
অতীতকে পাঠ করার নানা উপায় আছে। কখনো তারিখ, দলিল, স্মৃতিচারণা বা বিবরণীর মধ্য দিয়ে; আবার কখনো এমন কিছু মুহূর্তের মুখোমুখি আমরা হই, যার সমস্ত ভার, আবেগ ও বাস্তবতা সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীরভাবে ধারণ করে একটিমাত্র আলোকচিত্র। সময়ের সীমানা অতিক্রম করে টিকে থাকা এসব ছবির পেছনে লুকিয়ে থাকে বহুস্তর গল্প। এই ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্বে আমরা তুলে ধরব তেমনই কোনো বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্রের অন্তরঙ্গ ইতিহাস।
কখনো কখনো ইতিহাস নিজের সবচেয়ে নির্ভুল ভাষা খুঁজে পায় ছবিতে, শব্দে নয়। একটি আলোকচিত্র এমন সব সত্যকে ধারণ করে, যা বহু পৃষ্ঠার ইতিহাসও সব সময় প্রকাশ করতে পারে না। একটি মুহূর্ত, একটি দৃষ্টি, একটি মুখের অভিব্যক্তি কিংবা উঁচিয়ে ধরা একটি হাত—এসবই কখনো হয়ে ওঠে একটি যুগের সংক্ষিপ্ততম অথচ সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল। ইরানি আলোকচিত্রী হেঙ্গামেহ গোলেস্তানের আলোকচিত্রগুচ্ছ ‘উইটনেস ৭৯’ সেই বিরল দলিলগুলোর একটি, যা কেবল কয়েকটি প্রতিবাদ-সমাবেশের ছবি নয়; বরং আধুনিক ইরানের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এমন এক সন্ধিক্ষণকে ধারণ করে, যখন রাষ্ট্র, বিপ্লব এবং নারীর স্বাধীনতা—এই তিনটি শক্তি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়।
গোলেস্তানের ক্যামেরা কোনো বিজয়োল্লাসের মুহূর্তকে ধারণ করেনি; আবার কেবল পরাজয়ের ইতিহাসও লেখেনি। তিনি ধারণ করেছেন সেই উত্তাল মধ্যবর্তী সময়কে, যখন ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত, কিন্তু মানুষ জানে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আগামী দিনের ইতিহাস হয়ে থাকবে।
ছবিটির দিকে প্রথম তাকালেই চোখে পড়ে মানুষের এক অখণ্ড স্রোত। তেহরানের রাজপথে, অবিরাম ঝরে পড়া তুষারের নিচে, অসংখ্য নারী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের উপস্থিতি এত ঘন, এত নিবিড় যে ফ্রেমের কোথাও কোনো শূন্যতা নেই। বরং মনে হয়, ক্যামেরা কেবল এই সমাবেশের একটি ক্ষুদ্র অংশকে ধারণ করতে পেরেছে; মানুষের ঢল আরও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।
প্রতিবাদকারীদের দাবি ছিল খুবই স্পষ্ট—কেউ হিজাব পরবেন কি পরবেন না, সেই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র নেবে না; সিদ্ধান্ত নেবেন নারী নিজেই। পোশাককে ধর্মীয় আনুগত্যের মাপকাঠি বানানোর বিরুদ্ধেই তাঁরা কণ্ঠ তুলেছিলেন। এই আন্দোলন ছিল কেবল পোশাকের স্বাধীনতার জন্য নয়; এটি ছিল মানুষের শরীরের ওপর মানুষের নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। হেঙ্গামেহ গোলেস্তান এই আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। তিনি দূর থেকে ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করেননি; বরং মানুষের ভেতরে দাঁড়িয়ে তাঁদের মুখ, কণ্ঠ, ভঙ্গি এবং সংকল্পকে ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন।
ফ্রেমের ওপরের অংশজুড়ে খোলা ছাতাগুলোর এক অনন্য বিন্যাস চোখে পড়ে। কোথাও জ্যামিতিক নকশা, কোথাও ফুলের অলংকরণ, কোথাও আবার সরল একরঙা কাপড়। বিচিত্র এই ছাতাগুলো মিলে যেন প্রতিবাদী মানুষের মাথার ওপর একটি সামষ্টিক ছাউনি গড়ে তুলেছে। তারা কেবল তুষারের আঘাত থেকে আশ্রয় দিচ্ছে না; বরং ছবির ভিজ্যুয়াল গঠনে সৃষ্টি করছে এক পুনরাবৃত্ত ছন্দ, যা পুরো কম্পোজিশনকে একধরনের সংগীতময় গতি দিয়েছে।
ছাতার ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা নারীদের শরীরী ভাষাই ছবির প্রকৃত কেন্দ্র। অনেকের হাত মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় আকাশের দিকে উঁচিয়ে আছে। পৃথিবীর প্রায় সব গণ–আন্দোলনে এই ভঙ্গি প্রতিবাদের একটি সর্বজনীন প্রতীক। কোথাও মুখ খোলা। মনে হয়, তাঁরা স্লোগান দিচ্ছেন। কোথাও ঠোঁট শক্তভাবে চেপে ধরা। আবার কারও চোখ স্থির হয়ে আছে সামনের দিকে, যেন তিনি নিজের ভেতরেই কোনো দৃঢ় সিদ্ধান্ত বহন করছেন। প্রতিটি মুখ যেন আলাদা একটি গল্প, কিন্তু সব গল্প মিলেমিশে হয়ে উঠেছে এক সামষ্টিক উচ্চারণ।
পোশাকের দিকে তাকালেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে সময়ের পরিচয়। নারীদের পরনে সত্তরের দশকের শেষভাগের শহুরে ইরানের শীতকালীন পোশাক। দীর্ঘ কোট, মোটা উলের সোয়েটার, স্কার্ফ, কলারওয়ালা শার্ট, হাতে চামড়ার দস্তানা। এগুলো শুধু পোশাক নয়; এগুলো এক সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দলিল। এগুলো জানিয়ে দেয়, এই নারীরা এমন এক নগর-ইরানের প্রতিনিধি, যে সমাজ আধুনিক শিক্ষা, নাগরিক জীবন এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণার সঙ্গে পরিচিত।
কিন্তু ছবির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যটি অন্যত্র। সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা নারীদের কারও মাথায় ইরানের ঐতিহ্যগত চাদর নেই, নেই কোনো ধর্মীয় আবরণ। তারা হিজাব করছে না, তাদের চুল খোলা। চুলের ওপর নীরবে জমে আছে সাদা তুষারের স্তর। প্রথম দর্শনে এটি নিছক একটি প্রাকৃতিক দৃশ্য মনে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাস জানে, এই অনাবৃত চুলই কয়েক দিনের মধ্যে একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠোর রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হবে। ফলে ছবিতে তুষার কেবল ঋতুর পরিচয় বহন করে না; তা হয়ে ওঠে আসন্ন রাজনৈতিক ঝড়েরও নীরব পূর্বাভাস।
ছবির ফোরগ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে থাকা পাতাবিহীন বৃক্ষশাখাগুলো ছবির আবহকে আরও গভীর করে তোলে। শীতের নগ্ন ডালপালা যেন সময়ের অনিশ্চয়তার প্রতীক। জানা যায়, ছবিগুলো তোলা হয়েছিল তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন জনপথে। যে এলাকা বহু দশক ধরে ইরানের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ফলে ছবির স্থানও কেবল একটি ভৌগোলিক অবস্থান নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ভূগোল।
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতনের মধ্য দিয়ে ইরানে দীর্ঘ রাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটে। বিপ্লবের বিজয় অনেকের কাছে ছিল গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায় এবং রাজনৈতিক মুক্তির নতুন সম্ভাবনা। শাহবিরোধী আন্দোলনে সমাজের প্রায় সব শ্রেণি ও মতাদর্শের মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। ধর্মীয় নেতৃত্ব, বামপন্থী সংগঠন, জাতীয়তাবাদী শক্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী এবং বিপুলসংখ্যক নারী কেউ বিরত থাকেননি। তাঁদের প্রত্যেকের কল্পনায় ভবিষ্যৎ ইরানের রূপ এক ছিল না, কিন্তু শাহের স্বৈরশাসনের অবসানই ছিল তাঁদের অভিন্ন লক্ষ্য।
কিন্তু বিপ্লবের আনন্দ খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি।
১৯৭৯ সালের ৭ মার্চ আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ঘোষণা দেন, সরকারি দপ্তরে কর্মরত নারীদের ইসলামি হিজাব পরিধান করতে হবে এবং জনপরিসরেও নারীদের পোশাক ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী হওয়া উচিত। ঘোষণাটি ছিল সংক্ষিপ্ত; কিন্তু এর রাজনৈতিক অভিঘাত ছিল সুদূরপ্রসারী। অসংখ্য নারী উপলব্ধি করেন, যে বিপ্লবকে তাঁরা স্বাধীনতার স্বপ্ন বলে বিশ্বাস করেছিলেন, সেই বিপ্লবই হয়তো তাঁদের ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে যাচ্ছে।
ঘোষণার পরদিন, আন্তর্জাতিক নারী দিবস, ৮ মার্চ। তেহরানের রাস্তায় নেমে আসেন হাজার হাজার নারী। সেই সমাবেশ পরদিন আরও বড় হয়, তারপর আরও বড়। ৮ থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন ধরে তেহরানের রাজপথ পরিণত হয় নারীর স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে এক বিরল গণ–আন্দোলনের মঞ্চে। ইতিহাসবিদদের মতে, এই আন্দোলনে এক লাখের বেশি নারী অংশ নেন। তাঁদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন বহু পুরুষ, শিক্ষক, ছাত্র, শিল্পী, লেখক এবং মানবাধিকারকর্মী।
প্রতিবাদকারীদের দাবি ছিল খুবই স্পষ্ট—কেউ হিজাব পরবেন কি পরবেন না, সেই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্র নেবে না; সিদ্ধান্ত নেবেন নারী নিজেই। পোশাককে ধর্মীয় আনুগত্যের মাপকাঠি বানানোর বিরুদ্ধেই তাঁরা কণ্ঠ তুলেছিলেন। এই আন্দোলন ছিল কেবল পোশাকের স্বাধীনতার জন্য নয়; এটি ছিল মানুষের শরীরের ওপর মানুষের নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
হেঙ্গামেহ গোলেস্তান এই আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। তিনি দূর থেকে ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করেননি; বরং মানুষের ভেতরে দাঁড়িয়ে তাঁদের মুখ, কণ্ঠ, ভঙ্গি এবং সংকল্পকে ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন। তাঁর ছবিগুলো তাই সংবাদচিত্রের সীমা অতিক্রম করে ইতিহাসের প্রাথমিক উৎসে পরিণত হয়েছে।
গোলেস্তানের ছবিতে নারীরা কারও দয়ার অপেক্ষায় নেই। তাঁরা উদ্ধার হওয়ার অপেক্ষায়ও নেই। তাঁরা নিজেরাই নিজেদের ইতিহাস লিখছেন। তাঁদের মুখে প্রতিবাদের স্লোগান, তাঁদের চোখে দৃঢ়তা, তাঁদের শরীরের ভঙ্গিতে আত্মমর্যাদার প্রকাশ। তাঁরা কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াননি; তাঁরা সেই আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের নারীকে চিরকাল নিষ্ক্রিয় হিসেবে কল্পনা করতে অভ্যস্ত। এই জায়গাতেই গোলেস্তানের ক্যামেরা গুরুত্বপূর্ণ।
আজ এই আলোকচিত্রগুলোর দিকে ফিরে তাকালে আমরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য বুঝতে পারি। পরবর্তী কয়েক দশকে যে রাষ্ট্রীয় ইতিহাস নির্মিত হয়েছে, সেখানে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবকে প্রায়ই একক ইসলামপন্থী জন–অভ্যুত্থান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু গোলেস্তানের ছবিগুলো আমাদের অন্য কথা বলে। এগুলো আমাদের দেখায়, সেই বিপ্লবের ভেতরেই ছিল বহুস্বর, ছিল মতের বৈচিত্র্য, ছিল ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের স্বপ্ন, ছিল নারীর স্বাধীনতার দাবি এবং ছিল এমন এক নাগরিক সমাজ, যারা নতুন রাষ্ট্রকেও প্রশ্ন করতে দ্বিধা করেনি।
যে কারণে ‘উইটনেস ৭৯’ কেবল অতীতের ছবি নয়। এটি রাষ্ট্রীয় স্মৃতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি স্মৃতি; সরকারি ইতিহাসের পাশাপাশি টিকে থাকা আরেকটি ইতিহাস। সেই ইতিহাস, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কোনো বিপ্লবই একরঙা নয়, কোনো জনতার কণ্ঠই একমাত্রিক নয়, আর স্বাধীনতার প্রশ্ন কখনো কেবল ক্ষমতা বদলের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীর, পরিচয় এবং মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
প্রতিটি রাজনৈতিক বিপ্লবেরই একটি দৃশ্যমান ভাষা থাকে। কোথাও তা পতাকায়, কোথাও স্লোগানে, কোথাও অস্ত্রে। কিন্তু এমনও কিছু সময় আসে, যখন রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে মানুষের নিজের শরীর। ‘উইটনেস ৭৯’ সেই বিরল মুহূর্তগুলোর দলিল, যেখানে রাষ্ট্র এবং নাগরিকের সংঘাত কোনো সংসদে নয়, কোনো যুদ্ধক্ষেত্রেও নয়, সংঘটিত হয়েছে একজন নারীর মাথা, চুল এবং পোশাক ঘিরে।
আয়াতুল্লাহ খোমেনির ঘোষণার মধ্য দিয়ে নবগঠিত ইসলামি প্রজাতন্ত্র একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা নির্মাণ করতে চেয়েছিল। সেই বাস্তবতায় নারীর শরীর আর কেবল ব্যক্তিগত সত্তা নয়, তা রাষ্ট্রীয় মতাদর্শের দৃশ্যমান প্রতীক। ক্ষমতা বুঝেছিল, বিপ্লব-পরবর্তী সমাজে নতুন রাষ্ট্রের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে হলে জনপরিসরকে বদলাতে হবে, আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান উপায় হলো নারীর পোশাককে নিয়ন্ত্রণ করা। ফলে বাধ্যতামূলক হিজাব কেবল ধর্মীয় বিধান ছিল না; এটি ছিল ক্ষমতার একটি রাজনৈতিক ভাষা।
হেঙ্গামেহ গোলেস্তানের ছবিগুলো সেই ভাষার বিপরীতে আরেকটি ভাষা নির্মাণ করে। খোলা চুলে দাঁড়িয়ে থাকা নারীরা রাষ্ট্রকে সরাসরি বলছিলেন—আমাদের শরীরের মালিকানা রাষ্ট্রের নয়। তাঁদের শরীর হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের মঞ্চ, আর অনাবৃত চুল হয়ে উঠেছিল নাগরিক স্বাধীনতার দৃশ্যমান প্রতীক।
এই ছবিগুলোর সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দিক হলো এর বহুত্ব। এখানে কেবল একধরনের নারী নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আছেন, আছেন শিক্ষক, সরকারি কর্মচারী, লেখক, শিল্পী, শ্রমজীবী নারী। এমনকি এমন ধর্মবিশ্বাসী নারীরাও আছেন, যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে হিজাব করতেন, কিন্তু রাষ্ট্রের জোরপূর্বক পোশাক নির্ধারণের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, ধর্ম যদি বিশ্বাসের বিষয় হয়, তবে সেটি কখনোই রাষ্ট্রীয় নির্দেশে আরোপিত হতে পারে না।
এই বহুত্ব আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সত্য শেখায়। আন্দোলনটি ছিল না ‘হিজাব বনাম হিজাববিরোধিতা’র সরল দ্বন্দ্ব। এটি ছিল পছন্দের স্বাধীনতা বনাম রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা—এই দুই ধারণার সংঘর্ষ।
গোলেস্তানের ক্যামেরা আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। ছবির ভেতরে কোথাও রাষ্ট্র নেই। নেই কোনো পুলিশ, নেই বিপ্লবী গার্ড, নেই সরকারপন্থী মিলিশিয়া। অথচ ইতিহাস জানায়, এই নারীদের ঘিরে ছিল ভয়াবহ উত্তেজনা। চারপাশে উপস্থিত ছিল সশস্ত্র উগ্রপন্থী দল, যারা হুমকি, গালাগালি, এমনকি শারীরিক আক্রমণের মাধ্যমেও আন্দোলন ভাঙার চেষ্টা করেছিল।
কিন্তু আলোকচিত্রী তাঁর ফ্রেমে সেসব উপস্থিতি আনেননি।
এই অনুপস্থিতিও একটি রাজনৈতিক বক্তব্য। কারণ গোলেস্তান চাননি, রাষ্ট্র আবারও ছবির কেন্দ্র দখল করে নিক। তিনি ক্ষমতার মুখ নয়, মানুষের মুখকে ইতিহাসের কেন্দ্রে বসিয়েছেন। তাঁর ছবিতে রাষ্ট্র অনুপস্থিত, কিন্তু রাষ্ট্রের চাপ সর্বত্র অনুভব করা যায়। এ এক অভিনব রাজনৈতিক নির্মাণ। যেখানে নিপীড়ককে দেখানো হয়নি অথচ নিপীড়নের বাস্তবতা গভীরভাবে উপস্থিত।
মধ্যপ্রাচ্যের নারীকে ঘিরে বিশ্বমাধ্যমের দীর্ঘদিনের একটি পরিচিত বয়ান রয়েছে। সেখানে তাঁরা প্রায়ই এমন মানুষ হিসেবে হাজির হন, যাঁদের কোনো কণ্ঠ নেই, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই; যাঁদের জীবন অন্যরা নির্ধারণ করে দেয়। পশ্চিমা প্রাচ্যবাদী কল্পনায় এই নারী প্রায়ই করুণার পাত্র হয়। যেন তিনি নিজের ইতিহাসের নায়ক নন; বরং অন্য কারও গল্পের একটি চরিত্রমাত্র।
‘উইটনেস ৭৯’ সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে ভেঙে দেয়।
গোলেস্তানের ছবিতে নারীরা কারও দয়ার অপেক্ষায় নেই। তাঁরা উদ্ধার হওয়ার অপেক্ষায়ও নেই। তাঁরা নিজেরাই নিজেদের ইতিহাস লিখছেন। তাঁদের মুখে প্রতিবাদের স্লোগান, তাঁদের চোখে দৃঢ়তা, তাঁদের শরীরের ভঙ্গিতে আত্মমর্যাদার প্রকাশ। তাঁরা কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াননি; তাঁরা সেই আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়েছেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের নারীকে চিরকাল নিষ্ক্রিয় হিসেবে কল্পনা করতে অভ্যস্ত।
এই জায়গাতেই গোলেস্তানের ক্যামেরা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁদের দিকে ওপর থেকে তাকান না। করুণার দৃষ্টিতেও তাকান না। আবার বিপ্লবী রোমান্টিকতার অতিনাটকীয় ভঙ্গিও গ্রহণ করেন না। তিনি তাঁদের সমান উচ্চতায় দাঁড়িয়ে দেখেন। ফলে দর্শকও বাধ্য হন তাঁদের সমান হিসেবে দেখতে।
বার্তের মতে, প্রতিটি মহান আলোকচিত্রে এমন একটি ক্ষুদ্র উপাদান থাকে, যা দর্শককে হঠাৎ ব্যক্তিগতভাবে স্পর্শ করে। তিনি একে বলেছেন পাংকটাম, যে ক্ষুদ্র দৃশ্য আমাদের হৃদয়ে গিয়ে বিঁধে। ‘উইটনেস ৭৯’-এ সেই পাংকটাম কোথায়? সম্ভবত খোলা চুলের ওপর নীরবে জমে থাকা তুষারের স্তরে। সেই তুষার কেবল শীতের চিহ্ন নয়। সেখানে জমে আছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, এক অনিবার্য ঝুঁকি এবং স্বাধীনতা হারানোর আশঙ্কা। দর্শক যখন জানেন, এই ছবির কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছরের মধ্যেই তাদের চুল আইন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হবে, তখন তুষারের প্রতিটি কণা যেন হারিয়ে যেতে থাকা এক স্বাধীন সময়ের শেষ স্মৃতিতে পরিণত হবে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মার্চ ১৯৭৯-এর সেই বিক্ষোভ নিরাপদ ছিল না। আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে ছুরি দেখানো হয়েছিল, অ্যাসিড নিক্ষেপের হুমকি দেওয়া হয়েছিল, প্রকাশ্যে অশ্রাব্য গালাগাল করা হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই ভয়াবহ সহিংসতার খুব সামান্য অংশই গোলেস্তানের ছবিতে দেখা যায়। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি সচেতন নান্দনিক ও নৈতিক সিদ্ধান্ত।
তিনি জানতেন, যদি কেবল সহিংসতার দৃশ্য তুলে ধরেন, তাহলে নারীরা আবারও ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবেন। তাই তিনি তাঁদের ভয়ের ছবি নয়, তাঁদের সাহসের ছবি তুলেছেন। তিনি সহিংসতাকে নয়, সহিংসতার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মর্যাদাকে ইতিহাসে সংরক্ষণ করেছেন। ফলে ছবিগুলো আমাদের সহানুভূতি চায় না; বরং আমাদের শ্রদ্ধা অর্জন করে।
হেঙ্গামেহ গোলেস্তানের আলোকচিত্রগুলোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো একই সঙ্গে সংবাদচিত্র এবং শিল্পকর্ম। সাধারণত সংবাদচিত্র কোনো ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ করে, আর শিল্পকর্ম সেই ঘটনার আবেগকে দীর্ঘস্থায়ী করে। ‘উইটনেস ৭৯’ এই দুই ভূমিকাই সমান দক্ষতায় পালন করেছে।
ছবিগুলোর কম্পোজিশন অত্যন্ত নিবিড়। প্রচলিত আলোকচিত্রে আমরা প্রায়ই একটি স্পষ্ট দিগন্তরেখা দেখতে পাই, যা দর্শককে স্থানবোধ দেয়। গোলেস্তান সচেতনভাবে সেই দিগন্তকে মুছে দিয়েছেন। ফলে মানুষের ভিড় যেন ফ্রেমের বাইরে অনন্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। দর্শকের মনে হয়, তিনি কোনো সীমাবদ্ধ ছবির দিকে নয়; বরং এক চলমান জনসমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছেন।
ছবির জ্যামিতিও লক্ষণীয়। মাথার ওপর ছাতাগুলোর বৃত্তাকার পুনরাবৃত্তি একধরনের ছন্দ সৃষ্টি করেছে। সেই বৃত্তগুলোর মাঝখান থেকে উঠে এসেছে মানুষের সোজা শরীর, উঁচিয়ে ধরা হাত, পতাকার মতো প্রসারিত বাহু। গোলাকার এবং উল্লম্ব রেখার এই সংঘাত পুরো ছবিতে এক জীবন্ত গতি তৈরি করে।
গভীরতা নির্মাণেও গোলেস্তানের দক্ষতা অসাধারণ। সামনের সারির মুখগুলো স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ। একটু পেছনে গেলে মুখগুলো ধীরে ধীরে ঝাপসা হতে শুরু করে। তারও পেছনে মানুষ আর পৃথক ব্যক্তি থাকে না; তারা এক সম্মিলিত জনতার রূপ নেয়। এই স্তরবিন্যাস দর্শককে ছবির ভেতরে টেনে নেয় এবং অনুভব করায় তিনি যেন নিজেও সেই মিছিলে দাঁড়িয়ে আছেন।
আলোর ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য। পুরো দৃশ্য আলোকিত হয়েছে শীতের মেঘলা আকাশের নরম আলোয়। কোথাও তীব্র ছায়া নেই, নেই নাটকীয় আলোক-অন্ধকারের বৈপরীত্য। এই কোমল আলো মানুষের মুখ, কাপড়ের বুনন, চামড়ার দস্তানা, উলের সোয়েটার—সবকিছুর সূক্ষ্ম স্পর্শকে দৃশ্যমান করে তুলেছে।
তুষারপাত এই ছবিগুলোর আরেকটি নান্দনিক উপাদান। এটি কেবল আবহাওয়ার তথ্য দেয় না; বরং দৃশ্যের আবেগকে আরও গভীর করে। ঝরে পড়া প্রতিটি তুষারকণা যেন সময়কে ধীর করে দেয়। প্রতিবাদের উত্তেজনার মধ্যেও তৈরি হয় এক অদ্ভুত নীরবতা। এই নীরবতার কারণেই ছবিগুলো কেবল রাজনৈতিক দলিল নয়; তারা হয়ে ওঠে স্মৃতি, বিষাদ এবং আশার শিল্পিত ভাষা।
এই সিরিজের সবচেয়ে বড় শিল্পসাফল্য সম্ভবত এখানেই যে এটি দর্শককে কখনো ভুলতে দেয় না যে তিনি একটি বাস্তব ঘটনার ছবি দেখছেন। একই সঙ্গে এটিও ভুলতে দেয় না যে একটি মহান আলোকচিত্র সব সময় তথ্যের চেয়ে বড় কিছু হয়ে ওঠে। সেটি হয়ে ওঠে মানুষের অস্তিত্ব, সংগ্রাম এবং সময়ের স্থায়ী প্রতীক।
সেমিওটিক বা চিহ্নতত্ত্বের ভাষায় প্রতিটি দৃশ্যের অন্তত দুটি স্তর থাকে। এক. ডেনোটেশন এবং দুই. কনোটেশন। ডেনোটেশন আমাদের বলে ছবিতে কী আছে; কনোটেশন জানায় সেই দৃশ্যের সামাজিক, সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনৈতিক অর্থ কী।
এই আলোকচিত্রে খোলা চুলের নারীরা ডেনোটেটিভ অর্থে কেবল এমন কিছু মানুষ, যাঁরা তুষারপাতের মধ্যে মাথা না ঢেকে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু কনোটেটিভ স্তরে সেই খোলা চুল আর নিছক শরীরের অংশ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে ব্যক্তিস্বাধীনতার ঘোষণা, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে এক নীরব প্রত্যাখ্যান এবং নিজের শরীরের ওপর নিজের অধিকারের দৃশ্যমান প্রকাশ। কয়েক মুহূর্ত আগেও যা ছিল ব্যক্তিগত পরিচয়ের অংশ, রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেটিই রূপ নেয় প্রতিরোধের ভাষায়।
অন্যদিকে ফরাসি চিন্তক রোলাঁ বার্ত আলোকচিত্র বিশ্লেষণে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ব্যবহার করেছিলেন—স্টুডিয়াম ও পাংকটাম।
স্টুডিয়াম হলো সেই সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ক্ষেত্র, যার মাধ্যমে দর্শক ছবিটিকে বোঝে। ‘উইটনেস ৭৯’-এর ক্ষেত্রে স্টুডিয়াম আমাদের জানায় এটি ১৯৭৯ সালের মার্চে তেহরানে অনুষ্ঠিত বাধ্যতামূলক হিজাববিরোধী আন্দোলনের আলোকচিত্র। আমরা ইতিহাস জানি, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জানি, সেই জ্ঞান দিয়েই ছবির অর্থ নির্মাণ করি।
কিন্তু বার্তের মতে, প্রতিটি মহান আলোকচিত্রে এমন একটি ক্ষুদ্র উপাদান থাকে, যা দর্শককে হঠাৎ ব্যক্তিগতভাবে স্পর্শ করে। তিনি একে বলেছেন পাংকটাম, যে ক্ষুদ্র দৃশ্য আমাদের হৃদয়ে গিয়ে বিঁধে। ‘উইটনেস ৭৯’-এ সেই পাংকটাম কোথায়?
সম্ভবত খোলা চুলের ওপর নীরবে জমে থাকা তুষারের স্তরে। সেই তুষার কেবল শীতের চিহ্ন নয়। সেখানে জমে আছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, এক অনিবার্য ঝুঁকি এবং স্বাধীনতা হারানোর আশঙ্কা। দর্শক যখন জানেন, এই ছবির কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছরের মধ্যেই তাদের চুল আইন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হবে, তখন তুষারের প্রতিটি কণা যেন হারিয়ে যেতে থাকা এক স্বাধীন সময়ের শেষ স্মৃতিতে পরিণত হবে।
১৯৭৯ সালের ইরানে বাধ্যতামূলক হিজাব সেই বায়োপলিটিক্যাল ক্ষমতারই একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। রাষ্ট্র নারীর শরীরকে আদর্শ নাগরিকত্বের দৃশ্যমান প্রতীকে রূপ দিতে চেয়েছিল। এর বিপরীতে ‘উইটনেস ৭৯’-এর নারীরা নিজেদের শরীরকেই প্রতিরোধের ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের খোলা চুল, তাঁদের জনসমক্ষে উপস্থিতি, তাঁদের সম্মিলিত মিছিল—সবকিছুই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে ফুকোর ভাষায় একধরনের কাউন্টার-কন্ডাক্ট বা পাল্টা-আচরণ।
হেঙ্গামেহ গোলেস্তান ব্যবহার করেছিলেন একটি হালকা ৩৫ মিলিমিটার ক্যামেরা। প্রযুক্তিগতভাবে যা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। ভারী স্টুডিও ক্যামেরা নিয়ে এমন জনসমাবেশে কাজ করা সম্ভব ছিল না। ছোট ক্যামেরা তাঁকে দ্রুত চলাফেরা করার স্বাধীনতা দিয়েছে, মানুষের ভিড়ের মধ্যে মিশে যেতে সাহায্য করেছে এবং মুহূর্ত হারিয়ে যাওয়ার আগেই সেটিকে ধরে রাখার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল প্রযুক্তি নয়; ছিল অবস্থান। তিনি প্রায় প্রতিটি ছবিই তুলেছেন মানুষের চোখের সমতল থেকে। এই সামান্য সিদ্ধান্তই ছবিগুলোর নৈতিক শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, চোখের সমতল মানে সমতা।
একটি ক্যামেরা যেমন সত্যকে ধারণ করতে পারে, তেমনি সেই সত্যকে বিকৃতও করতে পারে। মানুষের দুর্দশাকে শোষণের উপাদানে পরিণত করা, সহিংসতাকে দৃশ্যমান উত্তেজনায় রূপ দেওয়া কিংবা ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত মর্যাদাকে উপেক্ষা করা, আলোকচিত্রের ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে। এই কারণেই রাজনৈতিক আলোকচিত্রের ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন সব সময় ফিরে আসে—কোন ছবি তোলা হবে, কী দেখানো হবে, আর কী দেখানো হবে না?
১৯৭৯ সালের মার্চে তোলা এই আলোকচিত্রগুলো খুব দ্রুতই রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপের মুখে পড়ে। নতুন ইসলামি প্রজাতন্ত্র এমন কোনো দৃশ্যকে জনসমক্ষে রাখতে আগ্রহী ছিল না, যা বাধ্যতামূলক হিজাবের বিরুদ্ধে নারীদের সংগঠিত প্রতিরোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অনাবৃত চুলে প্রতিবাদরত নারীদের ছবি কেবল একটি ঘটনার নথি ছিল না; তা রাষ্ট্রীয় বয়ানের জন্যও ছিল অস্বস্তিকর এক দলিল। ফলে ছবিগুলোর প্রকাশ, প্রদর্শন ও প্রচার দীর্ঘ সময় ধরে কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
সেন্সরশিপের কারণে ‘উইটনেস ৭৯’ বহু বছর জনচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়। ছবিগুলো বেঁচে ছিল ব্যক্তিগত সংগ্রহে, ব্যক্তিগত স্মৃতিতে এবং আন্তর্জাতিক আর্কাইভে। পরবর্তীকালে যখন সেগুলো আবার বিশ্বের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে স্থান পেতে শুরু করে, তখন সেগুলো কেবল শিল্পকর্ম হিসেবে ফিরে আসেনি; ফিরে এসেছিল ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া এক সাক্ষ্য হিসেবে। এখানেই গোলেস্তানের কাজের নৈতিক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মিশেল ফুকোর ‘বায়োপলিটিকস’ ধারণা এই সিরিজের রাজনৈতিক গভীরতা বুঝতে বিশেষ সহায়ক। ফুকোর মতে, আধুনিক রাষ্ট্র কেবল আইন বা প্রশাসনের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করে না; মানুষের শরীর, আচরণ, পোশাক, চলাফেরা এবং দৈনন্দিন জীবনকেও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনে। এই নিয়ন্ত্রণই বায়োপলিটিকস।
১৯৭৯ সালের ইরানে বাধ্যতামূলক হিজাব সেই বায়োপলিটিক্যাল ক্ষমতারই একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ। রাষ্ট্র নারীর শরীরকে আদর্শ নাগরিকত্বের দৃশ্যমান প্রতীকে রূপ দিতে চেয়েছিল। এর বিপরীতে ‘উইটনেস ৭৯’-এর নারীরা নিজেদের শরীরকেই প্রতিরোধের ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের খোলা চুল, তাঁদের জনসমক্ষে উপস্থিতি, তাঁদের সম্মিলিত মিছিল—সবকিছুই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে ফুকোর ভাষায় একধরনের কাউন্টার-কন্ডাক্ট বা পাল্টা-আচরণ।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ছবিগুলো আমাদের শেখায়, ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সব সময় অস্ত্র দিয়ে হয় না। কখনো কখনো নিজের শরীরকে নিজের মতো করে ধারণ করাও এক গভীর রাজনৈতিক কাজ।
তুষার গলে যায়। ঋতু বদলায়। রাষ্ট্র বদলায়। আইনও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু কিছু ছবি সময়ের ভেতর স্থির হয়ে থাকে। তারা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো সমাজের ইতিহাস কেবল ক্ষমতাবানদের ঘোষণায় লেখা হয় না; লেখা হয় সাধারণ মানুষের সাহসেও। ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও মানুষ প্রতিবাদ করতে পারে; নীরবতার মধ্যেও উচ্চারণ জন্ম নিতে পারে; আর একটি ক্যামেরা, যদি তা সততা ও মানবিকতার সঙ্গে পরিচালিত হয়, তবে সেটি কেবল একটি মুহূর্তকে নয়—একটি জাতির বিবেককেও সংরক্ষণ করতে পারে।