দেবেশ রায়: শ্রদ্ধেয় লেখক, প্রিয় মানুষ

দেবেশ রায় ( জন্ম: ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৩৬ মৃত্যু: ১৪ মে, ২০২০)
দেবেশ রায় ( জন্ম: ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৩৬ মৃত্যু: ১৪ মে, ২০২০)

অন্য অনেকের মতো, আমরা সাহিত্য করতে শুরু করি প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার অঙ্গীকার থেকে। ঢাকায় আসা ১৯৮৪-তে। এসেই আমরা পড়লাম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে। রাজপথে আন্দোলন হচ্ছে, নূর হোসেন বুকে-পিঠে 'স্বৈরাচার নিপাত যাক, গনতন্ত্র মুক্তি পাক' লিখে পুলিশের গুলিতে শহীদ হচ্ছেন। শামসুর রাহমান কবিতা লিখছেন, 'বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়।' জাতীয় কবিতা উৎসব বসছে টিএসসির খোলা চত্বরে, রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত সেই রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ, কবিতা শুনছেন! আমাদের পাঠ্য তখন সুবিমল মিশ্র, 'বিজ্ঞাপনপর্ব' নামের লিটল ম্যাগাজিন। অ্যান্টি-কবিতা, অ্যান্টি-উপন্যাস আমাদের আরাধ্য। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অনুবাদিত চেসোয়াভ মিউসের কবিতা, নিকানোর পাররার কবিতা, মিরোস্লাভ হোলুবের কবিতা। টেড হিউজ, এড্রিয়েন মিচেল। ইংরেজি অপূর্ব একটা ছবিওয়ালা কবিতার বই। এবং মানবেন্দ্রর অনুবাদে মার্কেস, 'কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না', 'সরলা এরেন্দিরা' ইত্যাদি। নিজে উপন্যাস লিখব, ভাবিনি, কবিতা লিখব, আর 'পূর্বাভাস' পত্রিকা বেরুলে ১৯৯০-এ লিখতে শুরু করি গদ্যকার্টুন, সে-ও প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার অঙ্গীকার থেকে। নিজেদের মনে মনে ভাবতাম অঙ্গীকৃত লেখক। সেই সময় দেবেশ রায় হাতে এলো। প্রথমে 'খরার প্রতিবেদন', 'দাঙ্গার প্রতিবেদন'। সংলাপের ভাষা আমাদের রংপুরের ভাষার সঙ্গে মিলে যায়। সেটা তো শিহরিত হয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট উপলক্ষ। 'মফস্বলি বৃত্তান্ত', 'তিস্তাপারের বৃত্তান্ত', 'জীবনচরিতে প্রবেশ'।

এরপরে যখন নিজেই উপন্যাস লিখতে শুরু করে দিই, মাথায় প্রশ্ন আসে 'উপন্যাস আসলে কী?' সত্যি কথা বলতে কি উপন্যাস কী, এই প্রশ্নের উত্তর আমি এখনো পাইনি। এই জীবনে আর পাওয়া হয়ে উঠবে না। বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে শঙ্খ ঘোষের প্রবন্ধ কিংবা আবু সয়ীদ আইয়ুবের 'পথের শেষ কোথায়' কিংবা 'আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ' পড়ে তো আর উপন্যাস কী, এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে না। হাতের কাছে কতগুলো ইংরেজি বই আছে বটে, যেসবে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলো গ্রন্থিত হয়েছে, এবং সেগুলোর লিখনশৈলী নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যেমন 'মার্জিনে মন্তব্য: গল্পের কলকব্জা'য় সৈয়দ শামসুল হক আলোচনা করছেন লেখার আঙ্গিকগত দিক নিয়ে। সেসব তো সাধ্যমতো পড়ছি। মুগ্ধ হয়ে গেলাম হাসান আজিজুল হকের 'কথাসাহিত্যের কথকতা' পড়ে। ওই সময়ই হাতে এলো দেবেশ রায়ের উপন্যাস-আলোচনার বইগুলো। 'উপন্যাস নিয়ে', 'সময় সমকাল'। প্রায় একই সময় কলকাতা থেকে বেরোল আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'সংস্কৃতির ভাঙা সেতু'। হাসান আজিজুল হকের প্রবন্ধও পাচ্ছি, বইয়ে, লিটল ম্যাগাজিনে, পত্রিকায়। তখন একবার, সংবাদের সাহিত্য পাতায় সৈয়দ শামসুল হক এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটা বাহাস জমে উঠেছিল। স্মৃতি থেকে লিখছি, একটু অতিসরলীকরণের দোষও থাকছে আমার কথায়, তবু যত দূর মনে পড়ছে, ব্যাপারটা এ রকম ছিল: আখতারুজ্জামান ইলিয়াস মনে করেন, উপন্যাস এসেছে সামন্ততন্ত্রের অবসানের পর। ব্যক্তি মানুষ যখন ব্যক্তি হয়ে উঠছে, তখন। সৈয়দ শামসুল হক মনে করেন, ব্যক্তি চিরকালই ছিল।

আমরা, অতিতরুণ থেকে তখন তরুণ হয়ে উঠছি, সেসবই গোগ্রাসে গিলছি, উপভোগ করছি। বোঝার চেষ্টা করছি, উপন্যাস কী! গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সাক্ষাৎকার 'পেয়ারার সুবাস' বেরোল 'বিজ্ঞাপনপর্বে'। আমরা বুঁদ। মার্কেস বলেন, 'আমি চাই, বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে পরিণত হোক। এবং আজ হোক কাল হোক, তা হবেই।

দেবেশ রায় ও লেখক

কিন্তু অঙ্গীকারের সাহিত্য হিসেবে বা সামাজিক প্রতিবাদের উপন্যাস হিসেবে ল্যাটিন আমেরিকায় যা এসেছে, সে সম্পর্কে আমার কিছু দ্বিমত আছে। এর অন্যতম কারণ, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে এসব উপন্যাস যে সীমিত বক্তব্য পেশ করে, তা দ্বারা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল হয় না। সচেতনতা দূরের কথা বরং তাকে তা আরও মন্থর করে দেয়। আমার চরমপন্থী বন্ধুদের অনেকে মনে করেন যে কী লিখতে হবে না-হবে, তা নির্দেশ দিয়ে শেখানো উচিত। কিন্তু এতে করে সম্ভবত অবচেতনভাবে তারা সৃজনশীল রচনার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে নিজেরাই প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা পালন করেন। আমার বিশ্বাস, প্রেম-সম্পর্কিত উপন্যাসও যেকোনো উপন্যাসের সমমূল্য। তা-ই যদি হয় তো একজন লেখকের দায়িত্ব? বলতে পারেন বিপ্লবী দায়িত্ব হলো—ভালো লেখা।' (পেয়ারার সুবাস, ১৯৮৩, গার্সিয়া মার্কেস) মানবেন্দ্রর অনুবাদে মার্কেসের নোবেল পুরস্কার ভাষণ আমাদের চির-অনুপ্রাণিত করে রাখছে। সেই ভাষণের এই অংশগুলো মুখস্থ করে ফেলি: 'সমস্ত দমনপীড়ন, নির্যাতন, লুটতরাজ, আত্মবিক্রয় সত্ত্বেও আমাদের উত্তর হচ্ছে: জীবন। না বন্যা, না মহামারি, না বুভুক্ষা, না প্রলয়-ঝড়, এমন কী শতাব্দীর পর শতাব্দীজুড়ে চিরকাল-চলা যুদ্ধবিগ্রহও মৃত্যুর ওপর জীবনের নাছোড় প্রাধান্যকে হ্রাস করতে পারেনি। এ এমনই সুযোগ বা অধিকার যে তা ক্রমবৃদ্ধি পায়, দ্রুতহারে বাড়ে: প্রতিবছর সেখানে মৃত্যুর চাইতেও, বেশি হয় নবজন্ম— ৭৪,০০০,০০০-নবজীবনের এ এক পরিমাণ, যা নিউইয়র্কের জনসংখ্যাকে প্রতিবছর সাতগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাদের বেশির ভাগই জন্মায় এমন সব দেশে, যাদের বৃত্তসম্পদ খুবই কম, আর তাদের মধ্যে বলাই বাহুল্য, আছে লাতিন আমেরিকা। অন্যদিকে অধিকতর সমৃদ্ধ দেশগুলো যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করার ব্যাপারে এমনই লাভ করেছে যে তার এক শ গুণ লোককে তারা মুহূর্তে নির্মূল করে দিতে পারে, শুধু যে আজকের পৃথিবীর সব মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে তা-ই নয়, এ দুর্ভাগ্য গ্রহে এযাবৎ যত মানুষ জন্ম নিয়েছে, সাকুল্যে তাদের সকলকেই ধ্বংস করে দিতে পারে।...এই ভয়াল বাস্তবতার সামনে—সমস্ত মানুষীকালে যাকে মনে হয়েছিল নিছক কোনো কল্পলোক বলেই, আমরা যাঁরা কথা বানাই, কাহিনি গড়ি, আমরা তবু বিশ্বাস করি সবকিছু, বিশ্বাস করবার দাবি ও অনুভূতি রাখি যে, এখনো এক বিকল্প/বিরুদ্ধ রাজ্য গড়বার কাজে কল্পরাজ্য—জীবনেরই কল্পরাজ্য—যেখানে অন্যদের কাছে আর কেউ ঠিক করে দেবে না তার মৃত্যুর রূপ কী হবে, সেখানে সত্যিই ভালোবাসা হয়ে উঠবে নিশ্চয় আর সুখ হয়ে উঠবে সম্ভব। যেখানে যেসব দেশ এক শ বছরের নিঃসঙ্গতার দণ্ড পেয়েছে, শেষটায়, চিরকালের জন্য পাবে পৃথিবীতে এক দ্বিতীয় সুযোগ।'

দেবেশ রায়

কিন্তু উপন্যাস কী, এই অন্বেষায় দেবেশ রায়কে সামনে রাখতেই হয়। তিনি বলেছেন, 'উপন্যাস বলতে 'দোন কিহোতে', 'টম জোনস', 'স্কারলেট অ্যান্ড ব্ল্যাক', 'হিউম্যান কমেডি', 'ওআর এন্ড পিস', 'আনা কারেনিনা', 'ব্রাদার্স কারামোজভ', এদের দ্বারা নির্দিষ্ট আদর্শ বোঝায়। এ উপন্যাসগুলোতে সমসাময়িক রাজনীতি আর ব্যক্তিমানুষের নিয়তি যেমন ওতপ্রোত, আমাদের ভাষায় তেমন উপন্যাসের অভাব।' (উপন্যাসচিন্তা, সময় ও সমকাল)

দেবেশ রায়ের এ কথাটাও আমার মনে ধরে, 'সর্বত্রই লেখককে তত্ত্ব বাতলানোর অবিনয়, ঔচিত্যবিচারের ঔদ্ধত্য। যেন মানিকবাবু লিখতে পারেন—মাত্র এটুকুই তার জোর। তাই বলে কী লিখতে হবে ও কেন লিখতে হবে—সেটা তাঁর ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। এ বিপদ সমালোচকরা যতটা বাড়ান, প্রায় ততটাই বাড়ান সমকালীন দুর্বল লেখকরা।'

একই সময়ে পড়ছি মিলান কুন্ডেরা। 'দ্য আর্ট অব দ্য নভেল'। কুন্ডেরা বলছেন, 'উপন্যাস বাস্তবতাকে নিরীক্ষণ করে না, নিরীক্ষণ করে অস্তিত্বকে। আর যা ঘটেছে, তা-ই অস্তিত্ব নয়, অস্তিত্ব হচ্ছে মানব-সম্ভাবনার রাজত্ব, মানুষের পক্ষে যা কিছু হওয়া সম্ভব, যা কিছু করার জন্য সে যোগ্য, তার সব। মানুষের এটা ওটা সব সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করে ঔপন্যাসিক রচনা করেন অস্তিত্বের মানচিত্র। এবং আবারও স্মরণ করি, অস্তিত্ব মানে বিয়িং-ইন-দ্য-ওয়ার্ল্ড। এভাবে চরিত্র আর তার জগত দুটোকেই দেখতে হবে সম্ভাবনা হিসেবে।' (মিলান কুন্ডেরা, দ্য আর্ট অব দ্য নভেল)

দেবেশ রায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক আর মিলান কুন্ডেরার অবস্থান যে ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে, সেটাও হয়তো বুঝি। কিংবা বুঝি না। দুই বিপরীতকে মেলাতে চাই।

২০০২ সালে পাপড়ি রহমানের অনুরোধে 'ধূলিচিত্র' পত্রিকার জন্য লিখে ফেলি একটা প্রবন্ধ, 'উপন্যাস নিয়ে উপক্রমণিকা'। সেটাই ২০১১ কি ২০১২ সালে স্থান পায় আমার সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধের বই 'লেখা নিয়ে লেখা'য় (সময় প্রকাশনী)।

২০১২ সালে দেবেশ রায় লিট ফেস্টে যোগ দিতে আসেন ঢাকায়। তাঁকে আমি দুটো বই উপহার দিই। 'লেখা নিয়ে লেখা' (প্রবন্ধ) এবং 'না-মানুষি জমিন' (উপন্যাস)।

তিস্তাপারের বৃত্তান্ত

২০১২ সালে আমার সাংঘাতিক অসুখ হয়েছিল। প্রথম আট দিনে ৫ জন ডাক্তার মিলেও ধরতে পারেননি রোগটা কী। খুব জ্বর। পরে পাওয়া গেল প্যারাটাইফয়েড। একুশ দিন রোজ অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন নিতাম। ওই সময় কী ঘটেছিল, আমার মনে নাই। কে কে দেখা করতে গিয়েছিলেন তা-ও না। একদিন ভোরে ঠান্ডায় কাঁপতে লাগলাম। মেরিনা আমার ভাইবোনদের খবর দিলেন। তাঁদের মধ্যে চারজন ডাক্তার। তাঁরা এলেন। বাসায় সবাই কাঁদছেন। তাঁদের চোখের সামনে তাঁদের ভাই মারা যাচ্ছে। চারটা কম্বল চাপা দিয়ে খানিক পরে টেম্পারেচার ফিরে পেলাম। ওই রোগের সময় কলকাতা থেকে দেবেশ রায়ের একটা ই-মেইল পাই। তিনি বইয়ের প্রিন্টার্স লাইন থেকে ই-মেইল অ্যাড্রেস নিয়ে আমাকে মেইল করেছিলেন। আমি ওই অবস্থায় দেবেশ রায়ের মেইলের জবাবও দিয়েছি। কিন্তু আমাদের ওই মেইল চালাচালির কথাও আমি একদম ভুলে গিয়েছিলাম। ওই টাইফয়েডের সময়ে। তারপর ২০১৬ সালে দেবেশ রায়ের মেইলের কথা মনে পড়ল হঠাৎ। খুঁজে বের করে দেবেশদার মেইলটা পড়লাম:


ভাই আনিসুল

আপনার 'লেখা নিয়ে লেখা' বইটি পড়ে ফেলেছি। মনে হল এমন বই আরও আরও কেন লেখা হচ্ছে না? বলতে চাই, এমন লেখা আরও কেন লেখা হচ্ছে না? আমি দুই বাংলার কথাই বলছি। তাত্ত্বিকজনই সাহিত্যের একমাত্র আলোচক হলে নতুন তত্ত্ব তৈরি হয় না। নতুন তত্ত্ব আসে নতুন সৃষ্টি আত্মসাতের অনিবার্য দরকার থেকে। আপনি নিজে লেখক, কবি, পাঠক ও চিন্তক। আপনার লেখাতে আপনি তাই তত্ত্বের ব্যবহারিক পরীক্ষা করতে পেরেছেন। আমি সেই কারণেই আপনাকে তারিফ করছি। বাংলাদেশের সাহিত্য কোনো প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্য থেকেই মাত্র তৈরি হচ্ছে না। ঐতিহ্য ভেঙেও তৈরি হচ্ছে—যেমন ধরুন ইসলামি বাংলা ও মান্য বাংলার ঐতিহ্য ভাঙা। আবার ঐতিহ্য তৈরিও করতে হচ্ছে। শিল্পসাহিত্যে ঐতিহ্য কখনোই সম্পত্তি নয়, সব সময়ই গুপ্তধন। বাংলাদেশের সাহিত্যের এটাই নিদান। প্রবল উদ্দীপ্ত মুখর আলোচনা ছাড়া এ গুপ্তধন উদ্ধার হবে না। আপনাকে তাই শাবাশ। আমাদের সম্পর্কে যা লিখেছেন, সে নিয়ে দুটো-একটা কথা বলছি।

১। ইলিয়াস ও আমার 'রাজনৈতিক মতাদর্শ' এক কি না আমি জানি না। যদি হয়ও, তাহলেও-বা আমাদের নান্দনিক মত এক হওয়ার বাধ্যতা কোথায়? সন্দেহ হচ্ছে, আপনার এ বিষয়ে ধারণাটি পুরোনো। কোনো মতাদর্শ দিয়ে শিল্পসাহিত্যের বিচার শেষবিচার নয়। মার্ক্স যাকে বলেছিলেন 'লজ অব বিউটি', সেটাই শিল্পসাহিত্যের শেষ কথা।

২। 'উপন্যাসচিন্তা' আমার একেবারে প্রাথমিক লেখা। খানিকটা নোটের মতো। ৭৫ সাল নাগাদ টুকতে শুরু করি। ওই চিন্তাগুলি ছাঁকা হতে থাকে, এখনো হচ্ছে। ওটাকে বলতে পারেন আমার উপন্যাস লেখার চেষ্টার গেজরিডার। যদিও একজন ঔপন্যাসিকের উপন্যাস-ধারণার সঙ্গে তাঁর লেখা উপন্যাসের মিল না-ও ঘটতে পারে। কবিতায় তেমন হয় না। উপন্যাসে অনেক সময়ই হয়। কারণ, উপন্যাস এতটাই বাহিরের আধিপত্য যে প্রচলকে সম্পূর্ণ ঠেকাতে গেলে একটা গা-জোয়ারি ঘটে যায় (আভাঁ গার্দ)। তবে 'উপন্যাসচিন্তা' থেকে আমার এখনকার চিন্তা পর্যন্ত সংগতি আমার এখনো নভেল লেখাকে জোর দেয়।

৩। এই সুযোগে একটা সন-তারিখের সমস্যা আমার দিক থেকে মিটিয়ে দেওয়া উচিত মনে হচ্ছে, কারণ আপনি কথাটা সরাসরি তুলেছেন। আমি ও ইলিয়াস—কে আগে 'প্রবন্ধটা' লিখেছি? কোন প্রবন্ধ? অনুমান করি, বঙ্কিমচন্দ্র কেন হুতোম-আলাল নিব্বংশ করে শুরু করলেন। এ নিয়ে আমার পরিণততর চিন্তা তো আমি প্রকাশ করেছি। আপনি যদি সেটি জোগাড় করতে না পারেন, আমাকে জানাবেন। শামীম রেজার কাছে থাকতে পারে। এই কথাটি আমার আগে কেউ ভেবেছেন বলে আমার জানা নেই। আমি এই প্রশ্নটিতে পৌঁছাই ১৯৭৫ সাল নাগাদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আমন্ত্রিত বক্তৃতায়, আর সেই সূত্র ধরে যোগ্যতর ব্যক্তিরা বাংলা নভেলের আরম্ভ নিয়ে নতুন চিন্তা করছেন। যদি এমন হয় যে আমার সমকালে বা আগে ইলিয়াসের মনে কথাটা উঠেছিল, তাহলে আমার প্রশ্নের নিহিত উদ্দেশ্য আরও জোর পায় যে বাংলা উপন্যাসের কতকগুলি অনিষ্পন্ন প্রশ্নের উত্থাপন না ঘটিয়ে আমরা লিখতে পারব না। আমরা দুজনই তো লেখার দরকারেই ইতিহাসে গেছি।

 ব্যক্তি ধনতন্ত্রের আগে ছিল না মানলে ইতিহাস বাতিল হয়ে যাবে। রাম, বিভীষণ, মারীচ, শকুনি, কীচক, আলি, জুদাস, অয়দিপাউস, মেনেলিউস, চাঁদ, মীনচন্দ্র, গোরক্ষ—এঁরা ব্যক্তি নন?

৪। ইলিয়াস থেকে ও আরও অনেকের থেকেই আমার এই দূরত্ব যে আমি আদৌ মনে করি না যে ইয়োরোপে নভেল লেখা শুরুর কারণ অনিয়োরোপীয়দের বেলায় প্রযোজ্য। বা, নভেল একমাত্র ইয়োরোপীয় প্রভাবে বিভিন্ন ভাষায় লেখা হয়েছে। ব্যক্তির উত্থান সব দেশে ইয়োরোপ-সদৃশ নয়।

আপনার লেখায় আমি কতটা উদ্দীপিত হয়েছি, সেটা নিশ্চয়ই এত বড় চিঠি লিখে প্রমাণ করতে পেরেছি। ভালোবাসা—

দেবেশ রায়।

এবং আমি জবাবে লিখেছিলাম:


দেবেশদা,

বেয়াদবি নেবেন না, রোমান হরফে বাংলা লিখতে হয়েছে। পিডিএফ করতে হলে আমাকে প্রথম আলোর কোনো সহকর্মীর সাহায্য নিতে হতো। কিন্তু গত আট দিন ভয়াবহ জ্বরে শয্যাশায়ী। আজ একটু ভালো, তাই মেইল খুললাম…

আপনি কোনো দিন জানতে পারবেন না, এই একটা মেইল আমার জীবনে কত বড় চাবি বা দম দিয়ে দিল…আমি এখন চাবি দিয়ে দেওয়া খেলনার মতো ছুটতেই থাকব…

আমার ওই লেখাটাও আসলে পুরোনো আর একেবারেই হঠাৎ করে অর্ডার পাওয়া বলে লেখা…আপনার মত যে বদলায়, সে খবর আমি একটু একটু পাই…আমার মত তো লিখতে লিখতে দাঁড়ায়…

হ্যাঁ, এখন আমি খুব বিশ্বাস করি যে মানুষ যন্ত্র না, ৯৯ ডিগ্রি থেকে তাপপাত্রা ১০০ ডিগ্রিতে গেলে গুণগত পরিবর্তন হয়, কিন্তু মানুষের সমাজে, তার মনের গভীরে কী যে একটা হয়, যা সরল অঙ্ক মেনে চলে না…কাজেই পুঁজিবাদের আগেও ব্যক্তিমানুষ ছিল…তার মন ছিল…মানুষের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে, যে ফর্মেই থাকুক না কেন একটা সমাজ বা রাষ্ট্রের সাথে তার সম্পর্ক ছিল…

উপন্যাস মাধ্যমটির সঙ্গে ছাপাখানার আবিষ্কারের সম্পর্ক আছে…

তার আগে তো মহাকাব্য বা মঙ্গলকাব্য ইত্যাদি ছিলই…

স্যরি দাদা, কাকে কী বলছি…আমি একদম পণ্ডিত না…আমি একেবারেই লিখে খাওয়া মানুষ…আমার যে অসুখ, ঢাকার ৫টা বেস্ট হসপিটাল থেকে ৫ জন ডাক্তার দেখিয়ে একপালা টেস্ট করলাম…কোনো রোগ নাই…জ্বর কমে না…ভাইরাস…ভালো হবে, এই হলো ডাক্তারদের বক্তব্য…

কিন্তু আমার সেরা দাওয়াই হলো লেখা…আমি যখন লিখি, তখন আমি ভালো থাকি…

আপনার করকমলে দুচরণ আরজ নিবেদন করছি, আসলে আমি যাতে সুস্থ হয়ে উঠি…এটা আমার চিকিৎসার অংশ…

বলেছি আমার বাড়ি রংপুর…আপনার সংলাপের ভাষাই হোক, চরিত্রের নাম হোক—আমার খুব চেনা, যেমন ওই দারিদ্র্য।

কিন্তু আপনার বহু উক্তি আমি প্রায় ধ্রুব বলে মানি…সময় ও সমকাল ছাড়া কথাসাহিত্য বাঁচে না…কবিতা হয়তো মহাকালের উদ্দেশে নিবেদিত হতে পারে…

আমার 'না-মানুষি জমিন' বইটা কি কলকাতা পর্যন্ত নিতে পেরেছেন? না হলে বলবেন, আরেকবার পাঠাব…খুব কলকাতা যাওয়া হচ্ছে ইদানীং…এবারের অসুখটা কলকাতা থেকেই এনেছি…হা হা হা

আবার যাব…কলকাতা বইমেলায়…

আনিসুল হক


তিনি আবার লেখেন:


আনিস ভাই,


আপনার জবাব পেয়ে খুব আশ্বস্ত হলাম। অসুখ সারিয়ে ফেলুন তো। আমি এখনো দিল্লিতে। আমার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য। হ্যাঁ, 'না-মানুষি জমিন' তো আপনি আমাকে দিয়েছেন, আমি নিয়েছি এবং পড়ব। আপনার আরও লেখা পড়লাম ওই বইতেই (লেখা নিয়ে লেখা)। ও আরও ভালো লাগল। নভেল আলোচনায় আপনার মতামত খুব ভেতর থেকে আসছে। কবিতা আলোচনাতেও। কবিতায় যেমন ছন্দ উপমা নিয়ে কথা বলেন, গল্প আলোচনাতেও ক্রাফট নিয়ে কথা তুলুন। শহীদুল জহিরের আলোচনাটা আপনি এনেছেন। শহীদুলকে নিয়ে আরও বড় করে আলোচনা হওয়া দরকার। ওর মৃত্যু আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে। শাহীন আখতারের 'রঙ্গমালা (সখী রঙ্গমালা)' ও সালমা বাণীর 'গোলাপী মঞ্জিল' নিয়ে তোলপাড় কথা হচ্ছে না কেন? আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের গল্প-উপন্যাস বিশ্বগ্রাহ্য সাহিত্য সৃষ্টি করবে। আপনার মতো যারা একই সঙ্গে তাত্ত্বিক ও লেখক, তারাই পারেন একটা ক্রিয়েটিভ এমবিয়েন্স তৈরি করে তুলতে। আপনি আমার শুভেচ্ছা নেবেন ও কলকাতা এলেই জানাবেন, আমার বাড়িতে আসবেন ও সারা দিন আড্ডা দেবেন।

দেবেশদা।

পশ্চিমবঙ্গের কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। কলকাতা যাওয়া হলে, মেরিনার সঙ্গে বেশ কয়েকবার গেছি, সদর স্ট্রিটে থাকি, পার্ক স্ট্রিটে যাই, যাই অক্সফোর্ডে বইয়ের দোকানে, নিজের উদ্যোগে জোড়াসাঁকো কিংবা কফি হাউস দেখতে যাই, কিন্তু কলকাতার কোনো লেখককে ফোনও করি না, কোনো পত্রিকা অফিসেও যাই না। কয়েকবার গেছি ওদের দাওয়াতে, 'টাইমস অব ইন্ডিয়া' দুবার নিয়েছিল দুটো উৎসবে, একবার আমি আর সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যার গেলাম, আরেকবার আমি, সেলিনা হোসেন আপা, ফারাহ গজনবী, জয়া আহসান গেলাম 'টাইমস অব ইন্ডিয়া'র লিট ফেস্টে। একবার কলকাতা বইমেলা ঘিরে একটা ইন্টারন্যাশনাল লিট ফেস্ট হয়, সেটাতেও আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম, বাংলাদেশ থেকে আর গিয়েছিলেন কবি বেলাল চৌধুরী (ভাই)। পাশাপাশি কলকাতা বইমেলা হচ্ছিল, বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নের উদ্যোগেও বেশ কজন লেখককে ঢাকা থেকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সমরেশ মজুমদারদারদার সঙ্গে কিছুটা খাতির হয়েছে, সে বহু বছর আগে নিউইয়র্কের বইমেলায় যেবার আমাকে উদ্বোধক করে নেওয়া হলো, সমরেশদা অতিথি ছিলেন, সেবার থেকে। কবি জয় গোস্বামীর সঙ্গে খুব সামান্য পরিচয় আছে, তিনিও বাংলাদেশে এসেছিলেন, আমিও কলকাতা লিট ফেস্টে গিয়ে আমাদের ছোট ভাই কূটনীতিক কবি মাহবুব সালেহ (তুহিন)-এর কাব্যগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে জয় গোস্বামীর সঙ্গে আহূত হয়েছিলাম।

বিস্ময়করভাবে আমার খাতির হয়ে গেল দেবেশ রায়ের সঙ্গে।
দেবেশ রায় আমার 'না-মানুষি জমিন'-এর রিভিউ লেখেন।
কলকাতা লিট ফেস্টে আমাকে দেখেই তিনি সহাস্যে হাত বাড়িয়ে দেন। তখনই বলেছিলেন, 'তোমার বইয়ের আলোচনা লিখেছি, একটা প্রবন্ধ সংকলনে আছে, সেটা এখনো বের হয়নি, বের হচ্ছে।'

তিনি গত বছর ২০১৯-এ ঢাকায় আসেন। সালমা বাণীর ফোন পাই, 'দেবেশদা আপনাকে খুঁজছেন।' আমি যাই। তিনি গেঞ্জি পরে আসেন। আমাকে জড়িয়ে ধরেন। আমি এই ভালোবাসাটার কোনো কারণও পাই না, মানেও পাই না। আমার মনে আছে, একবার ঢাকা থিয়েটার তাঁকে এনেছিল, একটা সেমিনারে তাঁকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, তাঁর লেকচারের পরে, আমার প্রশ্নটা ছিল এ-রকম, দাদা, আপনি বলছেন, যেই মেয়েটি গ্রামের পথ ধরে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে, তার কথা লিখতে হবে, এই কোকাকোলা, করপোরেট কালচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে, কিন্তু আমাদের পক্ষে ব্যাপারটার মধ্যে বিপুল স্ববিরোধিতা আছে, আমি নিজে করপোরেটে চাকরি করি, ওই পেপসি-কোকাকোলা আমার বেতন জোগায়, আবার আমি লিখি 'নাল পিরান' কিংবা 'নিধুয়া পাথার'; এই উভয়-সংকটের সমাধান কী? আমাদের লিট ফেস্টগুলোর স্পন্সর করে এই করপোরেটরা, আপনাকে-আমাকে স্পন্সর করে নিয়ে আসে এরা, ভালো হোটেলে রাখে, ভালো খাওয়ায়...আমার মনে আছে নাটকের কর্মীদের একজন-দুজন আমার ওপরে বেশ বিরক্ত হয়েছিলেন।

দেবেশ রায় শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার আদর্শ থেকে সরেননি। ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বই, 'ব্যক্তিগত ও গোপন ফ্যাসিবাদ নিয়ে একটি বই।' বইটার মলাটেই ৮টা অনুচ্ছেদ। ৪ নম্বর অনুচ্ছেদটা হলো: 'যে ভাষায় লিঙ্গের ডাকনাম কত জানা নেই, সে ভাষা ফ্যাসিস্ট হয়ে যেতে পারে—শুদ্ধতা-সৌন্দর্য-ব্যাকরণ-মান্যতা ভাষাকে শাস্ত্র করে তোলে—শাস্ত্র মাত্রই ফ্যাসিস্ট।'

৫ নম্বরে তিনি বলছেন, 'ভাষার ভেতরেই থাকে ফ্যাসিবাদের অ্যান্টিবডি—ভাষারই ভেতরে থাকে ফ্যাসিস্ট ভাইরাসের অবিনাশী বাঁচা—পর্নোগ্রাফি এ মুখের ভাষার ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগঠন।'
এই বইয়ের মলাট ওলটালেই লেখা শুরু হয়, কোনো পুস্তানি নেই। প্রিন্টার্স লাইন শেষের পাতায়।

এই বইয়ে তিনি লিখেছেন, 'তখন আমাদের অন্য একটা ভাষার দরকার হয়ে পড়ে, বাংলায়, যা দেখতে শুনতে অ-শিষ্ট। অ-শিষ্ট শব্দটিকে উল্টো করে ব্যবহার করেছি শিষ্ট সমাজে যা চলে না।'

একদিন তিনি আমাকে বললেন, 'বেশি করে লেখো। কলকাতায় এখন তো ফ্ল্যাটবাড়ির কাহিনি নিয়ে উপন্যাস লেখা শুরু হয়ে গেছে।' আমি কিছু বললাম না। ফ্ল্যাটবাড়ির মানুষদের নিয়ে, শুধু মানুষই-বা কেন, বিড়াল, তেলাপোকা, টিকটিকি, কুকুর, ছাদের কাক, সানশেডের অবাধ্য বেয়াড়া বটগাছটিকে নিয়ে কেন উপন্যাস লেখা যাবে না?
আমার আর দেবেশ রায়ের সাহিত্যাদর্শ এক নয়। কিন্তু ভেতরে তো আমাদের অভিন্ন চাওয়া। মানুষের কল্যাণ। একটা মানবিক সমাজ। একটা মানবিক পৃথিবী। যে সিস্টেমে পৃথিবীটা চলছে, এটা চলবার নয়, কেরোনাভাইরাস এসে তা দেখিয়ে দিয়েছে।

মফস্বলি বৃত্তান্ত

মিল্টন প্যাকার নামে একজন আমেরিকান চিকিৎসকের একটা লেখা তানজিনা হোসেন অনুবাদ করেছেন, প্রথম আলো অনলাইনেই প্রকাশিত হয়েছে। মিল্টন প্যাকার বলছেন, 'মাত্র ছয় মাস আগেও আমাদের মধ্যে অনেকেরই মনে হতো পৃথিবীটা অমানবিক, অসহ্য আর বৈষম্যে ভরা। অথচ আজ সেই আমরাই অস্থির হয়ে ভাবছি, আবার কবে সব স্বাভাবিক হবে? “স্বাভাবিক” শব্দটা বেশ গোলমেলে। “স্বাভাবিক”–এ ফেরা মানে আগের নিয়মে ফিরে যাওয়া। সত্যি কি তাই সম্ভব?...
'আমরা ফিরে যেতে চাই না আর। আমরা এক নতুন পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চাই। এই ক্রাইসিস আমাদের কোভিড–পূর্ববর্তী ভুলগুলো শোধরানোর সুযোগ এনে দিয়েছে। কোনটা ঠিক আর কোনটা অন্যায়, তা বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। তাই আবার কবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাব, সে চিন্তা বাদ দেওয়াই ভালো। সময়ই বলে দেবে স্বাভাবিকতার রূপ কী।' (মিল্টন প্যাকার, আবার সব স্বাভাবিক হবে?
প্রথম আলো ডট কম, ১৫ মে ২০২০, অনুবাদ: তানজিনা হোসেন)

আমরা এই অন্যায্য পৃথিবী চাই না। একে বদলানো দরকার নয়, শুধু তা-ই নয়, এর পরিবর্তন অপরিহার্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেবেশ রায় এই পরিবর্তনের জন্য মরিয়া মানুষ ছিলেন।

দেবেশ রায় আমাকে পছন্দ করতেন। তিনি কলকাতা থেকে আমাকে ফোন করতেন। আমিও করতাম। শেষের দিকে কানে কম শুনতেন বলে আর ফোন করা হতো না।

ভালোবাসা এমন একটা জিনিস, যা লুকিয়ে রাখা যায় না। গোপনে প্রেম রয় না ঘরে, আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ে। আমিও দেবেশ রায়কে আগে থেকেই শ্রদ্ধা করতাম, পড়তাম, পরে ভালোবাসতাম। দেবেশ রায় আমার শ্রদ্ধেয় লেখক, ভালো লাগার লেখক এবং ভালোবাসার মানুষ।

এখন তিনিও চলে গেলেন। আনিসুজ্জামান স্যার চলে যাওয়ার কঘণ্টা পরেই দেবেশ রায়ের প্রয়াণ।

কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতার লাইনটাই খুব মনে পড়ছে—'ভালোবেসে যাকে ছুঁই, সেই যায় দীর্ঘ পরবাসে।'