
১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর। হোটেল পূর্বাণী থেকে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার ও গৃহবন্দী করার নাটকীয় মুহূর্তগুলো রাষ্ট্রক্ষমতা ও প্রতিরোধের সংঘর্ষকে নগ্নভাবে সামনে এনে দিয়েছিল। এই লেখা কোনো পুনর্লিখিত ইতিহাস নয়। এটি গড়ে উঠেছে সেই দিনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী, দ্য নিউ নেশন-এর আলোকচিত্রী এ কে এম মহসীনের স্মৃতি ও ক্যামেরার ফ্রেম ধরে।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন বেশ তুঙ্গে। প্রতিদিনই চলছে হরতাল। এরশাদ সরকার তা কঠিন হস্তে দমনের চেষ্টা করছে। কিন্তু পুলিশের গুলিতে নূর হোসেন নিহত হওয়ার ঘটনায় সারা দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এরশাদ সরকার বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে নিজ গৃহে অন্তরিণ করে রাখে। এই ঘটনায় এত দিন ধরে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের যে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছিল, তা দাবানলে পরিণত হয়। দাবানল থামাতে এক মাস পর তাঁকে বাধ্য হয়ে মুক্তি দেওয়া হয়। তাতেও সিংহাসন রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। গৃহবন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে খালেদা জিয়া ঘোষণা করেন স্বৈরাচার হটানোর এক দফা কর্মসূচি।
১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর। সেদিন ছিল হরতাল। হরতাল সফল করতে আগের রাতে অধ্যাপিকা জাহানারা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে হোটেল পূর্বাণীতে ওঠেন খালেদা জিয়া। হোটেলের ৯০১ নম্বর ভিআইপি স্যুটে তাঁরা অবস্থান করেন।
ওই সময় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার ও অন্তরিণ করে রাখার ঘটনা কাভার করেছিলেন দ্য নিউ নেশন পত্রিকার নিজস্ব আলোকচিত্রী এ কে এম মহসীন। নাইকন এফএম-টু ক্যামেরা আর সাদাকালো আরও ফিল্মে তুলেছিলেন ওই দিনের গ্রেপ্তার নাটকের শুরু থেকে গৃহে প্রবেশের শেষ মুহূর্তের ছবি। তাঁর তোলা ছবিগুলো এখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের এক অসামান্য দলিল। তাঁর কাছে জানতে চাই সেদিনের ঘটনা। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তিনি জানালেন সেদিনের অনেক অজানা কথা।
১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর। সেদিন ছিল হরতাল। হরতাল সফল করতে আগের রাতে অধ্যাপিকা জাহানারা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে হোটেল পূর্বাণীতে ওঠেন খালেদা জিয়া। হোটেলের ৯০১ নম্বর ভিআইপি স্যুটে তাঁরা অবস্থান করেন। পাশের ৯০৪ নম্বর স্যুটে ওঠেন বিএনপি মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমান ও ঢাকা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান। খালেদা জিয়া অন্য কারও নামে স্যুটটি ভাড়া করেছিলেন। তাই গোয়েন্দাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য ছিল না। তারা খবর পায় পরদিন সকালে। সোয়া ১০টার দিকে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের ডেপুটি কমিশনার ওসমান আলী খানের নেতৃত্বে একদল পুলিশ হোটেল পূর্বাণী ঘিরে ফেলে। এই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের অসংখ্য আলোকচিত্রী ও প্রতিবেদক সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন। পুলিশ সাংবাদিকদের ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়।
পুলিশ খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করতে হোটেলের দশতলায় ওঠে। তাদের সঙ্গে ঢুকে পড়েন এ কে এম মহসীন ও দৈনিক বাংলার আলোকচিত্রী কামরুজ্জামান। পুলিশ প্রথমে ওবায়দুর রহমান ও সাইদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। ওই সময় খালেদা জিয়ার স্যুটটি বন্ধ ছিল। ট্রাফিকের ডিসি স্যুটের দরজা খোলার জন্য খালেদা জিয়াকে বারবার অনুরোধ করেন। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ডুপ্লিকেট চাবি চেয়ে নেন। স্যুটের দরজা খুলে দেখা গেল খালেদা জিয়ার বেডরুমের দরজা বন্ধ।
যেকোনো উপায়ে দরজা ভেঙে পুলিশ সদস্যদের ভেতরে প্রবেশের নির্দেশ দেন কমিশনার। পুলিশ উপর্যুপরি লাথি মেরে খালেদা জিয়ার বেডরুমের দরজাটি ভেঙে ফেলে। এরপর নসরুল্লাহ খান ১০ জন পুলিশ নিয়ে বেডরুমে ঢুকে পড়েন।
১১টা ৫০ মিনিটে ঘটনাস্থলে আসেন পুলিশ কমিশনার নসরুল্লাহ খান। এসেই তিনি সাংবাদিকদের করিডর থেকে সরানোর চেষ্টা করেন। তাতে পুলিশের সঙ্গে সাংবাদিকদের বাদানুবাদ বেধে যায়। এ সময় ওয়াকিটকিতে খবর আসে, ‘বড় একটি মিছিল পূর্বাণীর দিকে আসছে। এখনই খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা না গেলে সমস্যা হবে।’ যেকোনো উপায়ে দরজা ভেঙে পুলিশ সদস্যদের ভেতরে প্রবেশের নির্দেশ দেন কমিশনার। পুলিশ উপর্যুপরি লাথি মেরে খালেদা জিয়ার বেডরুমের দরজাটি ভেঙে ফেলে। এরপর নসরুল্লাহ খান ও ওসমান আলী ১০ জন পুলিশ নিয়ে বেডরুমে ঢুকে পড়েন। তাঁদের সঙ্গে আরও ৫ জন নারী পুলিশ। খালেদা জিয়া তখন সোফায় বসে একটি ইংরেজি পত্রিকা পড়ছিলেন। পাশের সোফায় জাহানারা বেগম।
খালেদা জিয়া উত্তেজিত কণ্ঠে পুলিশ কমিশনারকে প্রশ্ন করেন, ‘কার অনুমতি নিয়ে আপনারা আমার বেডরুমে প্রবেশ করেছেন?’ পুলিশ কমিশনার বললেন, ‘আপনাকে আমাদের সঙ্গে কন্ট্রোল রুমে যেতে হবে।’ খালেদা জিয়া বললেন, ‘আমি ব্রেকফাস্ট করব, তারপর যাব। আপনারা বাইরে যান। আমি রুম থেকে পালাব না।’ পুলিশ কমিশনার বললেন, ‘আপনার নিরাপত্তার জন্য আমরা আপনাকে হেফাজতের নিয়ে যাব।’ খালেদা জিয়া বললেন, ‘আমি বাসায় যাব না। বাসায় আমার অসুস্থ মা, বোন ও ছেলেরা আছে। বাসায় নিয়ে গেলে আমার ছেলেদের পড়াশোনার অসুবিধা হবে। গতবার আপনারা আমাকে জেলে নেবার কথা বলে বাসায় নিয়ে গেছেন।’ পুলিশ কমিশনার বললেন, ‘আমরা আপনাকে কথা দিচ্ছি, অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে।’ তখন খালেদা জিয়া আঙুল উঁচিয়ে বললেন, ‘আপনারা বরাবরই মিথ্যা কথা বলেন।’ পুলিশ কমিশনার বললেন, ‘আমি দুঃখিত, আপনাকে আসতে হবে।’
খালেদা জিয়া অনড়। তিনি এখান থেকে নড়বেন না। দৃঢ়চেতা খালেদা জিয়ার সামনে পুলিশ কমিশনার কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর নারী পুলিশদের নির্দেশ দেন খালেদা জিয়াকে উঠিয়ে আনার জন্য। নারী পুলিশরা খালেদা জিয়ার কাছে গিয়ে গায়ে হাত দেয়ামাত্র তিনি অগ্নিমূর্তিরূপ ধারণ করেন। বললেন, ‘আপনারা সরে যান। গ্রেপ্তার-নির্যাতন চালিয়ে আন্দোলন স্তব্ধ করা যাবে না। স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিবাজ সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।’ নারী পুলিশরা খালেদা জিয়াকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে বেডরুম থেকে করিডরের সামনে নিয়ে আসে। করিডর দিয়ে হেঁটে আসার সময় সাংবাদিকেরা খালেদা জিয়াকে ঘিরে ধরেন। একজন সাংবাদিক জানতে চান ওয়ারেন্ট নিয়ে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে কি না? খালেদা জিয়া বলেন, ‘পুলিশ আমাকে কোনো ওয়ারেন্ট দেখায়নি।’ সাংবাদিকদের সামনে তিনি পুলিশ কমিশনারকে বলেন, ‘আমাকে গ্রেপ্তারের ওয়ারেন্ট দেখান।’ পুলিশ এ সময় নীরব থাকে। খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের জানান, ‘আমরা যেখানেই থাকি না কেন, আন্দোলন চলবে।’
১২টা ২০ মিনিটে লিফট দিয়ে খালেদা জিয়া ও তাঁর তিন সতীর্থ নেতাকে নিচে নামিয়ে আনা হয়। হোটেলের ফটকের সামনে অপেক্ষমাণ ইউএসএইড প্রকল্পের একটি জিপে [ঢাকা মেট্রো–ঘ–৯২৬২] তুলতে চাইলে খালেদা জিয়া তীব্র প্রতিবাদ জানান। পুলিশের উদ্দেশে বলেন, ‘জবরদস্তি করবেন না। শক্তি প্রয়োগ করবেন না। আমি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা কথা বলছি। আমাকে যেখানে নিচ্ছেন, সাংবাদিকেরাও সেখানে যাবে।’ ওবায়দুর রহমান এবং সাইদুর রহমানকে তোলা হয় পুলিশের অন্য একটি জিপে [ঢাকা–ঘ–৯২৬৩]। খালেদা জিয়াকে জোরপূর্বক জিপে ওঠানোর চেষ্টা করা হলে তিনি জিপের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁকে জিপের মধ্যে বসানোর জন্য শত চেষ্টা করেও পুলিশ ব্যর্থ হয়। দৈনিক বাংলার মোড় পর্যন্ত জিপে দাঁড়িয়ে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়ানো জনতার উদ্দেশে হাত নাড়েন। জনতা স্লোগান দিতে শুরু করে, ‘খালেদা জিয়া যেখানে, আমরা আছি সেখানে’, ‘হরতাল হরতাল চলবে চলবে’। খালেদা জিয়াকে নিয়ে পুলিশের কনভয় দ্রুত ছুটে যাবার সময় রাজমনি হলের অদূরে জিপের সামনে একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়।
এয়ারপোর্ট ও মহাখালী হয়ে খালেদা জিয়াকে গুলশান থানায় নেওয়া হয়। সাংবাদিকদের বহু স্কুটার ও মোটরবাইক পুলিশের গাড়িবহর অনুসরণ করে। গিয়াস কামাল চৌধুরী, গোলাম সারওয়ার, কাশেম হুমায়ুন ও হাসান আবুল কাশেমের মতো বাঘা বাঘা সাংবাদিককে পুলিশ থানার গেটে আটকে দেয়। সাংবাদিকেরা বাইরে অপেক্ষা করতে থাকেন। থানার ভেতর দফারফা চলছে—খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে নাকি বাসায় অন্তরিণ রাখা হবে। এক ঘণ্টা পর সরকারের উচ্চ মহল থেকে অন্তরিণ রাখার নির্দেশ আসে। বেলা ২টা ৪ মিনিটে পুলিশ খালেদা জিয়া ও জাহানারা বেগমকে গুলশান থানা থেকে জিপে করে ক্যান্টনমেন্টের উদ্দেশে রওনা হয়। ওবায়দুর রহমান ও সাইদুর রহমানকে পাঠানো হয় নাজিমুদ্দিন রোডের দিকে।
পুলিশের কনভয় পুরোনো ডিওএইচএস থেকে ক্যান্টনমেন্টের মেইন গেটে ঢোকার সময় খালেদা জিয়া জিপ থেকে নেমে পড়েন। পুলিশ কমিশনার নসরুল্লাহ খানকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, ‘আপনারা ইউনিফর্ম পরে বারবার মিথ্যা কথা বলছেন। আমাকে সড়ক ও জনপথ বিভাগের রেস্টহাউসে নিয়ে যাবার কথা বলে এখানে নিয়ে এলেন কেন? আমি বাসায় যাব না, আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে না পারলে জেলে নিয়ে যান।’ ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোড়ের বাড়িতে প্রবেশে অস্বীকৃতি জানালে পুলিশ কমিশনার খালেদা জিয়াকে বারবার ভেতরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। একপর্যায়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমি যেতে পারি, তবে সাংবাদিকেরাও আমার সঙ্গে যাবে।’ পুলিশ কমিশনার তাঁর কথায় সম্মতি জানালেন। খালেদা জিয়া প্রায় ১৫ মিনিট হেঁটে তাঁর বাসভবনের গেটে পৌঁছান। তিনি সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন। এ সময় প্রচুর দাঙ্গা পুলিশ তাঁদের চারপাশে ঘিরে থাকে।
বাসভবনের গেটের সামনে গিয়ে তিনি রাস্তায় বসে পড়েন। খবর পেয়ে বেরিয়ে আসেন তারেক রহমান, বড় বোন, অন্য আত্মীয়স্বজন। তাঁরা খালেদা জিয়ার কুশল জানতে চান। মিনিট পাঁচেক বসে থাকার পর খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের নিয়ে তাঁর বাসভবনের প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় পুলিশ তাঁর বাসার প্রধান ফটক বন্ধ করে দেয়। তখন খালেদা জিয়া আবার গেটের কাছে ফিরে আসেন। পুলিশদের উদ্দেশে বলতে থাকেন, ‘এত ভয় পাচ্ছেন কেন? দেশের সর্বনাশ যারা করছে, তাদের গেট তো বন্ধ করতে পারেন না। মিথ্যাবাদী পুলিশ কমিশনার কোথায়, তাঁকে ডাকুন।’ কর্তব্যরত পুলিশরা খালেদা জিয়ার মুখের দিকে নির্বাক তাকিয়ে থাকেন। ২টা ৪৪ মিনিটে সাংবাদিকদের বিদায় জানিয়ে তিনি গৃহে প্রবেশ করেন।