গ্রাফিক্স: প্রথম আলো
গ্রাফিক্স: প্রথম আলো

আমাদের থিয়েটার, তাদের থিয়েটার

২০০৫ সালের ২৯ এপ্রিল প্রথম আলোর সাহিত্য পাতায় রামেন্দু মজুমদারের ‘আমাদের থিয়েটার, তাদের থিয়েটার’ প্রকাশিত হয়েছিল। এত দিন লেখাটি শুধু প্রথম আলোর কাগুজে সংস্করণে ছিল, আজ তুলে ধরা হলো অন্য আলোর অনলাইন পাঠকের জন্য।

মাঝে মাঝেই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় আমাকে, আপনি তো অনেক দেশের থিয়েটার দেখেছেন, বাংলাদেশের থিয়েটার আন্তর্জাতিক মানে কোন অবস্থানে রয়েছে? এ প্রশ্নের জবাব দেওয়া খুব সহজ কাজ নয়। একে শিল্পকলার ক্ষেত্রে তুলনামূলক বিচারের কাজটি বেশ দুরূহই, বিচারের তেমন স্বীকৃত মানদণ্ড নেই। অন্যদিকে প্রতিটি দেশের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর দাঁড়িয়ে যে থিয়েটার, সেখানে এক দেশের থিয়েটারের সঙ্গে ভিনদেশের তুলনাটা বাংলা ভাষার সঙ্গে ফরাসি বা জার্মান ভাষার তুলনার মতো হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমি কেবল বাস্তব অবস্থা, অবকাঠামো বা আমার চোখে দেখা কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করব, কোনো গুণগত বিচারের পথে পা বাড়াব না। তা ছাড়া কোনো দেশের দু-তিনটি নাটক দেখে, ভাষা না বুঝে সে দেশের থিয়েটার সম্পর্কে মতামত দেওয়া কি যুক্তিযুক্ত? যদিও আমাদের প্রসেনিয়াম থিয়েটার বা গ্রুপ থিয়েটার চর্চার জন্য আমরা ইংরেজদের প্রতি ঋণী, উপনিবেশবাদের কুফল আমাদের মাথা থেকে এখনো ঝেড়ে ফেলে দিতে পারিনি। পশ্চিমের দিকে আমাদের দৃষ্টি সর্বদা প্রসারিত, ঘরের পাশে ভিনদেশে কী ঘটছে, তার খবর রাখার তাগিদ বোধ করি না। আমরা লন্ডন, নিউইয়র্কে কী ধরনের নাটক হচ্ছে তার খবর রাখার চেষ্টা করি; কিন্তু আসাম বা মণিপুরে নাটকের ক্ষেত্রে কী ঘটছে সে সম্পর্কে কি আমাদের কোনো ধারণা আছে?

আমার দুটো বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার কথা এখানে বর্ণনা করতে চাই। দিন দশেক আগে আমার সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। শারজাতে বছরে একটি নাট্যোত্সব হয়, এবার ছিল তার ১৫তম বার্ষিকী। নাট্যোত্সব সংস্থাটি আমাদের আইটিআইয়ের কো–অপারেটিং মেম্বার হওয়ার আবেদন করেছে। সেই সূত্রে কেন্দ্রীয় আইটিআইয়ের সহসভাপতি হিসেবে শারজা সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর আমাকে আমন্ত্রণ জানায়। আরব আমিরাতের সংস্কৃতি বা তাদের নেতৃত্ব সম্পর্কে আমরা অনেকেই উচ্চ ধারণা পোষণ করি না। কিন্তু শারজা গিয়ে তো আমি হতবাক।

শারজার শাসনকর্তা অর্থাৎ আমির ড. শেখ সুলতান বিন মোহাম্মদ আল কাসেমির দুটো পিএইচডি ডিগ্রি রয়েছে ইংল্যান্ডের দুটো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে—একটি ইতিহাসে, অন্যটি রাজনৈতিক ভূগোলে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৮—বেশির ভাগই বিদেশের সম্ভ্রান্ত প্রকাশনালয় থেকে। তাঁর এক মেয়ে সিনেমাটোগ্রাফিতে পিএইচডি করছেন বিদেশে, ইতিমধ্যে দেশে ছবিও নির্মাণ করেছেন। আমির শেখ সুলতান ইতিহাসভিত্তিক তিনটি নাটকও রচনা করেছেন। আমাদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর তিনি আমার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় জানালেন, পরদিনই তিনি প্যারিস যাচ্ছেন, সেখানে আন্তর্জাতিক বইমেলায় তাঁর গ্রন্থের একটি প্রকাশনা উত্সবে উপস্থিত থাকার জন্য। তিনি কেবল পণ্ডিতই নন; নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে নানা কাজ করে চলেছেন। শারজায় নিয়মিত নাটক হয় না। বার্ষিক এ উত্সব উপলক্ষে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় কয়েকটি নতুন প্রযোজনা হয়, সব প্রযোজনারই একটি বা দুটি প্রদর্শনী হয়। অভিনেতা, কলাকুশলীরা সবই আমাদের মতো অপেশাদার। এক তরুণ নাট্যকর্মীকে নিয়মিত নাটক না হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দিলেন, দর্শক নেই। দর্শক মেতেছে সব টিভির সস্তা সিরিয়াল বা বাণিজ্যিক নাটকে। তখন আমি আমাদের দেশে কীভাবে মঞ্চনাটকের জন্য দর্শক তৈরি করেছি সে অভিজ্ঞতার কথা বললাম। বিপরীত দিকে এক সেমিনারে তরুণ নাট্যকর্মীরা অনুযোগ করলেন, তাঁরা কাজ করার সুযোগ পান না। সরকার নাটকের ব্যাপারে কতটা আন্তরিক, সে ব্যাপারে তাঁরা সন্দিহান।

অথচ নাটকের চমত্কার সব অবকাঠামো শারজাতে বিদ্যমান। কালচারাল প্যালেস বলে যে অট্টালিকায় উত্সবের উদ্বোধনী হলো, সেটা চমত্কার একটি আধুনিক মিলনায়তন, আমাদের ওসমানী বা জাতীয় নাট্যশালার চেয়েও উন্নতমানের, অবশ্য কারিগরি সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে নয়। মিলনায়তনে প্রবেশের আগে দুদিকে বিশাল অপেক্ষা করার ঘর। কারণ, আমির–ওমরাহরা প্রায়ই নানা অনুষ্ঠানে এখানে আসেন। বিশিষ্ট অতিথিরা গিয়ে বসলেই খানসামারা হাজির হয় আরবি কফি বা চা নিয়ে।

আরেকটি স্থাপনা রয়েছে—শারজা ইনস্টিটিউট ফর থিয়েট্রিক্যাল আর্টস। এটি শেখ সুলতান স্থাপন করেছেন নাটকের প্রশিক্ষণ ও চর্চার জন্য; কিন্তু এখনো কোনো কাজ শুরু হয়নি। এর ভেতর দুদিকে আছে সমান আয়তনের দুটি চমত্কার মঞ্চ, প্রতিটির সামনে ৪০০ দর্শক বসার আসন। এই তিনটি মিলনায়তনে উত্সব হয়েছে। দর্শকদের কোনো টিকিট লাগে না, উল্টো এখানে বিনে পয়সায় চা-কফি খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। প্রতিটি প্রদর্শনীই ছিল দর্শকে পূর্ণ। তাই দর্শক পাওয়া যাবে না বলে যে মত শুনলাম, তা আমার বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না। সংস্কৃতি দপ্তরের কর্মকর্তাদের আমি আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে কিছু পরামর্শ দিয়েছি। কীভাবে তাঁরা ইনস্টিটিউটের কাজ শুরু করতে পারেন, নিয়মিত নাট্যচর্চার সূচনা কীভাবে হতে পারে।

শারজার নাট্যোত্সবে ছয়টি নাটক আমার দেখার সুযোগ হয়েছিল, সবই আরবি ভাষায়। তাই নাটকের গুণগত মান সম্পর্কে কিছু বলতে পারব না। তবে সব প্রযোজনারই সেট ডিজাইন খুব উন্নতমানের। অভিনয় গতানুগতিক। হাস্যরস দর্শকের খুব পছন্দ। টিভি সিরিয়ালের জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা মঞ্চে এলেই দর্শক হাততালি দিয়ে তাঁদের স্বাগত জানায়। থিয়েট্রিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বলে একটি প্রতিষ্ঠান আছে নাট্যবিষয়ক প্রকাশনা, আলোচনা ও উন্নয়নমূলক কাজ করার জন্য। এখানকার এসব দেখে আমার কেবলই মনে হয়েছে, এদের সব আয়োজন আছে, অথচ মূল নাটকটার চর্চাই নেই। আর আমাদের হাজার হাজার ছেলেমেয়ে নাটকের জন্য নিবেদিত, অথচ আমাদের তেমন অবকাঠামো নেই।

এর চেয়েও অবাক হয়েছিলাম আমি পরপর দুবার ইরান গিয়ে। ইরানের উঁচু মানের চলচ্চিত্র ও চিত্রকলার সঙ্গে আমরা পরিচিত; কিন্তু নাটক সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। ২১ ও ২২তম ফাজ আন্তর্জাতিক থিয়েটার ফেস্টিভ্যালে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। ইরানের ধর্মীয় বিধিনিষেধের কথা অনেকটা আমরা জানি। প্রকাশ্যে মেয়েরা মাথায় কাপড় ছাড়া বেরোতে পারে না, অপরিচিত পুরুষকে স্পর্শ করতে পারে না। তাই নাটকেও মেয়েদের চুল ঢাকা থাকে, স্বামী-স্ত্রীর অভিনয়েও জামা ধরে টানাটানি করতে হয়, একে অন্যকে ছুঁতে পারে না। দ্বিতীয়বার গিয়ে দেখলাম মজার কাণ্ড। আইন বাঁচাতে মেয়েটি হাতে গ্লাভস পরে ছেলেটির হাত ধরেছে। কী উদ্ভাবনী শক্তি! তবে এত সব সামাজিক বিধিনিষেধের মধ্যে ইরানের নাট্যকর্মীরা যেসব বিষয় নিয়ে নাটক করেন, তাতে তাঁদের সাহসিকতার তারিফ না করে পারা যায় না। দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আধুনিক, অভিনয় মনোগ্রাহী, প্রযোজনার নান্দনিক দিকগুলো চোখে পড়ে। উত্সবে বিভিন্ন ধরনের নাটক হয় একসঙ্গে বিভিন্ন অভিনয়স্থলে। বিদেশের নির্বাচিত দলকেও ওরা আমন্ত্রণ জানায়। পাশাপাশি চলে ঐতিহ্যবাহী নাট্যানুষ্ঠান ও উন্মুক্ত প্রান্তরে নাটক। ইসলামি ঐতিহ্যবাহী ইরানের প্যাশন প্লে তাজিয়া বিশ্বখ্যাত। আমাদের এখানে তো অনেক ধর্মীয় চরিত্রকে বাস্তবে আনার কথা কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু ইরানে তাজিয়াতে দেখেছি এমন, চরিত্রের মুখে হালকা কাপড়ের একটা পর্দা থাকে, যাতে মুখ স্পষ্ট দেখা না যায়। মসজিদের মতো একটা জায়গা, যাকে ‘তাকিয়া’ বলে, সেখানে এবং উন্মুক্ত প্রান্তরেও তাজিয়া অভিনীত হয়। কারবালার মর্মন্তুদ কাহিনির রূপায়ণ দেখে বয়স্কদের কেঁদে বুক ভাসাতে দেখেছি অভিনয় চলার সময়। তাজিয়া দেখা পুণ্যের কাজ বলে তাঁরা বিবেচনা করেন।

রামেন্দু মজুমদার

তেহরানে ড্রাম্যাটিক আর্ট সেন্টার সরকারের একটা বিভাগ। তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে চারটি থিয়েটার হল ও কমপ্লেক্স। এক সিটি থিয়েটারেই রয়েছে ছোট-বড় সাতটি মঞ্চ। কোনোটি স্টুডিও থিয়েটার, কোনোটি প্রসেনিয়াম, কোনোটি থিয়েটার ইন দ্য রাউন্ড। সারা বছর এসব মঞ্চে টিকিট করে নাট্যাভিনয় হয়। তবে কী নাটক প্রদর্শিত হবে, তার পাণ্ডুলিপি আগেই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমোদন করিয়ে নিতে হয়। উত্সবে মঞ্চস্থ নাটকগুলোই সারা বছর চলে।

অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যশিক্ষার ব্যবস্থা আছে। বেশির ভাগ নির্দেশক, অভিনেতা-অভিনেত্রীরই দেখলাম নাটকের ডিগ্রি রয়েছে। শিশুনাট্য, মূকাভিনয়, লোকজ নাটক—সবকিছুরই আলাদা আলাদা উত্সব হয়। সিংহভাগ নাটকই মঞ্চস্থ করে আমাদের গ্রুপ থিয়েটারগুলোর মতো অলাভজনক নাট্যদলগুলো। তবে অবশ্যই তারা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। ইরানে আমি একটি চমত্কার প্রযোজনা দেখেছিলাম। কিসেস অ্যান্ড টিয়ার্স। ভাসলাম হ্যাভেলের নাটকের ভাবানুবাদ। এবার শারজা উত্সবে সে নাটকটিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর তরুণ পরিচালক আমাকে শোনালেন অবাক করা এক কথা। সম্প্রতি ইরানে কট্টরপন্থীরা নির্বাচনে তাদের অবস্থান দৃঢ় করেছে। তাই ড্রাম্যাটিক আর্ট সেন্টারের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এসেছে। নাটকটির দুটি চরিত্রের একটির অভিনেত্রী ব্যক্তিগত জীবনে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের। নাটকের নির্দেশককে বলা হয়েছে, তেহরানে অভিনয় করতে খল অভিনেত্রী পরিবর্তন করতে হবে। তেহরানের বাইরে বা বিদেশে করলে আপত্তি নেই। নির্দেশক অভিনেত্রী পরিবর্তন করেননি, তাই এ চমত্কার নাটকটির তেহরানে আর অভিনয় হয়নি। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও নাটক এগিয়ে চলেছে, এটাই নাটকের অন্তর্নিহিত শক্তি। উন্নত বিশ্বেও শতকরা প্রায় ৮০ জন নাটকে প্রশিক্ষিত অভিনেতা-অভিনেত্রী পেশাদার হওয়ার সুযোগ পান না। আমাদের মতো অন্য চাকরি করেন, তবে সুযোগ পেলেই চাকরি ছেড়ে নাটকে পেশাদার হয়ে যান। আমাদের গ্রুপ থিয়েটার চর্চার সঙ্গে কিছুটা মিল আছে বিদেশের ফ্রিন্জ বা অফ-অফ-ব্রডওয়ে কিংবা ফ্রি থিয়েটার গ্রুপগুলোর সঙ্গে। তবে সেখানেও একজন-দুজন পেশাদার সার্বক্ষণিক কর্মী থাকেন আর সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এ দলগুলোর পেছনে রয়েছে। আমাদের মতো দিনের পর দিন গাঁটের পয়সা খরচ করে নাটকে লেগে থাকার দৃষ্টান্ত এ উপমহাদেশ ছাড়া তেমন কোথাও আছে বলে জানা নেই।

বরফে ঢাকা উত্তর মেরুর দেশ আইসল্যান্ডে ১০০ বছর আগে প্রথম নাটকের দল গঠিত হয়েছিল। আর ওদের পেশাদার ন্যাশনাল থিয়েটারের বয়স ৫০ পেরিয়ে গেছে। ওদের জনসংখ্যার চেয়ে বছরে টিকিট বিক্রি হয় আরও বেশি। এর অর্থ একজন দর্শক একাধিকবার মঞ্চে নাটক দেখতে যান। ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ের মতো নরডিক দেশগুলোতে থিয়েটারের অবকাঠামো অনেক সংহত এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বিপুল। জার্মান সরকার নাটকের পেছনে কী পরিমাণ বার্ষিক ভর্তুকি দেয়, শুনলে আমাদের বিস্ময়ের সীমা থাকবে না। তবু সব জায়গায়ই নাট্যকর্মীদের অভিযোগ, নাটকের ক্ষেত্রে অনুদান কমে আসছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন থাকতে নাটকের পেছনে রাষ্ট্র যে অর্থ জোগান দিত, এখন রাশিয়া বা অন্য প্রজাতন্ত্রগুলো তার ধারেকাছে যেতে পারে না। তাই পূর্ব জার্মানি ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে অনেক থিয়েটার বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি আমেরিকায় ব্রডওয়েতে নাটক প্রযোজনা এত ব্যয়বহুল হয়ে গেছে যে প্রতিবছরই সেখানে বাণিজ্যিক থিয়েটারের সংখ্যা কমে আসছে।

আমরা চেষ্টা করি আমাদের থিয়েটারটাকে অর্থবহ করতে। আমাদের সব প্রযোজনার পেছনে একটা লক্ষ্য থাকে। সামাজিক সমস্যাই হোক আর মানবিক সম্পর্কের বিষয়ই হোক, আমাদের নাটকের মধ্য দিয়ে আমরা কিছু বলতে চাই। এটা বাংলাদেশের নাটকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু একই কথা বিদেশের অনেক নাটক সম্পর্কে বলা যাবে না। অনেক প্রযোজনাই আমাদের কাছে অর্থহীন অথচ ব্যয়বহুল মনে হবে। তবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানভেদে জীবনের অর্থ পাল্টে যায়। আমাদের কাছে যা অর্থহীন, অন্য সমাজে তার মধ্যে অর্থ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। নাটক তো সমকালীন দর্শকের সামনেই বেশির ভাগ অভিনীত হয়। বর্তমানটাই সেখানে প্রধান বিবেচ্য।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নাটকের আবেদন বদলে যায়। আধুনিক বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ব্রেশটের নাটক জার্মানিতেই আজকাল খুব কম মঞ্চস্থ হয়। এমনকি ভিনদেশেও।

সত্তরের দশকে যে ব্রেশটকে আমাদের নিজেদেরই নাট্যকার মনে হতো, সেই ব্রেশট আস্তে আস্তে চিরায়ত নাটকের কাতারে চলে গেছেন, আগের মতো আর সমকালীন মনে হয় না। তবে শেক্‌সপিয়ার, ব্রেশট, মলিয়েঁরের নাটক সমকালকে অতিক্রম করে চিরকালীন হয়ে গেছে—নতুন নতুন ব্যাখ্যা নিয়ে তা আমাদের সামনে উপস্থাপিত হবে প্রতিভাধর নির্দেশকের কল্যাণে।

রবীন্দ্রনাথের নাটককে আমরা অনেকেই মনে করি উত্তর–আধুনিক, সময়ের চেয়ে এগিয়ে। কেবল ইংরেজি বা অন্য আন্তর্জাতিক ভাষায় রবীন্দ্রনাথের নাটক যথেষ্ট অনূদিত হয়নি বলেই রবীন্দ্রনাথ আন্তর্জাতিক নাট্য প্রযোজকদের কাছে শেক্‌সপিয়ার বা ব্রেশটের কাতারে স্থান করে নিতে পারেননি।

আজকাল বিদেশেও অনেক প্রযোজক ভিন্ন ধরনের নাটক মঞ্চায়ন করতে চান, তাঁরা পূর্বদেশীয় নাটকের খোঁজ করেন। তাই আমাদের বাংলা নাটকের যদি প্রচুর অনুবাদ থাকত, বিদেশে এসব নাটকের অভিনয় সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যেত।

এবার দৃষ্টি ফেরাই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের দিকে। ভারতের নাট্য ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ, একটি রাজ্যে আমাদেরই বাংলা ভাষায় নাট্যচর্চা হয়। অনেক সময় আমাদের দর্শকেরা কলকাতার দু-একটা নাটক দেখে এসে বলেন, আমাদের নাটক ওখানকার চেয়ে ভালো। অবশ্য দুই-তিন বছর ধরে কলকাতার যেসব দল পারস্পরিক বিনিময়ের সূত্র ধরে বাংলাদেশে আসছে, তাতে ওই ধরনের মন্তব্য করলে দর্শকদের দোষ দেওয়া যায় না।

নাটকের দৃশ্যে রামেন্দু মজুমদার–ফেরদৌসী মজুমদার জুটি

সত্তরের দশকে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটারের স্বর্ণযুগ থেকে আমরা অনুপ্রেরণা পেয়েছি। আমাদের সঙ্গে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটারগুলোর চরিত্রের যথেষ্ট মিল থাকলেও আমরা সৌভাগ্যবান ছিলাম যে আমাদের বাণিজ্যিক থিয়েটারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়নি। আমাদের কিছু দর্শক কমেছে এবং নাট্যকর্মীদের সময় থেকে বঞ্চিত হয়েছি টেলিভিশন ধারাবাহিকের কল্যাণে। তবে সামগ্রিকভাবে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটারে পেশাদারির ছাপ সুস্পষ্ট—যেটা আমাদের আরও অর্জন করতে হবে। আজকাল সেখানে কয়েকটি দলে পূর্ণ সময়ের জন্য কর্মী কাজ করছেন। নান্দীকার প্রতি মাসে ২০ থেকে ২৫টি প্রদর্শনী করে, তাই তাদের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অন্য কাজ করেন না, নাটক থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। সেটা সম্ভব হয়েছে তাদের নানা প্রকল্প থেকে অর্থসহায়তা প্রাপ্তির কারণে। নতুবা নিয়মিত অভিনয় করে টিকিট বিক্রি থেকে দল চালানো রীতিমতো অসম্ভব। আজকাল কলকাতায় একাডেমি বা রবীন্দ্রসদনে শতকরা ৯০টি দল নিয়মিত প্রদর্শনী থেকে খরচ ওঠাতে পারে না। সম্প্রতি সেখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রযোজনা করেছে নান্দীকার, রঙ্গকর্মী, সায়ক প্রভৃতি দল। নান্দীকারের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ তো বিস্ময়কর এক প্রযোজনা। এমন ভালো নাটক আমি কয়েক বছরে দেখিনি। ৫০ জন শিল্পী নাচ, গান, অভিনয় ও বাদ্যে কীভাবে সব নাট্যমুহূর্ত তৈরি করেন, তা না দেখলে বোঝানো যাবে না। অন্যদিকে আমাদের দেশের মতো সেখানেও নিম্নমানের নাটকের কমতি নেই। তবে বাচিক অভিনয় সামগ্রিকভাবে আমাদের চেয়ে উন্নত, এর প্রধান কারণ আমরা হলে অ্যাকুয়াস্টিক না থাকার ফলে উচ্চগ্রামে অভিনয় করি। তাতে সংলাপকে খেলানো যায় না। এখন জাতীয় নাট্যশালার চমত্কার দুটো থিয়েটার আমাদের নাটকের গুণগত পরিবর্তন আনতে ধীরে ধীরে সক্ষম হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বিদেশিরা যখন আমাদের দেশে এসে আমাদের নাটক দেখেন, তখন তাঁরা একটা কথা বলেন—‘যদিও তোমরা পেশাদার নও, তবু তোমাদের প্রযোজনায় পেশাদারির ছাপ রয়েছে।’ এতে আমাদের আত্মতৃপ্তির কোনো সুযোগ নেই। এ কথা ঠিক, আমরা যথাযথ কারিগরি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। কিন্তু এক কয়লাখনিতে যদি খনিশ্রমিকদের কাজ করার আলো অভিনয়স্থলের দিকে ফেলে নাট্যাভিনয়ের আয়োজন করা যেতে পারে, আমাদের দেশেই যদি ১৯৫৩ সালে জেলখানার ভেতরে হারিকেনের আলোয় ‘কবর’ নাটকের প্রথম অভিনয় হতে পারে, আমাদের সেই সত্যের সামনেই পুনর্বার দাঁড় করায় যে নাটকের শক্তিই হচ্ছে সব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করা।

আজকের বিশ্বায়নের যুগে বড় রাষ্ট্রের শক্তিশালী সংস্কৃতির জোয়ার থেকে আমাদের রক্ষা পাওয়ার অস্ত্র আমাদের সংস্কৃতির শক্তি, আমাদের নাটকের শক্তি। আমরা নাটক করব আমাদের দেশের দর্শকদের জন্য, বিদেশিরা যেমন করেন তাঁদের নিজ নিজ দেশের মানুষের জন্য। আমরা বিশ্বায়নের সুযোগ ব্যবহার করব, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করব, তবে অবশ্যই নাটকের নিজস্ব চরিত্র বজায় রাখব। আমরা সেই সব বিদেশি নাটকে অভিনয় করব, যার এখানে প্রাসঙ্গিকতা আছে বা বৈশ্বিক মানে সাহিত্যমূল্য আছে।

অনেক সময় আমরা কূপমণ্ডূকতায় ভুগি। কিছু করেই বিশ্বে এই প্রথম বলে ঘোষণা দিয়ে দিই। আমাদের নবনাট্যচর্চার বয়স ৩৪ বছর হতে চলল। এই ভরা যৌবনে কি আর বালখিল্যতা আমাদের সাজে? বিদেশের নাটক থেকে আমরা প্রধান যে শিক্ষাটা নিতে পারি, তা হচ্ছে প্রযোজনায় আরও পেশাদারি অর্জন করা, কাজে আরও নিষ্ঠার পরিচয় দেওয়া। নাটক করে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের জীবিকা নির্বাহের সম্ভাবনা নেই—এ কথা জেনেও আমরা নাটকে নিবেদিত এ জন্য যে নাটকের মধ্যে আমাদের জীবনের অর্থ খুঁজে পাই। ফরাসি নির্দেশক আরিয়ান নুশকিনের এবারের বিশ্বনাট্য দিবস বাণীর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে চাই:

‘নাটক, ওই তোমার বাড়িয়ে দাও হাত, আমাকে উদ্ধার করো।

আমি যে ঘুমিয়ে পড়েছি, আমাকে তুমি জাগিয়ে দাও।’

২৭ মার্চ ২০০৫ বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ও আইটিআই বাংলাদেশ আয়োজিত বিশ্ব নাট্যদিবস উপলক্ষে প্রদত্ত ‘বিশ্ব নাট্যদিবস’ বক্তৃতা।