২০২৬ সালের ৩ মার্চ আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দে ঢাকায় নাসির আলী মামুনের ফটোজিয়াম লাইফ অব পোয়েট্রি প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মতিউর রহমানের বক্তৃতার লেখ্যরূপ।
নাসির আলী মামুনের ফটোজিয়াম: লাইফ অব পোয়েট্রি শিরোনামে কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের ওপর প্রদর্শনী এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হতে চলেছে। ২০২৫ সালের ২২ আগস্ট তিনি ঢাকার বেঙ্গল শিল্পালয়ে ‘শতবর্ষে সুলতান’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনী করেছিলেন। সেই প্রদর্শনীতে এস এম সুলতানকে আমাদের সামনে যেভাবে তিনি হাজির করলেন, সেটাও একটা বড় কাজ ছিল। এস এম সুলতান ঢাকার আধুনিক শিল্পী সমাজের কাছ থেকে দূরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিলেন। তাঁর প্রতি আমাদের দৃষ্টি বা আকর্ষণ তখনো জন্মায়নি। তাঁর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল ক্ষীণ। ঠিক একইভাবে কবিদের ক্ষেত্রে দেখা যায় শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমাদের যে নৈকট্য, সেই অর্থে আল মাহমুদকে আমরা কিছুটা দূরেই সরিয়ে রেখেছিলাম। আজ এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, এ সবকিছুই ছিল আমাদের সত্তর, আশি ও নব্বই দশকের রাজনৈতিক বিভেদের ফল। সেই রাজনীতির শিকার যেমন তাঁরাও হয়েছেন, একই সঙ্গে আমরাও তার শিকার হয়েছি।
শামসুর রাহমান জন্মেছেন ১৯২৯ সালে। আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালে। তাঁদের মাঝে বয়সের ব্যবধান ৭ বছর। আবার শামসুর রাহমান বেঁচে ছিলেন ৭৭ বছর এবং আল মাহমুদ ৮৩ বছর। আয়ুষ্কালে আল মাহমুদ এগিয়ে আছেন। সেদিক থেকে শামসুর রাহমানের চেয়ে ৭ বছরের বেশি জীবনকাল ছিল তাঁর। রাহমানের জন্ম ঢাকার ৩৬ মাহুতটুলির বাড়িতে। আর মাহমুদের জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামে। তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনা ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা তারপর সীতাকুণ্ডে। আর শামসুর রাহমান পোগোজ স্কুল থেকে প্রবেশিকা, ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট, তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক। অন্যদিকে মাহমুদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চট্টগ্রামের স্কুলে ক্লাস নাইন বা টেনের বেশি পড়া হয়নি।
শামসুর রাহমান সাংবাদিকতা জীবনের শুরুতে সাবএডিটর, মর্নিং নিউজে সিনিয়র সাবএডিটর, মাঝে রেডিও পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ বেতার), তারপর দৈনিক বাংলা, সেখানে সহকারী সম্পাদক, দৈনিক বাংলার সম্পাদক, দৈনিক বাংলার প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে আল মাহমুদের সাংবাদিক জীবন ঢাকায় কাফেলা পত্রিকা দিয়ে শুরু হয়। তারপর মিল্লাত পত্রিকার প্রুফ রিডার, ইত্তেফাকের প্রুফ রিডার, ইত্তেফাকের সাবএডিটর, ইত্তেফাকের গ্রামবাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। একসময় তিনি চট্টগ্রাম চলে যান, আবার ফিরে এসে ইত্তেফাকে কাজ করেন। এ ছাড়া তিনি আরও নানা কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন।
আল মাহমুদ গ্রামীণ বসতবাড়ি, শস্যখেত, পুকুর, কিংবা বৃষ্টিভেজা সেই গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। বাড়ির পাশের পুরোনো মসজিদে তিনি নামাজ পড়তেন। সেই মসজিদেই তাঁর প্রথম শিক্ষা গ্রহণ, তারপর স্কুল। আর শামসুর রাহমান শহরের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। বেড়ে উঠেছেন ঢাকা নগরের কোলাহলে। এ দুই কবির জীবন গড়ে ওঠে দুই ভিন্ন পরিবেশে, দুই ভিন্ন জগতে।
শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে। আর ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের এক ইশতেহারে আল মাহমুদের প্রথম একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল। এভাবে দুজনের কবিজীবনের যাত্রা শুরু হয়। জীবনের শেষ দিন অবধি শামসুর রাহমান বই লিখেছেন এক শটির ওপরে, তার মধ্যে কবিতার বই ৬০টি। অন্যদিকে আল মাহমুদ লিখেছেন আশিটির ওপরে বই, যার মধ্যে ৫০টি বই কবিতার। তাঁর বাকি বইগুলো গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, আত্মজীবনী, অনুবাদ ইত্যাদি। আবার শামসুর রাহমানের চেয়ে গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাসের সংখ্যা আল মাহমুদের বেশি। দুই কবির এ বইগুলো তাঁদের কাজের বহুমুখিতা, সংখ্যা, পরিমাণ, বিস্তৃতির ব্যাপকতাকে জানান দেয়।
আল মাহমুদ ছাত্রজীবনের শুরুতে বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সেই আগ্রহ আবারও জন্মেছিল যখন তিনি চট্টগ্রামে ছিলেন। অন্যদিকে শামসুর রাহমান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদ রাজনীতির সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালের পর থেকে ১৯৬৯-৭০ সালে তাঁর সেই রাজনৈতিক অগ্রগতি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। আল মাহমুদও কবিতা লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। তিনি সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। একাত্তরে অবস্থান করেছেন দেশের ভেতরে আবার দেশের বাইরে কলকাতায়। শামসুর রাহমান তখন দেশের ভেতরেই থেকেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ঢাকা ও তাঁর গ্রামের বাড়ি পাড়াতলীতে বসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কিছু ভালো কবিতা লিখেছেন। তাঁরা দুজনই ঢাকা ও কলকাতার বিদগ্ধ পাঠক সমাজে স্বীকৃত কবি ছিলেন। তাঁদের প্রতি ঢাকা ও কলকাতার পাঠকদের সমান সমর্থন ছিল। পরে ধীরে ধীরে কলকাতার পাঠক মহলে শামসুর রাহমান বড় জায়গাটি দখল করে নিয়েছিলেন। সেই ক্ষেত্র আল মাহমুদ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিলেন। তবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ছিল লেখক মহলে।
আমরা ছাত্রজীবনে সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সংকলন প্রকাশের জন্য দুজনের কাছ থেকেই কবিতা সংগ্রহ করেছি। ১৯৬৮ সালে শামসুর রাহমান আমাকে কবিতা দিয়েছিলেন। ১৯৬৮–৭০ সালে আমরা তাঁর কবিতা ছাপালাম। আল মাহমুদের কাছে আমি গিয়েছিলাম ১৯৬৯ সালে তাঁর ইত্তেফাক অফিসে। তিনিও আমাদের কবিতা দিয়েছিলেন। সেই কবিতাও আমরা সংকলনে ছেপেছি। এভাবে দুজনের সঙ্গেই সেই সময় যোগাযোগ ছিল। তখন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের মাঝে একরকম যোগাযোগ ছিল। স্বাধীনতার পর সেই যোগাযোগ ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শামসুর রাহমান দৈনিক বাংলার সম্পাদক হন। আর আল মাহমুদ রাজনৈতিক কারণে গণকণ্ঠের (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের মুখপত্র) সম্পাদক হয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে জাসদ কর্মীদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়িতে হামলার ঘটনার পর তিনি গ্রেপ্তার হন। সেই সময় জেলে গিয়ে দৈনিক বাংলার সম্পাদক শামসুর রাহমান তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। অবশেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে মুক্ত করে শিল্পকলা একাডেমিতে চাকরি দেন। সেই চাকরি তিনি ১৯৯১ সাল পর্যন্ত করে গেছেন। এভাবেই দুজনের জীবনের গতিপথ নানা দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম, স্বাধীনতাসংগ্রাম এবং পরবর্তী সময় রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে তাঁদের পাঠক সমাজ ও সমর্থকদের মধ্যে কিছুটা বিভাজন তৈরি হয়। আমি আমার দিক থেকে যদি বলি, আমরা প্রধানত কবি শামসুর রাহমানের প্রতি অনুরাগী ছিলাম। তাঁকে সমর্থন ও সহযোগিতা করেছি। একত্রে চলেছি। আমাদের মনে হয়েছে তিনি বোধ হয় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা এবং প্রগতির পথে প্রধানতম কবি। তাই তাঁর সঙ্গেই আমাদের চলতে হবে। আজ বলতে দ্বিধা নেই, সেদিক থেকে আল মাহমুদের প্রতি আমরা একটু দূরত্ব তৈরি করে ফেলেছি। যেমনটি আমরা জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, মোহাম্মদ কিবরিয়া বা কাইয়ুম চৌধুরীর সঙ্গে এস এম সুলতানের দূরত্ব তৈরি করে ফেলেছিলাম। এসব বিভেদ বা দূরত্ব আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক জীবনে কখনোই ভালো ফল বয়ে আনেনি। এ বিভেদ তৈরি হয়েছে মূলত রাজনৈতিক চিন্তার জায়গা থেকে। আমরা নিজেরাও তার ভুক্তভোগী।
আমরা শামসুর রাহমানের ঘনিষ্ঠ ছিলাম। আল মাহমুদের সঙ্গে সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয়ে ওঠেনি। এ বিভেদ কবিরা তৈরি করেননি। বিভেদ তৈরি করেছেন তাঁদের সমর্থক গোষ্ঠী এবং আমাদের মতো কাছের বন্ধুরা। আল মাহমুদ আর শামসুর রাহমানের মাঝে এই যে বিভেদ–বিভাজন এবং কেনই–বা আমরা আল মাহমুদের ঘনিষ্ঠ হতে পারলাম না! প্রথম আলোতে তাঁর কবিতা, সাক্ষাৎকার, গদ্য ছেপেছি এবং প্রথমা থেকে তাঁর ৩টি বই প্রকাশ করেছি। শামসুর রাহমানের বই করেছি ৬টি। এখানেও একটা পার্থক্য বা বিভাজনের জায়গা তৈরি হয়ে গেছে। এ রকমই এক বিভাজনের সময় নাসির আলী মামুন একটা ঐতিহাসিক কাজ করে ফেলেছেন। তিনি দুই কবিকে একত্রিত করেছেন। ২০০৪ সালে তাঁর নেওয়া একসঙ্গে দুই কবির সাক্ষাৎকারটি খুব ভালো হয়েছে। মামুনের উদ্যোগ ছিল দুজনকে কাছে নিয়ে কথা বলবেন, সাক্ষাৎকার নেবেন। আমি মনে করি বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে এমন এক বিভাজনের মধ্যে দুজনকে একত্র করা একটা দারুণ কাজ ছিল। ঠিক তেমনি এস এম সুলতানকে নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। নাসির আলী মামুন ফটোগ্রাফির সীমা ছাড়িয়ে এক সাংস্কৃতিক ভূমিকা পালন করেছেন। বাংলাদেশের শিল্প–সাহিত্যকে এক বড় জায়গায় নিয়ে গেছেন।
নাসির আলী মামুন বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮ হাজার বিখ্যাত ব্যক্তির হাজার হাজার পোর্ট্রেট তুলেছেন। যাঁদের মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন নোবেল বিজয়ী। অক্তাবিও পাজ ও ডেরেক ওয়ালকটসহ নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া অনেকেই তাঁর ছবির সাক্ষী হয়ে আছে। বাংলাদেশের আর কোনো ফটোগ্রাফারের পক্ষে এ সৌভাগ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। পোর্টেট ফটোগ্রাফির সীমা ছাড়িয়ে কোনো ব্যক্তির সাংস্কৃতিক ভূমিকার বিস্তৃতি কতটা হতে পারে, তারই প্রমাণ এ প্রদর্শনী। এস এম সুলতানকে নিয়েও প্রদর্শনীটি তাই ছিল। মামুন গদ্য লেখেন, উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর লেখা সাক্ষাৎকারের বইও আছে।
আল মাহমুদ আমাদের গ্রাম ও গ্রামীণ জীবনঘনিষ্ঠতা নিয়ে বেড়ে ওঠা এক কবি। তাঁর কবিতায় সে জীবন নিবিড়ভাবে উঠে এসেছে। এবং ধর্মের প্রতি তাঁর বিশ্বাস। অন্যদিকে শামসুর রাহমান ঢাকা শহরের এলিট সমাজে বেড়ে ওঠা এক কবি। আধুনিক প্রজন্মের মানুষ, নাগরিক সমাজের চিত্র, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রভাব নিয়ে রাহমান কাজ করেছেন। মামুনের এই প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের প্রধান দুই কবির ছবি পাশাপাশি প্রদর্শিত হলো।
নাসির আলী মামুনকে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে আল মাহমুদ বারবার বলছেন, বাংলাদেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমান। কিন্তু শামসুর রাহমান তাঁর জবাবে বলতে পারেননি যে আপনিও একজন প্রধান কবি। আমাদের মধ্যে এ ধরনের বিষয়গুলো ছিল, এখনো রয়ে গেছে। আর বিগত বছরগুলোতে আমরা অনেক রাজনৈতিক তর্কবিতর্ক করে চলেছি। বলতে দ্বিধা নেই, এখন প্রথম আলোর পক্ষ থেকে আমরা আরও উন্মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছি। সকল মত ও চিন্তাকে আমরা আরও বেশি বেশি করে আমাদের পত্রিকায় নিয়ে আসতে চাই।
আজকে বলতে চাই, লেখক–শিল্পী–কবিদের সরাসরি কোনো রাজনীতিতে যুক্ত না হওয়াই শ্রেয়, ভালো। বিগত সময়ের অভিজ্ঞতা বলে, রাজনীতির কারণে শিল্পীদের মধ্যে যে বিরোধ ও বিচ্ছেদ তৈরি হয়েছে, তা খুব ক্ষতি করেছে আমাদের শিল্প–সংস্কৃতিকে। আমরা কবিকে কবির মর্যাদা দিতে চাই। লেখককে লেখকের মর্যাদা দিতে চাই। আমরা প্রথম আলো থেকে সেই চর্চা করি এবং আত্মসমালোচনা করি—আমরা ভুল করেছি, সংশোধন করতে হবে এবং আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
(সামান্য পরিমার্জিত)