ফাউস্ট চলচ্চিত্রের দৃশ্য ও গ্যোটের প্রতিকৃতি অবলম্বনে। গ্রাফিকস প্রথম আলো
ফাউস্ট চলচ্চিত্রের দৃশ্য ও গ্যোটের প্রতিকৃতি অবলম্বনে। গ্রাফিকস প্রথম আলো

শতবর্ষে ফাউস্ট চলচ্চিত্র

প্রত্যেকের ভেতরে একজন করে ফাউস্ট বাস করে

১৪ অক্টোবর ১৯২৬। বার্লিনের খ্যাতনামা প্রেক্ষাগৃহ ‘উফা-পালাস্ট আম জোলোজিশেন গার্টেন’-এ জাঁকজমকের সঙ্গে প্রদর্শিত হয় একটি চলচ্চিত্র। নাম ‘ফাউস্ট: আইনে ডয়চে ফোকজাগে’, যা বাংলায়: ‘ফাউস্ট: একটি জার্মান লোককথা’।

১৪ অক্টোবর ১৯২৬। বার্লিনের খ্যাতনামা প্রেক্ষাগৃহ ‘উফা-পালাস্ট আম জোলোজিশেন গার্টেন’-এ জাঁকজমকের সঙ্গে প্রদর্শিত হয় একটি চলচ্চিত্র। নাম ‘ফাউস্ট: আইনে ডয়চে ফোকজাগে’, যা বাংলায়: ‘ফাউস্ট: একটি জার্মান লোককথা’। পরিচালক ফ্রিডরিশ ভিলহেল্ম মুরনাউ।

চলচ্চিত্র তখনো নির্বাক; পর্দায় শব্দের আগমন ঘটেনি। অথচ মুরনাউ এমন এক ‘শব্দহীন’ পৃথিবী নির্মাণ করেন, যেখানে মানুষ আর শয়তান, জ্ঞান আর অজ্ঞতা, প্রেম আর পাপ, আকাঙ্ক্ষা আর অনুতাপ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়, কী দারুণ বাঙ্ময়তায়!

কিন্তু মুরনাউর ‘ফাউস্ট’-এর শতবর্ষ উদ্যাপন আসলে শুধু একটি চলচ্চিত্রের শতবর্ষ নয়; এটি এমন এক চরিত্রের দীর্ঘ যাত্রার আরেকটি মাইলফলক, যে মুরনাউর অনেক আগে থেকেই মানুষের কল্পনায় বাস করছে। ‘ফাউস্ট’—মানুষের অতৃপ্তির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকগুলোর একটি।

লোককথা থেকে গ্যোটের ‘মানসপুত্র’

ফাউস্ট কে? একজন পণ্ডিত, জ্ঞানপিপাসু, প্রেমিক, উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষ; আবার একজন অপরাধীও। তিনি জ্ঞান অর্জন করেছেন, কিন্তু জ্ঞান তাঁকে শান্তি দেয়নি। তাঁর মনে হয়, বইয়ের পাতায়, দর্শনের যুক্তিতে, বিজ্ঞানের অনুসন্ধানে এমন কিছু রয়ে গেছে, যা তাঁর নাগালের বাইরে। তিনি সব জানেন, অথচ মনে হয় কিছুই জানেন না।

এই ‘আরও কিছু’ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই ফাউস্টকে নিয়ে যায় মেফিস্টোফিলিসের (সংক্ষেপে মেফিস্টো) কাছে। আর সেখানেই শুরু হয় মানুষের সঙ্গে শয়তানের সেই বিখ্যাত চুক্তি।

ফাউস্টের গল্প অবশ্য ইয়োহান ভল্ফগাং ফন গ্যোটের সৃষ্টি নয়। এর শিকড় ষোড়শ শতাব্দীর জার্মান লোককথায়। ঐতিহাসিক ইয়োহান গেওরগ ফাউস্ট নামের এক পণ্ডিত ও জাদুকরকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল নানা কিংবদন্তি। পরে সেই কিংবদন্তি সাহিত্যিক রূপ পায় ক্রিস্টোফার মার্লোর ‘ডক্টর ফস্টাস’-এ। কিন্তু ‘ফাউস্ট’কে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান যিনি, তিনি নিঃসন্দেহে গ্যোটে।

ইতালির রোমের ক্যাম্পানিয়া অঞ্চলে ইয়োহান ভলফগাং ফন গ্যোটে। ১৭৮৭ সালে জার্মান নিওক্ল্যাসিক্যাল চিত্রশিল্পী ইয়োহান হাইনরিশ ভিলহেল্ম টিশবাইন ছবিটি আঁকেন। বর্তমানে ছবিটি ফ্রাঙ্কফুর্টের স্ট্যাডেল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত

গ্যোটে তাঁর ‘ফাউস্ট’ রচনা ও পুনর্লিখনে প্রায় ছয় দশক সময় ব্যয় করেছিলেন। প্রথম অংশ প্রকাশিত হয় ১৮০৮ সালে; দ্বিতীয় অংশ তাঁর মৃত্যুর পর, ১৮৩২ সালে। গ্যোটের হাতে ফাউস্ট আর শুধু শয়তানের কাছে আত্মা বিক্রি করা একজন পণ্ডিত ব্যক্তি নন। তিনি হয়ে ওঠেন মানুষ নামের প্রাণীটির এক জটিল প্রতিরূপ—যিনি কখনো তৃপ্ত নন, নিজের সীমা ভাঙতে চান, ভুল করেন, পাপ করেন, আবার সেই পাপের অর্থও খুঁজে বেড়ান।

ফাউস্ট কে? একজন পণ্ডিত, জ্ঞানপিপাসু, প্রেমিক, উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষ; আবার একজন অপরাধীও। তিনি জ্ঞান অর্জন করেছেন, কিন্তু জ্ঞান তাঁকে শান্তি দেয়নি। তাঁর মনে হয়, বইয়ের পাতায়, দর্শনের যুক্তিতে, বিজ্ঞানের অনুসন্ধানে এমন কিছু রয়ে গেছে, যা তাঁর নাগালের বাইরে। তিনি সব জানেন, অথচ মনে হয় কিছুই জানেন না।

ফাউস্টের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তাঁর অতৃপ্তি। তিনি যা পেয়েছেন, তা যথেষ্ট নয়; যা জানেন, তা যথেষ্ট নয়; যে জীবন পেয়েছেন, তা–ও যথেষ্ট নয়। তাই মেফিস্টোফিলিসের প্রস্তাব তাঁর কাছে এত আকর্ষণীয় ঠেকে। যৌবন ফিরে পাবেন, পৃথিবীর সুখ পাবেন, প্রেম পাবেন, অভিজ্ঞতার দরজা খুলে যাবে। বিনিময়ে? নিজের আত্মা বিক্রি। মানুষের ইতিহাসে এর চেয়ে পুরোনো দর-কষাকষি আর কী আছে—যা চাই, তা পেতে যা সবচেয়ে মূল্যবান, সেটিই বিসর্জন দেওয়া!

 গ্যোটের ‘ফাউস্ট’ (মূল চিত্রণসহ), চিত্রকর: হ্যারি ক্লার্ক

মুরনাউর দৃশ্যভাষা ও আকাঙ্ক্ষার খেসারত

মুরনাউ যখন ১৯২৫–২৬ সালে ‘ফাউস্ট’ নির্মাণ করছিলেন, তখন তাঁর সামনে ছিল এই দীর্ঘ সাহিত্যিক উত্তরাধিকার। তাঁর চলচ্চিত্র শুধু গ্যোটের নাটকের সরাসরি রূপান্তর নয়; এতে জার্মান লোককথা, মার্লোর ‘ডক্টর ফস্টাস’ এবং গ্যোটের ‘ফাউস্ট’—সব কিছুরই ছাপ রয়েছে।

তবু মুরনাউয়ের ‘ফাউস্ট’ আলাদা। কারণ, শব্দ ছাড়া আলো, ছায়া, অভিব্যক্তি ও ক্যামেরার ভাষায় তিনি এমন এক জগৎ নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে আলো ও অন্ধকার যেন নিজেরাই একেকটি চরিত্র। জার্মান অভিব্যক্তিবাদী সিনেমার (জার্মান এক্সপ্রেশনিজম) চূড়ায় দাঁড়িয়ে, আলো-ছায়ার তীব্র বৈপরীত্যের (কিয়ারোস্কুরো) মাধ্যমে মুরনাউ ফাউস্টের আত্মার আলো-আঁধারির লড়াইকে দৃশ্যমান করেছিলেন। মেফিস্টোর বিশাল কালো অবয়ব, ডানা বিস্তার করে পুরো মহামারিতে আক্রান্ত শহরকে ঢেকে ফেলার সেই বিখ্যাত দৃশ্য কিংবা অন্ধকারের মধ্যে তার আবির্ভাব—যেগুলো স্কেল মডেল আর ডাবল এক্সপোজারের ট্রিক শটে তৈরি—১৯২৬ সালে এমন দৃশ্যভাষা ছিল বিস্ময়কর নান্দনিক অর্জন!

ফাউস্ট (১৯২৬) চলচ্চিত্রে এমিল ইয়ানিংস

কিন্তু ফাউস্টের গল্পের সবচেয়ে গভীর অংশ সম্ভবত মেফিস্টোফিলিস নয়—গ্রেটশেন। ফাউস্ট যখন নিজের আকাঙ্ক্ষার পেছনে ছুটছে, তখন তার সেই আকাঙ্ক্ষার মূল্য দিতে হয় অন্যদের। গ্রেটশেনের জীবনে ফাউস্টের প্রবেশ প্রেমের পয়গাম নিয়ে, কিন্তু ধীরে ধীরে তা হয়ে ওঠে ‘বিপর্যয়’। তাঁর মা মারা যান, ভাই নিহত হন, সামাজিক নিরাপত্তা ও সম্মান হারিয়ে তিনি একা হয়ে পড়েন। সন্তান জন্ম নেয়; সেই সন্তানও বাঁচে না। শেষ পর্যন্ত গ্রেটশেনের জীবন পৌঁছে যায় অপরাধবোধ, উন্মাদনা ও মৃত্যুর প্রান্তে।

এখানেই ফাউস্টের গল্প বদলে যায়। শয়তানের সঙ্গে চুক্তি করা এক পণ্ডিতের গল্প থেকে এটি হয়ে ওঠে মানুষের আকাঙ্ক্ষার নৈতিক মূল্যেবোধের শিক্ষা এবং শিক্ষা নিয়ে এক গভীর প্রশ্ন। ফাউস্ট কী চেয়েছিলেন? যৌবন, প্রেম, অভিজ্ঞতা। কিন্তু তাঁর চাওয়ার মূল্য কে দিল? গ্রেটশেন।

মুরনাউ যখন ১৯২৫–২৬ সালে ‘ফাউস্ট’ নির্মাণ করছিলেন, তখন তাঁর সামনে ছিল এই দীর্ঘ সাহিত্যিক উত্তরাধিকার। তাঁর চলচ্চিত্র শুধু গ্যোটের নাটকের সরাসরি রূপান্তর নয়; এতে জার্মান লোককথা, মার্লোর ‘ডক্টর ফস্টাস’ এবং গ্যোটের ‘ফাউস্ট’—সব কিছুরই ছাপ রয়েছে।

মেফিস্টোফিলিস তাই শুধু বাইরের কোনো শয়তান নয়। সে যেন মানুষের ভেতরের সেই কণ্ঠ, যে তাকে ক্রমাগত বলে, ‘আরও চাও।’ যা পেয়েছ, তা যথেষ্ট নয়। যা নেই, সেটাই তোমার প্রয়োজন। মেফিস্টোফিলিস মানুষের দুর্বলতা সৃষ্টি করে না; সে দুর্বলতাকে চিনে ফেলে। ফাউস্টের ভেতরে যে অতৃপ্তি আগে থেকেই ছিল, মেফিস্টোফিলিস শুধু তাকে ব্যবহার করে। এই অর্থে ফাউস্টের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়তো মেফিস্টোফিলিসও নয়, তার নিজের অন্তহীন আকাঙ্ক্ষা।

তবে এখানেই গ্যোটের ‘ফাউস্ট’ আরও জটিল হয়ে ওঠে। গ্যোটে মানুষকে শুধু তাঁর পাপ দিয়ে বিচার করেন না। মানুষের ভুল, আকাঙ্ক্ষা ও অনুসন্ধানের মধ্যেও তিনি তার সম্ভাবনা খুঁজে পান। মানুষ পতিত হবে, ভুল করবে, নিজের আকাঙ্ক্ষার কাছে পরাজিত হবে—কিন্তু তার ভেতরে আবার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও থাকবে। এ কারণে ফাউস্ট নিছক নৈতিক উপদেশের গল্প নয়।

১৯২৬ সালের ফাউস্ট চলচ্চিত্রে ইয়েস্তা একমান ও কামিলা হর্ন

প্রযুক্তির যুগে নতুন রূপে শয়তান

১৯২৬ সালের সাদামাটা দুনিয়া আর ২০২৬-এর প্রযুক্তি–শাসিত পৃথিবীর মধ্যে শুধু ১০০ বছরের দূরত্ব নয়, চরিত্রগতভাবে ফারাক বলা যায় আকাশ-পাতাল। কিন্তু মানুষের আকাঙ্ক্ষার চরিত্র কি সত্যিই বদলেছে?

আজ বিশ্ব এক অর্থে মানুষের হাতের মুঠোয়। মহাকাশে যন্ত্রযান পাঠাতে পারি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছি। জেনেটিক কোড নিয়ে কাজ করছি। এমন অনেক কিছু করতে পারছি, যা এক শতাব্দী আগে কল্পকাহিনির বিষয় ছিল। তবু আমাদের আকাঙ্ক্ষার অভিধানে সবচেয়ে পরিচিত শব্দগুলো কি বদলেছে? আরও জ্ঞান। আরও ক্ষমতা। আরও সম্পদ। আরও দীর্ঘ জীবন।

আজ বিশ্ব এক অর্থে মানুষের হাতের মুঠোয়। মহাকাশে যন্ত্রযান পাঠাতে পারি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছি। জেনেটিক কোড নিয়ে কাজ করছি। এমন অনেক কিছু করতে পারছি, যা এক শতাব্দী আগে কল্পকাহিনির বিষয় ছিল। তবু আমাদের আকাঙ্ক্ষার অভিধানে সবচেয়ে পরিচিত শব্দগুলো কি বদলেছে? আরও জ্ঞান। আরও ক্ষমতা। আরও সম্পদ। আরও দীর্ঘ জীবন।

আজকের প্রযুক্তি–শাসিত বিশ্বে আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবিধার কাছে নিজেদের চিন্তাশক্তি সঁপে দিচ্ছি কিংবা জেনেটিক প্রযুক্তির সাহায্যে প্রকৃতির সীমা ভাঙতে চাইছি—তখন মূলত আমরা নতুন রূপের এক ‘ফাউস্টীয় চুক্তিতেই’ (ফাউস্টিয়ান বারগেন) জড়াচ্ছি। তাৎক্ষণিক সুবিধা ও ক্ষমতার বিনিময়ে মানুষ কি তার নিজস্ব মানবিক বোধ, গোপনীয়তা আর আত্মাকেই বাজি রাখছে না?

১৯২৬ সালের ফাউস্ট চলচ্চিত্রে ইয়েস্তা একমান

মানুষের সীমা অতিক্রম করার আকাঙ্ক্ষাই একদিকে সভ্যতাকে এগিয়ে নেয়, অন্যদিকে তাকে বিপদের দিকেও ঠেলে দেয়। তাই ফাউস্ট কেবল অতীতের চরিত্র নয়; সে আমাদের সময়েরও চরিত্র। আমাদেরই প্রতিনিধি। তখন ফাউস্টের পুরোনো সেই চিরন্তন জিজ্ঞাসা নতুন করে ফিরে আসে: মানুষের জন্য কতটুকু যথেষ্ট?

মুরনাউর ‘ফাউস্ট’ আজ বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাস্টারপিস হিসেবে বিবেচিত। গ্যোটের ‘ফাউস্ট’-এর মানসিক অন্ধকারকে দৃশ্যমান করেছিলেন মুরনাউ। ১০০ বছর পর আজ যখন আমরা সেই নির্বাক চলচ্চিত্রের দিকে ফিরে তাকাই, তখন হয়তো মেফিস্টোর কালো অবয়বের চেয়েও বেশি পরিচিত মনে হয় ফাউস্টের মুখ—একজন মানুষের মুখ, যে সব পেয়েও তৃপ্ত নয়; যে জানে তার সামনে একটি সীমা আছে, তবু সেই সীমা ভাঙতে চায়।

এই চাওয়ার মধ্যে মহত্ত্ব আছে। আবার বিপদও এখানেই। সম্ভবত এ কারণেই ফাউস্টের গল্পের শেষ নেই। কারণ, ফাউস্ট কোনো একজন মানুষের নাম নয়। ফাউস্ট আমাদের ভেতরের সেই মানুষের নাম, যে সব পেয়েও বলে, ‘আরও চাই!’

hello.hasanimam@gmail.com