নেপালের সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আলোকচিত্র ও সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালীর দৃশ্য অবলম্বনে। প্রথম আলো গ্রাফিকস
নেপালের সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আলোকচিত্র ও সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালীর দৃশ্য অবলম্বনে। প্রথম আলো গ্রাফিকস

নেপালি বরফ নাড়িয়ে ঢাকায় নামল শারদ বৃষ্টি

আজ সকাল থেকে দুপুর ঢাকার আকাশে রোদ-ছায়ার খেলা দেখা গিয়েছে। কখনো রোদ এমনভাবে ছড়িয়েছে, মনে হয়েছে আজ আকাশে মেঘের কোনো ছুটি নেই। আবার পাঁচ মিনিট পরই চারপাশের আলো ম্লান। বর্ষা শেষ, শরৎ এসেছে ঢাকায়।

গরম অবশ্য সেটা মানতে রাজি নয়।

বরং এবারের বর্ষায় গরমের তীব্রতা ছিল অদ্ভুত রকমের।

বৃষ্টি হচ্ছে, মানুষ ভিজছে, অথচ ঘামও হচ্ছে।

এ কেমন বর্ষা!

অফিসে যাওয়ার পথে আজ সেই কথাই ভাবছিলাম। কেন এমন হচ্ছে। মহান হিমালয় তার কন্যাসম নেপালকেও ছাড় দিচ্ছে না।

পৃথিবী গরম হচ্ছে—বাক্যটা শুনতে শুনতে আমরা প্রায় অভ্যস্ত। সংবাদপত্রে পড়ি, টেলিভিশনে শুনি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখি। কিছুক্ষণ চিন্তা করি। তারপর নিজের কাজে ফিরে যাই।

কিন্তু গরমটা যখন ত্বকে লাগে, চাঁদিতে লাগে তখন ব্যাপারটা আর খবর থাকে না।

হিমালয়ের ভয়াবহ সেই দুর্যোগের খবর আমরা কমবেশি সবাই দেখেছি।

হিমালয়ের হাজার বছরের পাহাড়ি পাথুরে বরফ কাদায় মিশে একসঙ্গে নেমে এসেছিল মানুষের জীবনের ওপর। একটি চনমনে নেপালি সকাল মুহূর্তে বদলে গিয়েছিল।

ওই দিন যারা সকালে ঘর থেকে বের হয়েছিল হাসিমুখে, তাদের অনেকেই আর ঘরে ফিরতে পারেনি।

হিমালয় আমাদের অনেকের কাছে দূরের পাহাড়।

আমাদের ঢাকা থেকে অনেক দূর।

তবু ভাবছিলাম, ঘটনাটা আসলে কতটা দূরের?

হিমালয়ের বরফের সঙ্গে আমাদেরও নাড়িপোঁতা সম্পর্ক আছে। হিমালয়ের হিমবাহ গলে যে পানি নামে, নদী হয়ে তাই ছুটে যায় সমতলের দিকে। কত দেশ, কত জনপদ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে আমাদের এই বৃহৎ বঙ্গীয় বদ্বীপে। পৃথিবীর বৃহত্তম বদ্বীপ অখণ্ড বাংলা।

আমরা তাই পাহাড়ের খবর, আমাদের পিসতুতো বোন নেপালির খবর পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারি না।

আমাদের এখানেও পাহাড়ধসে মানুষের মৃত্যু হয় প্রতি বর্ষাকালে। কোথাও পাঁচজন কোথাও দশজন। সংখ্যাটি এক করলে অনেক বেশি।

প্রতি বর্ষাতেই আমাদের নদীগুলো অস্বাভাবিক ফুলে ওঠে।

কোথাও ঘর নিয়ে যায়। কোথাও ভিটেমাটি পরিবার–পরিজন।

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন সমুদ্র একটু একটু করে এগিয়ে আসছে।

প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারালে তার খবর শেষ পর্যন্ত মানুষের ঘরেই পৌঁছায়।

ভাবতে ভাবতেই মেট্রোর সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, হাতে সময় খুব বেশি নেই। ঠিক সময়ে অফিসের পাঞ্চটা ছুঁতে হবে।

ঢাকার জীবনে বৃষ্টির চেয়েও সময় কখনো কখনো বড় হয়ে ওঠে।

নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলীতে আকস্মিক ঢলের পর কাদা-ধ্বংসস্তূপে ঢেকে গেছে ঘরবাড়িসহ অন্যান্য স্থাপনা। ২৭ আগস্ট

সিঁড়ি থেকে বের হওয়ার মুখে দেখি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাইরে যারা ছিল, তারা দ্রুত আশ্রয় নিচ্ছে। মেট্রোর নিচে কয়েকজন দাঁড়িয়ে গেলেন। একজন হেসে বললেন,

—দারুণ বৃষ্টি!

সত্যিই তখন দারুণ লাগছিল।

গরমের মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে ঢাকার মানুষ একটু থামে। কেউ আকাশের দিকে তাকায়, কেউ মোবাইল বের করে, কেউ ছাতা খোঁজে। ব্যস্ত শহর কয়েক মুহূর্তের জন্য অন্য রকম হয়ে যায়।

কিন্তু এই শারদীয় বৃষ্টিরও মেজাজ আছে।

দু-তিন মিনিটের মধ্যে তার চেহারা পাল্টে গেল। সামনে রাস্তা ঝাপসা। মেট্রোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো আরও ভেতরে সরে আসছেন। সামনের অফিস বিল্ডিংটা মাত্র তিন–চার মিনিটের হাঁটা পথ। এখন মনে হচ্ছে, মাঝখানে ছিপছিপে কারওয়ান নদী এসে গেছে।

ভিড় বাড়ছে।

কেউ মেট্রোর ছাট থেকে বের হচ্ছে না।

কারও হাতে ব্যাগ, কারও হাতে ল্যাপটপ, কেউ ফোনে অফিসে জানাচ্ছেন একটু দেরি হবে। বারোটার আপলোডটা ছাড়ুন।

একজন ছাতা খুলে আবার বন্ধ করে ফেললেন। বাতাসের সঙ্গে বৃষ্টির যে তেজ! হালের মাঙ্কি ছাতা কাজে আসবে না।

আমারও ভয় হচ্ছে।

পুরো ভিজে গেলে জ্বর হতে পারে। কিংবা খুশখুশে কাশি। তারপর অফিস, কাজ, দুই দিনের অসুবিধা—

সব মিলিয়ে শরতের বৃষ্টি অযথা ঝামেলায় পরিণত হতে পারে।

কিন্তু আমার সামনে আরেকটা ঝামেলা।

পাঞ্চ।

সময় চলে যাচ্ছে।

একবার বৃষ্টির দিকে চোখ রাখি তো আরেকবার ঘড়ির দিকে...

কী আশ্চর্য!

একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ গলে যাওয়া, সমুদ্রের উচ্চতা বাড়া; অন্যদিকে আমার এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা অফিসের পাঞ্চটা ঠিক সময়ে দেওয়া যাবে কি না।

মানুষ বোধ হয় এভাবেই বড় বিপর্যয়ের মাঝেও নিজের ছোট জীবনটা বাঁচিয়ে রাখে।

তবু কথাটা মাথা থেকে যাচ্ছিল না।

আমরা কি সত্যিই বুঝতে পারছি আমাদের কী কী বদলে যাচ্ছে?

নাকি নিজের শরীরে যতক্ষণ না লাগে, ততক্ষণ পৃথিবী দিন দিন উষ্ণ হচ্ছে

এটি আমাদের কাছে একটা খবর মাত্র?

এর মধ্যে বৃষ্টির তেজ একটু কমল।

শরৎকাল...

মুষলধারার জায়গায় এল চিকন জল। বাতাসে ভেসে আসছে জলের কণা। ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু আগের মতো আছড়ে পড়ছে না।

ছাঁটবৃষ্টি।

এই বৃষ্টিটা চেনা।

হৃদপুরে দেখেছি এমন বৃষ্টি। উত্তরবঙ্গের শরৎ দুপুরে হঠাৎ শীতল হাওয়া উঠত, তারপর ঝিরঝির করে নামত ছাটা। মাঠে, উঠোনে, টিনের চালে—সবখানে তার আলাদা শব্দ ছিল।

আজ সেই বৃষ্টি ঢাকায়।

ঘড়ির দিকে শেষবার তাকালাম।

আর দাঁড়িয়ে থাকার সময় নেই।

ব্যাগটা শক্ত করে ধরলাম। জ্বর-কাশির ভয় মাড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

দুই শ মিটার রাস্তা।

ছাঁটবৃষ্টির মধ্যে খোটা দৌড়ে হঠাৎ মনে হলো, এই ছোট্ট পথটাও যেন আজ অন্য কোনো অর্থ নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

পৃথিবী বদলাচ্ছে।

আমাদের ঋতু বদলাচ্ছে।

বৃষ্টির ভাষাও বদলাচ্ছে।

আর আমরা?

আমরা এখনো সময়মতো অফিসে পাঞ্চ দেওয়ার জন্য দৌড়াচ্ছি।

হয়তো এটাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।

অথবা

সবচেয়ে বড় অসহায়ত্ব।