
উপন্যাস অবলম্বনে নাটক, সিনেমা হয়েছে; সেগুলো জনপ্রিয়তাও পেয়েছে এমন উদাহরণ আছে অনেক। সত্যজিৎ রায়, ঋতুপর্ণ ঘোষ, জহির রায়হান থেকে হুমায়ূন আহমেদ—প্রত্যেকের ঝুলিতেই আছে অগণিত সম্ভার। তবে উপন্যাস অবলম্বনে নাটক, সিনেমা বানিয়ে তা একই সঙ্গে দর্শক ও উপন্যাসের পাঠকের উপভোগের উপযুক্ত করে তোলার কাজটা কেবল কঠিনই নয় রীতিমতো দুরূহ। সাম্প্রতিক সময়ে এই দুরূহ কাজকে সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়নে হুমায়ূন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাস অবলম্বনে তানিম নূরের ‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এর পর আরও একটি নাম খুব চাউর হচ্ছে। জেন–জি থেকে শুরু করে আগের প্রজন্মের কাছেও ওয়েব সিরিজটি হয়ে উঠেছে সম্পর্কের বুনন, ভাঙন ও ভবিষ্যতের বাস্তব দৃশ্যায়ন। মুগ্ধ দর্শক ওয়েব সিরিজটি দেখে প্রশংসায় যেমন পঞ্চমুখ, তেমনি সমালোচনাও করছেন কেউ কেউ। প্রেক্ষাগৃহের নির্মাণ নয়, এমনকি বাংলা ভাষারও নয়, তারপরও সিরিজটিতে বুঁদ হয়েছেন, হচ্ছেন দর্শকেরা। বহুভাষাভাষী মানুষের আনন্দ উপভোগের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে ওয়েব সিরিজটি।
বলছিলাম, ‘মুসাফির ক্যাফে’র কথা। আন্তর্জাতিক ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে গত ২৪ জুলাই সিরিজটি মুক্তি পেয়েছে। মুক্তির পর থেকে এটি আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে। কেউ কেউ ওয়েব সিরিজটিকে আধুনিক সম্পর্কের দলিল বলেও অভিহিত করেছেন। সত্যিই কি ‘মুসাফির ক্যাফে’ আধুনিক সম্পর্কের দলিল, কী আছে সিরিজটিতে, কেন এত আলোচনা-সমালোচনা?
গল্পটা চন্দর, সুধা ও প্রীতির। বিয়ের জন্য একে অপরের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে চন্দর ও সুধার পরিচয়। কিন্তু প্রথাগত বিয়ের সম্পর্ক না হলেও দুজনে প্রেমে পড়ে, একসঙ্গে থাকে, তারপর একপর্যায়ে ক্যারিয়ারের জন্য সুধা চন্দরকে ছেড়ে চলে যায়।
অন্যদিকে বিদেশের উচ্চবৈভবের চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে আসা তরুণ চন্দর। ধীরে ধীরে মনের কোণে ক্ষত লুকিয়ে নিয়ে, পাহাড়ে একটা ক্যাফে দিয়ে শান্ত জীবন কাটানোর যে স্বপ্ন ছিল, সে তেমন একটা জীবন সাজানোর পরিকল্পনা করে। আর এই ক্ষতবিক্ষত পরিকল্পনার মধ্যেই পৌঁছায় প্রীতি।
যে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করে, লেখালেখি করে। তারপর দুজনে মিলে পাহাড়ি পথের ধারে একটি ক্যাফে করে। মুসাফির ক্যাফে, নামটা কিন্তু সুধার দেওয়া। সুধার দেওয়া কীভাবে? জানতে সিরিজটি দেখতে হবে। তবে পরের ঘটনা আরও একটু বলি। প্রীতির ইচ্ছা চন্দরের সঙ্গে বিয়ে করে ঘর–সংসার করবে। কিন্তু সুধাকে নিয়ে চন্দরের যে সিরিয়াসনেস ছিল প্রীতির ক্ষেত্রে সেটি দেখা যায় না। এর মধ্যে অনেক বছর পর চন্দরের সঙ্গে দেখা করতে আসে সুধা। পুরোনো স্মৃতি, ভালোবাসা সুধার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর যেন পুনরায় জেগে ওঠে।
দেখা হলে চন্দর কী করে, কী বলে, শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেবে—সুধা না প্রীতিকে, প্রীতির জীবনে কি অন্য কেউ আছে, রাফায়েল কি আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে না মার্কের দেওয়া উপদেশে প্রীতির সঙ্গেই গাঁটছড়া বাঁধবে চন্দর, জানতে সিরিজটি দেখতে হবে।
শুরুতে উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা যাক।
দৃশ্যায়নেও ছিল চোখের আরাম। মুসৌরির মনোরম পাহাড় ও ক্যাফের পরিবেশ মনকে উদ্বেলিত করে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, তা ছাড়া গানগুলো দৃশ্যগুলোর আবেগ বাড়িয়েছে বহুগুণ। বিশেষ করে ‘ডারমিয়ান’ গানটা প্রশংসার দাবি রাখে। গানটা শুনতেই যেন ফেলে আসা কারও মুখ, কারও আবদার আহ্লাদের স্মৃতি মনে পড়ে যায়।
উপন্যাস থেকে ওয়েব সিরিজ
দিব্য প্রকাশ দুবের উপন্যাস ‘মুসাফির ক্যাফে’কে ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে ৮ পর্বের ওয়েব সিরিজটি। চিত্রনাট্য করেছেন শরন্যা রাজগোপাল। প্রথমে সিনেমা হিসেবে ভাবা হলেও চরিত্রের গভীরতা বিবেচনায় গল্পকে সঠিকভাবে চিত্রায়ণ করতে নেটফ্লিক্স-এ ৮ পর্বে উপস্থাপন করা হয়েছে। মুসৌরি ও আশপাশের নৈসর্গিক লোকেশনে হয়েছে সিরিজটির দৃশ্যায়ন।
এই যে বহুভাষাভাষী দর্শক, পাঠক ওয়েব সিরিজটি দেখছেন এখানে দুবের ও উপন্যাস ‘মুসাফির ক্যাফের’ প্রভাব কতটা? সিনেমা হোক বা নাটক বা ওয়েব সিরিজ প্রতিটির ক্ষেত্রেই গল্পের অবদান অগ্রগণ্য। ভালো গল্প হলে তা যে দর্শককে টানবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ‘মুসাফির ক্যাফে’র ক্ষেত্রে গল্প ভালো হওয়াই শেষ কথা নয়। দুবের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও উপন্যাসটির জনপ্রিয়তাও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।
কারণ, গল্পকার হিসেবে ভারতীয় এই লেখকের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। তা ছাড়া ভারতে ‘আধুনিক হিন্দি’ ধারার যে জাগরণ ঘটেছে, দুবে তার সামনের সারির একজন। সহজ, সাবলীল এবং দৈনন্দিন জীবনের আবেগনির্ভর লিখনশৈলী দিয়ে সহজেই তিনি পরিচিতি পেয়েছেন। পাশাপাশি স্টোরিবাজি নামের একটি লাইভ স্টোরিটেলিং শো এবং অ্যামাজন অডিবলে অডিও শো–র মাধ্যমেও পৌঁছেছেন অগণিত শ্রোতার কাছে। টেনশন মাত লে ইয়ার, ইবনেবতুতি, অক্টোবর জংশন তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস।
সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস ‘মুসাফির ক্যাফে’। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘মুসাফির ক্যাফে’ দিয়েই তরুণ পাঠকদের কাছাকাছি আসেন দুবে। অ্যামাজন ও অন্যান্য বই বিক্রির প্ল্যাটফর্মে বইটি বেস্টসেলার তালিকায় ছিল। তাই সিরিজটি যখন পর্দায় আসে, উপন্যাসের বিশাল পাঠকগোষ্ঠী সিরিজটি দেখতে আগ্রহী হয়েছেন, যা মুক্তির পরপরই সিরিজটিকে বড় ধরনের প্রচার দিয়েছে।
ভালো লাগার নেপথ্যে কী
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে, সাঙ্গ করি মনে হবে, শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। অপূর্ণতা, তার যেমন আলাদা সৌন্দর্য আছে, তেমন আছে বিস্তৃত ব্যপ্তিও। মানব হৃদয়ে অপূর্ণতা দীর্ঘ ছাপ রেখে যায়। জীবনে পূর্ণতার চেয়ে অপূর্ণতা বেশি মাতাল করে বলেই হয়তো এই অনুভব খুব সহজে হৃদয়ে রেখাপাত করে। তা ছাড়া মানুষ হিসেবে আমরা কেউই পূর্ণ নই। কত স্বপ্ন, কত আশা, কত মানুষকে হারিয়ে জীবনকে চালিয়ে যেতে হয় তার ইয়ত্তা নেই। ওয়েব সিরিজটি নিয়ে এই যে এত হইচই, বোধ করি তার পেছনের প্রধান কারণ অপূর্ণতা। জীবনের পরতে পরতে মিশে থাকা অপূর্ণতার ছায়া আছে গোটা ‘মুসাফির ক্যাফে’জুড়ে। তা ছাড়া জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠ থাকা সম্পর্কগুলোও যে নিখুঁত নয়, মানুষ যে পরিবর্তন হতে পারে, পরিবর্তন হয়ে যায়; সহজ এই সত্যটি নিদারুণভাবে ওয়েব সিরিজটিতে ফুটে উঠেছে।
দৃশ্যায়নেও ছিল চোখের আরাম। মুসৌরির মনোরম পাহাড় ও ক্যাফের পরিবেশ মনকে উদ্বেলিত করে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, তা ছাড়া গানগুলো দৃশ্যগুলোর আবেগ বাড়িয়েছে বহুগুণ। বিশেষ করে ‘ডারমিয়ান’ গানটা প্রশংসার দাবি রাখে। গানটা শুনতেই যেন ফেলে আসা কারও মুখ, কারও আবদার আহ্লাদের স্মৃতি মনে পড়ে যায়।
সংলাপের জীবনঘনিষ্ঠতা, সাবলীল অভিনয়, বাস্তবের সঙ্গে সংযোগকারী গল্পই ওয়েব সিরিজটিকে প্রাণ দিয়েছে। যে কারণে সিরিজের ছোট ছোট অংশ, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও আবেগপ্রবণ সংলাপগুলো ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের রিলসে ব্যাপকভাবে শেয়ার হয়েছে, যা দর্শক টানার ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক। তা ছাড়া অতিরিক্ত মারপিট বা অহেতুক ড্রামা না থাকায়, একধরনের ধীরগতির হলেও হৃদয়স্পর্শী আমেজ নিয়ে ‘মুসাফির ক্যাফে’র গল্পটি এগিয়েছে, যা খুব সহজেই ভালো লাগার অনুভূতি দিয়েছে।
চন্দর চরিত্রে বিক্রান্ত ম্যাসির অভিনয়ের কথা বলতেই হবে। টুয়েলভথ ফেল, আ ডেথ ইন দ্য গুঞ্জ, হাসিন দিলরুবা, ক্রিমিনাল জাস্টিস দিয়ে পরিচয় পেয়েছেন ম্যাসি। জানান দিয়েছেন সাবলীল অভিনয়ে কতটা দক্ষ তিনি। বিশেষ করে টুয়েলভথ ফেল-এ বিক্রান্ত অসাধারণ করেছেন। ‘মুসাফির ক্যাফে’র চন্দর চরিত্রটিকেও একইভাবে ছাড় দেননি। শান্ত মনে ওয়েব সিরিজটি দেখলে অনুভব করা যাবে চন্দর চরিত্রটি বাইরে খুব শান্ত হলেও ভেতরে ভেতরে বেশ বিভ্রান্ত ও আবেগপ্রবণ। ভেতর-বাহিরের এই যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব, পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে কার্পণ্য করেননি বিক্রান্ত। তাঁর সাবলীল অভিনয় ভঙ্গিতেই চন্দরের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছেন।
অন্যদিকে সুধা আধুনিক, স্বাধীনচেতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রথাগত পারিবারিক জীবনযাত্রার বাইরে এসে নিজের শর্তে বাঁচতে চাওয়া এক তরুণী। চরিত্রটিকে পর্দায় তুলে ধরেছেন বেদিকা পিন্টো। তাঁর অভিনয়ও ছিল আকর্ষণীয়, প্রাণবন্ত। সুধা যে একদিকে নিজের লক্ষ্য ও স্বাধীনতা নিয়ে অটল, অন্যদিকে ভালোবাসা ও সম্পর্কের জায়গায় উচ্ছ্বাসপূর্ণ হলেও কমিটমেন্টের জায়গায় শান্ত, উদ্দীপনাহীন। ক্যারিয়ার ও স্বপ্ন তার কাছে বেশি মূল্যবান। নিজের আত্মবিশ্বাস দিয়ে এই সুধাকে ভালোই প্রেজেন্ট করেছেন বেদিকা। পর্দায় বিক্রান্ত ও তাঁর কেমিস্ট্রির ভারসাম্যও প্রশংসাযোগ্য।
ত্রিভুজ প্রেমের গল্পে সেতুবন্ধ রচনার জন্য যে চরিত্রটি থাকে, সেই চরিত্রটিই সচারাচর বেশি আকর্ষণ করে। ‘মুসাফির ক্যাফে’র ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ‘প্রীতি’ চরিত্রটি চন্দর ও সুধার দুই ভিন্ন পৃথিবীর মাঝে একধরনের স্থায়িত্ব ও বাস্তবতার সেতুবন্ধ রচনা করেছে। প্রীতি চরিত্রটিতে কিছুটা ম্যাচিউরিটি ও সাবলীলতার দরকার ছিল, মহিমা মাকওয়ানা খুব সুন্দরভাবেই কাজটা করেছেন। সাবলীলতা দিয়ে প্রতিটি দৃশ্যে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। পাশাপাশি তাঁর সংলাপ বলার স্বতঃস্ফূর্ততা গল্পকে একঘেয়ে হতে দেয়নি। চন্দরের সঙ্গে কথোপকথনের ক্ষেত্রে ‘প্রীতি’ চরিত্রের যে গভীরতা প্রয়োজন ছিল মহিমা তা ভালোভাবেই তুলে এনেছেন।
পাশাপাশি আরও একটি চরিত্রের কথা না বললে ভালো লাগার কারণেও অপূর্ণতা থেকে যাবে। মার্ক আব্রাহাম বাস্তবের আদিল হোসেন, সিরিজটিতে গভীর অন্ধকারে যে আলো এনেছেন। দীর্ঘ জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দেওয়া শিক্ষা চন্দর-প্রীতির সম্পর্ককে যেমন আলোকিত করেছে, একইভাবে আলোকিত করেছে দর্শককেও।
‘মুসাফির ক্যাফে’র নির্মাতা রুচির অরুণও প্রশংসা পাবেন। অজয় ভুয়ানের সঙ্গে তাঁর আগের কাজ ‘লিটল থিংস’ও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দৃশ্যায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ করে অনুভূতি প্রকাশ, সংলাপ এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের নিখুঁত ব্যবহার করে গল্প বলার যে বিশেষ ক্ষমতা রুচির আছে, ‘মুসাফির ক্যাফে’ দিয়েও তা তিনি পুনরায় প্রমাণ করলেন।
সংলাপের জীবনঘনিষ্ঠতা, সাবলীল অভিনয়, বাস্তবের সঙ্গে সংযোগকারী গল্পই ওয়েব সিরিজটিকে প্রাণ দিয়েছে। যে কারণে সিরিজের ছোট ছোট অংশ, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও আবেগপ্রবণ সংলাপগুলো ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের রিলসে ব্যাপকভাবে শেয়ার হয়েছে, যা দর্শক টানার ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক। তা ছাড়া অতিরিক্ত মারপিট বা অহেতুক ড্রামা না থাকায়, একধরনের ধীরগতির হলেও হৃদয়স্পর্শী আমেজ নিয়ে ‘মুসাফির ক্যাফে’র গল্পটি এগিয়েছে, যা খুব সহজেই ভালো লাগার অনুভূতি দিয়েছে।
ত্রিভুজ প্রেমের গল্প, নতুন কিছু নয়। গল্প কিছুটা ধীরগতির মনে করেছেন অনেকে। কিছু জায়গায় পরিণতি খুব সহজেই অনুমেয়। প্রেম নাকি প্রতারণা—এই প্রশ্নও যেমন উঠেছে, বর্তমান সঙ্গী থাকার পরও অতীতের স্মৃতির মায়ায় আটকে থাকা চন্দর চরিত্রটিকে মানসিকভাবে জটিল বা রেড ফ্ল্যাগও মনে করেছেন কেউ কেউ।
আধুনিক সম্পর্কের দলিল?
ওয়েব সিরিজটি দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ ‘মুসাফির ক্যাফে’কে আধুনিক সম্পর্কের দলিল হিসেবেও অভিহিত করছেন। তাঁরা বলার চেষ্টা করছেন যে জেন–জিরা যে ওয়েব সিরিজটিকে গ্রহণ করল, তার কারণ কী? এই কারণের জায়গাটা ধরতে পারলেই ওয়েব সিরিজটির জনপ্রিয়তার অবস্থান পরিষ্কার হয়ে যায়। তাঁদের মত এই যে, এই প্রজন্ম প্রথাগত রোমান্স বা অতি নাটকীয় গল্প পছন্দ করে না। তারা চায় সত্যতা এবং বাস্তব জীবনের জটিলতার স্পষ্ট প্রতিফলন। তা ছাড়া বর্তমান সময়ে আলোচিত সম্পর্কের নানা টার্ম যেমন সিচুয়েশনশিপ, যেখানে দুজন মানুষ একে অপরের প্রতি ভালোবাসা অনুভব করলেও সম্পর্ককে স্বীকৃতি দিতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার বা নানা সীমাবদ্ধতাও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চন্দর ও সুধা চরিত্রের মধ্য দিয়ে বিষয়টি নিদারুণভাবে ফুটে উঠেছে। যেখানে সুধা প্রেমের জন্য নিজের জীবনের লক্ষ্য বা ক্যারিয়ারকে জলাঞ্জলি দেয় না। এমনকি চন্দর ও প্রীতির সম্পর্কের অবস্থানও স্পষ্ট নয়। তা ছাড়া ভালোবাসি বলেই সবকিছু মানিয়ে নিতে হবে, পুরোনো এই সিনেম্যাটিক ধারণা ভেঙে দিয়ে নিজেদের ক্যারিয়ার ও আত্মপরিচয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার বাস্তব মানসিকতা কি আধুনিক ধারণা নয়?
এ ছাড়া জেন–জিরা এমন গল্প দেখতে ভালোবাসে, যেখানে জীবনের অসম্পূর্ণতাকে মেনে নেওয়ার ইতিবাচকতা থাকে। ওয়েব সিরিজটিকে এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও বিচার করা যায়। যেখানে জোর করে দুজনকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়নি। বিচ্ছেদ বা দূরে যাওয়া মানেই যে জীবন শেষ নয়, বরং জীবন এগিয়ে চলে। এবং দুজন মানুষ অসম্পূর্ণতা নিয়েও স্মৃতি ধরে রেখে বেঁচে থাকতে পারে। ম্যাচিউরড এই বার্তাটি জেন–জিদের কাছে ভীষণ গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়, ক্যাফে কালচার, ব্যাকপ্যাকিং, কফির কাপের আড্ডা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার তো এই প্রজন্মকেই বেশি রিপ্রেজেন্ট করে। চরিত্রগুলোতে অভিনেতা, অভিনেত্রীর কথা বলার ভঙ্গি ও সংলাপে ভাষার ব্যবহারেও ছিল আধুনিকতার ছাপ।
এই কয়েকটি নিরিখে একটা গোটা ওয়েব সিরিজকে আধুনিক সম্পর্কের দলিল বা জেন–জিদের সিনেমা বলে দেওয়াটা কি সমীচীন হবে? কারণ, ওয়েব সিরিজটি কেবল জেন–জি বা তরুণদেরই টানেনি, তার আগের প্রজন্মের দর্শকমহলেও বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। তা ছাড়া এর বিভিন্ন দৃশ্য আপামর মানুষের জীবনেরই অংশ। তাই আপাতদৃষ্টিতে এটি তরুণদের সম্পর্কের গল্প মনে হলেও, বয়স্ক বা অন্যান্য প্রজন্মের মানুষও এটি পছন্দ করছেন। আর কেনই বা করবেন না, ভালোবাসাকে পাশে সরিয়ে রেখে ক্যারিয়ার বা পারিবারিক বাস্তবতাকে বেছে নেওয়ার স্মৃতি তো আধুনিক নয়, চিরাচরিত। তা ছাড়া নিরিবিলি পরিবেশে এমন একটা ক্যাফে খুলে নিজের মতো জীবন কাটানোর স্বপ্ন কার না থাকে!
সময় বদলাতে পারে, পোশাক বদলাতে পারে, বাচনভঙ্গি বদলাতে পারে, অনুভূতি, বিশ্বস্ততাতেও তারতম্য হতে পারে কিন্তু ভালোবাসা, একাকিত্ব, হারানোর ভয়, অনুশোচনার বোধ চিরাচরিত, মানবভ্রূণে গ্রথিত।
সমালোচনা কেন
ত্রিভুজ প্রেমের গল্প, নতুন কিছু নয়। গল্প কিছুটা ধীরগতির মনে করেছেন অনেকে। কিছু জায়গায় পরিণতি খুব সহজেই অনুমেয়। প্রেম নাকি প্রতারণা—এই প্রশ্নও যেমন উঠেছে, বর্তমান সঙ্গী থাকার পরও অতীতের স্মৃতির মায়ায় আটকে থাকা চন্দর চরিত্রটিকে মানসিকভাবে জটিল বা রেড ফ্ল্যাগও মনে করেছেন কেউ কেউ।