
চিঠি শুধু খবরের আদান-প্রদান নয়, কখনো তা হয়ে ওঠে মানুষের অন্তর্জগতের দরজা। রবীন্দ্রনাথের বিপুল চিঠির ভুবনে তাই ধরা পড়ে তাঁর নিতান্ত ব্যক্তিগত অনুভব, দৈনন্দিন জীবন ও নিভৃত আত্মকথন। আজ ১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব চিঠি দিবসে সেই চিঠির সূত্রেই ফিরে দেখা যাক চিঠিপ্রিয় রবীন্দ্রনাথকে।
রবীন্দ্রনাথকে সবচেয়ে বেশি অনুধাবন করা যায় কোথায়? নিঃসন্দেহে তাঁর চিঠিতে। চিঠির রবীন্দ্রনাথ ছিলেন রোজকার রবীন্দ্রনাথ। নিজেকে এত অকপটে আর কোথাও তিনি উম্মোচন করেননি। তিনি নিজেই লিখেছেন ‘আমার গদ্য, পদ্যে কোথাও আমার সুখদুঃখের দিনরাত্রিগুলো এরকম করে গাঁথা নেই।’ এমনকি তাঁর আত্মজীবনীতেও যে তাঁকে পাওয়া যাবে না উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘কবিরে পাবে না কবির জীবন চরিতে।’
রবীন্দ্রনাথের চিঠি তাই তাঁকে পাওয়ার সবচেয়ে শুদ্ধতম উপায়। তাঁর মৃত্যুর ৮৫ বছর পরে এসে রবীন্দ্রনাথের চিঠিগুলো পড়লে যেন তাঁর অনুভূতির জগৎকে উপলব্ধি করে ফেলা যায়।
রবীন্দ্রনাথ জীবদ্দশায় সবচেয়ে বেশি চিঠি লিখেছেন নির্মলকুমারী মহলানবিশকে। সংখ্যার হিসাবে যা পাঁচ শর বেশি। নির্মলকুমারী প্রথম চিঠি পেয়েছিলেন ১৯২৫ সালে আর শেষ চিঠিটা ৮ জুন ১৯৪১ সালে। নিজের মেয়ের নামে, রানী নামেই ডাকতেন নির্মলকুমারীকে। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল না তাঁদের, তবে ছিল আত্মার সম্পর্ক। রানীকে লেখা চিঠির বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য দেখে বোঝা যায়, রানীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল এক অনন্য নির্ভরতার, বন্ধুতার, স্নিগ্ধতার। এই চিঠির ভান্ডারের পরতে পরতে তাই দৈনন্দিন রবীন্দ্রনাথকে ছুঁয়ে দেখা যায়। অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য–এর সংকলন ও সম্পাদনায় মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স থেকে ‘নিজের কথা’ নামে প্রকাশিত হয়েছে ৫১১ পৃষ্ঠার এই চিঠির সংকলন। অপেক্ষাকৃত কম চর্চিত রবীন্দ্রনাথের এই চিঠিগুলোতে যেন রয়েছে তাঁকে আবিষ্কারের এক অনন্য সুযোগ।
রানীকে লেখা চিঠি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা চলতে পারে। দেশে বা বিশ্বের রাজনীতি, কবিতা, কবিতা প্রকাশের তাগাদা, ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, শরীরের ক্লান্তি, হোমিওপ্যাথির চর্চা, শরীরের অসুস্থতা নিয়ে রসিকতা, ফুলের সৌরভ, টেবিলের ওপর পড়া একফালি রোদ, বৃষ্টির ঝাপটা, রবীন্দ্রনাথের সহকারী বনমালীর দেওয়া গোসলের তাগাদা, একপাটি জুতার নিখোঁজ হওয়া, ডাকপিয়নের জন্য অপেক্ষা, জন্মদিনের অভিনন্দন, সমালোচনার তীরে ক্ষতবিক্ষত মনের অবস্থা, এমনকি জীবন নিয়ে আক্ষেপ—কী নেই রবীন্দ্রনাথের লেখা চিঠিতে। রবীন্দ্রনাথ এত চমৎকার করে চিঠি লিখতেন—বর্ণনায় যেন ছবির মতো নিখুঁত হয়ে উঠত তার চারপাশ, মনের অবস্থা। নিপুণ বর্ণনায় যেন নিজেকেই খামে ভরে পাঠিয়ে দিতেন প্রাপকের কাছে।
রানীকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কারের পাশাপাশি আরেক বড় পাওয়া চিঠি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনার বিস্তারিত জানা। চিঠিকে তিনি কত নামে, কত উপমায়, কত ঢঙে যে দারুণ করে উপস্থাপন করেছেন, তা চিঠির সঙ্গে পাঠকের নতুন মিতালি তৈরির পথই হয়ে উঠেছে।
চিঠিকে রবীন্দ্রনাথ ভাগ করেছিলেন দুই ভাগে—এক কাজের চিঠি, আরেকটা অকারণে লেখা, অনাবশ্যক চিঠি। কাজের চিঠি লিখতে রবীন্দ্রনাথের কলম সরত না। অকারণে অনাবশ্যক লেখা এসব চিঠিই ছিল রবীন্দ্রনাথের জন্য আচমন। নিজের মনকে পরিষ্কার করার জন্যই দীর্ঘ চিঠি লিখতেন তিনি। চিঠি ছিল তাঁর সঞ্চিত বেদনার প্রকাশ। মনের কথা লেখার এসব চিঠি লিখতে তাঁর কোনো ক্লান্তি ছিল না। উত্তরের প্রত্যাশা না রেখেই নিজের জন্যই রোজ লিখতেন তিনি। প্রতিদিনের ক্লেদ থেকে মনকে মুক্ত করতে, মন খোলাসা করতে চিঠি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। তাই রানীকে লেখা চিঠিগুলো ছিল কখনো এক লাইনের, কখনো বা কয়েক পাতার।
শান্তিনিকেতন থেকে রানীকে লেখা এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘…চিঠিটা হওয়া উচিৎ কলম দিয়ে লেখা নয়, লেখনী দিয়ে লেখা—কলমের লেখা হয়ত চিন্তার খোরাক দেয় কিন্তু লেখনী দেয় সঙ্গ।...চিঠিতে যা লিখি সেটা পুরোপুরি আপন কথা, একেই বলে আত্মপ্রকাশ, নিজের অব্যক্তকে ব্যক্ত করে যাওয়া।’
সাহিত্যের লেখার মধ্যে একধরনের ফরমাশ থাকে, চিঠি সেখান থেকে মুক্ত। তাই চিঠি ছিল তাঁর এত প্রিয়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘মানুষের একটা বিশেষ খাতা আছে—আলগা পাতা—সেটা যা-তা লেখবার জন্য, সে লেখার দামে কথা কেউ ভাবেও না। লেখাটাই তার লক্ষ্য, কথাটা উপলক্ষ। সে রকম লেখা চিঠিতে ভালো চলে; আটপৌরে লেখা,––তার না আছে মাথার পাগড়ি, না আছে পায়ে জুতো। পরের কাছে পরের বা নিজের কোন দরকারে নিয়ে সে যায় না; সে যায় যেখানে বিনা দরকারে গেলেও জবাবদিহি নেই, যেখানে কেবলমাত্র বকে যাওয়ার জন্যই যাওয়া আসা।…
ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী, রাণু মুখোপাধ্যায়, হেমন্তবালা দেবী এবং নির্মলকুমারী মহলানবিশ—এই চার নারী রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বেশি চিঠি পেয়েছেন। নিজের কথা গ্রন্থের ভূমিকায় অমিত্রসূদন লিখেছেন ‘কোন কোন নারীকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের যে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ উচ্ছ্বাস আকুলতা—আত্মপ্রকাশের যে অন্তরঙ্গ ঐকান্তিকতা লক্ষ করা যায়, তা তেমনভাবে পুরুষকে লেখা চিঠিতে খুঁজে পাওয়া যাবে না।’
চিঠি পাঠাতে তখনকার দিনে পাঁচ পয়সা খরচ হতো বলে রবীন্দ্রনাথ চিঠিকে বলেছেন ‘পাঁচ পয়সার নৈবদ্য’। চিঠি লিখেছেন পরিচিত অপরিচিত অসংখ্য মানুষকে। সারা জীবনই তিনি চিঠি লেখার জন্য দিনের কিছুটা সময় ব্যয় করেছেন। তাঁর কাছে চিঠি লেখা ছিল যেন নিজের সঙ্গেই নিজের কথোপকথন। শান্তিনিকেতন থেকে এক শ্রাবণে রানীকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন ‘তাই আজ চিঠি লিখিনে, স্বগত উক্তি করে যাই। জীবনের জানালায় বসে বাইরের দিকে তাকাবার অভ্যাস চলে গেছে—এখন মনের ভিতরের দিকে তাকিয়ে বক্তব্য সংগ্রহ করে চলি।… আমার নিজের সেদিনকার চিঠি যেন আমার আজকের এই দিনকে লেখা।’