রিজিয়া রহমানের প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
রিজিয়া রহমানের প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

রিজিয়া রহমানের স্মৃতিচারণা

অবিস্মরণীয় সেই মার্চ মাস

প্রায় ২৫ বছর আগে ২০০১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনে রিজিয়া রহমানের এই স্মৃতিচারণাটি প্রথম ছাপা হয়েছিল। আমাদের বহু মূল্যবান লেখা শুধু মুদ্রণের পাতায় রয়ে গেছে; তেমনি একটি লেখা এই—‘অবিস্মরণীয় সেই মার্চ মাস’।

স্বাধীনতা দিবস ও মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে অনলাইনপূর্ব যুগে যত লেখা, সাক্ষাৎকার, স্মৃতিচারণ ও কবিতা ছাপা হয়েছিল, স্বাধীনতার পুরো মাসজুড়ে সেসব ধুলোঝরা পৃষ্ঠা আমরা প্রথমবারের মতো অনলাইনে তুলে আনছি।

ঘুম ভেঙেছিল মধ্যরাতে আচমকা। বিকট ভয়ংকর শব্দে চৌচির হচ্ছে রাতের প্রশান্তি। আকাশজুড়ে লাল আগুনের উদ্দাম শিখার তাণ্ডব আর ট্রেসারের নীল বিজলি–ঝলক। একবার মনে হলো এসব যেন সত্যি নয়। ঘুম হয়তো ভাঙেনি। ঘুমের মাঝেই আক্রমণ করেছে দুঃস্বপ্ন।

দুঃস্বপ্নই ছিল সেটা। তবে ঘুমের মাঝে সে হানা দেয়নি। হানা দিয়েছিল বাস্তবে। কেড়ে নিয়েছিল রাতের নগরবাসীর ঘুমের নিরাপত্তা। প্রথমে হতভম্ব হয়ে বসেছিলাম কিছুক্ষণ। বুঝতে পারছিলাম না কী হচ্ছে চারদিকে। এমন অচেনা বিকট শব্দ কখনো শুনিনি। এমন ভয়াবহ শব্দ প্রাচীন নগরী ঢাকাকে হিংস্র দাঁতে কামড় বসিয়েছিল কি না কোনো দিন, জানা নেই।

ভাবলাম, হয়তো মেঘ ডাকছে। উঠেছে হয়তো আকাশে সেজে কালবৈশাখী। ঝড় আসছে।

বিছানা ছেড়ে নামলাম। অন্ধকারেই জানালার পর্দা সরালাম। রাতের আকাশ নির্মেঘ। আগুনের লালচে আভায় আকাশ ভয়াবহ। তীব্র বেগে ছিটকে উঠছে নীলাভ সর্পিল রেখা (পরে জেনেছিলাম ওগুলো ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিক্ষিপ্ত ট্রেসারের আলো)। প্রতি রাতের চেনা আকাশের তারাগুলো বিস্ময়ে স্তব্ধ স্থির। মেঘ নেই। ঝড় নেই। তাহলে কী? কী হচ্ছে আচমকা মধ্যরাতে? এরই মধ্যে মনে হলো বড় রাস্তা কাঁপিয়ে ভারী কোনো যানবাহন চলেছে মালিবাগের দিকে। আমাদের বাড়িটা মালিবাগ থেকে খুব দূরে নয়। কী গেল মালিবাগের দিকে? পাকিস্তানি আর্মির ট্রাক? কিন্তু ট্রাকের শব্দ তো অচেনা নয়। ঢাকা শহরে পাকিস্তানি জঙ্গি ফৌজের ট্রাক আজকাল যখন-তখনই দেখা যায়। তবে কি ট্যাংক? সরাসরি খালি চোখে ট্যাংকের বহর তখনো দেখার দুর্ভাগ্য হয়নি। দেখেছি কেবল সিনেমার পর্দায়। তাহলে কি যুদ্ধ হচ্ছে? পাকিস্তানি সাঁজোয়া বাহিনীর ট্যাংক কি নেমে এসেছে ঢাকার রাজপথে?

ট্যাংক তো সমরক্ষেত্রে যুদ্ধের ফ্রন্টে নামে বলে জানি। নিরস্ত্র নাগরিকের আবাসস্থল মধ্যরাতের ঢাকায় ট্যাংক কেন নেমে এসেছে। এমন ব্যাপার হতবুদ্ধি করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। সেটা কাটিয়ে উঠতেও সময় লাগল না। থেকে থেকে কেঁপে উঠছে জানালার কাচ। ঘরের পাশ দিয়ে শাঁ শাঁ করে উড়ে যাচ্ছে গুলির ঝাঁক।

জন্ম আমার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝে। যুদ্ধ-আক্রান্ত কলকাতা শহরের স্মৃতি নিয়েই শুরু হয়েছে শৈশবের বোধোদয়। তখন অতিপরিচিত ছিল ব্ল্যাকআউটের রাত, যখন-তখন বেজে ওঠা সাইরেনের শব্দ, বম্বার প্লেনের ঝাঁক, শহর-কাঁপানো বোমা আর অ্যান্টি–এয়ারক্রাফটের আওয়াজ। কিন্তু কলকাতা শহরের রাজপথে ট্যাংক দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কেবল দেখেছি গোরা সৈন্যবোঝাই ‘মিলিটারি লরি’র আনাগোনা।

ট্যাংক তো সমরক্ষেত্রে যুদ্ধের ফ্রন্টে নামে বলে জানি। নিরস্ত্র নাগরিকের আবাসস্থল মধ্যরাতের ঢাকায় ট্যাংক কেন নেমে এসেছে। এমন ব্যাপার হতবুদ্ধি করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। সেটা কাটিয়ে উঠতেও সময় লাগল না।

থেকে থেকে কেঁপে উঠছে জানালার কাচ। ঘরের পাশ দিয়ে শাঁ শাঁ করে উড়ে যাচ্ছে গুলির ঝাঁক। বেডরুমের ভারী দরজা এমনভাবে কাঁপছে যেন ভূমিকম্প। ছেলেবেলার সেই যুদ্ধের স্মৃতিই আমাকে আমার করণীয় বলে দিল। আমার আট বছরের ঘুমন্ত ছেলে তপুকে টেনে নামালাম বিছানা থেকে। শুইয়ে দিলাম মেঝেতে। ওর বাবা মিজানুর রহমান তখনো গভীর ঘুমে। তাকে ঠেলে তুললাম। বললাম, ‘ওঠো। শিগগিরই ওঠো। চারদিকে কী যেন সব হচ্ছে। মনে হয় গোলাগুলি। ভীষণ শব্দ হচ্ছে।’

আমার উদ্বেগ ওকে স্পর্শ করল না তেমন। ঘুমের ঘোরেই বলল, ‘কী আবার হবে। ঘুমিয়ে থাকো।’ তখনই প্রচণ্ড শব্দে আবারও কেঁপে উঠল ঘর। ও উঠে বসল। একপলক মনোযোগ রাখল শব্দের বহরে। তারপর শুয়ে পড়ল আবার। নিশ্চিন্তে বলল, ‘ও কিছু না। মনে হয় ঝড় আসছে।’ বলেই ঘুমিয়ে গেল। সারা রাত কাটল সেই ভৌতিক ভয়ংকর শব্দের আতঙ্কের মাঝে। শেষরাতের দিকে এলাম রান্নাঘরে, আলো জ্বালাতেই দেখলাম আমার রান্নার বুয়া গুটিসুটি হয়ে বসে আছে। আমাকে দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, ‘ইতান কী হয় আপা? দুনিয়া কি গরাদ হইতাছে?’

চুলোয় চায়ের কেটলি বসালাম, সারা বাড়ি অন্ধকার। জানালা-দরজা বন্ধ। বসার ঘরের জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম একটু। সামনের গলি নির্জন। নির্বিকারে দাঁড়িয়ে আছে স্ট্রিট লাইট। পাড়ার বাড়িগুলো নিঃশব্দে ফুঁকড়ে আছে যেন।

রান্নাঘরে ফিরে চা তৈরি করলাম। চায়ের পেয়ালা হাতে নিতেই বাইরের দরজায় মৃদু টোকার শব্দ। থমকে গেলাম। রহস্যময় শব্দের ঝড়ে থরথর করে কাঁপছে রাত। এমন দুর্যোগে কে এসে টোকা দিচ্ছে দরজায়। রান্নার বুয়া কার্তিকের মা উঠে দাঁড়িয়েছে। ভীষণ আতঙ্কগ্রস্ত চেহারা তার। আমিও দাঁড়িয়ে গেছি অনড় হয়ে। যেন আঙুলটা নাড়ানোর শক্তিও নেই।

সে কি ছিল উত্তাল সমুদ্রের দুর্বার জলোচ্ছ্বাস? অবিশ্বাস্য প্রচণ্ড গতির কোনো কালবৈশাখী? দক্ষিণ বাংলায় ফুঁসে ওঠা ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহের বিশাল বিক্ষোভ? কিংবা বাস্তিল দুর্গ ভাঙার নেশায় ক্রুদ্ধ জনতার গগনবিদারী হুংকার? একাত্তরের মার্চ মাস! সে কি ছিল শিকল ভাঙার উন্মাদনায় স্বাধীনতার যুদ্ধ ঘোষণা?

দরজায় আবার টোকা। সেই সঙ্গে নিচু কণ্ঠে কথার শব্দ, ‘ভাবি। দরজা খোলেন। আমি মেজবাহউদ্দীন। আপনাদের ওপরতলার।’

প্রাণ ফিরে পেলাম। ওপরতলায় সপরিবার থাকেন মেজবাহউদ্দীন সাহেব, আমার স্বামীর সহকর্মী। দরজা খুললাম। ভেতরে এলেন মেজবাহ সাহেব। আমার হাতে চায়ের পেয়ালা দেখে ভীষণ অবাক। এমন ভয়ংকর দুর্যোগে কেউ যে আয়েশ করে চা খেতে পারে—এ ঘটনা যেন জীবনে তিনি প্রথম দেখলেন। নিষ্প্রাণ বিস্ময়ে শুধু বললেন, ‘আপনি চা খাচ্ছেন।’ মেজবাহ সাহেব প্রশ্ন করলেন, ‘মিজান কোথায়?’

‘সে তো ঘুমোচ্ছে।’

আরেক দফা অবাক হলেন তিনি। এত প্রচণ্ড শব্দের ঝড় উপেক্ষা করে কেউ যে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে, তা তিনি ভাবতেই পারেননি।

মেজবাহ সাহেবই জানালেন শহরে এখন পাকিস্তানি আর্মির দাপট। রাত ১০টাতেই তারা ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে শহরে নেমে এসেছে। আলো নিভিয়ে দিতে বলে ওপরে চলে গেলেন তিনি। অন্ধকারেই বসে চা খেলাম। আর অনবরতই প্রশ্ন করলাম সেই উন্মাদ শব্দকে লক্ষ করে, কী অপরাধ করেছি আমরা, যার জন্য এই নিরীহ রাতে সাঁজোয়া বহরের তাণ্ডব! কেন কাপুরুষের মতো ঘুমন্ত মানুষের ওপর হিংস্র আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়া। তখনো জানতে পারিনি রক্তে ভাসছে ঢাকা শহর। কল্পনা করা সম্ভব হয়নি উন্মত্ত পাকসেনাদের বেয়োনেটের আগায় বিঁধে যাচ্ছে নিরপরাধ নারী, শিশু, যুবক, বৃদ্ধের জীবন।

সন্ধ্যারাতেও তো ঢাকা টেলিভিশনে খবরে দেখেছি জুলফিকার আলী ভুট্টো আর ইয়াহিয়াকে। ক্ষমতা হস্তান্তরের আলাপ-আলোচনায় বসেছেন তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে।

সত্তরের ডিসেম্বরে হয়েছে সাধারণ নির্বাচন। বিজয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে দুটি মাস ধরে চলেছে নানা টালবাহানা। পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো স্বপ্ন দেখেছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্বের। আওয়ামী লীগের বিজয় ছিল সম্ভবত তার কাছে অচিন্তনীয়। প্রত্যক্ষ গোলযোগটা সম্ভবত সেখান থেকেই শুরু।

উনসত্তরের গণ–আন্দোলনের পর স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করল ইয়াহিয়া খান। সরকার ঘোষণা দিল, ‘সামনেই সাধারণ নির্বাচন হবে পাকিস্তানে। এরপর সামরিক শাসনের অবসান। আমরা ফিরে যাব ব্যারাকে।’

সবই তো হলো। কিন্তু তারপরও কেন এত প্রহসন। এত নাটক। পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা কেন দলে দলে আসছেন এ দেশে! বারবার কেন রুদ্ধদ্বার বৈঠক?

খবর তো চাপা থাকে না। উড়োজাহাজ বোঝাই হয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদল এসে নামছে ঢাকায়। জাহাজ বোঝাই হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসছে অস্ত্র আর সৈন্য।

বাঙালির ক্ষোভ ক্রমেই উত্তাল হচ্ছে। বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে এই মার্চ মাস। উন্মত্ত শব্দের তাণ্ডবে বসে সেই বন্দি উনিশ শ একাত্তরের পঁচিশে মার্চের ভয়াবহ রাতে খুঁজলাম সেই উদ্বেল মার্চ মাসকে। যে মার্চ আমাদের। একান্তই আমাদের।

একাত্তরের মার্চ মাস। ৩০ বছর আগের সেই অবিস্মরণীয় দিনক্ষণ আর উত্তাল প্রহর। এর কথা বলতে গেলে আবেগকে শাসনে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কেমন ছিল সেই মার্চ মাস?

সে কি ছিল উত্তাল সমুদ্রের দুর্বার জলোচ্ছ্বাস? অবিশ্বাস্য প্রচণ্ড গতির কোনো কালবৈশাখী? সে কি ছিল দক্ষিণ বাংলায় ফুঁসে ওঠা ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহের বিশাল বিক্ষোভ? কিংবা বাস্তিল দুর্গ ভাঙার নেশায় ক্রুদ্ধ জনতার গগনবিদারী হুংকার? একাত্তরের মার্চ মাস! সে কি ছিল শিকল ভাঙার উন্মাদনায় স্বাধীনতার যুদ্ধ ঘোষণা? আসলেই তা–ই। একাত্তরের মার্চ-বিক্ষোভে, আশায়, প্রতিবাদে, হুংকারে স্বাধীনতা ঘোষণার মাস। বঞ্চিত বাঙালির আত্ম–অধিকার অর্জনে যাত্রার মাস। ইতিহাস যত সত্যের চিহ্ন রেখেছে তার শিলালিপিতে, একাত্তরের মার্চে ঘটেছে আর একবার তারই আত্মপ্রকাশ। কখন উঠেছিল ঝড়? দিনক্ষণ, মাস, বছর ধরে যুগান্তর পেরিয়ে ক্রমে ক্ষোভের মেঘ পুঞ্জিত হচ্ছিল আকাশের ঈশান কোণে। চলছিল ঝোড়ো মেঘে যুদ্ধের প্রস্তুতি। সেই ঝড়ের আয়োজন ছিল ভেঙে ফেলার, গড়ে তোলার ডাক। মাত্র ২৪টি বছরে নয়, এ আয়োজনের শুরু হয়তো অনেক আগেই। হয়তো হাজার বছরের বঞ্চনার বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত আক্রোশ গর্জে উঠেছিল একাত্তরের সাতই মার্চের পল্টন ময়দানে—‘এবারের সংগ্রাম... স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ অত্যাচারী, স্বৈরাচারীর বিরুদ্ধে জনতার সম্মিলিত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ঘোষণা বাঙালির জীবনে সম্ভবত ছিল সেটাই প্রথম।

দ্রুত বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। বেলুচিস্তানের বিদ্রোহ দমনে নির্মম নিষ্ঠুরতার ভূমিকার জন্য ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ নামে কুখ্যাত পাকিস্তানি সেনানায়ক টিক্কা খানকে এনে বসানো হয় ঢাকায়। ষড়যন্ত্রের পুরোনো কৌশল প্রয়োগ করে উসকে দেওয়া হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে।

অত্যাচারী পাল রাজবংশের বিরুদ্ধে কৈবর্ত বিদ্রোহ, কিংবা ব্রিটিশ শাসনের প্রথম ১০০ বছরের সময়সীমার মধ্যে ইংরেজের বিরুদ্ধে সিপাহি বিদ্রোহ, কৃষক বিদ্রোহ, সন্ন্যাস বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ অথবা ফারাজি কিংবা ওয়াহাবি আন্দোলনের ডাক, অতঃপর সত্যাগ্রহ বা স্বদেশি আন্দোলনের বীজ একাত্তরের মার্চে নিহিত থাকলেও একাত্তরের সাতই মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণা ছিল বাঙালির প্রথম সর্বজনীন যুদ্ধ ঘোষণা। সে যুদ্ধ ছিল স্বাধীন জাতির আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য।

একসময় বাঙালি জাতির আর এক অবিস্মরণীয় নেতা সুভাষ চন্দ্র বসু বলেছিলেন, ‘তোমরা রক্ত দাও। আমি তোমাদের স্বাধীনতা এনে দেব।’ তাঁর সেই সশস্ত্র বিপ্লবের আহ্বান ছিল সর্বভারতীয় জনতার উদ্দেশে। আর একাত্তরের মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল বাঙালি জাতির জন্য। যে জাতি হাজার হাজার বছর ধরে আগ্রাসনবাদীর শোষণের শিকলে বন্দী হয়ে ক্রমে পরিণত হচ্ছিল আজ্ঞাবাহী গোলামের জাতে। নিশ্চিহ্ন হচ্ছিল তার ভাষা, সংস্কৃতি, তার জাতিসত্তার গৌরব। অধিকার, মর্যাদা আর আত্মপরিচয়ের ঠিকানা উদ্ধারের জন্য ক্রমেই তাদের মাঝে সঞ্চিত হচ্ছিল বিক্ষোভ। জমে উঠছিল ঝড়ের মেঘ। একাত্তরের মার্চ মাস ছিল সেই ঝড়েরই মাস। বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল সারা বাংলাদেশ।

আবেগের এমন প্লাবন আর দেখিনি। জনতার এমন স্বতঃস্ফূর্ত ঢল আর কখনো কি দেখেছি রাজপথে! কৃষক, শ্রমিক... বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, ছাত্র, শিক্ষক থেকে ঘরের গৃহিণীরাও নেমে এসেছিলেন রাজপথে।

মানুষ ঘর ছেড়েছিল, রাজপথে মিছিলের পর মিছিল। শহীদ মিনার দিবারাত্রি লোকে লোকারণ্য। মানুষের দাবি দ্রুত স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে ওঠে। ছয় দফার বাঁধন কেটে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধিকার, তারপর স্বাধীনতার দাবি।

রিজিয়া রহমান (২৮ ডিসেম্বর ১৯৩৯–১৬ আগস্ট ২০১৯)। ছবি: খালেদ সরকার

সেই বিশাল দাবির গর্জনে কেঁপে ওঠে ঢাকার আকাশ। বাঙালির দাবির সপক্ষে পল্টনের বিশাল জনসমাবেশে সঠিক নেতৃত্বদানে সফল নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন—এবারের সংগ্রাম...স্বাধীনতার সংগ্রাম।

তারপর দ্রুত বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। বেলুচিস্তানের বিদ্রোহ দমনে নির্মম নিষ্ঠুরতার ভূমিকার জন্য ‘বেলুচিস্তানের কসাই’ নামে কুখ্যাত পাকিস্তানি সেনানায়ক টিক্কা খানকে এনে বসানো হয় ঢাকায়। ষড়যন্ত্রের পুরোনো কৌশল প্রয়োগ করে উসকে দেওয়া হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে। দাঙ্গাকারী বিহারিদের নামিয়ে দেওয়া হয় ‘রায়ট’ করার জন্য।

শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগের ডাকে মার্চের প্রথম সপ্তাহগুলো ছিল উত্তাল। ওদিকে চলছিল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার ‘ছেলে ভোলানো’ খেলা। শহরে এদিক-সেদিকে পাকিস্তানি সেনাদের বিক্ষিপ্ত গোলাগুলিও চলছিল। মার্চের শেষে পরিস্থিতি ক্রমেই ঘোলাটে হয়ে উঠেছিল। ক্ষমতা হস্তান্তরের মুখোশের আড়ালে যে চলছিল ব্যাপক এক গণহত্যার প্রস্তুতি, তার সরাসরি প্রকাশ ঘটল মার্চ মাসের শেষে। অস্ত্রবোঝাই জাহাজ এমভি সোয়াত এসে ভিড়ল চট্টগ্রাম বন্দরে।

আমরা চিন্তিত হয়েছিলাম। বুঝে উঠছিলাম না আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে। পঁচিশে মার্চ রাতে যখন পাকদের পরিকল্পিত ‘অপারেশন’ চলছে, চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে তখনো বুঝে উঠিনি সেই ‘অপারেশন’ কতখানি নির্মম, বর্বর, নিষ্ঠুর হতে পারে।

বসে আছি অন্ধকারে। রাত শেষ হতে চলেছে। গোলাগুলির শব্দের শেষ নেই। অবিরাম চলছে। এরই মধ্যে ভীষণভাবে চমকে গেলাম আমরা। বড় রাস্তা থেকে ছুটে কারা যেন গলিতে ঢুকল। আমাদের গেটের সামনেই শোনা গেল গুলির শব্দ। ট্যাংকের শেলিং আর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের একটানা গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভাঙেনি মিজানুর রহমানের। কিন্তু বাড়ির গেটের সামনে গুলির শব্দে উঠে বসল সে। বলল, এ তো রাইফেলের গুলির শব্দ। আমরা এলাম বসার ঘরে। বসার ঘরের বারান্দার সামনেই গেট। জানালার পর্দা সরানোর সাহস হলো না আমাদের। রাইফেলের গুলির শব্দ আর শোনা গেল না। দ্রুত ছুটে আসা পায়ের শব্দও তখন মিলিয়ে গেছে।

অন্ধকার ফিকে হলো। মসজিদ থেকে ভেসে এল ফজরের আজান। গোলাগুলি তখনো চলছে।

আকাশে ভোরের আলো ফুটল। কলঙ্কিত পঁচিশে মার্চের রাত বিদায় নিল। গৃহবন্দী আমরা। রেডিওতে ঘোষিত হয়েছে কারফিউ জারির খবর।

ভেসে এল হালকা কণ্ঠস্বর—‘শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে আমি মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।’ ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষাতেই ঘোষণাটি দেওয়া হলো। ঘোষণার পর মেজর জিয়াউর রহমান বিশ্বের কাছে অস্ত্র সাহায্যের আবেদন জানালেন।

এরই মধ্যে আমার ছুটা বুয়া এসে উপস্থিত। ঘরে ঢুকেই সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। ও থাকে মালিবাগের বস্তিতে। ও যে খবর দিল, তাতে নিজের শ্রুতিশক্তিকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। এ কি কখনো সম্ভব? ঢাকা শহর রক্তে ভাসছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা সারা রাত পাখি মারার মতো করে মেরেছে মানুষ। বস্তিতে, রাস্তায়, গলির মুখে। মানুষের লাশ রক্তে ভাসছে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন পুড়ে ছাই... সেখানে রক্ত গড়িয়ে যাচ্ছে ড্রেনে। হালিমার মা ওর মাইনার টাকা নিয়ে চলে গেল। বলে গেল, এই শহরে আর থাকুম না। থাকলে বাঁচুম না। ওকে কিছুতেই ধরে রাখা গেল না।

দুদিন একটানা কারফিউ। হালিমার মায়ের দেওয়া খবর আমাদের সবাইকে ভয়াবহ আতঙ্কের জগতে ছুড়ে দিয়েছে। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ। পাড়ার সব বাড়ি যেন এক মৃতপুরী। ট্রানজিস্টর রেডিওর মিটারের কাঁটা ঘুরিয়ে চলেছি। হঠাৎ এক স্টেশনে কাঁটা থামিয়ে দিলাম; শুনতে পেলাম পাঞ্জাবি টানের ইংরেজি। রাজেন্দ্রপুরে অস্ত্র পাঠাতে বলছে। ওয়্যারলেসে তাদের ব্যস্ত ঘোষণা, ‘সেন্ড অ্যামুনেশন।’ বুঝলাম সেখানে কিছু ভয়ংকর ঘটনা ঘটছে। ২৭ তারিখ রাতে কারফিউর মধ্যেই আমাদের পেছনের বাড়ির প্রতিবেশী দেয়াল টপকে এলেন আমাদের বাড়িতে। তিনিই বললেন, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।

তিনি রেডিওতে একটি মিটার ব্যান্ডের খবর বলে গেলেন। বললেন, ওখানে ধরলেই শুনতে পাবেন। কাল বেলা ১১টার দিকে ধরবেন। পরদিন রেডিওতে পেয়ে গেলাম সেই স্টেশনটি। ভেসে এল হালকা কণ্ঠস্বর—‘শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে আমি মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।’

ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষাতেই ঘোষণাটি দেওয়া হলো। ঘোষণার পর মেজর জিয়াউর রহমান বিশ্বের কাছে অস্ত্র সাহায্যের আবেদন জানালেন।

অন্ধকার সমুদ্রে নিমজ্জিত জাহাজ থেকে যেন বাতিঘরের আলো দেখতে পেলাম। উত্তাল মার্চের সবকিছু তাহলে শেষ হয়ে যায়নি। আমরা যুদ্ধ ঘোষণা করেছি শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জন্য। প্রত্যাঘাতের জন্য। স্বাধীনতার জন্য।

শুরু হলো যুদ্ধ। স্বাধীনতার জন্য বাঙালির প্রথম সর্বজনীন যুদ্ধ। সেই অবিস্মরণীয় মার্চ মাসের প্রতিটি দিনেই ঘোষিত হয়েছিল যুদ্ধ। প্রতিটি মানুষ তখন যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল তাদের চিন্তায়, কর্মে, বিক্ষোভে। ৩০ বছর পর যখন সেই আতঙ্কিত পঁচিশে মার্চের রাতটি ফিরে আসে স্মৃতিতে, রাজারবাগের দিক থেকে ছুটে আসা সেই পায়ের শব্দ আর সেই রাইফেলের গুলির শব্দ আমি স্পষ্ট যেন শুনতে পাই। অবাক হয়ে ভাবি ট্যাংকের শেলিংয়ের প্রতিরোধে সেই রাইফেলের গুলি ছিল বালুর বাঁধের মতো দুর্বল। কিন্তু সেই শব্দই ঘুমন্ত মানুষকে জাগিয়ে তুলতে পেরেছিল। যেমন করে একাত্তরের মার্চের যুদ্ধ ঘোষণা ঘুম ভাঙিয়েছিল একটি যোদ্ধা জাতির।