একসময় নাম ছিল ফরমোসা, এখন তাইওয়ান। চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপটিকে আলাদা করেছে তাইওয়ান প্রণালি। তবে সমুদ্রের জল দুই ভূখণ্ডকে আলাদা করলেও তাদের সাংস্কৃতিক বন্ধন আজও অটুট। তাইওয়ানের মানুষের মুখে মুখে এখনো ফেরে প্রাচীন চীনের নানা লোকগল্প। এসব গল্পের অনেকগুলোতেই আছে দার্শনিক কনফুসিয়াসের নৈতিক আদর্শের ছোঁয়া। বিশেষ করে মা–বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা ও দায়িত্বের গল্পগুলো সেখানে বেশ জনপ্রিয়। এমনই কিছু গল্প নিয়ে ১৯৭০ সালে ডাকটিকিট প্রকাশ করতে শুরু করে তাইওয়ান। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় পর্ব। সেই ডাকটিকিটে জায়গা পাওয়া চারটি গল্প শোনাচ্ছেন নিজাম বিশ্বাস।

অনেক দিন আগের কথা। শুন নামে এক কিশোর ছিল। মা–বাবাকে সে খুব ভালোবাসত। কিন্তু তার বাবা ছিলেন ভীষণ একগুঁয়ে। সৎমা ছিলেন চরম রাগী। আর ছোট ভাইটিও কম দুষ্টু ছিল না!
তবু কারও ওপর রাগ করত না শুন। সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করত। মন দিয়ে নিজের কাজ করত।
একদিন পাহাড়ের কাছে জমিতে চাষ করছিল শুন। হঠাৎ কোথা থেকে একদল হাতি এসে হাজির! অবাক কাণ্ড! হাতিগুলো তাকে জমি চাষে সাহায্য করতে লাগল। শুধু তা-ই নয়, আকাশ থেকে নেমে এল পাখির পাল। তারা ঠোঁট দিয়ে জমির আগাছা তুলে ফেলতে লাগল।
এ দৃশ্য দেখে তো লোকজন অবাক! ‘দেখো, দেখো! শুন কত ভালো মানুষ! মা–বাবাকে এত ভালোবাসে বলেই বনের পশুপাখিরাও তাকে ভালোবাসে!’
এমন আশ্চর্য ঘটনার খবর একসময় পৌঁছে গেল রাজা ইয়াওয়ের কানে।
শুনের কাজে সাহায্য করতে রাজা নিজের ৯ ছেলেকে পাঠালেন। শুনের সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়েও দিলেন।
এরপর রাজা ভাবলেন, এত ভালো মনের মানুষই তো রাজা হওয়ার যোগ্য! শুনকে তাই একদিন নিজের সিংহাসনেও বসালেন তিনি।
অনেক দিন আগে ছাই নামে এক ছেলে ছিল। ছোটবেলায়ই তার বাবা মারা যান। তার পর থেকে মাকে নিয়েই তার সংসার। মায়ের যত্নআত্তিতে কোনো ত্রুটি সে রাখত না।
সে সময় দেশে যুদ্ধ চলছিল। মাঠে ফসলও ভালো হয়নি। চারদিকে খাবারের অভাব।
কী আর করা! ছাই বনে গিয়ে তুঁত ফল কুড়িয়ে আনত। তারপর ফলগুলো আলাদা করে দুটি পাত্রে রাখত। একটিতে কালো পাকা ফল, অন্যটিতে লাল কাঁচা ফল।
একদিন পথের ধারে বসে ফল বাছাই করছিল ছাই। এমন সময় সেখানে হাজির হলো একদল ডাকাত।
এক ডাকাত জিজ্ঞেস করল, ‘এই ছেলে, ফলগুলো আলাদা করছ কেন?’
ছাই বলল, ‘কালো পাকা ফলগুলো মায়ের জন্য রাখছি। আর লাল কাঁচা ফলগুলো আমি খাব।’
উত্তর শুনে ডাকাতেরা অবাক! নিজে কাঁচা ফল খেয়ে মায়ের জন্য পাকা ফল রেখে দিচ্ছে!
ছাইয়ের মায়ের প্রতি এমন ভালোবাসা দেখে ডাকাতদের মন গলে গেল। তারা তাকে তিন মণ চাল আর গরুর একটি পা উপহার দিল।
সেই উপহার নিয়ে খুশিমনে বাড়িতে ফিরল ছাই।
মাকে খুব ভালোবাসত জেং শেন। মন দিয়ে মায়ের যত্নও করত।
একদিন কাঠ কুড়াতে পাহাড়ে গেছে শেন, এমন সময় বাড়িতে এক অতিথি এসে হাজির। কিন্তু অতিথিকে আপ্যায়ন করার মতো ঘরে তেমন কিছুই নেই। মা পড়লেন বিপদে। মনে মনে ভাবলেন, ‘আহা, শেন যদি এখন বাড়িতে ফিরত!’
ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে অস্থির হয়ে নিজের আঙুলেই কামড় বসালেন মা। এত জোরে কামড়ালেন যে রক্ত বের হওয়ার উপক্রম!
ঠিক সেই মুহূর্তে পাহাড়ে থাকা শেনের বুকে হঠাৎ ব্যথা হলো। শেন বুঝল, বাড়িতে নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে!
আর দেরি না করে কাঠের বোঝা কাঁধে তুলে দ্রুত সে বাড়ির পথ ধরল।
বাড়িতে ফিরেই মায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে শেন জিজ্ঞেস করল, ‘মা, কী হয়েছে?’
প্রচলিত আছে, যখনই শেনকে মনে করতেন মা, দূরে থেকেও সে তা টের পেত। এমনই ছিল মা–ছেলের মনের টান!
অনেক দিন আগে মেং ঝং নামে এক ছেলে ছিল। ছোটবেলায় তার বাবা মারা যায়। অসুস্থ মাকে নিয়েই ছিল তার সংসার।
একবার শীতের দিনে মা বললেন, ‘বাবা, বাঁশের কুঁড়ি দিয়ে বানানো স্যুপ খেতে খুব ইচ্ছে করছে।’
মায়ের ইচ্ছা শুনে বনে ছুটল ঝং। কিন্তু হায়! শীতকালে বাঁশের কুঁড়ি পাওয়া কি এত সহজ! এদিক খুঁজল, ওদিক খুঁজল। সারা বন ঘুরেও সে একটি কুঁড়ি পেল না।
মন খারাপ করে একটি বাঁশ জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল ঝং। কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে পড়ল তার চোখের জল। আর তখনই ঘটল এক আশ্চর্য ঘটনা! মাটি ফুঁড়ে একের পর এক বেরিয়ে এল বাঁশের কচি কুঁড়ি! ঝং তো আনন্দে আত্মহারা! তাড়াতাড়ি কুঁড়িগুলো তুলে নিয়ে ছুটল বাড়ির দিকে।
তারপর মায়ের জন্য রান্না করল মজাদার স্যুপ। সেই স্যুপ খেয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন মা।