কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ছবি অবলম্বনে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ছবি অবলম্বনে

অবসরে দেখতে পারেন দারুণ গল্পনির্ভর কয়েকটি সায়েন্স ফিকশন

কিছু মুভি শেষ হয়ে যায়, কিন্তু শেষ হয় না তাদের গল্প। পর্দা অন্ধকার হয়ে আসে, নামের তালিকা ভেসে ওঠে, তবু মনে হয়; গল্পটা যেন কোথাও এখনো চলছে। আমরা তখন ফিরে যাই দূর কোনো গ্রহে, হারিয়ে যাই সময়ের গোলকধাঁধায়, ঢুকে পড়ি স্বপ্নের ভেতর আরেক স্বপ্নে। কখনো মহাকাশের নিঃসীম অন্ধকারে ভেসে চলি, কখনো প্রশ্ন করি, ‘আমরা যে পৃথিবীকে বাস্তব বলে জানি, সত্যিই কি তা বাস্তব?’ কখনো হয়তো তাকিয়ে থাকি ভবিষ্যতের দিকে, যেখানে মানুষ ও যন্ত্রের মাঝের দূরত্বটুকুও হয়তো মুছে গেছে।

সায়েন্স ফিকশনের সৌন্দর্য এখানেই। এই জগৎ আমাদের এমন সব জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে এখনো মানুষের পা পড়েনি। অসম্ভবকে সম্ভবের খুব কাছে এনে দাঁড় করায়, তারপর নিঃশব্দে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—একদিন কি সত্যিই এমন হবে?

এই ৭ মুভিতে সেই প্রশ্নেরই সাত রকম উত্তর। কোনোটি মহাকাশের গল্প, কোনোটি সময়ের, কোনোটি স্বপ্নের, আবার কোনোটি মানুষের নিজের অস্তিত্বের। কিন্তু সব কটি মুভিই শেষ হওয়ার পর মনে একটুখানি বিস্ময় রেখে যায়—জগৎটা কি সত্যিই আমাদের ভাবনার সমান বড়, নাকি তার চেয়ে অনেক বড়?

চলুন, মুভি নিয়ে আড্ডা দিতে দিতে সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজি।

ইন্টারস্টেলার

পৃথিবী যখন মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠতে শুরু করে, তখন সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না। বাঁচতে হলে পাড়ি দিতে হবে অজানার দিকে। সেই যাত্রাতেই মহাকাশযানে চড়ে বসে এক সাবেক নভোচারী, কুপার। সে জানে না তার সামনে কী অপেক্ষা করছে। পেছনে পড়ে থাকে পৃথিবী ও পরিবার।

তারপর শুরু হয় এমন এক যাত্রা, যেখানে মহাকাশ শুধু দূরত্বের গল্প নয়, সময়ও হয়ে ওঠে এক অদ্ভুত প্রতিপক্ষ। বিশাল নক্ষত্র, কৃষ্ণগহ্বর, অচেনা গ্রহ আর মহাকর্ষের রহস্য পেরিয়ে কুপার এগিয়ে যায় এমন এক সত্যের দিকে, যা মানুষের চেনা সময় ও স্থানের ধারণাকেই বদলে দেয়। মুভিটি মহাকাশবিজ্ঞানের কঠিন বিষয়গুলোকে গল্পের ভেতর এমনভাবে বুনে দেয় যে কৃষ্ণগহ্বর কিংবা সময়ের আপেক্ষিকতা নিয়েও ভাবতে শুরু করবেন আপনি।

কিন্তু ইন্টারস্টেলার শুধু মহাকাশে হারিয়ে যাওয়া মানুষের গল্প নয়। এটি দূরত্ব, অপেক্ষা ও ভালোবাসার গল্পও। তাহলে ব্ল্যাকহোলের ওপারে, পঞ্চম মাত্রার সেই অনন্ত শূন্যতায় কি সত্যিই ভালোবাসার কোনো বৈজ্ঞানিক সমীকরণ লুকিয়ে আছে, যা মানুষকে পথ দেখাতে পারে? জানতে হলে দেখতে হবে ক্রিস্টোফার নোলানের এই মুভিটি।

ইনসেপশন

মানুষের সবচেয়ে ব্যক্তিগত ও সুরক্ষিত জায়গা তার মন। কিন্তু কেমন হতো, যদি সেই মনের সবচেয়ে গহিন স্তরে, স্বপ্নের ভেতর ঢুকে আপনার মহামূল্যবান কোনো গোপন তথ্য কেউ চুরি করে নিত? নোলানের আরেক মগজ ধোলাই করা মাস্টারপিস ইনসেপশন। ডম কব চরিত্রে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও এখানে একজন পেশাদার চোর। তবে সে টাকা চুরি করে না, ঘুমন্ত মানুষের অবচেতন মন থেকে চুরি করে বুদ্ধি ও আইডিয়া। স্বপ্নের ভেতর আরেক স্বপ্ন, তার ভেতর আরেকটা স্বপ্ন—এই মানসিক গোলকধাঁধায় কখন যে দর্শক নিজেই হারিয়ে যাবেন, তা টেরই পাবেন না। ডিক্যাপ্রিওর সঙ্গে ম্যারিয়ন কঁতিয়ারের রসায়ন এবং স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যকার যে মানসিক দ্বন্দ্ব, তা দারুণভাবে ফুটে উঠেছে তাঁদের অভিনয়ে। মুভির প্রতিটি দৃশ্য আপনাকে আক্ষরিক অর্থেই সিটে বসিয়ে রাখতে বাধ্য করবে। মুভির একেবারে শেষ দৃশ্যে এসে সেই যে লাটিমটা ঘুরতে শুরু করে, তা কি শেষ পর্যন্ত থেমেছিল, নাকি পুরোটাই ছিল ডিক্যাপ্রিওর অনন্ত এক স্বপ্ন?

ব্লেড রানার ২০৪৯

কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাসে ভিজ্যুয়াল পোয়েট্রির কথা বললে এই মুভির নাম সবার আগে আসবে। ডেনিস ভিলনোভ পরিচালিত এই মুভিটি আমাদের নিয়ে যায় এক অন্ধকার, নিয়ন আলোয় মোড়া ভবিষ্যতের লস অ্যাঞ্জেলেসে। সেখানে মানুষের দাসত্ব করার জন্য তৈরি করা হয়েছে হুবহু মানুষের মতো দেখতে কৃত্রিম মানব। রায়ান গসলিং অভিনয় করেছেন ‘কে’ নামে এমনই এক রেপ্লিক্যান্ট অফিসারের চরিত্রে, যার কাজ হলো পুরোনো ও অবাধ্য রেপ্লিক্যান্টদের খুঁজে বের করে খুন করা। গসলিংয়ের সেই নির্বিকার, অভিব্যক্তিহীন মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তীব্র একাকিত্ব আর বিষাদ আপনাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে যাবে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রিক ডেকার্ডের আইকনিক চরিত্রে হ্যারিসন ফোর্ডের ফিরে আসাও ছিল এই মুভির অন্যতম বড় চমক। কৃত্রিম স্মৃতি এবং মেমোরি ইমপ্ল্যান্টের এক পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে ‘কে’ এমন এক ভয়ংকর রহস্যের সন্ধান পায়, যা পুরো সমাজব্যবস্থাকে ধসিয়ে দিতে পারে।

২০০১: আ স্পেস ওডিসি

বিখ্যাত লেখক আর্থার সি. ক্লার্কের গল্প অবলম্বনে স্ট্যানলি কুবরিকের এই মুভিটি সায়েন্স ফিকশন জগতের এক অবিসংবাদিত বাইবেল। ১৯৬৮ সালে বসে, মানুষের চাঁদে পা রাখার আগে কুবরিক এমন এক মহাজাগতিক দৃশ্যপট তৈরি করেছিলেন, যা আজও বিজ্ঞানীদের অবাক করে। আদিম যুগের বানর থেকে শুরু করে মানুষের মহাকাশ জয়ের যে বিবর্তন, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক রহস্যময় কালো মনোলিথ। ডিসকভারি ওয়ান মহাকাশযানে বৃহস্পতি গ্রহের উদ্দেশে রওনা হওয়া নভোচারী ডেভ বাউম্যানের চরিত্রে কিয়ার ডুলিয়া অসাধারণ অভিনয় করেছেন। তবে এই মুভির সবচেয়ে ভয়ংকর ও আইকনিক চরিত্রটি কিন্তু কোনো রক্তমাংসের মানুষ নয়; সেটি হলো মহাকাশযানের এআই ‘হ্যাল ৯০০০’। এই সুপারকম্পিউটার যখন নিজের অস্তিত্ব বাঁচাতে মানুষের নির্দেশ অমান্য করতে শুরু করে, তখন তৈরি হয় এক চরম স্নায়ুযুদ্ধ। মানুষের চেয়ে যখন তার সৃষ্টি করা যন্ত্র বেশি আত্মসচেতন ও বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে, তখন মহাকাশের সেই অসীম শূন্যতায় কি মানুষের জয় হয়, নাকি যন্ত্রের? এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে মুভিটিতে।

দ্য মার্শিয়ান

মঙ্গল গ্রহে এক ভয়ানক বালুঝড়ের কবলে পড়ে নভোচারীদের একটি দল বাধ্য হয়ে দ্রুত গ্রহটি ত্যাগ করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে মার্ক ওয়াটনি নামে দলের এক সদস্যকে অন্যরা মৃত ভেবে সেখানেই ফেলে আসে। এই মুভিটি মূলত এক চরম বৈরী পরিবেশে একজন মানুষের বেঁচে ফেরার অদম্য লড়াইয়ের গল্প। পরিচালক রিডলি স্কট এখানে কোনো এলিয়েন বা ভিনগ্রহের দানব দেখাননি, বরং দেখিয়েছেন প্রকৃতির রুক্ষতার কাছে মানুষের উপস্থিত বুদ্ধির লড়াই। মার্ক ওয়াটনির চরিত্রে ম্যাট ডেমন যেন একাই পুরো মুভিটি টেনে নিয়ে গেছেন। তাঁর একা থাকা, পাগলামি এবং বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মঙ্গলের মাটিতে নিজের মল–মূত্র দিয়ে আলু ফলানোর অসাধ্য সাধনের দৃশ্যগুলো আপনাকে একই সঙ্গে ভাবাবে এবং হাসাবে। কোনো মেলোড্রামা নয়, বরং খাঁটি বিজ্ঞান এবং গাণিতিক হিসাব–নিকাশ দিয়ে কীভাবে একটি মৃত গ্রহে টিকে থাকা যায়, তার নিখুঁত এক রূপায়ণ এই মুভি। শুধু প্রবল ইচ্ছাশক্তি আর বিজ্ঞানের সূত্রগুলোকে হাতিয়ার করে ৫ কোটি কিলোমিটার দূরের এক জনমানবহীন লাল গ্রহ থেকে কি শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে ফেরা সম্ভব হয়েছিল? এ প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে আজই মুভিটি দেখতে বসে যান।

গ্র্যাভিটি

মহাশূন্য দেখতে যতই সুন্দর ও শান্ত হোক না কেন, এটি মানুষের জন্য এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদ। আলফোনসো কুয়ারন পরিচালিত গ্র্যাভিটি মুভি সেই ভয়ংকর সুন্দর রূপেরই এক শ্বাসরুদ্ধকর দলিল। পৃথিবীর কক্ষপথে হাবল টেলিস্কোপ মেরামত করার সময় হঠাৎ ছুটে আসা পুরোনো স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে ছিটকে পড়েন নভোচারী রায়ান স্টোন। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, চরম শূন্যতা আর ভয়ংকর এক নিস্তব্ধতা। পৃথিবীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই, অক্সিজেনের মিটার ক্রমেই নিচের দিকে নামছে। রায়ান স্টোনের চরিত্রে স্যান্ড্রা বুলকের অভিনয় আক্ষরিক অর্থেই আপনার বুকে কাঁপুনি ধরিয়ে দেবে। তাঁর ভয়, বেঁচে থাকার মরিয়া চেষ্টা এবং জর্জ ক্লুনির সাবলীল অথচ আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি মুভিটিকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। মুভিটি দেখতে দেখতে আপনার মনে হবে, আপনি নিজেই যেন মহাশূন্যে ভাসছেন আর খাবি খাচ্ছেন। কোনো শব্দ নেই, বাতাস নেই, শুধু বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি। এই অন্তহীন অন্ধকার আর মহাকর্ষের ভয়ংকর মায়াজাল ছিন্ন করে রায়ান কি পেরেছিলেন পৃথিবীর মাটিতে নিজের পা রাখতে?

দ্য ম্যাট্রিক্স

আপনি রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠছেন, অফিসে যাচ্ছেন, হাসছেন, কাঁদছেন। কিন্তু কেমন হতো, যদি একদিন হঠাৎ জানতে পারেন এই সবটাই আসলে একটা বিশাল কম্পিউটার সিমুলেশন? আপনি আসলে কোনো এক অন্ধকার তরল চেম্বারে শুয়ে আছেন, আর যন্ত্র আপনার মগজে এই মিথ্যা পৃথিবীর ছবি ঢুকিয়ে দিচ্ছে! ওয়াচৌস্কি বোনদের তৈরি দ্য ম্যাট্রিক্স সাই-ফাই জগতে আক্ষরিক অর্থেই এক বিপ্লব নিয়ে এসেছিল। থমাস অ্যান্ডারসন বা হ্যাকার নিওর চরিত্রে কিয়ানু রিভস এবং মরফিয়াসের চরিত্রে লরেন্স ফিশবার্নের অভিনয় আজও আইকনিক। দর্শনের সঙ্গে অ্যাকশনের এমন দুর্দান্ত মিশেল হলিউডে খুব কমই দেখা গেছে। এই মুভির ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট, বিশেষ করে বিখ্যাত সেই বুলেট টাইম দৃশ্যগুলো মুভি নির্মাণের সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়েছিল। নিও যখন জানতে পারে তার পুরো জীবনটাই একটা কোডের খেলা, তখন মরফিয়াস তার সামনে দুটো বড়ি এগিয়ে দেয়। মুভিটি শেষ হওয়ার পরও একটি প্রশ্ন আপনার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাবে, এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে আপনি কোনটা বেছে নিতেন? আরামদায়ক মিথ্যার নীল বড়ি, নাকি নির্মম ও রূঢ় সত্যের লাল বড়ি?

ছবির সূত্র: আইএমডিবি