গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বইপত্র

সৃষ্টিশীল জীবনের অনিবার্য দুঃখ

ইতিহাসতাত্ত্বিক ই এইচ কার বলেছিলেন, ইতিহাস হচ্ছে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে অব্যাহত সংলাপ। ইতিহাস প্রতিনিয়ত স্বরূপে প্রকাশিত হয়—ঘটে তার পালাবদল। ইতিহাসের রকমফেরও ঘটে নানাভাবে। আলোচ্য গ্রন্থে এসবের ছাপ লক্ষণীয়। গ্রন্থটিতে রয়েছে পনেরোটি প্রবন্ধ-নিবন্ধ, স্মৃতিতর্পণ ও গ্রন্থালোচনা। রচনাগুলো মূলত ইতিহাস, রাজনীতি ও সাহিত্যবিষয়ক। কয়েকটি রচনার মূল ভিত্তি দিনলিপি ও আত্মজীবনী। কয়েকটি লেখায় রয়েছে স্মৃতিচারণা। আত্মজীবনীগুলো যে ইতিহাসের অমূল্য উপকরণে সমৃদ্ধ, সে কথা ব্যাখ্যাত হয়েছে।

গ্রন্থটির নাম-প্রবন্ধ ‘ইতিহাসের ফাঁকফোকর এবং সরল বা একপার্শিক বয়ান’ থেকেই প্রবন্ধটির বিষয়বস্তু ও প্রবণতা অনুমান করা যায়। ইতিহাস কখনো ফিতে ধরে এগিয়ে যায় না, বিজয়ীর বয়ানই ইতিহাস—ইত্যাকার মন্তব্য সত্ত্বেও বলতে হয়, ইতিহাস ইতিহাসই। প্রবন্ধটিতে লেখক আধুনিক বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের কিছু প্রসঙ্গের অবতারণা করে এর মৌলিক ও অপূর্ণতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তাতে উল্লিখিত হয়েছে ইতিহাসের অজ্ঞতার, কোথাও খণ্ডায়নের, কোথাও ভুল ব্যাখ্যার, কোথাও বিপরীতমুখী প্রবণতার বা একদেশদর্শিতার। প্রসঙ্গগুলো যে খুব অজ্ঞাত-অনালোকিত এমন নয়, তবে এসব প্রসঙ্গ একীভূত হওয়ার ফলে বাংলার ইতিহাসের নানাবিধ অপূর্ণতার কথা জানা যায়।

রচনাগুলো মূলত ইতিহাস, রাজনীতি ও সাহিত্যবিষয়ক। কয়েকটি রচনার মূল ভিত্তি দিনলিপি ও আত্মজীবনী। কয়েকটি লেখায় রয়েছে স্মৃতিচারণা।  প্রসঙ্গগুলো যে খুব অজ্ঞাত-অনালোকিত এমন নয়, তবে এসব প্রসঙ্গ একীভূত হওয়ার ফলে বাংলার ইতিহাসের নানাবিধ অপূর্ণতার কথা জানা যায়।

প্রবন্ধটিতে উঠে এসেছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পটভূমি ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ, কংগ্রেস-মুসলিম লীগ-হিন্দু মহাসভা প্রতিষ্ঠার পটভূমি, প্রথম ও দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গে হিন্দু মধ্যশ্রেণির সমর্থন-অসমর্থন, যুক্ত বাংলা আন্দোলন ও তার ব্যর্থতা, পাকিস্তানের প্রতি মোহভঙ্গের কারণ, ভাষা আন্দোলনের আবেগীয় উপাদান, বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রতি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিন্মম্মন্যতা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বিপ্লবীদের আত্মদান প্রভৃতি অনুষঙ্গ। ইতিহাস-মূল্যায়নে লেখক কয়েকটি মৌলিক প্রবণতা মান্য করে খণ্ডিত ইতিহাসচর্চার কিছু নমুনাও তুলে ধরেছেন। তবে রাজনীতি যেমন, ইতিহাসও তেমনি নৈয়ায়িক সূত্র ধরে এগিয়ে যায় না।

গ্রন্থে রাজনীতিবিষয়ক প্রবন্ধের মধ্যে রয়েছে ‘তাজউদ্দীন আহমদ: দিনলিপির দর্পণে’, ‘পঙ্কজ ভট্টাচার্য: সংগঠন ছাড়িয়ে যাঁর পরিচয়’ ও ‘উনসত্তরের গণ–আন্দোলন ও ড. জোহা’। তাজউদ্দীনবিষয়ক প্রবন্ধে দিনপঞ্জির নানা দিক তুলে ধরে তাঁর আদর্শবাদী চরিত্র, অনমনীয় ব্যক্তিত্ব ও আত্মপ্রচারবিমুখ স্বভাবের পরিচয় দিয়ে দিনলিপির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবৃত হয়েছে। দ্বিতীয় প্রবন্ধটিতে পঙ্কজ ভট্টাচার্যের সংগ্রামী ও ত্যাগী রাজনৈতিক জীবন প্রসঙ্গে পূর্ব বাংলার বামপন্থী রাজনীতির উত্থান-ভঙ্গুরতা এবং তাঁর আত্মজীবনীর গুরুত্ব মূল্যায়ন করেছেন লেখক।

ইতিহাসের ফাঁকফোকর এবং অন্যান্য
মোরশেদ শফিউল হাসান

প্রকাশক: পুণ্ড্র প্রকাশন
প্রকাশ: আগস্ট ২০২৫
প্রচ্ছদ: তৌহিন হাসান
পৃষ্ঠা: ১১২
মূল্য: ৩২০ টাকা

বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

‘মাহবুব উল আলম চৌধুরী ও তাঁর সীমান্ত পত্রিকা’, ‘ওমর আলী: তাঁর স্বনির্ধারিত নিয়তি’, ‘হাসু ফাটিয়ে দিতে চেয়েছিলেন’, ‘ক্রুশ্চেভের স্মৃতিকথায় পাস্তারনেক, লেখকের স্বাধীনতা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ এবং ‘যুক্তি ও ভক্তি’ প্রবন্ধগুলো সাহিত্যবিষয়ক। মাহবুব উল আলম চৌধুরী-বিষয়ক প্রবন্ধে সমকালীন পটভূমিতে মূল্যায়িত হয়েছে সীমান্ত পত্রিকার তাৎপর্য। মূলত দেশভাগের অব্যবহিত পরে সীমান্ত পত্রিকা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতা আনয়নের যে প্রয়াস নিয়েছিল, রেখেছিল ঐতিহাসিক ভূমিকা, তারই পরিচয়বহ এই প্রবন্ধ। ওমর আলীবিষয়ক নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধের উপজীব্য তাঁর কবিতার বিষয়, বক্তব্য ও আঙ্গিকশৈলী। প্রবন্ধে উঠে এসেছে কবির দেশ ও সমাজচেতনা, জীবনানন্দ প্রভাবমুক্ত স্বকীয়তা, আত্মসচেতনতা প্রভৃতি। হাসুবিষয়ক প্রবন্ধে বিধৃত হয়েছে শিশুসাহিত্যিক আলতাফ আলী হাসুর জীবন, সাহিত্য ও সংগঠক সত্তার পরিচয়। তবে শেষ পর্যন্ত ভেসে ওঠে নিবেদিত চিত্ত এক সাহিত্য-সাধকের মুখচ্ছবি। সাহিত্যশিল্প প্রসঙ্গে সোভিয়েত রাষ্ট্রের মনোভঙ্গি, বরিস পাস্তারনাক প্রসঙ্গ, সমকালীন কবি-প্রসঙ্গ, বিমূর্ত শিল্পকলা ইত্যাদি সম্পর্কে বিবরণ দিয়ে লেখক দলীয় মনোবৃত্তির বাইরে ক্রুশ্চেভের মনোভঙ্গি তুলে ধরেছেন ক্রুশ্চেভের স্মৃতিকথাবিষয়ক রচনায়। এ প্রসঙ্গে ক্রুশ্চেভের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে সৃষ্টিশীলদের বিষয়ে সহনশীলতা এবং তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি।

গ্রন্থভুক্ত রচনাগুলো ঈষৎ ব্যতিক্রম বাদে সবগুলোতেই উঠে এসেছে ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ, উনসত্তরের গণ–আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ের কথা। রয়েছে কোনো ত্যাগী, নিবেদিত চিত্ত ও সৃষ্টিমুখর মানুষের মূল্যায়ন বা অনুরূপ প্রসঙ্গের অবতারণা। তাঁরা জীবন ব্যয় করেছেন মানুষের জন্য।

নিরেট স্মৃতিচারণামূলক রচনা ‘চট্টগ্রামের যুদ্ধ শুরুর দিনটি’, ‘প্রিয় বন্ধু: ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি’ ও ‘আবু করিম: প্রিয় পুরাতন বন্ধু’। প্রথম প্রবন্ধের উপজীব্য চট্টগ্রামে একাত্তর সালের পঁচিশে মার্চের দুঃসহ স্মৃতি। সেই অগ্নিগর্ভ সময়ে বিহারি অধ্যুষিত এলাকায় বাঙালি জনগণের উৎকণ্ঠা ও যুদ্ধের প্রস্তুতি, পাকিস্তানি বাহিনী ও ইপিআরের গোলাগুলি ও পাল্টা আক্রমণ থেকে লেখকের তরুণ বয়সের স্মৃতি বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রবন্ধে লেখকের অন্তরঙ্গ বন্ধু মোহীত উল আলম ও আবু করিমের নিবিড় স্মৃতিচারণা প্রসঙ্গে উঠে এসেছে বন্ধুবৃত্তের গল্প, উনসত্তরের গণ–আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, যুবরাজ সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ, সংগঠন প্রতিষ্ঠা প্রভৃতির কথা। জানা যায় তাঁদের সাহিত্যজীবন। ব্যক্ত হয়েছে সেকালের অনেক সমাজসত্য ও মূল্যবোধের কথাও—‘মোটামুটি সত্তর দশক পর্যন্ত আমাদের সবার জন্যই সে এক অন্য রকম সময় ছিল। বিশ্বাসের সময়। বিশ্বাসের জন্য একেবারে জান লড়িয়ে দিতে না পারি, কথায় ও কাজে সত্য হবার অন্তত দায়টুকু আমরা সেদিন অনেকেই অনুভব করতাম।’

গ্রন্থপরিচয়ের মধ্যে রয়েছে ‘সরদার ফজলুল করিমের স্মৃতিসমগ্র’, ‘সীমাবদ্ধতা মেনেও সৎ যে আত্মকথন’ ও ‘ইতিহাস যখন কথাসাহিত্যের বিষয়’। প্রথম রচনার উপজীব্য সরদার ফজলুল করিমের আদর্শবাদী সংগ্রাম, ব্যক্তিবিভা ও ত্যাগী জীবনের পরিচয় এবং তাঁর স্মৃতিকথার গুরুত্ব মূল্যায়ন। অভিন্ন রূপে দ্বিতীয় প্রবন্ধটিতে আলোচিত হয়েছে আকবর আলি খানের আত্মজীবনীর। শেষ প্রবন্ধে পর্যালোচিত হয়েছে ভাষা আন্দোলনভিত্তিক কল্যাণী/মমতাজ শীর্ষক জীবনী-উপন্যাসে ইতিহাসের বিকৃতি, বিভ্রান্তি, অতি সরলীকরণ ও গোঁজামিল। এভাবে লেখক যেন প্রকারান্তরে ইতিহাসের ব্যবচ্ছেদ করেছেন।

গ্রন্থভুক্ত রচনাগুলো ঈষৎ ব্যতিক্রম বাদে সবগুলোতেই উঠে এসেছে ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ, উনসত্তরের গণ–আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ের কথা। রয়েছে কোনো ত্যাগী, নিবেদিত চিত্ত ও সৃষ্টিমুখর মানুষের মূল্যায়ন বা অনুরূপ প্রসঙ্গের অবতারণা। তাঁরা জীবন ব্যয় করেছেন মানুষের জন্য। একসমুদ্র দুঃখবোধ তাদের তাড়িত করেছে স্বপ্নসাধ পূরণের সংগ্রামে। শত বাধাবিঘ্ন ও সংকট তাঁদের সেই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তাঁদের সেই জাগর সত্তাকে লেখক তুলে ধরেছেন, যা ব্যক্ত হয়েছে কবি আবু করিমের প্রসঙ্গে, ‘সৃষ্টিশীল জীবনের অনিবার্য দুঃখ’ হিসেবে। গ্রন্থজুড়ে এই সত্য গুঞ্জরিত হয়েছে।

ধীমান লেখক-গবেষক মোরশেদ শফিউল হাসান বিশ্লেষণী ও যুক্তধর্মী ভাষ্যে, নির্মেদ গদ্যে এবং নির্মোহ ভঙ্গিতে নানান প্রসঙ্গে তুলে ধরেছেন পূর্ব বাংলার ইতিহাস ও সাহিত্যের বহুধাবিস্তৃত দিক। সেখানে সমাজ, সাহিত্য ও ইতিহাসের নানাবিধ উপাদান তুলে ধরে লেখক বর্তমানের সঙ্গে প্রতি–তুলনা করে অব্যাহত সংলাপে নিমগ্ন থেকেছেন। খণ্ড খণ্ডভাবে হলেও শেষতক একটি অখণ্ড চিত্র মানসপটে ভেসে ওঠে। এ রকম একটি প্রবন্ধ-সংগ্রহের জন্য লেখক আমাদের হার্দিক অভিনন্দন পেতেই পারেন।