ও সংগ্রামী বাস্তবতা। আর প্রতিদিনের শেষে আবহাওয়ার চুম্বক বিবরণ একজন প্রকৃতিপ্রেমী, সংবেদনশীল তরুণের আত্মজৈবনিক চেতনার জানান দেয়। এই ডায়েরি কেবল একজন কর্মীর দিনলিপি নয়, বরং তা এক যুগসচেতন তরুণের আত্মপ্রত্যয়ের দলিল।

তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর ছাত্রজীবন থেকেই প্রগতিশীল রাজনীতি ও সমাজসেবায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের কারণে শিক্ষাজীবনে বারবার ছেদ পড়লেও তিনি কখনো শিক্ষাকে উপেক্ষা করেননি। 

মানুষের প্রতি তাঁর গভীর দায়বদ্ধতার নিদর্শন পাওয়া যায় ১৯৫০–এর দুর্ভিক্ষ–পরবর্তী উদ্যোগে। খাদ্যের অভাবে মানুষের মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি ‘ধর্মগোলা’ প্রকল্পের সূচনা করেন, যেখানে ফসলের মৌসুমে শস্য সংরক্ষণ করে দুর্যোগকালে ক্ষুধার্তদের সহায়তা করা হতো। 

তাজউদ্দীন আহমদ মহাত্মা গান্ধীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ পোষণ করতেন। তাঁর মৃত্যু তাজউদ্দীনকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেদিন ছিল শুক্রবার। রাত আটটার দিকে বন্ধু জলিল তাঁকে খবরটি জানান। প্রথমে তিনি বিশ্বাসই করতে পারেননি—সংবাদটি অসত্য বলে মনে হচ্ছিল। গান্ধীর মতো অহিংসার প্রতীক একজন মহামানবের এভাবে বিদায় তাঁকে গভীর শোকে বিমূঢ় ও হতবাক করে তোলে। ধাক্কাটা এতটাই তীব্র ছিল যে কিছু সময়ের জন্য তিনি স্নায়বিক দৌর্বল্যে ভুগেছিলেন। এ ঘটনার মাধ্যমে তাঁর সংবেদনশীলতা ও আদর্শিক মানসিকতা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। এ ছাড়া ওই দিনই, অর্থাৎ ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮ তারিখে তিনি লিখেছেন, ‘আমার কাছে মৃত্যু একটা সাধারণ ব্যাপার, স্বাভাবিক ব্যাপার। আমি কারও মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন হইনি।’ এমনকি সেটা তাঁর বাবা, কিংবা বড় ভাইয়ের মৃত্যুতেও নয়। বাবার মৃত্যুর পর ‘আমার মনে আছে, কলকাতা থেকে ঢাকা হয়ে গ্রামের বাড়ি, এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে, তাই বাবার মৃত্যুর খবর শোনার মাত্র ১৫ মিনিট পরেই আমি ৪টা পরোটা এবং এক বাটি মাংস খেয়েছিলাম। আমার তো এ কথাও মনে আছে, তার পরের রাতে যে বিছনায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন, সেই বিছানাতে আমি ভালো ঘুমিয়ে ছিলাম।’ অথচ গান্ধীজির মৃত্যুতে তিনি লিখলেন, ‘গান্ধীজির মৃত্যুতে আমি তেমনটি হতে পারছিনে কেন?...জাগ্রত অবস্থাতে গান্ধীজি আমাকে আপ্লুত করে রাখলেন। স্নায়ু বিবশ হলো। আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন হলাম। কিন্তু সে তন্দ্রার মধ্যেও তো গান্ধীজি আমাকে আপ্লুত করে রাখলেন।’

বইটি শুধু ইতিহাস নয়, এক আত্মনিবেদিত, প্রজ্ঞাবান, মানবিক রাজনৈতিক সত্তার নির্মাণপ্রক্রিয়ার প্রতিচ্ছবি। ছাত্রজীবন, দায়বদ্ধতা, শিক্ষাপ্রীতি, আদর্শবাদ—সব মিলিয়ে এই ডায়েরি এক মহান রাষ্ট্রনায়কের অন্তর্জগতের অসাধারণ দলিল হয়ে উঠেছে।