গল্প

গল্পের গাছ

অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

আমাদের বাড়িতে গল্পের একটা গাছ আছে। অনেক বড় ঝাকড়মাকড় গাছ। গাছের ডালে ডালে গল্পেরা ঝুলে থাকে। পাতায় পাতায় গল্পেরা লুকিয়ে থাকে।

এই গাছে ভূত থাকে। পেতনি থাকে। শাকচুন্নি থাকে। কেউ কেউ বলে, এই গাছেই নাকি ব্যঙ্গমা–ব্যঙ্গমী থাকে।

আমাদের বাড়ির উঠানে গাছটা দাঁড়িয়ে আছে। আমার মা বলেন, ওটা তো একটা গল্পের গাছ। তোমার দাদু যখন এই জায়গা কেনেন তখন থেকেই গল্পেরা ডালপালা মেলেছে এই গাছে। এই গাছ ছাড়া কিছুই ছিল না এই পাড়ায়।

কয়েক ঘর পালেরা ছিল। ওরা মাটির জিনিসপত্র বানাত। ওদের তাড়িয়ে দিয়ে জায়গা–জমি দখল করেছিল কিছু লোক। অনেক কান্নার সাক্ষী এই গাছ।

দাদিমা বলতেন, সন্ধ্যার পর ওই গাছতলায় যাবি না। ভূত এসে মুণ্ডু চেপে ধরবে। বুঝলি?

আমি দাদিমার কথা শুনে ভয়ে জড়সড় হয়ে যেতাম। ভুলেও গাছতলায় যেতাম না।

দাদিমা আরও বলতেন, ভজরামের বউ ওই গাছে গলায় দড়ি বেঁধে মারা যায়। তার আত্মা নাকি মাঝেমধ্যে ঘুরে বেড়ায়। বউটা কেন মারা গিয়েছিল?

এই প্রশ্ন যতবার করতাম দাদিমা উত্তর দিতেন না। তিনি বলতেন, তোর বয়স হয়নি রে। আরও বড় হ। তারপর বুঝতে পারবি।

একবার ঝড়ে গাছটা একটু কাত হয়ে যায়। তখন বাবা–কাকারা মিলে দেয়াল তুলে ঠেকা দেয় গাছটাকে। যেন গাছটা পড়ে না যায়। এত পুরোনো গাছ। ওর–ও তো একটু আদর–যত্ন দরকার।

একদিন অনেক লোক এল আমাদের বাড়িতে। বড় কাকা আমাদের দাদার কেনা জমি ডেভেলপারদের দিয়ে দিচ্ছেন। এই জমিতে বহুতল দালান উঠবে। কাকা ও ফুফুরা সবাই একটা করে ফ্ল্যাট পাবে। জীবনের প্রয়োজনে এই ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।

কদিন পর খবর পেলাম, উঠোনটা পরিষ্কার করতে হবে। প্রথম কোপ পড়বে গল্পের গাছের ওপর। কাঠুরেরা এল। ট্রাক এল। বুড়ো গল্পের গাছটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল।

আমি ভাবতে লাগলাম, গল্পগুলো কোথায় যাবে? ভূতপেতনিরা কোথায় যাবে?

মা বললেন, সবকিছু বদলে যায়। শুধু অদলবদলের স্মৃতি থেকে যায় আমাদের মনে।