আনিসুজ্জামান সোহেলের আঁকা ক্লিন্টন বি সিলি ও জীবনানন্দ দাশের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
আনিসুজ্জামান সোহেলের আঁকা ক্লিন্টন বি সিলি ও জীবনানন্দ দাশের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

সাক্ষাৎকার: ক্লিন্টন বি সিলি

‘জীবনানন্দ নিজেকে বরিশাল থেকে নির্বাসিত মনে করতেন’

ক্লিন্টন বুথ সিলি যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশীয় ভাষা ও সভ্যতা বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক। বাংলা সাহিত্যের এই গবেষক লিখেছেন কবি জীবনানন্দ দাশের গবেষণামূলক জীবনী, ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য। ইউপিএল থেকে সম্প্রতি পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে তাঁর বই বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড: এসেজ অন বাংলা লিটারেচার। ২১ জুন ৮৫তম জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত হলো তাঁর এই সাক্ষাৎকার, নিয়েছেন প্রিয়ম পাল

প্রিয়ম পাল: বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড বইটির শিরোনাম একই সঙ্গে দুটি অবস্থার ধারণা দেয়—স্মৃতিতে প্রোথিত শিকড় এবং তা অতিক্রম। জীবনানন্দ দাশের আঞ্চলিক কল্পনাশ্রয়কে আপনি কীভাবে দেখেন? বরিশাল কি মূলত একটি স্মরণীয় জন্মভূমি, না নির্বাসন আর প্রতীক্ষার এক রূপক অস্তিত্ব?

ক্লিন্টন বুথ সিলি: বাংলার মাটিতে আমার প্রথম পদচারণা বরিশালে। জীবনানন্দ দাশেরও যাত্রা শুরু হয়েছিল বরিশালেই। তবে দুজনেরই পথ স্থানের সীমানা অতিক্রম করেছিল। জীবনানন্দ যেমন তাঁর রূপসী বাংলার মধ্যে বরিশালের স্মৃতি অনেকখানি ধরে রেখেছেন, আমিও তেমনই এই বইয়ের মাধ্যমে বরিশালকে কিছুটা স্মরণ করেছি।

যদিও সেই অর্থে বাংলায় ‘ফিরে আসার ডাক’ আমি পাইনি, জীবনানন্দ পেয়েছিলেন। আর সেই ফিরে আসা অবশ্যই তাঁর নির্বাসনে যাওয়ার রূপক চিত্র নয়। তিনি হয়তো নিজেকে প্রথমবার নির্বাসিত অনুভব করেছিলেন ১৯২৯ সালের শেষদিকে দিল্লিতে শিক্ষকতার চাকরিতে যোগ দিয়ে। কয়েক মাস পরেই তিনি ইস্তফা দিয়ে ফিরে আসেন বরিশালে। ১৯৪৬ সালের পরে আবার তিনি বরিশাল ছেড়ে কলকাতায় বাস করতে থাকেন। বরিশালে আর স্থায়ীভাবে তাঁর ফিরে আসা হয়নি। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে নিজেকে তিনি বরিশাল থেকে নির্বাসিত মনে করতেন, বরিশালে নির্বাসিত নয়।

আমার মনে হয় কবির যে কবিতাগুলি মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে, সেগুলির একটি হচ্ছে ‘ফিরে এসো’ শিরোনামের সেই কবিতা, যেখানে কবি ডাক পেয়েছিলেন বাংলায় ফিরে আসার। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতা পত্রিকায়, ১৯৩৭ সালে। এই কবিতায় জীবনানন্দ অ্যাপস্ট্রফি বা ঊর্ধকমা ব্যবহার করেছেন। পাঠকদের সুবিধার জন্য জানাই, ঊর্ধকমা কোনও যতিচিহ্ন নয়। যেমন অ্যাপস্ট্রফি এস (’এস) এক ধরনের কাব্যিক অলঙ্করণ যার সাহায্যে এমন কাউকে বা কিছুকে সরাসরি সম্বোধন করা হয় যার উপস্থিতি নেই, অথবা যার উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এখানে উল্লেখ করতে পারি যে শাক্তবাদের ভক্ত কবি রামপ্রসাদ সেন দেবীমাতাকে সম্বোধন করতে তাঁর রচনায় প্রচুর ঊর্ধকমা ব্যবহার করেছেন। ‘ফিরে এসো’ কবিতাটি ধর্মীয় বা ভক্তিমূলক নয়, বরং সাধারণ একটি কবিতা যেখানে ঊর্ধকমা ব্যবহার করা হয়েছে। বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড-এর ভূমিকায় আমি দেখিয়েছি, এই কবিতায় জীবনানন্দ নিজেকেই বরিশালে ফিরে আসার আহ্বান করেছেন:

ফিরে এসো


ফিরে এসো সমুদ্রের ধারে,
ফিরে এসো প্রান্তরের পথে;
যেইখানে ট্রেন এসে থামে
আম নিম ঝাউয়ের জগতে
ফিরে এসো; একদিন নীল ডিম করেছো বুনন;
আজো তারা শিশিরে নীরব;
পাখির ঝরনা হ’য়ে কবে
আমারে করিবে অনুভব!

এর চেয়েও বেশি আবেগময় তাঁর অন্য একটি কবিতা ‘বলিল অশ্বত্থ সেই’। সেখানেও তিনি বরিশালের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেছেন। এই কবিতায় তিনি একটি গাছের জবানিতে মানুষকে সম্বোধন করেছেন:

বলিল অশ্বত্থ সেই
বলিল অশ্বত্থ ধীরে: কোন্ দিকে যাবে বলো
তোমরা কোথায় যেতে চাও?
এত দিন পাশাপাশি ছিলে, আহা, ছিলে কত কাছে;
ম্লান খোড়ো ঘরগুলো—আজো তো দাঁড়ায়ে তারা আছে;
এই সব গৃহ মাঠ ছেড়ে দিয়ে কোন্ দিকে কোন্ পথে ফের
তোমরা যেতেছো চ’লে পাই নাকো টের!
বোচকা বেঁধেছ ঢের,—ভোলো নাই ভাঙা বাটি ফুটো ঘটিটাও;
আবার কোথায় যেতে চাও?
পঞ্চাশ বছরও হায় হয়নিকো,—এই-তো সে দিন
তোমাদের পিতামহ, বাবা, খুড়ো, জেঠামহাশয়
—আজো, আহা, তাহাদের কথা মনে হয়!—
এখানে মাঠের পারে জমি কিনে খোড়ো ঘর তুলে
এই দেশে এই পথে এই সব ঘাস ধান নিম জামরুলে
জীবনের ক্লান্তি ক্ষুধা আকাঙ্ক্ষার বেদনার শুধেছিলো ঋণ;
দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে সব দেখেছি যে,—মনে হয় যেন সেই দিন!
এখানে তোমরা তবু থাকিবে না? যাবে চ’লে তবে কোন্ পথে?
সেই পথে আরো শান্তি—আরো বুঝি সাধ?
আরো বুঝি জীবনের গভীর আস্বাদ?
তোমরা সেখানে গিয়ে তাই বুঝি বেঁধে রবে আকাঙ্ক্ষার ঘর!...
যেখানেই যাও চ’লে, হয় নাকো জীবনের কোনো রূপান্তর;
এক ক্ষুধা এক স্বপ্ন এক ব্যথা বিচ্ছেদের কাহিনী ধূসর
ম্লান চুলে দেখা দেবে যেখানেই বাঁধো গিয়ে আকাঙ্ক্ষার ঘর!’
বলিল অশ্বত্থ সেই নড়ে নড়ে অন্ধকারে মাথার উপর।

এটা ছিল সেই অশ্বত্থ বৃক্ষ—তাকে মানুষরূপে ভাবলে বেশি মানায়—যার উদ্ধৃতি আছে তাঁর ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতায়। সেখানে বৃক্ষটি আত্মহত্যার মতো নিষ্ঠুর কর্মের প্রতিবাদ করেছিল নাকি করেনি, সেই প্রশ্ন রেখেছেন কবি। কোন অজুহাতে কেউ বঙ্গদেশ বা বরিশাল থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে চাইবে?

ক্লিন্টন বুথ সিলি ও তাঁর বিড়াল
আয়ওয়া রাইটার্স ওয়ার্কশপের কাজ শেষ করে ১৯৬৬ সালে প্রখ্যাত সাংবাদিক, কবি ও লেখক জ্যোতির্ময় দত্ত (বুদ্ধদেব বসুর জামাতা) যোগ দিয়েছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন তিনি এবং অধ্যাপক এডওয়ার্ড সি. ডিমক জুনিয়র দুজনেই আমার শিক্ষক ছিলেন। জ্যোতিই আমাকে উৎসাহ দিয়েছিলেন অনন্য ও কিছুটা দুর্বোধ্য প্রয়াত বাঙালি কবি জীবনানন্দ দাশের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে গবেষণার।

প্রিয়ম: জীবনানন্দ দাশের প্রতি এত গভীরভাবে মনোনিবেশ করার পিছনে আপনার ব্যক্তিগত বা বৌদ্ধিক প্রণোদনা কী ছিল? আপনার অবাঙালি গবেষক পরিচয় কি বাংলা সাহিত্যজগতে আপনার গ্রহণযোগ্যতায় কোনো প্রভাব ফেলেছিল?

সিলি: আয়ওয়া রাইটার্স ওয়ার্কশপের কাজ শেষ করে ১৯৬৬ সালে প্রখ্যাত সাংবাদিক, কবি ও লেখক জ্যোতির্ময় দত্ত (বুদ্ধদেব বসুর জামাতা) যোগ দিয়েছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন তিনি এবং অধ্যাপক এডওয়ার্ড সি. ডিমক জুনিয়র দুজনেই আমার শিক্ষক ছিলেন। জ্যোতিই আমাকে উৎসাহ দিয়েছিলেন অনন্য ও কিছুটা দুর্বোধ্য প্রয়াত বাঙালি কবি জীবনানন্দ দাশের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে গবেষণার। আমার অবাঙালি পরিচয় আসলে সুবিধারই হয়েছিল। জীবনানন্দ ছিলেন সবার প্রিয় কবি (অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের পরে)। আমার মতো একজন অবাঙালি ব্যক্তির কাছে জীবনানন্দ এবং তাঁর কবিতা নিয়ে মতামত দিতে সবাই এগিয়ে আসতেন।

প্রিয়ম: জীবনানন্দ দাশের রচনা যখন আপনি প্রথম পড়েন, আর পরে কয়েক দশক ধরে পড়েছেন, আপনার উপলব্ধিতে কোনো পার্থক্য ধরা পড়েছে? পরিবর্তিত আবেগ বা দৃষ্টিকোণের বিচারে ‘বনলতা সেন’ কবিতাটির ব্যাখ্যা এখন আপনি কীভাবে করতে চাইবেন?

সিলি: আমি ‘বনলতা সেন’ যেভাবে বুঝেছি, বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড বইয়ে তা নিয়ে একটি সম্পূর্ণ পরিচ্ছেদ আছে। আমার সবসময় মনে হতো যে কবিতাটির কথক উপমহাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে মালয় দ্বীপপুঞ্জে যাবে, অথচ সেখান থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোথাও যাবে না—ব্যাপারটা অস্বাভাবিক, এমনকি বিব্রতকর। কর্মজীবনের শেষদিকে এসে আমি অনুভব করেছি, এই কবিতার মালয় সাগর কথাটিকে আমরা সবাই ভুল বুঝেছি। কবি সম্ভবত মালয় সাগর বলতে দক্ষিণ ভারতের মালাবার উপকূলের বিশাল জলরাশিকেই বোঝাতে চেয়েছেন।

প্রিয়ম: ভারতচন্দ্র রায়ের অন্নদামঙ্গল কাব্যটিকে কাব্যিক উত্তরণের নিরিখে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? সাহিত্যের ঐতিহাসিক বিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ভারতচন্দ্র তাঁর আগের মধ্যযুগীয় সাহিত্যের প্রতীকী বৈশিষ্ট্যগুলো নিজের কবিতায় কীভাবে এত দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে পারলেন?

সিলি: মঙ্গলকাব্যগুলোর মধ্যে সাহিত্যমূল্যের বিচারে অন্নদামঙ্গল, আমার মতে, শীর্ষস্থানীয়। প্রথমত এটি রচিত হয়েছে মঙ্গলকাব্যের নিখুঁত আদলে। দ্বিতীয়ত এই শ্রেণির লেখাগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশি নান্দনিক। বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড-এর প্রথম পরিচ্ছেদের শেষভাগে এই দুটি মত নিয়ে বিশদ আলোচনা আছে।

প্রথমে দ্বিতীয় মতটি নিয়ে বলি। প্রাক-আধুনিক যুগের বর্ণনামূলক কবিতায় দুই ধরনের ছন্দের ব্যবহার দেখা যায়, পয়ার ও ত্রিপদী। এই দুই ছন্দের মধ্যে পয়ার বেশি গদ্যময়। এর প্রয়োগ বর্ণনার জন্য বিশেষ উপযোগী। ত্রিপদী ছন্দের ব্যবহার মূলত কবিতার সৌন্দর্য রচনায়। অবশ্য দরকামতো দুই ক্ষেত্রেই এই দুই ছন্দের যেকোনোটি প্রয়োগ হতে পারে। তবে ভারতচন্দ্র এই দুই ছন্দ ছাড়াও আরও কয়েকটি ছন্দ ব্যবহার করে অন্নদা মঙ্গল কাব্যটি অনুপম সৌন্দর্যে রচনা করেছেন।

আমার অন্য দাবিটি হচ্ছে যে অন্নদা মঙ্গল কাঠামোগতভাবে একটি নিখুঁত মঙ্গলকাব্য। এই দাবি অধ্যাপক সুকুমার সেনের মতের একেবারে বিপরীত। অধ্যাপক সেনের মতে ভারতচন্দ্রর রচনা আসলে তিনটি আলাদা রচনার সংযোজন—একটি মঙ্গলকাব্য, একটি রোমান্টিক বা যৌনাবেদনময় গল্প, আরেকটি ঐতিহাসিক বিবরণ।

আমি মনে করি, যেকোনো পূর্ণাঙ্গ মঙ্গলকাব্যে তিনটি অংশ থাকে। প্রথমটিতে বলা হয় দিব্যলোকের ঘটনা, যেখানে শুধু দেবদেবীর নিবাস। দ্বিতীয়টিতে থাকে পৃথিবীর ঘটনা, যেখানে মরণশীলদের বাস। তৃতীয় অংশটি শুরু হয় বঙ্গদেশে, যেখানে থাকে একজন বাঙালি, সাধারণত কোনো বণিক, যিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে অন্য দেশে পাড়ি জমান। এই অংশটিকে আমি বলি ধনপতি প্যারাডাইম। মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল–এর গল্পমতে ধনপতি নামে এক বাঙালি বণিক সিংহল দ্বীপে (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) বাণিজ্য করতে যান। সেখানকার রাজা তাঁকে তস্কর সন্দেহে কারাবন্দি করে মৃত্যুদণ্ড দিতে চান। তখন সেই মঙ্গলকাব্যের দেবীমাতা—সেই কাব্যটি যাঁর গৌরবগাথা—রাজাকে প্রভাবিত করেন। রাজা নিরপরাধ বাঙালি বণিককে মুক্ত করে দিতে বাধ্য হন।

ভারতচন্দ্রর অন্নদামঙ্গল-এ এই তিনটি অংশ তিনটি খণ্ডে নিখুঁতভাবে সংযোজিত। প্রথম খণ্ডের ঘটনা স্বর্গলোকে। সেখানে দেবীর পূজার সময় দুজন অধিবাসী কামকেলিতে লিপ্ত ছিলেন। তাই তাঁরা শাপগ্রস্ত হলেন যে কিছুকাল তাঁদের মর্ত্যলোকে মরণশীলদের মধ্যে কাটাতে হবে। এঁদের নাম সুন্দর ও বিদ্যা; পুরুষটি দক্ষিণ ভারতীয়, নারীটি বঙ্গদেশী। এই দুজনের প্রেমগাথাই কাব্যটির দ্বিতীয় খণ্ড। একসময় বিদ্যার পিতা কন্যার শ্লীলতাহানীর জন্য সুন্দরের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। তখন অন্নপূর্ণা দেবীর আগমন ঘটে। বিদ্যার পিতাকে তিনি বোঝাতে সমর্থ হন যে এই দুজনের আইনসম্মত রাক্ষসবিবাহ আগেই সম্পন্ন হয়েছে। সুন্দর নির্দোষ প্রমাণিত হন এবং দেবীর সর্বময় কর্তৃত্ব আবারও জনসমক্ষে প্রকাশ পায়।

তৃতীয় খণ্ড বঙ্গবিজয়ের কাহিনি। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সেনাদল বাংলার যশোর অঞ্চল দখল করলেন। এই বিজয়ে মুঘলদের সাহায্য করলেন একজন বাঙালি, কৃষ্ণনগরের জমিদারবাড়ির সদস্য। মুঘল সেনাপতি এই সহায়তা পেয়ে খুশি হয়ে বাঙালি ভদ্রলোককে কথা দিলেন যে তাঁকে বাদশাহর কাছ থেকে পুরস্কার পাইয়ে দেবেন।

এখানে পুরোপুরি ধনপতি প্যারাডাইমের পুনরাবৃত্তি হলো। উত্তর ভারতের মুঘল রাজধানীতে বঙ্গবিজয়ী সেনাপতি বাঙালি ভদ্রলোকটিকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হলে সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর সেনাপতিকে অবিশ্বাস করলেন। তিনি স্থির করলেন, ওই বাঙালি লোকটি মিথ্যাবাদী। তাঁকে কারাবন্দি করা হলো। তাঁকে জীবননাশের হুমকিও দিলেন। সেই সময় অবতারণা ঘটল দেবী অন্নদার। তিনি জাহাঙ্গীরকে শাসিয়ে বাঙালি ভদ্রলোকটিকে সসম্মানে মুক্ত করলেন। জাহাঙ্গীর লোকটিকে পুরস্কৃতও করলেন। উল্লসিত বাঙালি ব্যক্তিটি বঙ্গদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। সেই সঙ্গে সমাপ্ত হলো নিখুঁতভাবে সাজানো তিন খণ্ডের এই মঙ্গলকাব্যটি।

কবি জীবনানন্দ দাশ
হাজার হোক, মেঘনাদ ছিল পিতার আদর্শ পুত্র, মাইকেল নিজে যা হতে পারেননি। বাবার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে বিয়ে করতে তিনি রাজি হননি। তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন। বাবার ধর্মসংস্কার ত্যাগ করে তিনি খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। বাবার আর্থিক অবস্থা যখন সংকটময় হয়ে আসছিল, মাইকেল তাঁর সাহায্যে না এসে কলকাতা থেকে মাদ্রাজে পালিয়ে যান। মায়ের মৃত্যুর পরে একবার কলকাতায় এলেও দ্রুত ফিরে যান মাদ্রাজে। বাবার দেহাবসানের পরে—মাদ্রাজে স্ত্রী ও চার সন্তানকে পরিত্যাগ করে—স্থায়ীভাবে কলকাতায় চলে আসেন সম্পত্তির অংশ দাবি করতে।

প্রিয়ম: রবীন্দ্রনাথের মঙ্গলকাব্য পর্যালোচনা নিয়ে আপনি প্রচুর লেখালেখি করেছেন। তাঁর পর্যালোচনার তাৎপর্য কী? আধুনিক বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের সেই সমীক্ষার কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছিল কি?

সিলি: মঙ্গলকাব্যের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিলেন। তবে তা আধুনিক বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে প্রভাব ফেলেছিল কি না, সেটা বলতে পারব না। আমি বলতে চাই যে মঙ্গলকাব্যগুলোর বিশেষ কাঠামো—যা ছিল প্রাক-আধুনিক বঙ্গদেশের হিন্দু বাঙালিদের জীবনপ্রবাহের সর্বব্যাপী বর্ণনা এবং অন্যান্য দেবদেবীর চেয়ে অন্য কোনো দেবীর শৌর্যের প্রাধান্য—রবীন্দ্রনাথকে ভাবিয়েছিল। তাই তিনি রচনা করেছেন একটি আনন্দমুখর প্রতীকী নাটক তাসের দেশ, যেখানে তিনি জাতিভেদ এবং রক্ষণশীল ও আনুগত্যময় সমাজব্যবস্থার (তাঁর ভাষায় নিয়ম) বিরুদ্ধে প্রগতিশীল, আধুনিক ও সংস্কারমুক্ত সমাজব্যবস্থার (তাঁর ভাষায় ইচ্ছে) পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।

প্রিয়ম: মাইকেল মধুসূদন দত্ত যেভাবে রাবণ চরিত্রটি সৃষ্টি করেছেন, আপনার বিবেচনায় কেন সেটা আসলেই আধুনিক? মাইকেল যে নতুন করে রামায়ণের গল্প বললেন, সেটা কি পাশ্চাত্য না দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড়ীয় চিন্তাধারায় প্রভাবিত, যা আর্য ভাবধারার পরিপন্থী?

সিলি: রাম ও রাবণ সম্পর্কে মাইকেলের লেখা যে বাক্যটির উদ্ধৃতি প্রায়ই দেওয়া হয়ে থাকে, সেটি তাঁর সাহিত্যকর্ম থেকে নয়, বরং একটি চিঠি থেকে। সেটা তিনি লিখেছিলেন রাজনারায়ণ বসুকে। মাইকেল লিখেছিলেন, আমি রাম আর তাঁর দলবলকে ঘৃণা করি, কিন্তু রাবণের কথা মনে হলে আমার কল্পনাশক্তি উচ্চতর পর্যায়ে চলে যায় এবং উচ্চকিত হয়; তিনি ছিলেন বড় মাপের চরিত্র।

আপনার প্রশ্ন, মাইকেলের রচনায় রামায়ণ যেভাবে এসেছে, সেটা ইউরোপের ধ্রুপদী ধারার প্রতিফলন নাকি দ্রাবিড়ীয় ভাবধারায় রামায়ণের পুনঃনির্মাণ। এই বিষয়ে আমি বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড বইয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। সেখানে দেখিয়েছি যে মাইকেলের মহাকাব্যে প্রধান চরিত্রগুলি যেভাবে এসেছে, তা বাল্মিকীর সংস্কৃত ভাষার রামায়ণ অথবা কৃত্তিবাসের বাংলা ভাষার রামায়ণের চেয়ে ভিন্ন নয়। বছরের পর বছর ধরে সমালোচনামুখর পাঠকেরা ঐতিহাসিক রামায়ণ আর মাইকেলের রামায়ণের মধ্যে চরিত্রগুলির যে পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন, তাকে আমি বলেছি নাশকতামূলক উপমা। অর্থাৎ মাইকেল এমন উপমা ব্যবহার করেছেন যে পাঠকেরা বুঝেছেন রাম ও রাবণের চরিত্র তাঁর কাব্যে ভিন্নভাবে আঁকা হয়েছে। আদপে তা করা হয়নি।

ওপরে উল্লেখ করা মাইকেলের উদ্ধৃতিতে ফিরে আসি। সেখানে মনে হতে পারে যে তিনি রাবণকে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসাবে দেখিয়েছেন। না, তা তিনি করেননি। তাঁর মহাকাব্যের নাম রাবণবধ নয়, মেঘনাদবধ অর্থাৎ মেঘনাদকে হত্যা। রাবণের প্রথম ও প্রধান পুত্র মেঘনাদ এই মহাকাব্যের নায়ক। প্রকৃতপক্ষে মেঘনাদের কথা মনে হলে মাইকেলের কল্পনাশক্তি ‘উচ্চতর পর্যায়ে ওঠে, আর জাগ্রত হয়’। মেঘনাদকেই তিনি বীরোত্তম বিবেচনা করেছেন, এমনকি পূজনীয়ও। আমি মনে করি মেঘনাদ ছিল মাইকেলের কাঙ্ক্ষিত পুরুষ এবং তিনি নিজে মেঘনাদ হতে না পারার বিফলতা অনুভব করতেন। মেঘনাদবধ কাব্যের যে ইংরেজি অনুবাদ আমি করেছি, তার ভূমিকা থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিই। তাহলে বোঝাতে পারব আমি কী বলতে চাচ্ছি, ‘(মধুসূদন) দত্ত তাঁর এক চিঠিতে বলেছেন মেঘনাদকে নিধন করতে তাঁর কতটা কষ্ট হয়েছে। মেঘনাদ আমাকে শেষ করে দেবে, নাকি আমি তাকে শেষ করে দেব, এই ছিল আমার মনের দ্বন্দ্ব। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমি জিতে গেছি। সে এখন মৃত। এর অর্থ, আমি আমার বইয়ের ষষ্ঠ সর্গ আনুমানিক সাড়ে সাতশো লাইনে লিখে শেষ করলাম। মেঘনাদকে নিধন করতে আমার অনেক অশ্রু ঝরেছে। হাজার হোক, মেঘনাদ ছিল পিতার আদর্শ পুত্র, মাইকেল নিজে যা হতে পারেননি। বাবার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে বিয়ে করতে তিনি রাজি হননি। তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন। বাবার ধর্মসংস্কার ত্যাগ করে তিনি খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। বাবার আর্থিক অবস্থা যখন সংকটময় হয়ে আসছিল, মাইকেল তাঁর সাহায্যে না এসে কলকাতা থেকে মাদ্রাজে পালিয়ে যান। মায়ের মৃত্যুর পরে একবার কলকাতায় এলেও দ্রুত ফিরে যান মাদ্রাজে। বাবার দেহাবসানের পরে—মাদ্রাজে স্ত্রী ও চার সন্তানকে পরিত্যাগ করে—স্থায়ীভাবে কলকাতায় চলে আসেন সম্পত্তির অংশ দাবি করতে। মেঘনাদ তাঁর বাবার জন্য সব ত্যাগ স্বীকার করেছিল। এমনকি ঘটোৎকচও তাঁর বাবা ভীমের জন্য জীবন দান করেছিল। অন্যদিকে রাম—পিতার প্রতি আনুগত্য সত্ত্বেও—স্বেচ্ছানির্বাসনে দক্ষিণ ভারতে চলে গিয়েছিলেন। এই শোকে পিতা দশরথের অকালপ্রয়াণ ঘটে। বাবার প্রতি ভক্তি ও সেবায় মেঘনাদ শ্রেষ্ঠ, রাম নয়। আমি মনে করি মেঘনাদের জন্য, আর নিজে মেঘনাদের মতো সুপুত্র হতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য, মাইকেল এমন গভীর আবেগাপ্লুত শোকে মুহ্যমান।

মেঘনাদ তাঁর জনকের জন্য আত্মত্যাগ করেছে, রাম করেনি। মাইকেলও করেননি। মাইকেল মেঘনাদকেই সবচেয়ে বেশি সম্মান করতেন, তাই মেঘনাদের মৃত্যু তাঁকে অশ্রুসিক্ত করেছিল।

ক্লিন্টন বি সিলির ‘বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড: এসেজ অন বাংলা লিটারেচার’ বইয়ের প্রচ্ছদ
মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো মীর মশাররফ হোসেনও একজন বিরল ভাষাপ্রতিভা ছিলেন। দুজনেই নিজেদের কথ্যভাষা ছাড়াও ভাষার বাগধারা এবং প্রকাশভঙ্গিতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। দুজনেই নিজ নিজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কাহিনির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং সেগুলো নিজস্ব ধারায় আধুনিক বাকরীতিতে পুনঃনির্মাণ করেছেন। দুজনেই তাঁদের যৌবনকালের দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃষ্টিশীলতা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা হারিয়েছিলেন। তবে তাঁরা আমাদের জন্য যে অবিশ্বাস্য সাহিত্যশৈলী রেখে গেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

প্রিয়ম: আধুনিক বাংলা সাহিত্যে একজন প্রথম দিকের গদ্যসাহিত্যিক হিসাবে মীর মশাররফ হোসেনের স্থানকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন, বিশেষ করে যখন তাঁর বিষাদ–সিন্ধু আদৌ উপন্যাস কিনা, সেই বিতর্ক যখন রয়েই গেছে? তিনি যে প্রথম জীবনের অসাম্প্রদায়িক চিন্তাবিদ থেকে প্রৌঢ়ত্বে এসে অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল হয়ে গেলেন, এ বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যা কী?

সিলি: মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো মীর মশাররফ হোসেনও একজন বিরল ভাষাপ্রতিভা ছিলেন। দুজনেই নিজেদের কথ্যভাষা ছাড়াও ভাষার বাগধারা এবং প্রকাশভঙ্গিতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। দুজনেই নিজ নিজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কাহিনির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং সেগুলো নিজস্ব ধারায় আধুনিক বাকরীতিতে পুনঃনির্মাণ করেছেন। দুজনেই তাঁদের যৌবনকালের দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃষ্টিশীলতা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা হারিয়েছিলেন। তবে তাঁরা আমাদের জন্য যে অবিশ্বাস্য সাহিত্যশৈলী রেখে গেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বিষাদ–সিন্ধুকে উপন্যাস শ্রেণিভুক্ত করা যায় কিনা, সে প্রশ্নে আমি স্মরণ করব মেঘনাদবধ কাব্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বিরূপ সমালোচনা। তিনি রচনাটিকে মহাকাব্য বলে গ্রহণ করতেই অসম্মত ছিলেন। পরে অবশ্য সেই অবস্থান থেকে এই বলে সরে এসেছিলেন যে তাঁর আগের নেতিবাচক মতামত অনেকটাই প্রথম বয়সের ভাবোচ্ছ্বাসের ফল। মীর মশাররফ হোসেনের চিত্তাকর্ষক রচনা বিষাদ–সিন্ধু সাহিত্যের কোন শ্রেণিতে পড়বে তা নিয়ে এবং সাহিত্যের শ্রেণিবিভাগ ও তার সমালোচনা, অর্থাৎ সাহিত্যকর্মের সাফল্য অনেকটা নির্ভর করে সেই রচনাটি নির্দিষ্ট শ্রেণির বৈশিষ্ট্য কতখানি মেনে চলেছে তার ওপর। এসব বিষয়ে আমি বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড বইটিতে সাধারণভাবে আলোচনা করেছি।

আমার স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে মাঝেমধ্যে আমার মনে হয়েছে, জীবনানন্দ তাঁর রূপসী বাংলার সনেটগুলো প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন এই ভেবে যে পাঠকেরা কবিতাগুলোর আবেগপূর্ণ আবেদন উপেক্ষা করে সেগুলো ইউরোপীয় সনেটের কাঠামো শুদ্ধভাবে অনুসরণ করেছে কিনা সেটাই বেশি করে দেখবেন। আমরা জানি যে মাইকেলের সময় থেকেই সনেট বাংলা সাহিত্যের একটি ফলপ্রসূ ধারা। জীবনানন্দ তাঁর সনেটগুলোর আবেদনের গভীরতা নিয়ে সন্দিহান না থাকলেও পারতেন। আমরা দেখেছি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই কবিতাগুলো কী দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল।

প্রিয়ম: রবীন্দ্রনাথের গল্প যখন আপনি সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে দেখলেন, সেটা কি মূল গল্প সম্পর্কে আপনার ধারণা বদলে দিয়েছিল? এই অভিজ্ঞতার আলোকে, সাহিত্য ও চলচ্চিত্র, এই দুই মাধ্যমের পারস্পরিক ভাববিনিময়, দ্বন্দ্ব বা রূপান্তর নিয়ে আপনার অভিমত কী?

সিলি: সত্যজিৎ রায়ের নির্দেশনার সঙ্গে মাধবী মুখোপাধ্যায় ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ে চারু/কাদম্বরী এবং অমল/রবীন্দ্রনাথের উপস্থাপনায় রবীন্দ্রনাথের নষ্টনীড় নভেলাটি বেশি জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে। সাধারণত চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের মধ্যে আমি যেটা প্রথমে দেখি বা পড়ি, সেটাই আমার পছন্দের বস্তু হয়। যদি সিনেমাটা আগে দেখে বইটা পরে পড়ি, বইয়ের লেখা অসম্পূর্ণ মনে হয়। আবার বই আগে পড়ে আর সিনেমা পরে দেখলে সিনেমাটা সেরকম ভালো লাগে না। কিন্তু নষ্টনীড় আর চারুলতার কথা ধরলে দুটিই আমার দৃষ্টিতে অপূর্ব এবং সমানভাবে আকর্ষণীয়।

ইউপিএল থেকে প্রকাশিত বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড-এর ভূমিকায় আমি লিখেছি যে একটি অসুখী দাম্পত্যের কাহিনি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় নাটকীয়ভাবে ফুটে উঠেছে। আমি আরও লিখেছি যে সত্যজিৎ কাহিনিটিকে যেভাবে দেখেছেন আমিও সেভাবেই দেখি। সব সমসাময়িক বাঙালি পাঠক ও দর্শকদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য মনে হবে না। অনেকেই কিছুতেই মেনে নেবেন না যে অমল আসলে রবীন্দ্রনাথের নিজের চরিত্রের প্রতিফলন, আর চারুও বস্তুতপক্ষে কাদম্বরী দেবী। এইসব পাঠক-দর্শক সত্যজিৎকে এবং আমাকেও এই বলে দোষারোপ করতে চান যে আমরা রবীন্দ্রনাথ ও কাদম্বরীর চরিত্র–হনন করেছি। এই প্রসঙ্গে আমার ওই বইয়ের ভূমিকা থেকে হুবহু তুলে দিচ্ছি, ‘সত্যজিৎ বা আমি কেউই রবীন্দ্রনাথ বা কাদম্বরীর নামে কলঙ্ক লেপন করতে চাইনি। রবীন্দ্রনাথ নিজেও তা করেননি। তিনি তাঁর বিস্ময়কর প্রতিভাময়ী বৌঠান কাদম্বরীর গল্প—যা প্রাণবন্ত ও স্বাভাবিকভাবেই হৃদয়বিদারক—বলে গেছেন, কিন্তু তাঁর প্রতি কখনোই অশ্রদ্ধাশীল হননি।

রোকেয়া থেকে আরম্ভ করে বাঙালি নারী লেখকদের কাতারে রিজিয়া রহমানকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়। তবে আমি তাঁকে শুধুমাত্র নারী লেখকদের অন্তর্ভুক্ত হিসাবে দেখি না, বরং একজন বাঙালি লেখক হিসাবেই দেখি। তিনি যে তাঁর সাহিত্যে সমকালীন বাংলাদেশের অসম ও বৈচিত্রময় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয়কে অর্থবহ করার উদ্যোগ নিয়েছেন, তা আমার মতে তাঁর অন্তর্দৃষ্টির পরিচায়ক এবং আমাদের জন্য ভাবনা–উদ্দীপক।

প্রিয়ম: আপনি রাজা প্রতাপাদিত্যকে বিতর্কিত নায়ক হিসাবে বর্ণনা করেছেন। কী কারণে আপনি এই সিদ্ধান্তে এসেছেন? বারো ভুঁইয়াদের মধ্যে তিনিই কি ব্যতিক্রমী ছিলেন, নাকি অন্যদের চরিত্রেও আপনি এমন দ্ব্যর্থকতা লক্ষ করেছেন? পরবর্তী সময়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদের ঢেউ আর আঞ্চলিক বাঙালি সত্তা এবং সর্বভারতীয় বীরত্বব্যঞ্জনার টানাপোড়েনের মধ্যে রাজা প্রতাপাদিত্যের কীর্তি কীভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে?

সিলি: আমার বইয়ে রাজা প্রতাপাদিত্যকে নিয়ে লেখা পরিচ্ছেদে আমি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছি কেন আমি তাঁকে বিতর্কিত বাঙালি নায়ক হিসাবে চিত্রিত করেছি। স্বদেশি আন্দোলনের সময় প্রতাপাদিত্যের ভূমিকার জন্য তাঁকে নায়কোচিত মর্যাদা দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ—বিশেষ করে তাঁর ভাগ্নি সরলা দেবী চৌধুরানী যে তাঁকে অতি উচ্চ আসনে বসিয়েছিলেন, তা নিয়ে। রাম রাম বসুর লেখা জীবনী পড়ে এবং সাহিত্যে অন্যান্য যুক্তি-প্রমাণ দেখার পর, প্রাক-আধুনিক বঙ্গদেশের যশোরের এই বাঙালি যুদ্ধবাজ রাজা সম্পর্কে আমি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একমত, তাঁর ভাগ্নির সঙ্গে নই।

প্রিয়ম: স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা কথাসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে রিজিয়া রহমানের অবস্থান কোথায় বলে আপনি মনে করেন?

সিলি: রোকেয়া থেকে আরম্ভ করে বাঙালি নারী লেখকদের কাতারে রিজিয়া রহমানকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়। তবে আমি তাঁকে শুধুমাত্র নারী লেখকদের অন্তর্ভুক্ত হিসাবে দেখি না, বরং একজন বাঙালি লেখক হিসাবেই দেখি। তিনি যে তাঁর সাহিত্যে সমকালীন বাংলাদেশের অসম ও বৈচিত্রময় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয়কে অর্থবহ করার উদ্যোগ নিয়েছেন, তা আমার মতে তাঁর অন্তর্দৃষ্টির পরিচায়ক এবং আমাদের জন্য ভাবনা–উদ্দীপক।

দ্য ডেইলি স্টার থেকে

অনুবাদ: লুৎফর রহমান খান: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী প্রকৌশলী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক