আন্তর্জাতিক বুকারজয়ী ইয়াং শুয়াং-জির সাক্ষাৎকার

‘অনুবাদ সাহিত্য পৃথিবী দেখার আরেক জোড়া চোখ’

প্রথমবার আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার জিতেছে চীনের মান্দারিন ভাষার উপন্যাস তাইওয়ান ট্রাভেলগ। উপন্যাসটি লিখেছেন তাইওয়ানের লেখক ইয়াং শুয়াং-জি এবং ইংরেজি অনুবাদ করেছেন লিন কিং। বইটির জন্মকথা, তাইওয়ানের জটিল ঔপনিবেশিক ইতিহাস, অনুবাদ সাহিত্যের গুরুত্ব ও লেখক হয়ে ওঠার গল্প শুনিয়েছেন ইয়াং শুয়াং-জি। বুকারের ওয়েবসাইট থেকে সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন রবিউল কমল

প্রশ্ন: তাইওয়ান ট্রাভেলগ লেখার পেছনে কী অনুপ্রেরণা কাজ করেছে?

ইয়াং শুয়াং-জি: কোরিয়া ও তাইওয়ান, দুটো দেশই একসময় জাপানি সাম্রাজ্যের উপনিবেশ ছিল। কিন্তু ইতিহাসের সেই সময় নিয়ে কোরিয়ানদের মধ্যে সাধারণত তীব্র ক্ষোভ দেখা যায়। অন্যদিকে তাইওয়ানের মানুষদের অনুভূতি জটিল। সেখানে বিরক্তি যেমন আছে, তেমনি কিছুটা নস্টালজিয়াও আছে। আমি চেয়েছিলাম সমকালীন তাইওয়ানি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সেই অতীতকে নতুনভাবে বুঝতে। জানতে চেয়েছিলাম সেই সময়ের মানুষেরা কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। একই সঙ্গে আমি ভাবতে চেয়েছি ভবিষ্যতে আমাদের কেমন সমাজ গড়ে তোলা উচিত।

প্রশ্ন: উপন্যাসটি কীভাবে লিখলেন?

ইয়াং শুয়াং-জি: ২০১৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে আমি প্রথম গল্পের খসড়া ও প্রথম অধ্যায়ের লেখা শুরু করি। তবে এ নিয়ে নিয়মিত কাজ শুরু করি ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। একই বছরের ২০ আগস্ট প্রথম খসড়া শেষ হয়। এই উপন্যাসে ভ্রমণ ও খাবার খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। সেগুলো নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমার জীবনে দুটি পরিবর্তন এসেছে। প্রথমত আমার সঞ্চয় কমে গেছে, দ্বিতীয়ত ওজন বেড়ে গেছে!

‘তাইওয়ান ট্রাভেলগ’ উপন্যাসের প্রচ্ছদ
ইয়াং শুয়াং-জি

প্রশ্ন: এ বছরের বুকার প্রচারণার মূল বিষয় ‘সীমানের বাইরের কল্পকাহিনি’। অনুবাদ সাহিত্য কীভাবে পাঠকদের ভৌগোলিক সীমার বাইরে দেখতে সাহায্য করে?

ইয়াং শুয়াং-জি: আমি কেবল একটি ভাষায় পড়তে পারি। তাই অনুবাদ না থাকলে পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিসীমা অনেক ছোট হয়ে যেত। তাই আমার কাছে অনুবাদ সাহিত্য পৃথিবী দেখার আরেক জোড়া চোখ। তবে শুধু তা-ই নয়। অনুবাদকেরা আমার কাছে পথপ্রদর্শক, যাঁরা আমাকে অচেনা দেশ ও সংস্কৃতির কাছে নিয়ে যান।

প্রশ্ন: গত এক দশকে এই পুরস্কার অনুবাদ সাহিত্য সম্পর্কে মানুষের ধারণা কতটা বদলাতে পেরেছে?

ইয়াং শুয়াং-জি: গত ১০ বছরে এই পুরস্কার লেখক ও অনুবাদক দুজনকেই সমান স্বীকৃতি দিয়েছে। এই সমতার ওপর জোর দেওয়ার ফলে মানুষ অনুবাদ সাহিত্যকে নতুনভাবে বুঝতে শিখেছে। এখন পাঠকেরা আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন, সাহিত্য অনুবাদ আসলে দুজন সৃষ্টিশীল মানুষের যৌথ প্রচেষ্টার ফল।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাইওয়ানে রোমান্টিক উপন্যাসের জনপ্রিয়তা খুব বেড়ে যায়। তখন আমার স্কুলের কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি লেখালেখির দল গড়েছিলাম। আমরা ছিলাম পাঁচজন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমিই লেখালেখি চালিয়ে গেছি।

প্রশ্ন: ছোটবেলায় কোন বই আপনাকে পড়ার প্রেমে ফেলেছিল?

ইয়াং শুয়াং-জি: আকিরা তোরিয়ামার ড্রাগন বল। এর ধারাবাহিক প্রকাশ শুরু হয়েছিল ১৯৮৪ সালে, যে বছর আমার জন্ম। আর শেষ হয়েছিল যখন আমার বয়স ১১ বছর। মোট ৪২টি খণ্ড ছিল। এই সিরিজই আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে পড়তে হয় এবং কীভাবে গল্প তৈরি করতে হয়। সৃজনশীল মানুষ হওয়ার যে সংকল্প আমার মধ্যে জন্মেছিল, তার শুরু এখান থেকেই।

প্রশ্ন: কোন বই আপনাকে লেখক হতে অনুপ্রাণিত করেছিল?

ইয়াং শুয়াং-জি: আসলে এমন কোনো একক বইয়ের নাম বলতে পারব না। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তাইওয়ানে রোমান্টিক উপন্যাসের জনপ্রিয়তা খুব বেড়ে যায়। তখন আমার স্কুলের কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি লেখালেখির দল গড়েছিলাম। আমরা ছিলাম পাঁচজন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমিই লেখালেখি চালিয়ে গেছি।

কোনো বই সবার জন্য আবশ্যিক নয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি দ্য স্টোলেন বাইসাইকেল উপন্যাসটিকে অসাধারণ মনে করি। এটি লিখেছেন উ মিং-ই এবং অনুবাদ করেছেন ডেরিল স্টার্ক। বইটি ২০১৮ সালের ইন্টারন্যাশনাল বুকার পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকায় ছিল।

প্রশ্ন: এমন কোনো বই কি আছে, যা পৃথিবী সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে?

ইয়াং শুয়াং-জি: হ্যাঁ, অ্যানালেক্টস। এটি কনফুসীয় দর্শনের মূল গ্রন্থ, প্রায় দুই হাজার বছর আগে লেখা। কিশোর বয়সে বইটি পড়ার পর কনফুসীয় চিন্তাধারাভিত্তিক চীনা সংস্কৃতির প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা জন্মায়। সেই প্রভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি চীনা সাহিত্য নিয়ে পড়ালেখা করি। কিন্তু বড় হওয়ার পর একই বই আমাকে ভাবতে বাধ্য করে, ইতিহাসে বিভিন্ন শোষণমূলক শাসনব্যবস্থা কীভাবে এই দর্শনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। তখন আমি নিজের জন্য নতুন চিন্তার ভিত্তি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিই।

প্রশ্ন: মান্দারিন ভাষায় লেখা কোন বই সবার পড়া উচিত বলে মনে করেন?

ইয়াং শুয়াং-জি: আমি বিশ্বাস করি না যে কোনো বই সবার জন্য বাধ্যতামূলক। তবে যাঁরা চীনা অক্ষর ব্যবহারকারী সংস্কৃতিগুলোর চিন্তাধারা ও বিশ্বদৃষ্টি বুঝতে চান, তাঁদের জন্য অ্যানালেক্টস একটি গুরুত্বপূর্ণ বই। তবে আমি বলব, বইটি অবশ্যই সমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পড়া উচিত।

প্রশ্ন: ইন্টারন্যাশনাল বুকার মনোনীত কোনো বই আপনি সুপারিশ করবেন?

ইয়াং শুয়াং-জি: আমি আগের উত্তরের মতোই বলব, কোনো বই সবার জন্য আবশ্যিক নয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি দ্য স্টোলেন বাইসাইকেল উপন্যাসটিকে অসাধারণ মনে করি। এটি লিখেছেন উ মিং-ই এবং অনুবাদ করেছেন ডেরিল স্টার্ক। বইটি ২০১৮ সালের ইন্টারন্যাশনাল বুকার পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকায় ছিল।