
রবীন্দ্রনাথের হাতে লেখা চিঠি পড়া মানে কেবল কিছু বাক্য পাঠ করা নয়; বরং তাঁর মনের ভেতর প্রবেশের এক দুর্লভ সুযোগ পাওয়া। এ আয়োজনের চিঠিগুলো পাঠকের কাছে সেই অন্তরঙ্গ দরজাটিই খুলে দেবে, যেখানে কবি, মানুষ ও সময় একাকার হয়ে আছে।
রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র তাঁর সাহিত্যসম্ভারের এক অনন্য ভুবন। কবিতা, গল্প কিংবা প্রবন্ধে যে রবীন্দ্রনাথকে আমরা দেখি, চিঠিতে তিনি আরও অন্তরঙ্গ, আরও অকপট। সেখানে বিশ্বকবির অলংকারময় ভাষা যেমন আছে, তেমনি আছে দৈনন্দিন জীবন, ব্যক্তিগত অনুভব, সময় ও সমাজ সম্পর্কে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ। কখনো তিনি স্নেহময় অভিভাবক, কখনো শিল্পস্রষ্টা, কখনোবা চিন্তাশীল দার্শনিক হয়ে উঠেছেন।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে লেখা এ চারটি চিঠি ও একটি দাওয়াতপত্র আমাদের সেই বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে নিয়ে যায়। চিঠিগুলোয় ধরা পড়ে তাঁর ভাষার সহজ সৌন্দর্য, মানবিক বোধ এবং সময়কে অতিক্রম করা চিন্তার দীপ্তি। ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যম হয়েও এসব পত্র আজ ইতিহাসের মূল্যবান দলিল; কারণ এগুলোর মধ্যে নিহিত আছে এক যুগের সংস্কৃতি, সাহিত্যচর্চা ও মননজগতের স্পন্দন।
রবীন্দ্রনাথের হাতে লেখা চিঠি পড়া মানে কেবল কিছু বাক্য পাঠ করা নয়; বরং তাঁর মনের ভেতর প্রবেশের এক দুর্লভ সুযোগ পাওয়া। এ আয়োজনের চিঠিগুলো পাঠকের কাছে সেই অন্তরঙ্গ দরজাটিই খুলে দেবে, যেখানে কবি, মানুষ ও সময় একাকার হয়ে আছে।
চিঠিগুলো ২০২৫ সালে প্রথমা থেকে প্রকাশিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ: অগ্রন্থিত চিঠিপত্র বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বইয়ে কেবল চিঠির পাঠোদ্ধার রাখা হলেও চিঠির ছবি যুক্ত করা হয়নি। পাঠকের জন্য সেই দুর্লভ চিঠিগুলো এখানে সচিত্র প্রকাশ করা হলো। চিঠিগুলো সংরক্ষিত রয়েছে মুর্তজা বশীর সংগ্রহশালায়।
ওঁ শান্তিনিকেতন
২৯ বৈশাখ, ১৩২৯
বিনয়সম্ভাষণপূর্ব্বক নিবেদন, “বিশ্বভারতীকে সাধারণের হস্তে সমর্পণ করিবার উদ্যোগ প্রায় সমাধা হইয়াছে। Constitution পত্র রেজিস্ট্রি হইবার সময় আসিয়াছে। আপনাকে ইহার সংসদের (Managing Commitee) সদস্যরূপে বরণ করা হইয়াছে। অনুগ্রহ করিয়া সম্মতি জানাইতে বিলম্ব করিবেন না। আশা করি ইহাতে আপনার আপত্তির কোন কারণ হইতে পারে না।
ইতি
ভবদীয় শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওঁ শান্তিনিকেতন, বীরভূম
৩রা ফেব্রুয়ারী ১৯২৪
বীরভূম
সবিনয় নিবেদন,
আপনার ১লা ফেব্রুয়ারী তারিখের পত্র প্রাপ্ত হইয়া অবগত হইতেছি, আপনি আমার জীবন স্মৃতি ও ছিন্নপত্র পুস্তক হইতে কয়েক অংশ উদ্ধৃত করিয়া পুস্তকাকারে ছাপাইবার জন্য আমার অনুমতি চাহিয়াছেন, ইহাতে আমার সম্পূর্ণ সম্মতি আছে জানিবেন।
ইতি
ভবদীয় শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ওঁ সাদর সম্ভাষণ,
আগামী ১৪ই পৌষ শনিবার গোধূলি লগ্নে শান্তিনিকেতন আশ্রমে বোস্বাইবাসী শ্রীযুক্ত মোরারজি মূলরাজ খাটাও মহাশয়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র কল্যাণীয় শ্রীমান অজিত সিংহের সহিত আমার পৌত্রী কল্যাণীয়া শ্রীমতী নন্দিনী দেবীর শুভ পরিণয় সম্পন্ন হইবে । আশা করি উক্ত দিবসে এই উৎসবে যোগদান করিয়া আপনি আমাদের শুভকর্ম সুসম্পূর্ণ করিবেন।
নিবেদক
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
* তারিখ পাওয়া যায়নি।
VISVA-BHARATI
SANTINIKETAN, W. BENGAL ওঁ
২৯ জুলাই, ১৯৩২
সবিনয় নমস্কার সম্ভাষণ,
আপনার ভাষা ও সাহিত্য বইখানা পড়ে খুশি হয়েছি। এতে ভাববার ও শেখবার কথা বিস্তর আছে। বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখকদের আহ্বান করে আপনি যে প্রবন্ধ কয়টি লিখেছেন, তা হিন্দুদেরও বিষয়। বাংলা ভাষাতত্ত্ববিচার সম্বন্ধে আপনার যোগ্যতার প্রশংসা অনাবশ্যক। এ প্রসঙ্গে আপনি আমাকে যে সংবাদ দিয়েছেন তাতে আমি সঙ্কোচ বোধ করি। যে সময়ে আমি এই অনুশীলনে প্রবৃত্ত হয়েছিলেম তখন এ পথে আমি ছিলাম একা৷ তাছাড়া বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে আমি সম্পূর্ণ আনাড়ি৷ অন্ধকারে আমার প্রদীপ ছিল না, হাৎড়িয়ে বেড়িয়েছি। যখন থেকে আপনাদের হাতে আলো জ্বলল, তখন থেকেই এ অধ্যবসায় ত্যাগ করেছি।
বাংলা ভাষায় আরবী ও পারসী সাহিত্যের অনুবাদ অবশ্য কর্তব্য তাতে আমার সন্দেহ নেই। যদি বিশ্বভারতীর অর্থদৈন্য কখনো দূর হয় তবে এ কাজে নিশ্চয় প্রবৃত্ত হব।
বিদেশী ভাষার উচ্চশ্রেণীয় কাব্যগুলিকে পদ্যে অনুবাদ করার চেষ্টা বর্জ্জনীয় বলে আমি মনে করি। কবিতার একদিকে ভাবার্থ। আর একদিকে ধ্বনির ইন্দ্রজাল৷ ভাবার্থকে ভাষান্তরিত করা চলে কিন্তু ধ্বনির মোহকে এক ভাষা থেকে আর এক ভাষায় কোনোমতেই চালান করা যায় না। চেষ্টা করতে গেলে ভাবার্থের প্রতিও জুলুম করতে হয়। এই কারণেই পদ্যে আপনার হাফেজ অনুবাদ চেষ্টার আমি অনুমোদন করতে পারলেম না।
ইতি
ভবদীয় শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
Uttarayan Shantiniketan, Bengal 2/9/36
ওঁ সাদর নমস্কার সম্ভাষণ
আপনার বাঙ্গলা ব্যাকরণখানি পড়ে বিশেষ সন্তুষ্ট হয়েছি। ব্যাকরণখানি সকল দিকেই সম্পূর্ণ হয়েছে, এতে ছাত্রদের উপকার হবে। বইখানি আমার এখানকার বাংলা বিভাগের অধ্যাপকদের হাতে দেব, তাঁরা শ্রদ্ধাপূর্ব্বক ব্যবহার করবেন।
ইতি ১৩৪৩
ভবদীয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ: অগ্রন্থিত চিঠিপত্র
সংকলক ও সম্পাদক: আনিসুর রহমান
প্রকাশনী: প্রথমা প্রকাশন
প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২৫
প্রচ্ছদ: অনিসুজ্জামান সোহেল
মূল্য: ৪৭০ টাকা