
ফিলিস্তিনের ধূসর বালুমাখা ইট, কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপের ভেতর প্রতিদিনের জীবনই মৃত্যুর প্রবল অনিশ্চয়তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। সেখানে আর্ট বা শিল্পের জন্ম হলে তা আর কোনো শৌখিনতা বা নান্দনিকতার বিষয় থাকে না, সেটি হয়ে ওঠে বেঁচে থাকারই একটি ভাষা, একটি অভিব্যক্তি। মারাহ খালেদ আল-জাআনিন সেই ভাষারই একজন একান্ত নিবিড় শিল্পী। মারাহ একজন ফিলিস্তিনি নারী শিল্পী। তাঁর তুলির আঁচড়ে ধরা পড়েছে ফিলিস্তিনের রক্তমাখা ভূমির যুদ্ধ, ক্ষুধা, ধ্বংস, হারানো শৈশব আবার একই সঙ্গে অবিশ্বাস্য মানবিক সৌন্দর্য। যখন তাঁর কাজগুলো অনলাইনে প্রথম দেখি, তখন এক অদ্ভুত নীরবতা ঘিরে ধরে, যেন শব্দহীন অসংখ্য মানুষের আর্তনাদ ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে পড়ছে, আর বুঝতে পারছি তাঁর আঁকা ছবিগুলোর মধ্যে মানুষ আছে, জীবন আছে আর আছে অদম্যভাবে টিকে থাকার অবিনাশী সত্তা। গাজার কথা তো আমরা খবরের কাগজে পড়ি, টেলিভিশনের স্ক্রিনে দেখি, কিন্তু সেসব দৃশ্য খুব দ্রুতই আমাদের চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়। গাজার মানুষেরা শুধু সংখ্যা নয়, একটা পরিসংখ্যান, একটা বিরোধপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যু হয়েই শুধু আমাদের কাছে ধরা দেয়। কিন্তু মারাহর ছবিতে সেই গাজা হঠাৎই খুব কাছের আর গভীর হয়ে যায়, অস্বস্তিকরভাবে কাছের, যেন আমরা আর দূরে দাঁড়িয়ে নেই, বরং সেই তাঁবুর ভেতরেই বসে আছি। সেই চোখগুলোর ভেতর তাকিয়ে আছি যেগুলো ক্লান্ত তবু প্রবল উদ্যমে প্রতিটি দিন বেঁচে আছে। এতটুকু ভেঙে পড়েনি।
মারাহর শিল্পকর্মকে চিন্তার জগতে স্থাপন করলে মনে হবে যেন আমরা এক কল্পনার ভেতর হারিয়ে যাচ্ছি। মৃত, বিধ্বস্ত শহরের ভাঙা কংক্রিটের ওপর দিয়ে হাঁটছি, মনে হচ্ছে হাজার গল্প, কথা, হাসি, কান্না, আর্তনাদ—সব মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে।
মারাহর শিল্পকর্মকে চিন্তার জগতে স্থাপন করলে মনে হবে যেন আমরা এক কল্পনার ভেতর হারিয়ে যাচ্ছি। মৃত, বিধ্বস্ত শহরের ভাঙা কংক্রিটের ওপর দিয়ে হাঁটছি, মনে হচ্ছে হাজার গল্প, কথা, হাসি, কান্না, আর্তনাদ—সব মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। বাতাসে পোড়া ধাতুর গন্ধ, তার সঙ্গে মিশে আছে রান্নার হালকা ধোঁয়া। জীবন আর ধ্বংস এখানে যেন পাশাপাশি হাঁটে। কোথাও দেয়াল নেই, কিন্তু দেয়ালটা দাঁড়িয়ে আছে। কিংবা কোথাও ঘর নেই, কিন্তু জানালার ফ্রেম এখনো আকাশের দিকে খোলা। আবার গাজার মানুষদের যখন দেখি তখন মনে হয়, এই অসম্পূর্ণতাগুলোই যেন এখানে পূর্ণতার সংজ্ঞা।
মারাহর শিল্পের সংজ্ঞাটা যতই জানি, ততই মনে হয় এটা কোনো শিল্পীর গল্প না বরং একধরনের বেঁচে থাকার কাব্য।
ছোটবেলা থেকে আঁকার প্রতি তাঁর টান ছিল। কিন্তু সেই টানটা ধীরে ধীরে একধরনের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়, যখন চারপাশের বাস্তবতা ক্রমশ অসহনীয় হয়ে ওঠে। যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, ভয়—এই শব্দগুলো আমরা খুব সহজেই উচ্চারণ করি। কিন্তু সেগুলোর ভেতর যে প্রতিদিনের ক্ষয়, প্রতিদিনের অদৃশ্য ভাঙন, যে নিরাকার ভগ্ন যাপন, সেটা আমরা খুব কমই অনুমান করতে পারি। ভাবতে অবাক লাগে, একজন মানুষ কতটা চাপের মধ্যে থাকলে তার আশপাশের বাস্তবতাকে গ্রহণ করার জন্য তাঁকে ক্যানভাসে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়? মারাহর কাছে আঁকা মানে তাই যেন একটা বেঁচে থাকা, নিজেকে টিকিয়ে রাখার একটা উপায় অর্থাৎ নিজেকে বোঝানো যে এই কষ্টেরও একটা অর্থ আছে, একটা গল্প আছে, যা বলা দরকার।
তাঁর নিজের কথায় ‘হার্শ রিয়্যালিটি’কে (বাস্তবতার নির্মম রূপ) ‘আর্টিস্টিক এক্সপ্রেশনে’ (শিল্পিত অভিব্যক্তি) রূপান্তর করা শুনতে যতটা সহজ লাগে, ভেতরের কাজটা ততটাই কঠিন, ততটাই ব্যক্তিগত, ততটাই অন্তর্গত। একজন শিল্পীকে যতটা দহনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তা আদৌ বোঝা সম্ভব নয়। মারাহর কাজগুলো নিয়ে যখন পড়াশোনা করা হয়, তখন সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল তাঁর সেই ছোট্ট তাঁবুর গল্পটা। একটা শরণার্থীশিবিরের ভেতরে, যেখানে মানুষের নিজের জন্য জায়গা নেই সেখানে একটা তাঁবুকে গ্যালারি বানিয়ে ফেললেন তিনি। যেন সেই প্রবল ধ্বংসযজ্ঞ ও অসহায়ত্বের মধ্যেও এটা এক নীরব বিদ্রোহ। কল্পনা করা যায়, সেই তাঁবুর দেয়ালে আঁকা মুখগুলো, ছাদের ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়া আলো, আর সেই আলোতে ভেসে থাকা কিছু অসমাপ্ত রেখা—যেন না–ফেরার দেশে চলে যাওয়া মানুষেরা বলে, আমরা এখনো আছি।
এই থাকাটাই এখানে সবচেয়ে বড় কথা। কারণ, যখন একটি ভূখণ্ডকে বারবার ধ্বংস করা হয়, তখন সবচেয়ে বড় আঘাতটা পড়ে মানুষের অস্তিত্ববোধে। তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি সত্যি গুরুত্বপূর্ণ? মারাহর গ্যালারি সেই প্রশ্নের উত্তর ভীষণ শক্তিশালীভাবে দেয়—হ্যাঁ, তোমরা গুরুত্বপূর্ণ। তোমাদের গল্প গুরুত্বপূর্ণ, তোমাদের কষ্ট, তোমাদের হাসি—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। মারাহর কাজগুলো ছোট্ট গ্যালারিতে এসে কিংবা ইন্টারনেটে দেখে আমরা জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শেখার রসদ নিতে পারি যে, কীভাবে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও জীবনের বিপুল অর্থ নিয়ে বেঁচে থাকা যায়। মারাহর ছবিগুলোর দিকে তাকালে একটা জিনিস খুব স্পষ্ট বোঝা যায়। এখানে কোনো ভান নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই। কোনো সাজানো আবেগ নেই। ক্ষুধার্ত শিশু, ক্লান্ত মুখ, ভেঙে পড়া ঘর—এসব তো আমরা অনেক জায়গায়ই দেখি। কিন্তু মারাহর ছবিতে এগুলো যেন অন্যভাবে উপস্থিত হয়।
এখানে কষ্টটা খুব চুপচাপ, খুব গভীর, কিন্তু তার ভেতরে একটা অদ্ভুত স্থিরতা আছে। আমরা যখন তার আঁকা কোনো মুখের দিকে তাকাই, মনে হয় সেই মানুষটা অনেক কিছু দেখেছে, অনেক কিছু হারিয়েছে, তবু সে ভেঙে পড়েনি। সে এখনো দাঁড়িয়ে আছে। এই দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটাই হয়তো তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
তাঁর মনোক্রোম ব্যবহারের দিকটিও ভাবা যেতে পারে। কালো, সাদা, আর মাঝেমধ্যে কিছু ধূসর। এটা কি শুধু উপকরণের সীমাবদ্ধতা? নাকি এটা একটা সচেতন সিদ্ধান্ত? যেখানে রঙের অভাবই হয়ে ওঠে জীবনের অভাবের প্রতীক? মনে হয় দুটোই। এই সীমাবদ্ধতা তাঁর শিল্পকে আরও সত্য করে তোলে, আরও প্রগাঢ় করে তোলে যে আমরা কোনো ফিল্টার ছাড়াই বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি।
ফিলিস্তিনি শিল্পের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু মারাহর কাজের মধ্যে আমরা একটা অন্য রকম দৃষ্টিভঙ্গি দেখি। তিনি স্লোগান দেন না, কোনো প্রতিবাদী বার্তা দেন না। বরং তিনি আমাদের এমন দৃশ্য দেখান, যেগুলো নিজেই কথা বলে। একটা শিশু খাবারের অপেক্ষায় বসে আছে, এটা কি শুধু দারিদ্র্যের ছবি? নাকি এটা একটা রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল? একটা মা তার সন্তানকে আগলে রেখেছে, এটা কি শুধু মাতৃত্ব? নাকি এটা নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে একধরনের প্রতিরোধ? এই প্রশ্নগুলো মারাহর কাজের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে। আর দর্শক হিসেবে আমরা ধীরে ধীরে সেসব অর্থ আবিষ্কার করি। এই সূক্ষ্মতাটাই তাঁকে আলাদা করে তোলে। কারণ, সরাসরি চিৎকার অনেক সময় আমাদের কানে লাগে।
কিন্তু এই নীরব উচ্চারণ আমাদের অন্তরের গভীরে গিয়ে আঘাত করে, দীর্ঘ সময় ধরে অনুরণন তোলে। তাঁর শিল্পে অভাবের নান্দনিকতার বিষয়টি আমাকে বারবার ভাবায়। আমরা সাধারণত সৌন্দর্য বলতে বুঝি পরিপূর্ণতা, রঙের প্রাচুর্য, নিখুঁত গঠন। কিন্তু মারাহর কাজ সেই ধারণাটাকে ভেঙে দেয়। এখানে অসম্পূর্ণ রেখাই সুন্দর। খালি জায়গাই অর্থপূর্ণ, আর গাঢ় ছায়াই অনুভূতির গভীরতা তৈরি করে। আমরা কখনো কখনো ভাবি, আমরা যারা তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে বড় হয়েছি, আমাদের চোখ কি আসলে এ ধরনের সৌন্দর্য দেখে কিছু শেখে? নাকি আমাদের নতুন করে শেখা দরকার কীভাবে কমের ভেতর বেশি খুঁজে পাওয়া যায়? কীভাবে অভাবের মধ্যেও একধরনের নান্দনিকতা তৈরি হয়?
মারাহর ব্যক্তিত্ব নিয়ে ভাবলে একটা শব্দ বারবার মনে আসে—সাক্ষী। তিনি সময়ের সাক্ষী, মানুষের সাক্ষী। তিনি যা দেখছেন, যা অনুভব করছেন, সেটাকে ধরে রাখছেন, যেন ভবিষ্যতে কেউ যদি জানতে চায় কী ঘটেছিল, তখন এই ছবিগুলো উত্তর দিতে পারে। তাঁর এই ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইতিহাস অনেক সময় ক্ষমতাবানদের দ্বারা লেখা হয়, কিন্তু শিল্প সেই ইতিহাসের ভেতরে হারিয়ে যাওয়া মানুষের কণ্ঠস্বরকে বাঁচিয়ে রাখে। তিনি উচ্চকণ্ঠ নন, তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেন না। কিন্তু তাঁর ছবিগুলোই তাঁর ভাষা, আর সেই ভাষা অনেক সময় হাজার শব্দের চেয়েও শক্তিশালী। একজন নারী শিল্পী হিসেবে তাঁর কাজের ভেতরে যে সংবেদনশীলতা আছে, সেটাও আলাদা করে চোখে পড়ে।
তাঁর ছবিতে নারীরা শুধু কষ্টের প্রতীক নয়, তাঁরা শক্তিরও প্রতীক। তারা ভেঙে পড়ে আবার উঠেও দাঁড়ায়। তারা ভয় পায়, আবার সেই ভয়ের সঙ্গেই বাঁচতে শেখে। এই দ্বৈততা—নাজুকতা ও শক্তি—একসঙ্গে উপস্থিত থাকে, আর সেটাই তাঁর কাজকে আরও মানবিক করে তোলে। আমরা মনে করি, এই দৃষ্টিভঙ্গি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি নারীদের একমাত্রিকভাবে দেখার প্রবণতাকে চ্যালেঞ্জ করে।
আজকের দ্রুতগতির পৃথিবীতে, যেখানে খবর আসে আর হারিয়ে যায়, সেখানে মারাহর মতো শিল্পীরা আমাদের থামতে বাধ্য করেন। তাঁর কাজ আমাদের ভাবায় যে আমরা কি সত্যিই অন্যের কষ্টকে বুঝতে চাই? নাকি আমরা শুধু সেটাকে স্ক্রল করে পাশ কাটিয়ে যাই? তাঁর ছবিগুলো যেন একটা আয়না, যেখানে আমরা শুধু গাজার মানুষদের দেখি না, দেখি আমাদের উদাসীনতা, আমাদের সীমাবদ্ধতা, আমাদের প্রদর্শনমূলক মেকি সহানুভূতির পরিধি।
তাঁর প্রতিটি ছবি যেন বলে আমরা এখনো হার মানিনি। আর এই কথাটাই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যখন সবকিছু ভেঙে পড়ে তখন এই ছোট ঘোষণাগুলোই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। মারাহ সেই বেঁচে থাকার নান্দনিকতার পথিকৃৎ, যিনি দেখিয়ে যান সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও মানুষ সৃষ্টি করতে পারে, ভালোবাসতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আশা করতে পারে...
শেষ পর্যন্ত যখন তাঁর কাজের কথা ভাবি, তখন একটা অনুভূতি খুব জোরালো হয়ে ওঠে—ধ্বংস কখনো শেষ কথা নয়। যতক্ষণ মানুষ আছে ততক্ষণ গল্প থাকবে। যতক্ষণ গল্প থাকবে ততক্ষণ শিল্প। মারাহর সেই ছোট্ট তাঁবু হয়তো সামান্য একটু জায়গা। কিন্তু সেই জায়গার ভেতরেই একটা বিশাল জগৎ তৈরি হয়েছে। যেখানে কষ্ট আছে কিন্তু তার চেয়ে বেশি আছে টিকে থাকার ইচ্ছে। তাঁর প্রতিটি ছবি যেন বলে আমরা এখনো হার মানিনি। আর এই কথাটাই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যখন সবকিছু ভেঙে পড়ে তখন এই ছোট ঘোষণাগুলোই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। মারাহ সেই বেঁচে থাকার নান্দনিকতার পথিকৃৎ, যিনি দেখিয়ে যান সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও মানুষ সৃষ্টি করতে পারে, ভালোবাসতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আশা করতে পারে...
আমজাদ হোসাইন: লেখক ও গবেষক