মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হলেও এর পরে সাংস্কৃতিক প্রশ্ন মীমাংসিত হয়নি। সাতক্ষীরা শহর আক্রমণের প্রস্তুতি মুক্তিযোদ্ধাদের। দেবহাটা, ২২ নভেম্বর ১৯৭১
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হলেও এর পরে সাংস্কৃতিক প্রশ্ন মীমাংসিত হয়নি। সাতক্ষীরা শহর আক্রমণের প্রস্তুতি মুক্তিযোদ্ধাদের। দেবহাটা, ২২ নভেম্বর ১৯৭১

মূল রচনা

বাংলাদেশের সংস্কৃতির খোঁজে

আমাদের দেশে সংস্কৃতির আধুনিক ধারণার উদয়ের একটা উপনিবেশি পরম্পরা আছে। প্রাগাধুনিক সমাজে ধর্ম, রীতি, দেশাচার, আর্যত্ব, তমদ্দুন, তাহজিব, রসম, রেওয়াজ ইত্যাদির ধারণা থাকলেও হালে সংস্কৃতির ধারণা অপেক্ষাকৃত নতুন। ১৯২২ সালে এক মারাঠি বন্ধুর কাছে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি পান ‘কালচার’–এর বাংলা হিসেবে। শব্দটির বরাত তাঁরা বেদে খুঁজেছিলেন বটে, কিন্তু এর অর্থ নির্ধারণ করেন আধুনিক ইউরোপের ‘কালচার’ ও ‘বিল্ডাং’ শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে।

মোগল আমলে আলাওল তরুণদের জীবন সম্পর্কে শেখাতে গিয়ে তোহফা গ্রন্থ অনুবাদ করেছিলেন। সে গ্রন্থে ফিরিস্তি ছিল জীবনের সকল দিকের, ‘কিবা দ্বীনী, কিবা দুনি কিবা ধর্মকর্ম/ ভোজন, পিয়ন, রতি, বাহ্য শৌচকর্ম/ গৃহস্থির কার্য কিবা লক্ষ্মী বাড়ে টুটে।’ অর্থাৎ শরিয়ত, দুনিয়ার বুদ্ধি, নীতিশাস্ত্র, জীবনের লক্ষ্মীশ্রী সবকিছু এক ম্যানুয়ালে হাজির করেছেন তিনি। আলাওলের এই ছকটির নাম ছিল ‘আদব’ তথা সাংস্কৃতিক শিক্ষা—যার ভিত্তি ছিল প্রত্যাদেশ থেকে শুরু করে দেশাচার।

কিন্তু আলাওলের কেতাবি ও দরবারি বোঝাপড়ার বাইরে মেঠো বাংলায় রসম-রেওয়াজ ছিল বহুবিচিত্র। এই দেশের সংস্কৃতি গঠিত হয়েছে খনা, কাহ্নপা, শাহজালাল, নূর কুতুব আলম, শ্রীচৈতন্য, নিত্যানন্দ, হাজী মুহম্মদ, লালন ফকিরসহ বহুবিচিত্র ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক রূপান্তরের পথ ধরে। বর্ণাশ্রম তথা জাতপাতের বৈষম্য কিংবা রাজা-জমিদার-ডিহিদারের শাসন-শোষণ সত্ত্বেও বাংলায় জীবন্ত বিচিত্র মানুষের সপ্রাণ সম্পর্কের ভেতর দিয়ে সুফি, ফকির, বৈষ্ণব, নাথ ইত্যাদি চিন্তা, চিহ্ন, করণের বিকাশ ঘটে, যা আধিপত্যবাদী ও বৈষম্যমূলক নিগড়কে প্রশ্ন করার উসকানিই কেবল দেয়নি, বরং দরগা-আখড়ার জাতিভেদহীন কল্পনায়, কৃষক-কারিগর-ফকির-সন্ন্যাসীর আন্দোলনে সেই নিগড় ভাঙা বাসনার খণ্ডিত প্রয়োগও করেছে।

তাহমিদাল জামি

কিন্তু উপনিবেশি জমানায় বাংলার সমাজে যে ধাক্কা লাগল, তার দরুন কলকাতাকেন্দ্রিক ভদ্রবিত্তের সমাজে আচার-আদব-রসম-রেওয়াজকে নতুন ভিত্তি দেওয়ার প্রয়োজন হলো। এই নতুন ভিত্তির কেতাবি নাম ছিল মানুষের বৃত্তি বা শক্তি। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘অনুশীলন’ নামক নতুন এক তত্ত্ব হাজির করলেন, যা হলো মানুষের ‘শারীরিক ও মানসিক শক্তি’র সম্যক অনুশীলনের মাধ্যমে ‘মনুষ্যত্বের সর্বাঙ্গীণ পরিণতি’। এই অনুশীলনকে মানুষের বৃত্তির ওপর স্থাপন করে তাকে একদিকে ধর্মতত্ত্ব, আরেক দিকে রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে বঙ্কিম একটি নতুন মানবকেন্দ্রিক অথচ ধর্মতাত্ত্বিক পরমার্থ হাজির করেছেন। তাই বঙ্কিমের কাছে, ‘কালচার বিলাতি জিনিস নহে, ইহা হিন্দুধর্মের সারাংশ’।

বঙ্কিমের মতো রবীন্দ্রনাথও সংস্কৃতি বলতে চিত্ত, শক্তি ও চরিত্রের বিকাশ ও সক্রিয়তা বুঝিয়েছেন। মানবীয় বৃত্তিকে কেন্দ্রে রেখে রবীন্দ্রনাথও ‘কালচার’ বলতে ‘কালচারড’ হওয়াই বুঝিয়েছেন। ‘কালচার’–এর বাংলা হিসেবে ‘কৃষ্টি’ শব্দটি তাঁর ভালো লাগেনি। ওটা চাষবাসের সঙ্গে যুক্ত বলে ওই শব্দে তাঁর চন্দনের সাবান মেখে স্নান করার ইচ্ছা হয়েছে।

আধুনিক যুগের সংস্কৃতি ‘কৃষ্টি’র হদিসের ব্যাপার, আবার ‘অনুশীলন’ বা সাধনারও ব্যাপার। একদিকে জাতি, আম বা জনসমাজের সংস্কৃতি নিয়ে পণ্ডিতেরা লেখাপড়া করেন; অপরের সাংস্কৃতিক হালচালের হদিস-বিবরণ-সঞ্চয়ন করেন। অন্যদিকে মানুষের যে আত্মসত্তা গঠনের সাধনা, যে তালিম-তরিবত-সহবত চর্চা—সেই সাধনার দিকটাও সংস্কৃতি।

সংস্কৃতি একই সঙ্গে মানুষের আবাস ও আবাদ। মানুষ ভাষায়, চিহ্নে, আচারে বাস করে; আবার সেগুলোকে ব্যবহারিকভাবে গড়েপিটে কাজেও লাগায়। উৎপাদনে মানুষ আদৌ কোন শর্তে শরিক হবে, সেটারও নির্ণয় ঘটে সাংস্কৃতিক চিহ্নতন্ত্রে। এ কারণেই আধুনিক সমাজে সাংস্কৃতিক নানা প্রথা-প্রতিষ্ঠান মানুষকে বিদ্যমান কাঠামোর অনুগত বান্দা আকারে পুনরুৎপাদন করে। সংস্কৃতি সমাজের মধ্যে অভিমুখিতা তৈরি করে। সমাজের মাতবর শ্রেণি ও গোষ্ঠী আমের হালচাল, বাসনা ও সাধনার রূপকার হতে চায়। এভাবে সংস্কৃতি বান্দাকে বিদ্যমান কাঠামোতে যে কল্পসূত্রে বাঁধে, তাকেই ফরাসি তাত্ত্বিক লুই আলথুসারের ভাষায় ভাবাদর্শ বলা যায়।

চব্বিশের গণ–আন্দোলন অনেক সাংস্কৃতিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। পুলিশের বাধার সামনে একা। ৩০ জুলাই ২০২৪। গুলিস্তান, ঢাকা

জাতীয়তাবাদের ঐতিহাসিক গণ্ডি

সলিমুল্লাহ খান তাঁর বেহাত বিপ্লব গ্রন্থে বলেছিলেন, বাংলাদেশের মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলেও জাতিনিরপেক্ষতা নাই—যেটা সংকটের এক গোড়া। বাঙালি জাতীয়তাবাদকে যেভাবে একটি কর্তৃত্ববাদী ও বৈষম্যবাদী সাংস্কৃতিক কাঠামো আকারে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তার কারণ স্বাধীন বাংলাদেশে তা একদিকে কায়েমি ক্ষমতার কর্তৃত্ববাদী সাংস্কৃতিক যুক্তি আকারে জারি হয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের জাতিপ্রশ্নেরও ন্যায্য মীমাংসা করতে সমর্থ হয়নি।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদি বয়ান উনিশ শতকে কলকাতাকেন্দ্রিক ভদ্রবিত্ত বর্গের হাতে বিকশিত হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়দের হাতে এমন একটি রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব গঠিত হয়, যেখানে জাতীয়তাবাদ, ধর্মতত্ত্ব, সভ্যতাগত আদর্শ ইত্যাদির এক কিম্ভূতকিমাকার সংশ্লেষ তৈরি হয় এবং সমগ্র ভারতীয় হিন্দু-আর্য সভ্যতার সূচিমুখ হিসেবেই বাংলার হিন্দু, বিশেষত ব্রাহ্মণ ভদ্রলোকের একধরনের নেতাগিরি প্রস্তাব করা হয়।

তবে উপনিবেশি বাংলায় পরিগঠিত হওয়া জাতি ও সংস্কৃতিবোধ ঠিক এককাট্টা-একশিলা জিনিস ছিল না, বরং তার ভেতরে প্রত্যক্ষ ও নেপথ্য নানা বাহাস ছিল। বঙ্কিমের হিন্দু-আর্যকেন্দ্রিকতাকে খানিকটা দুর্বল করে দেয় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর বৌদ্ধ ইতিহাসের পর্যালোচনা। বাংলার আদি বৌদ্ধ গান ও দোঁহা তিনি নেপালের মহাফেজখানা থেকে সংগ্রহ করে আনেন। রবীন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথদের রূপকথা, ছড়া, পট, ব্রত ইত্যাদির সঙ্গে সংযোগ কিংবা দীনেশচন্দ্র সেনের বঙ্গসাহিত্য বা বৃহৎ বঙ্গ–এ উপস্থাপিত নতুন কল্পপ্রেক্ষিতও বঙ্কিমের হিন্দুরাষ্ট্রের কল্পনাকে কিছুটা ধাক্কা দিয়েছিল। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের পুঁথিচর্চার মধ্য দিয়ে বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতির পরিসরে হিন্দু-মুসলমানের যৌথ শরিকানার দাবি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়; আর নজরুলের গণ্ডিভাঙা চঞ্চল সঞ্চারণে জাতপাতহীন এক মুক্ত জমায়েতের সুদূর সম্ভাবনা ফুটে ওঠে।

রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি প্রশ্নে এই ডামাডোলের মধ্যেই ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশে একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম হয়। হিন্দু-মুসলমান বিভাজন এবং উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গের দ্বন্দ্বের যে বাস্তবতা, সেই রাজনৈতিক দিগন্তের ভেতরেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রশ্নটিও পূর্ব বাংলায় নতুনভাবে মোকাবিলার অন্তত দুটি প্রচেষ্টা হয়।

প্রথমত, কলকাতাকেন্দ্রিক ভদ্রবিত্ত সমাজের দাপটের মুখে পূর্ব বাংলার আম কৃষক ও মুসলমান সমাজকে কেন্দ্রে রেখে আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠনের চেষ্টা করেন। পূর্ব বাংলা ও মুসলমান পরিচয়ের সংশ্লেষকে তাঁরা একটা জাতিতাত্ত্বিক ভিত্তিও দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ অঞ্চলের মানুষ দ্রাবিড় জাত থেকে এসেছে তাই তারা আলাদা, এমন আনাড়ি যুক্তিও দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে ‘পাকবাংলার কালচার’ এবং মুক্তিযুদ্ধের পরে ‘বাংলাদেশের কালচার’ নামে এভাবেই ভিন্ন সাংস্কৃতিক বনিয়াদ গঠনের চেষ্টা করেছিলেন আবুল মনসুর আহমদ।

দ্বিতীয়ত, উনিশ শতকের বাঙালি জাতীয়তাবাদের বাইরেও অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতির ধারণা ১৯৬০–এর দশকে বাংলার ইতিহাস ও জাতীয় সাহিত্য খুঁড়ে রচনার প্রয়াস দেখা যায়। মমতাজুর রহমান তরফদারের সুলতানি আমলের ইতিহাসে, আহমদ শরীফের ‘গণমানবে’র সাহিত্যের সযত্ন উপস্থাপনে, জহির রায়হানের উপন্যাসে-চলচ্চিত্রে, বদরুদ্দীন উমরের সাম্প্রদায়িকতা ও সংস্কৃতি বিশ্লেষণে সেই হদিস ধরা পড়ে। এ সকল কাজের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলায় বাঙালি পরিচয়ের একটি নতুন এথনোলজিক্যাল আর্কাইভ গঠিত হয়, যা তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বসেও একটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক দিগন্তের দিকে হাতছানি দিয়েছিল। সাংস্কৃতিক চিহ্নশালা ও সাধনা এখানে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী গঠনের যুক্তি আকারে কাজ করেছিল।

সংস্কৃতি মানে নিছক আত্মতত্ত্ব নয়, আত্মপরিচয়ের উদাত্ত জাহিরা ও দাপট নয়, বরং সমাজে হাজির বহুবিচিত্র মানুষের যে ঐতিহাসিক অস্তিত্ব, তাকে ধারণ করে সবার সঙ্গে শরিকানার ভাষা খুঁজে পাওয়াই দশের সংস্কৃতি গঠনের মূল শর্ত।

বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক লড়াই

১৯৬০–এর দশকের সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে পরিণতি পাওয়ার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হলেও তার ফলে সাংস্কৃতিক প্রশ্ন মীমাংসিত হয়ে যায়নি। মীমাংসিত হওয়ার কথাও নয়। আলমগীর কবির বা বদরুদ্দীন উমরের মতো কেউ কেউ মনে করতেন যে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্ন চিরদিনের মতো মীমাংসা হয়ে গেছে। কিন্তু আহমদ ছফার বরাত দিয়ে সলিমুল্লাহ খান বলেছেন যে প্রশ্নটার গোড়া উপমহাদেশের আন্তরাজনৈতিক পরিসরে এবং বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির মননে প্রোথিত। ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে আহমদ ছফা দেখান যে এই দেশের আমমানুষ এমন এক ইতিহাসের ‘দাবায়ে রাখা’ জনগোষ্ঠী, যারা তাদের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক অধস্তনতাকে মোকাবিলা করার জন্য বারবার তাদের ধর্মান্তর করেছে, সাংস্কৃতিক খোলস ও রাজনৈতিক পরিচয় বদল করেছে, এমনকি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রও গঠন করেছে। তবু তার মুক্তি যে এখনো সুদূরপরাহত, তার কারণ এখানে গড়ে ওঠা ভদ্রবিত্ত শ্রেণির সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতের সীমাবদ্ধতা ও চিন্তার বিকাশের আড়ষ্টতা।

স্বাধীন বাংলাদেশেও বাঙালি জাতীয়তাবাদ আর মুসলমান বা ইসলামি পরিচয়বাদ একই সঙ্গে রাষ্ট্রাদর্শ ও সাংস্কৃতিক ভাবাদর্শের দুই মেরু আকারে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। ডিজিটাল পরিসরে প্রতিদিন অ্যালগরিদমের বলকে বলকে উথলে ওঠে ভাষা, ধর্ম, যৌনতা, জীবনাচরণ ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে সাংস্কৃতিক কাজিয়া।

এই সাংস্কৃতিক মেরুকরণ কি মানুষের বাস্তব গরজের প্রশ্নগুলোকে ধামাচাপা দেয় না? মানুষের চোখে ধুলা দেওয়ার জন্যই কি অনিঃশেষ নিত্যনতুন কাজিয়া হাজির করা হয়? এই মেরুকরণের চাপে মানুষ ও প্রাণের গোড়ার নানা গরজ আদতেই চাপা পড়ে যায়; জলবায়ু, প্রাণবৈচিত্র্য, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বিপন্নতা, প্রযুক্তির আগ্রাসী উৎত্রাস ইত্যাদি প্রসঙ্গ ধামাচাপা পড়ে।

তবে তাত্ত্বিকভাবে আলাদা করা গেলেও মূর্ত ইতিহাসের জমিনে সাংস্কৃতিক প্রশ্ন আর মানুষের ব্যবহারিক স্বার্থের প্রশ্নকে আলাদা করা মুশকিলই। একদিকে সাংস্কৃতিক আত্ম–পরের প্রশ্ন, আরেক দিকে সম্পদের হিস্যার প্রশ্ন—এই দুইটা ব্যাপারকে সাতচল্লিশ, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তর, মুক্তিযুদ্ধ বা চব্বিশের জুলাই, কোনো পর্যায়েই একেবারে আলাদা রাখা যায়নি। নাগরিকদের জীবন ও জবানের স্বাধীনতা, শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকারের প্রশ্নকে সাংস্কৃতিক নাকি আর্থসামাজিক প্রশ্ন বলা হবে, সেই ভেদরেখা টানা অসম্ভব। সাংস্কৃতিক মেরুকরণ সমাজ ও রাষ্ট্রে ক্ষমতা, সম্পদ ও আত্মপরিচয়ের ভিন্ন ভিন্ন দিগন্ত হাজির করে।

সংস্কৃতি কি শুধু আত্মপরিচয়ের জাহিরানা নাকি পরের সঙ্গে শরিকানাও? পরিচয়বাদ মানুষের ঐতিহাসিক আপতিক অস্তিত্বকে শাশ্বত বা অপরিবর্তনীয় ধাতে (এসেন্স) পর্যবসিত করে, আত্মপরিচয় নির্ধারণ করতে গিয়ে তাকে বানিয়ে ফেলে ধর্মতত্ত্ব।

জাতীয়তাবাদের সংকট

বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে লিবারেল আধুনিকতাবাদী কল্পনা, সেখানে সমাজের শিক্ষিত অগ্রসর ‘ভদ্রবিত্ত’ শ্রেণিই আপামর আমজনতাকে চালিত করবে উন্নয়ন ও বিকাশের পথে, যে পথ আগে থেকেই দেখিয়ে দিয়েছে উন্নত পশ্চিমের দেশগুলো। সরলরৈখিক পরিণামবাদী উন্নয়নের পথে দেশীয় নানা চিহ্ন নেহাত কিয়াস, রূপক, মেছাল আকারে আসবে মাত্র। ‘সুফিবাদ’, ‘লোকসংস্কৃতি’ বা ‘রবীন্দ্রনাথ’কে সেখানে প্রতীক আকারে, আত্মপরিচয়ের বিনোদ রূপ আকারে, কায়েমি কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতার চিহ্নতান্ত্রিক ঠেকনা আকারে ব্যবহার করা হয়।

কিন্তু লিবারেল জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতিকে আমরা যে পোষা, নিরীহ ও সরল চেহারায় হাজির করতে চেয়েছি, তা কাজ করেনি। ফলে লিবারেল জাতীয়তাবাদকে দ্রুতই কর্তৃত্ববাদী চরিত্র ধারণ করতে হয়েছে। জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র সমাজে ক্রমবর্ধমান শ্রেণিবৈষম্য লাঘব করতে পারেনি। নাগরিকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বাংলা, ইংরেজি ও আরবি মাধ্যমের যে ত্রিধাবিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থা এ দেশে চালু আছে, তাতে বোঝা যায় দেশের অধিপতি শ্রেণি নিজ সাধনাকে আমজনতার সাধনার সঙ্গে একাত্ম করতে চায় না। তার নিজ বাসনা-সাধনা যে মানচিত্রে হাজির, সমাজের আমের জন্য সে সেই একই মানচিত্র ও দিগন্ত ধার্য করেনি। শিক্ষাব্যবস্থার এই বৈষম্যই হাল–জমানায় জাতপ্রথা আকারে কায়েম হয়েছে।

ধর্মীয় পরিচয়বাদ ও সভ্যতাবাদের সীমাবদ্ধতা

রাষ্ট্র যখন সমাজের সাধারণ মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, শিশুযত্ন, আবাসন, মনঃসামাজিক আশ্রয় দিতে পারেনি, তখন একদিকে এগিয়ে এসেছে বিদেশি তহবিলনির্ভর এনজিও, আরেক দিকে মাদ্রাসাভিত্তিক ধর্মীয় সমাজ। বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রায়োগিক রূপের যে বিকার, তার পরিপ্রেক্ষিতেই ধর্মপরিচয়বাদী ভাবাদর্শের বিপুল বিকাশ ঘটেছে। অনেকে উগ্র জাতীয়তাবাদী অচলায়তনকে এককাট্টাভাবে ইসলামবিদ্বেষী বলেন, কিন্তু আসলে উগ্র জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শ তার কর্তৃত্ববাদী চরিত্রের কারণেই মুসলমান, হিন্দু, আদিবাসীসহ সমাজের কোনো অংশের মানুষের সপ্রাণ অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও অভিব্যক্তিকেই মূল্য দিয়ে গ্রহণ করতে পারেনি।

এর মধ্যে উল্টা দিকে আবার সভ্যতা, তুরাস, খেলাফত-ইমারত, সালতানাত, বড় বাংলা ইত্যাদি চিন্তা হাজির হয়েছে। এককেন্দ্রিক বিশ্বে মানুষকে একাকাররূপে গড়ে তোলার যে আগ্রাসী জ্ঞানগত আইনি প্রক্রিয়া, তার বিপরীতে দুনিয়ার নানা এলাকায় অমোচনীয় সাংস্কৃতিক ভেদের পপুলার ডোক্সা বা জনপ্রিয় মত আকারেই সভ্যতার ধারণা গজিয়ে উঠছে। তবে এগুলোও পাল্টা মোড়লবাদী চিন্তাই। এক সাম্রাজ্য ভেঙে কতিপয় সাম্রাজ্য বা প্রভাববলয় গঠনের কল্পনা থেকে বহু-সভ্যতাবাদকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব।

সভ্যতার হদিসবাদী ধারণার পাশাপাশি তার একটা সাধনাবাদী দিক আছে। সেটা অসভ্য, বর্বর, হাইল্যা, ফকিন্নি, ছাপড়ি, শিরকি, মাজারি প্রভৃতিতে আমমানুষকে বর্গায়িত করে তাদের সভ্যকরণের বান্দা–গাঠনিক প্রকল্প চালু করার অর্থে। ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলে তো বটেই, হালেও পরিচয়বাদী ও ধর্মতান্ত্রিক চিন্তায় বাংলার আপামর মানুষের বহুমাত্রিক সংস্কৃতিকে নিচু আকারে দেখার প্রবণতা আছে। আকিদাতান্ত্রিক কায়দায় মানুষের জীবনকে অনুশাসন ও পুনর্গঠন করার চেষ্টাও আছে। কল্পনায় সুনির্দিষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক গোষ্ঠী মানুষকে তুরাস ও তকলিদের পথে এগিয়ে নেবে, সেখানে মৌলিকভাবে নতুন কোনো দশা ও বিবেচনার সুযোগ কম। সেই পথে উত্তর গোলার্ধের বিদ্যায়তনে চর্চিত নানা তত্ত্বের বরাত ও তাত্ত্বিকের নাম সাফাই আকারে ব্যবহৃত হয়।

অথচ বাংলায় ইসলাম শুরু থেকেই বাংলার স্থানীয় প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিন্যাসের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। কৃষিভিত্তিক দেশে ইউসুফ গদার অনুসরণে আলাওল লিখেছেন, ‘যথেক বিদ্যা হএ ধন উপার্জিত।/ তার মধ্যে কৃষিকর্ম সবার পূজিত।’ বাংলায় বজ্রযান থেকে সহজ এসেছে। চণ্ডীদাসের সহজ মানুষ গৌড়ীয় বৈষ্ণবে হয়েছে সহজিয়া। আবদুল হাকিমের কবিতায় স্পষ্ট হয়েছে যে যেই দেশে যেই বাক্য বা চিহ্ন ধারণ করে মানুষ, সেটাই নিরঞ্জনের কাছে গ্রাহ্য। লিখন, মুদ্রণ ও ডিজিটাল মাধ্যমে সংস্কৃতির এই স্থানিক আত্মীকরণ নতুন নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে মাত্র।

বরং সভ্যতাবাদী ডানপন্থার যে স্থানিক নমুনা, তার বোলচাল-লব্জ অনেকটাই ধার করা। আদতে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক তুরাসের সঙ্গে পুনঃসংযোগের রাস্তাগুলো আন্ততুরাসি বলেই তুরাসবাদীদের আলাপ দারুণভাবে বৈশ্বিক পরিচয়বাদী ডানপন্থার সঙ্গে মিলে যায়। ইতিহাস ও বিবর্তনবাদী মনস্তত্ত্ব ও জীববিদ্যার একপেশে ব্যবহার, জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ ইত্যাদির ধাতবাদ, অপর বা সংখ্যালঘু পরিচয়ের মানুষকে ক্রিমিনাল এলিয়েন বা ‘বিজাতীয় বদমাশ’ মনে করা—এইসব প্রশ্নেই দেশি ডানপন্থীরা হাল দুনিয়ার শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী বা হিন্দুত্ব সংস্কারীদের স্বগোত্র। জাতীয়তাবাদ বা সভ্যতাবাদ যেমন বৈষম্যের বৈধতা দিতে হাজির হচ্ছে, তেমনি বি–উপনিবেশায়নের ধারণাটিও প্রায়ই হাজির হচ্ছে পরিচয়বাদী ও আকিদাতান্ত্রিক চিন্তার ছুতা আকারে। নেকড়ে প্রায়ই দাদিমা সেজে শুয়ে থাকে, বের হয়ে থাকে কেবল তার দাঁতগুলো।

শেষ কথা

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সংকটের অন্যতম কারণ দেশটা বৈশ্বিক আখেরি পুঁজিতন্ত্রের প্রান্তিক জোগানদার-ঠিকাদার। দেশবাসী সর্বজনীন শিক্ষা পাবে কি না, বাক্​স্বাধীনতা কতটা ভোগ করবে, দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে কতটা অর্থপূর্ণ কর্মকাণ্ড হবে বা না হবে—তা এই প্রান্তিক জোগানদারির জায়গা থেকেই নির্ধারণ করে শাসক মাতব্বরবর্গ। ফলে দেশে জাতীয় বা ধর্মীয় পরিচয়বাদের নামে যেসব বড়াই করা হয়, প্রায়ই তা বৈশ্বিক ক্ষমতাকাঠামোতে দেশ যে ‘অসম সমন্বয়ে’ বিজড়িত, সেটা জারি রাখার সাফাই আকারে কাজ করে।

সংস্কৃতি মানে নিছক আত্মতত্ত্ব নয়, আত্মপরিচয়ের উদাত্ত জাহিরা ও দাপট নয়, বরং সমাজে হাজির বহুবিচিত্র মানুষের যে ঐতিহাসিক অস্তিত্ব, তাকে ধারণ করে সবার সঙ্গে শরিকানার ভাষা খুঁজে পাওয়াই দশের সংস্কৃতি গঠনের মূল শর্ত। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক গণ–অভ্যুত্থানের পর সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রচেষ্টা কোনো রেনেসাঁ বা ষাটদশকি জাগরণেরও জন্ম দিতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে এই পরিচ্ছন্ন বিবেচনার ওপর।

লেখক : গবেষক ও সাংবাদিক