উনিশ শতকে (১৮০০-৯৯ খ্রি.) বঙ্গীয় রেনেসাঁর উন্মেষের কালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে কবি নবীনচন্দ্র সেনের (১০ ফেব্রুয়ারি ১৮৪৭-২৩ জানুয়ারি ১৯০৯ খ্রি.) আবির্ভাব। জন্মেছিলেন চট্টগ্রাম জেলার রাউজানের নয়াপাড়া গ্রামে। সাহিত্যিক-আগমনটি ছিল খানিকটা নীরব, তবে দ্রুত তিনি তাঁর কালের প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে নিজেকে যথাযথভাবেই সংস্থাপন করতে পেরেছিলেন। বিশেষত ১৭৫৭ সালে ইংরেজশক্তি কর্তৃক বাংলার স্বাধীনতা হননের মর্মযাতনা ও সিরাজউদ্দৌলার শৌর্যকে নিয়ে লেখা প্রথম কাব্য পলাশীর যুদ্ধ (১৮৭৫ খ্রি.) প্রকাশ ছিল সে সময়ের এক সাড়াজাগানো ঘটনা। তাতে প্রথমত বিদ্বৎসমাজ ও পাঠকের কাছে তিনি রাতারাতি হয়ে ওঠেন সমানভাবে আদৃত ও একাত্ম।
নবীন সেনের বিখ্যাত পলাশীর যুদ্ধ কাব্যের শেষ চার উজ্জ্বল পঙ্ক্তি:
‘সিরাজের ছিন্ন মুণ্ড চুম্বিয়া ভূতল
পড়িল, ছুটিল রক্ত স্রোতের মতন।
নিবিল গৃহের দীপ; নিবিল তখন
ভারতের শেষ আশা, হইল স্বপন।’
পলাশীর যুদ্ধ কাব্যের শেষ দৃশ্য করুণ বেদনায় আচ্ছন্ন করে পাঠকদের। এ দৃশ্যে নবাব সিরাজ ভারতের স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে একই সমান্তরালে অবস্থান করে গৌরব সৃষ্টি করে। এখানে নবীন সেন মূলত সিরাজচর্চাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের ভিত্তি প্রদান করেছেন। এ কাব্য প্রকাশের পরই বাংলায় একের পর এক সিরাজউদ্দৌলার ওপর বহু নাটক রচিত ও মঞ্চস্থ হতে থাকে। এভাবেই পলাশীর যুদ্ধ কাব্যটি বাংলা সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্নায়ক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধারায় মহাকাব্য রচনায় নিবিষ্ট হন কবি নবীনচন্দ্র সেন। তারুণ্যে পেয়েছেন ‘বিগ বস’ মাইকেলের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। অপর দিকে সে কালের কৃতী পুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অপত্যস্নেহ ও আনুকূল্য এবং বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে আন্তরিক যোগাযোগ।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩ খ্রি.) ও হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৯০৩ খ্রি.) ধারায় মহাকাব্য রচনায় নিবিষ্ট হন কবি নবীনচন্দ্র সেন। তারুণ্যে পেয়েছেন ‘বিগ বস’ মাইকেলের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। অপর দিকে সে কালের কৃতী পুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অপত্যস্নেহ ও আনুকূল্য এবং বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে আন্তরিক যোগাযোগ তাঁকে সমকালীন মানসগঠনে যথার্থভাবে গড়ে তুলেছিল। মহাকাব্য রচনার জোয়ারের সেই কালে তাঁর লেখা—রৈবতক, কুরুক্ষেত্র ও প্রভাস ত্রয়ীকাব্য বা মহাকাব্য হিসেবে বাংলা সাহিত্যে স্বচিহ্নিত।
এ পর্বে আমরা কবি নবীনচন্দ্র সেনের সাহিত্যের বাইরে অন্য একটি বিষয়ের দিকে নজর দেব। যদিও মনে করি, তা তাঁর জীবনও সাহিত্যদর্শন থেকে দূরের বিষয় নয়। প্রখ্যাত কবির বাইরেও নবীনচন্দ্র সেন ছিলেন একজন স্বনামধন্য বাঙালি আমলা। কবি, মহকুমা প্রশাসক ও ডেপুটি কালেক্টর। একজন স্বনিষ্ঠ প্রশাসক ও মানবদরদি হিসেবে নবীন সেনের ভূমিকা যুগপৎভাবে ঐতিহাসিক এবং বঙ্গদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসের এক আলোকিত অধ্যায়।
আমাদের জানামতে, এ দিকটির প্রতি ইতিপূর্বে সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিতভাবে এর আগে আলোকপাত করা হয়নি। এযাবৎ প্রায়ান্ধকারে থাকা বিষয়টিকে আমরা একটি দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপনের চেষ্টা করব।
নবীনচন্দ্র সেনের চিন্তা-দর্শন—ভাব ও বস্তুগত অনেকগুলো সদর্থক সূচকে একীভূত হয়েছে। বাংলার রেনেসাঁ অগ্রসর উদ্যমী পুরুষের সমাজ ও ধর্ম সংস্কার প্রথমত চিন্তা ও সাহিত্যকে মাধ্যম করে এগিয়েছে। সেখানেই নবীনচন্দ্র সেন অনন্য হয়ে ওঠেন। কীভাবে? সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি অতি নিভৃতে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করে জনসমাজের বস্তুগত প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। যেখানে লুকিয়ে ছিল নবীন সেনের দর্শনচিন্তা।
প্রখ্যাত কবির বাইরেও নবীনচন্দ্র সেন ছিলেন একজন স্বনামধন্য বাঙালি আমলা। কবি, মহকুমা প্রশাসক ও ডেপুটি কালেক্টর। একজন স্বনিষ্ঠ প্রশাসক ও মানবদরদি হিসেবে নবীন সেনের ভূমিকা যুগপৎভাবে ঐতিহাসিক এবং বঙ্গদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসের এক আলোকিত অধ্যায়।
তিনি উন্নয়ন-রূপ তরির বিমূর্ত ও মূর্ত দুটো দাঁড়ই টেনেছেন। তিনি যেমনভাবে, ভাবকল্পনার জগতে বিচরণ করে কালোত্তীর্ণ কাব্য নির্মাণে সফলতা পেয়েছেন। তেমনি সমাজ উন্নয়নে বস্তুগত উপাদানের উপযোগিতাকে যথাগুরুত্ব দিয়েছেন। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-পরিবেশ-যোগাযোগব্যবস্থা-আইনশৃঙ্খলা রক্ষা-দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিকরণ-জনমতের পক্ষাবলম্বন-জনঅধিকার রক্ষা-সংস্কৃতিচর্চা-ধর্মীয় উদারতা-মানবিকতা ও পরিকল্পিত নগরায়ণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আমাদের বিশেষ মনোযোগ অধিকার করেছেন। এসব বিষয়ের সংশ্লেষকে নবীনচন্দ্র সেনের চিন্তাদর্শন বলে উত্থাপন করতে চাই।
এখন দর্শনের দৃষ্টিতে দুয়েক কথা। আমরা জানি, উনিশ শতকের বাঙালি মধ্যশ্রেণির সমাজসংস্কার আন্দোলন প্রবাহিত হয়েছিল দুটি ভিন্ন ধারায়। একটি ছিল ধর্ম সংস্কারের মধ্য দিয়ে সমাজসংস্কার। অপরটি হলো ধর্মকে বাইরে রেখে সমাজসংস্কার। রেনেসাঁ পুরুষদের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার বিপুল আলোড়ন ঘটেছে নবীন সেনের মধ্যে।
নবীনচন্দ্র সেনের দর্শন দুই ধারায় সমর্পিত—একটি সমাজ উন্নয়নদর্শন, অপরটি সাহিত্যদর্শন। তিনি অভিজ্ঞতার পরতে পরতে নিজেকে বদলেছেন। তাঁর সে চিন্তা ক্রমান্বয়ে দর্শনে রূপ নিয়েছে বলে আমরা আস্থা আনতে চাই। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মধ্যে নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মিথস্ক্রিয়া ঘটেছে। নবীনচন্দ্র সেনের উন্নয়নদর্শন—দর্শনের আরোহ পদ্ধতিতে (ইন্ডাক্টিভ মেথড) এগিয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে। উন্নয়নটা ওপর থেকে নিচে নয়, নিচ থেকে ওপরে উঠেছে। অর্থাৎ রেনেসাঁ বা সমাজ পরিবর্তনের যে স্বপ্নাকাঙ্ক্ষা তাঁর মধ্যে ছিল তা তিনি সরাসরি সমাজে প্রয়োগ করেছেন আরোহ পদ্ধতিতে।
যেখানে রেনেসাঁ-পুরুষেরা উন্নয়ন চেয়েছেন ওপর থেকে অবরোহ পদ্ধতিতে (ডিটাক্টিভ মেথড), প্রথমত শিক্ষিত সমাজকে নিয়ে—সাধারণদের বাদ দিয়ে। এ ক্ষেত্রে নবীন সেন ব্যতিক্রম। তিনি অনুধাবন করেছেন সাধারণ বা বৃহত্তর মানুষের স্বস্তি ও সচেতনতার ভিতের ওপর দীর্ঘস্থায়ী বড় পরিবর্তন নিহিত।
নবীনচন্দ্র সেনের জীবনীগ্রন্থ আমার জীবন থেকে জানা যায়, সরকারি চাকরিতে নবীন সেন তাঁর বিভিন্ন কর্মস্থলে উন্নয়নের চিন্তা প্রথমেই ভেবেছেন। নবীনচন্দ্র ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে নোয়াখালী জেলার একটি মহকুমা হিসেবে ফেনী প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন। পরে ১৮৮৪ সালের নভেম্বরে ফেনী এসে দুই দফায় আনুমানিক সাড়ে সাত বছরের দায়িত্বে ফেনীকে নতুন চেহারা দিয়েছেন। তাঁর এ উন্নয়নচিন্তাটি পুরো বাংলাদেশের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।
নবীন সেনের সমকালে ব্রিটিশ-ভারতে সরকারি চাকরিসূত্রে কর্মরত ছিলেন ইংরেজ চিন্তাবিদ জন স্টুয়ার্ট মিল। তিনি ছিলেন ‘উপযোগবাদে’র অন্যতম বিশ্বদার্শনিক। মিলের সঙ্গে নবীন সেনের দেখা হয়েছিল কি না, তা জানা যায় না। তবে মিলের সঙ্গে বা তাঁর চিন্তার সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রসহ রেনেসাঁ আন্দোলনের অনেকের পরিচয় ছিল।
নবীনচন্দ্র সেন জনসাধারণের মঙ্গলের চিন্তায় ফেনী মহকুমাকে একটি সুন্দর-উৎকর্ষময় আধুনিক জনপদ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছেন। এ স্বপ্নের বাস্তব ভিত্তিও তিনি রচনা করে গেছেন। আর এমন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে ‘উপযোগবাদী’ দর্শনের প্রভাব বা সমিলতা স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়।
‘উপযোগবাদী’ দর্শনের মূল ভাষ্য, সর্বসাধারণের মঙ্গল তথা সুখ বা পরিতৃপ্তি। নবীন সেনের সমকালে ব্রিটিশ-ভারতে সরকারি চাকরিসূত্রে কর্মরত ছিলেন ইংরেজ চিন্তাবিদ জন স্টুয়ার্ট মিল (২০ মে, ১৮০৬–৮ মে, ১৮৭৩)। তিনি ছিলেন ‘উপযোগবাদে’র অন্যতম বিশ্বদার্শনিক। তাঁর নাম এ মতবাদের ইতিহাসে জেরেমি বেন্থামের পরেই উল্লেখ করা হয়। মিল ছিলেন উপযোগবাদের একজন বিশিষ্ট প্রবক্তা। তাঁর মতে, সামষ্টিক মঙ্গলই এ দর্শনের মূলকথা।
মিলের সঙ্গে নবীন সেনের দেখা হয়েছিল কি না, তা জানা যায় না। তবে মিলের সঙ্গে বা তাঁর চিন্তার সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রসহ রেনেসাঁ আন্দোলনের অনেকের পরিচয় ছিল। এদিকে নবীনচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্রের প্রিয়পাত্র হওয়ায়, অনুমান করা যায়, বঙ্কিমচন্দ্রের মতো নবীনচন্দ্রও মিলের উপযোগবাদী দর্শনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরিচিত ছিলেন। আবার এমনও হতে পারে, এ দর্শনের সঙ্গে পরিচিত না হয়েও নবীনচন্দ্র সেন নিজ জীবনাভিজ্ঞতা থেকেই এ উন্নয়নচিন্তায় ধাবিত হয়েছেন। প্রশাসকজীবনে তিনি উপযোগবাদী দর্শনের সমিল ‘ভাব’ ও ‘বস্তু’র সক্রিয় সম্মিলনে এক উন্নয়নচিন্তার ভিত্তি রচনা করেন।
এক ক্ষয়িষ্ণু জমিদার পরিবারের সন্তান নবীন সেন পিতার মৃত্যুর পর বিপুল দরিদ্রতার ভেতর দিয়ে গিয়েও শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেন। বৃহৎ একটি পরিবার ছিল তাঁর আয়ের ওপর নির্ভরশীল। নিজে কষ্টে দিনাতিপাত করে সে দুঃখের দিনকে তিনি কোনো দিন ভোলেননি। তাই জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়নে তিনি হয়ে ওঠেন উদ্যোগী।
১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রেজারস ম্যাগাজিনে জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘ইউটিলিটারিয়ানিজম’ রচনাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে ১৮৬৩ সালে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। হাসনা বেগম অনূদিতউপযোগবাদ গ্রন্থে থেকে এ দর্শনের পরিচয় দেওয়া হচ্ছে এভাবে:
[...] ‘ইউটিলিটারিয়ানিজম’ বা ‘উপযোগবাদ’ গ্রন্থটিতে মিল তাঁর একটি রূপরেখা দেন এবং সেই আদর্শ অনুসরণে সমাজ পরিবর্তনের একটি উপযুক্ত পথ প্রদর্শন করেন। তাঁর মতে, তেমন একটি সমাজে অধিকাংশ মানুষ (এবং সম্ভব হলে সব সংবেদনশীল প্রাণীই) আনন্দপূর্ণ জীবন যাপন করতে সক্ষম হবে। মানুষের কার্যকলাপ হবে সেরূপ সমাজকে প্রতিষ্ঠিত ও প্রলম্বিত করার জন্য উপযোগী। মানুষ স্বার্থের পথ ত্যাগ করে নিজের ও অপরের জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলবে। [...] (বাংলা একাডেমি, সেপ্টেম্বর-১৯৮৮, পৃষ্ঠা: ৪)
এরপর মিলের বক্তব্য উদ্ধৃত করে অনুবাদক জানান, [...] উপযোগ সুখের বিপরীতধর্মী কিছু তো নয়ই, বরং উপযোগ বলতে সুখকেই বোঝায়, যে সুখ বেদনার অনুপস্থিতির স্বার্থে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। [...] মিলের বক্তব্য, [...] একটি সন্তুষ্ট শূকর হওয়ার চেয়ে একজন অসন্তুষ্ট মানুষ হওয়া উত্তম; একজন সন্তুষ্ট নির্বোধ হওয়ার চেয়ে অসন্তুষ্ট সক্রেটিস হওয়া উত্তম। [...] (প্রগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৭)
অন্যদিকে শরীফ হারুন সম্পাদিত ‘বাংলাদেশে দর্শন: ঐতিহ্য ও প্রকৃতি অনুসন্ধান’ গ্রন্থে ‘বাঙালির দর্শন’ রচনায় আমিনুল ইসলাম লিখেছেন, [...] বঙ্কিমের মতে, ধর্ম বলি আর দর্শন বলি, এদের প্রত্যেকেরই আসল লক্ষ্য ব্যক্তির সুখসাধন। [...] (বাংলা একাডেমি, জুন- ১৯৯৪) এখানেও উপযোগবাদের সাক্ষাৎ পাই। এর পরের অনুচ্ছেদে লেখক বলেন, [...] কিন্তু সমষ্টিকে বাদ দিয়ে কিছুতেই সম্ভব নয় ব্যক্তির সুখ আনি। জন স্টুয়ার্ট মিলও অনুরূপ কথা বলেছিলেন। [...]
তবে নবীন সেন পূর্বসূরিদের অন্ধ অনুসারী ছিলেন না। নবীনচন্দ্র সেন, বঙ্কিমকে সবিনয়ে অভিযোগ করেছেন, ঈশ্বরচন্দ্র-রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ সম্পর্কে বঙ্কিমের নেতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির। সামনে বসে অগ্রজ বঙ্কিমের সমালোচনাও করেছেন। বাস্তবে, নবীনচন্দ্র সেন ছিলেন তাঁর সময়ের হাতে গোনা ধর্মীয়ভাবে উদার তথা বিরল ব্যক্তিদের একজন। (বঙ্কিমের দীর্ঘশ্বাস, সাইফুর রহমান, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২ অক্টোবর ২০২০)
নবীনচন্দ্র সেন একদিকে ভারতীয় পুরাণাশ্রয়ী সাহিত্য রচনা করে সে রেনেসাঁয় শামিল থেকেছেন; আবার কর্মসূত্রে ব্রিটিশ সরকারের চাকরিসূত্রে প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে বঙ্গদেশকে গড়ে তুলছিলেন। জনহিতকর কাজকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া নিয়ে ইংরেজ সরকারের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধও হয়েছে।
ফলে দেখি, তিনি ‘প্রতিবেশী’ মুসলিম লেখকদের প্রতি ছিলেন সেই সময়ের অন্য হিন্দু লেখকদের চেয়ে ঢের উদার। আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ ও মহাকবি কায়কোবাদের প্রতি তাঁর স্নেহই এর প্রমাণ। নবীন সেন চট্টগ্রামে বিভাগীয় কমিশনারের পিএ থাকাকালে বেকার যুবক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদকে ‘অ্যাপ্রেনটিস’ পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি তরুণ কায়কোবাদের অশ্রুমালা কাব্য পাঠ করে এক চিঠিতে কায়কোবাদকে লিখেছিলেন:
[...] আপনার ‘অশ্রুমালা’ পরম প্রীতিসহকারে পাঠ করিয়াছি এবং স্থানে স্থানে আপনার অশ্রুর সঙ্গে অশ্রু মিশাইয়াছি। জাতিভেদে সকলেই ভিন্ন হইতে পারে, অশ্রু অভিন্ন। যাহার অশ্রু আছে, তাহার কবিত্ব আছে। মুসলমান যে বাঙ্গালা ভাষায় এমন সুন্দর কবিতা লিখিতে পারেন, আমি আপনার উপহার না পাইলে বিশ্বাস করিতাম না। [...] (নবীনচন্দ্র সেন: চিন্তা ও দর্শন, জেলা প্রশাসন-ফেনী, পৃষ্ঠা ১৯, তৃতীয় মুদ্রণ-২০২৩)
নবীনচন্দ্র সেন একদিকে ভারতীয় পুরাণাশ্রয়ী সাহিত্য রচনা করে সে রেনেসাঁয় শামিল থেকেছেন; আবার কর্মসূত্রে ব্রিটিশ সরকারের চাকরিসূত্রে প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে বঙ্গদেশকে গড়ে তুলছিলেন। এ যেন ছিল বাঙালির রেনেসাঁর আরেক সম্প্রসারণ। জনহিতকর কাজকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া নিয়ে ইংরেজ সরকারের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধও হয়েছে।
নবীনচন্দ্র সেন শিশুশিক্ষা নিয়ে তিনি বেশ মনোযোগী। সে সময় পাঠ্যবইকে তিনি ‘শিশুরক্তশোষী’ বলেছেন। এত বছর পর, আজকের দিনে শিশুদের ব্যাগভর্তি বইয়ের কষ্ট বলে দেয়, নবীন সেন কত দূরদর্শী ছিলেন।
তিনি সে সময় সরকারের অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চা–শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। মাদারীপুরে দলাদলি, মারামারি ও মামলা মোকদ্দমা হ্রাস করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। বিহার মহকুমায় তিনি রাস্তাঘাট নির্মাণ, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, চিকিৎসালয় স্থাপন, কবরস্থানের ব্যবস্থা, কুয়া-পায়খানার সংস্কার ইত্যাদি জনহিতকর কাজে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন।
তিনি সে সময় সরকারের অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চা–শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। মাদারীপুরে দলাদলি, মারামারি ও মামলা মোকদ্দমা হ্রাস করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। বিহার মহকুমায় তিনি জনহিতকর কাজে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন।
সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে নবীনচন্দ্র সেনের দৃষ্টি ছিল সচ্ছল। সাহিত্য যে একটি সাধনার বিষয়, তিনি তা মর্মে মর্মে অনুভব করেছেন বলেই সে সময় প্রচলিত প্রচার-প্রপাগান্ডা-নির্ভর চর্চাকে তিনি ঘৃণা করেছেন।
পলাশীর যুদ্ধ কাব্যের ইংরেজি অনুবাদবিষয়ক এক ইংরেজের ঘটনায় আত্মসমালোচনা করে ‘নবীনচন্দ্র রচনাবলী’র দ্বিতীয় খণ্ডের চতুর্থ ভাগের প্রথমাংশে বলছেন, [...] তিনি এমন সুন্দর অনুবাদটি প্রকাশ করিলেন না, আর আমরা বাঙ্গালী এক লাইন অপাঠ্য কবিতা লিখিলে তাহা কেমন করিয়া একটা সভা ডাকিয়া, পড়িয়া শুনাইব এবং তাহা ছাপাইব, তজ্জন্য আহার-নিদ্রা-বঞ্চিত হই। [...] (নবীনচন্দ্র সেন রচনাবলী, ১৪১৯: ৪৯৭)
মহকুমা প্রশাসক হয়ে নবীন সেন ফেনীর উন্নয়নে যে পরিবর্তন সাধন করেছেন, তাকে এককথায় ‘বৈপ্লবিক’ ঘটনা বলা যায়। নবীন সেনের সময় তাঁর উদ্যোগে ফেনীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়। তিনি ফেনী এন্ট্রান্স স্কুল (১৮৮৬) ও ফেনী বাজার (১৮৮৮) প্রতিষ্ঠা করেন। আগের নকশা বদলে ফেনী শহরের ওপর দিয়ে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের পুনর্নকশা প্রণয়ন করেন। ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্রে রাজাঝি দিঘির পূর্ব কোণে ফেনী উপকারাগার (১৮৯০) সংস্কার করেন। এ ছাড়া ফেনী শহরের ডাক্তারপাড়ায় ‘পুরনো হাসপাতাল’খ্যাত বাঁশের তৈরি ডিসপেনসারিটি (১৮৬০) ১৮৯০ সালের দিকে পাকা করেন। স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি ডিসপেনসারিকে সচল করে ওষুধপত্রের ব্যবস্থার পাশাপাশি সব সময় সেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের বাসভবন তৈরি করলেন সেই কম্পাউন্ডে।
বর্তমানের ফেনী শহরকে (সে সময়ের নির্জন পল্লি এলাকা) গড়ে তুলতে তিনি ফেনীর উপশহরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে মুন্সেফ আদালতকে রাজাঝি দিঘির (বর্তমান ফেনী শহরের কেন্দ্রস্থলে) পূর্ব পাড়ে নিয়ে আসেন। এভাবে নবীনচন্দ্র সেন নানা প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে এ জনপদের নাগরিক জীবনের বিস্তৃতি ঘটান। এমন পরিবর্তন তিনি করতে চেয়েছেন—কর্মস্থলের যেখানে ছিলেন, সেখানেই।
‘ফেনী উপনগর’ সৃষ্টির স্বপ্নে বিভোর নবীনচন্দ্র এখানে এসেই প্রথমে রাজাঝি দিঘির চারদিকের উঁচু পাড়কে কেটে অতি সরু চলার পথটিকে প্রশস্ত রাস্তা হিসেবে গড়ে তুললেন। এর চারপাশে বিভিন্ন গাছপালা রোপণ ও বাগান তৈরি করলেন, যা পরিবেশ আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দেয়। দিঘির পূর্ব-দক্ষিণ পাড়ের উপকারাগারকে বর্ধিত ও সংস্কার করেন।
বর্তমান ফেনী শহর সে সময় জনমানবশূন্য ছিল, এ এলাকাটি ‘আবাদ’ করতে তিনি ‘ফেনী বাজার’ গড়ে তুললেন, এভাবে ফেনী শহরের সৃষ্টি। নবীন সেন শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছেন সর্বাধিক। চাঁদা সংগ্রহ করে দিঘির পূর্ব পাড়ে এক খণ্ড জমি ক্রয় করে প্রতিষ্ঠা করলেন এন্ট্রান্স স্কুল, যা বর্তমানে ফেনী সরকারি পাইলট হাইস্কুল।
তিনি আজ থেকে প্রায় ১৪২ বছর আগে ফেনী পাইলট স্কুলের ছাত্রদের জন্য ক্রিকেটের দামি সরঞ্জামের ব্যবস্থা করে শিক্ষার্থীদের এ খেলায় অনুপ্রাণিত করেছেন। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-ক্রীড়াকে সামনে রেখে এগিয়েছেন তিনি।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও যোগাযোগব্যবস্থাকে উন্নত করতে প্রত্যন্ত গ্রামে রাস্তাঘাট-পুল-কালভার্ট তৈরিকে নবীন সেন সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। পাহাড়ি ঢলে প্রতিবছর রাস্তা ভেঙে যেত বলে নবীন সেন খেতের মধ্যে-মধ্যে কালভার্ট তৈরি করার এক অভিনব পরিকল্পনা প্রদান করেন।
ফেনীর মুহুরী নদীর ওপর কাঠের পুল তৈরি ছাড়াও তিনি ‘বড় ফেনী নদীর সঙ্গে যেখানে সমুদ্রের সঙ্গম, সেদিকে প্রায় বারো মাইল এক রাস্তা’ নির্মাণ তাঁর বিশেষ কীর্তি। তাঁর শাসনের শেষ দিকে প্রত্যন্ত গ্রামে তৈরি করা রাস্তায় তিনি ঘোড়ায় চড়ে বেড়িয়েছেন। গ্রাম উন্নয়নে তাঁর সজাগ দৃষ্টি ছিল।
নবীনচন্দ্র সেন ফেনী আসার আগে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের যে নকশা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল, বর্তমান ফেনী থেকে সাত মাইল পশ্চিমে। তিনি তা বদল করে পুনরায় নকশা প্রণয়ন করে তা পাঠালে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ মেনে নেয়। কারণ, তাঁর প্রণীত নকশার কারণে কর্তৃপক্ষের পঞ্চাশ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে। সে সময়ের পঞ্চাশ লাখ টাকা! নবীন সেনের কারণেই ফেনী শহরের ওপর দিয়ে রেললাইন নির্মিত হয়েছে। ফেনীতে পঞ্চায়েত প্রথারও সূচনাকারী তিনি।
নবীনচন্দ্র সেন সংস্কৃতিচর্চার প্রতিও ছিলেন বিশেষ মনোযোগী। তিনি ফেনীতে বার্ষিক ‘বাসন্ত উৎসব’ আয়োজন করে সংস্কৃতির আনুষ্ঠানিক চর্চাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে শিল্পী তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ফেনী বাজারে সরস্বতীপূজা-সংগীতায়োজনের পাশাপাশি পাগলা মিয়ার (রহ.) দরগার সামনে হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর জীবনবৃত্তান্ত পাঠ তথা ‘মৌলুদ শরীফ’–এর ব্যবস্থা করেন। ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সংস্কৃতির এক সহাবস্থানের ছবি নবীনচন্দ্র সেন এঁকেছিলেন সচেতনভাবেই।
কবি ও মহকুমা প্রশাসক নবীনচন্দ্র সেন তাঁর ধারণ করা উপযোগবাদী নানা কর্মকাণ্ড দিয়েই আজকের দিনেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছেন। তিনি একদিকে সাহিত্যে ভাবকে সঙ্গী করে যুগের পরিবর্তন করতে চেয়েছেন; অপর দিকে বস্তুগত অনুষঙ্গকেও গ্রাহ্য করে রেনেসাঁয় শামিল হয়েছেন। যদিও বিষয়টি তেমনভাবে আলোচিত হয় না। কালের ধারায় নবীন সেনের সাহিত্য আজ অনেকটা ‘অপাঠ্য’। কিন্তু তাঁর এসব প্রশাসনিক উন্নয়নচিন্তা আজও সমকালীনতাকে দারুণভাবেই স্পর্শ করে। নবীনচন্দ্র সেনের এই অনালোচিত দিকটির প্রতি আরও আলোকসম্পাত করা সময়ের দাবি।