
পুতুল নাচিয়ে তিনি শুধু শিশুদের হাসাননি, কথা বলেছেন সময় ও সমাজেরও। কার্টুন থেকে পাপেট, টেলিভিশন থেকে মুক্তিযুদ্ধ—শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের ৯১ বছরের জীবন যেন বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির এক চলমান ইতিহাস। জন্মদিনে ফিরে দেখা তাঁর বহুমাত্রিক শিল্পজীবন।
আমাদের শিক্ষক পাপেটশিল্পের রূপকার শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। যিনি বাংলার অপরূপ চিত্র এঁকেছেন পাপেটের গল্পে। যিনি ভাষা আন্দোলনের কিশোর কার্টুন আর্টিস্ট থেকে মুক্তিযুদ্ধের সাংস্কৃতিক যোদ্ধা।
টেলিভিশনের জাদুকরি নন্দনতত্ত্বের শিক্ষক। আর আমাদের মুক্তচিন্তা এবং শিল্পকলার রূপকথার এক অনন্য জাদুকর। তিনি পাপেটের গল্পকথায় বাংলার মানুষের মনের ছবি ফুটিয়ে তুলেছিলেন। সেই পাপেট কখনো শিশুর বন্ধু, সমাজের আয়না, কখনো প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর। আবার কখনো যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিল মনে বল দেওয়ার মাধ্যম।
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট তাই নিছক পুতুল নয়। তাঁর হাতে পুতুল হয়ে উঠেছিল মানুষের মনের ভাষা, অন্তরের কারিগর।
বাংলাদেশের পাপেটশিল্পের পথিকৃৎ, বরেণ্য চিত্রশিল্পী, টেলিভিশন নির্মাতা, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক মুস্তাফা মনোয়ার চলে গেছেন ২০২৬ সালের ২৯ জুন। কিন্তু তাঁর ৯১ বছরের জীবন যেন বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির এক অনন্য চলমান দলিল।
১ সেপ্টেম্বর মুস্তাফা মনোয়ারের জন্মদিন। ১৯৩৫ সালের এই দিনে মাগুরার নাকোল গ্রামে জন্মেছিলেন তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা, মা জমিলা খাতুন। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা, গান, প্রকৃতি আর গ্রামবাংলার সংস্কৃতি তাঁর মনে ছবি এঁকে দেয়। আর এই স্মৃতিপটে তৈরি হয় মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা। গ্রামের পুতুলনাচ, বাবার ফটোগ্রাফি এবং চারপাশের মানুষ ও প্রকৃতি তাঁর শিল্পীসত্তার ভিত গড়ে দেয়। কিন্তু এই শিল্পীর প্রথম বড় পরিচয় পাপেট দিয়ে নয়—প্রতিবাদ দিয়ে।
১৯৫২: যে কিশোর কার্টুন চিত্র এঁকে জেলে গেল!
১৯৫২ সালে মুস্তাফা মনোয়ার তখন নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। অল্প বয়স কিন্তু সময়টা ছিল উত্তাল। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তখন পূর্ব বাংলার মানুষ রাজপথে। কিশোর মুস্তাফা মনোয়ারও সেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ভাষা আন্দোলনের পক্ষে কার্টুন আঁকেন। সেই কার্টুনচিত্রই হয়ে ওঠে তাঁর ‘গুরুতর অপরাধ’। আর এই আপরাধেই পাকিস্তানি সরকারের রোষানলে পড়ে তাঁকে গ্রেপ্তার হতে হয় এবং প্রায় এক মাস কারাগারে বন্দী করে রাখে এই কিশোর শিল্পীকে।
শিল্পের মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ—এই বিশ্বাসটি সম্ভবত তখনই তাঁর মধ্যে আরও গভীরভাবে গড়ে উঠেছিল।
পরবর্তী জীবনে তিনি বহুবার দেখিয়েছেন—শিল্প শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়; শিল্পকর্ম মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও শক্তি আর প্রতিবাদের হাতিয়ার বটে।
আমাদের শহীদ মিনারে তাকালেই দেখতে পাই লাল সূর্যের দৃশ্যকাব্য! এই লাল সূর্যটি তিনি জুড়ে দিয়েছেন। তাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের প্রতীকী লাল সূর্যের নকশার সঙ্গেও তাঁর নাম লেখা আছে।
আজকের চোখে সেই ঘটনাটি হয়তো একটি সম্প্রচার-সিদ্ধান্ত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক শাসনের অধীনে এটি ছিল বড় ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। টেলিভিশনের পর্দা সেদিন একটি পতাকা দেখায়নি। কিন্তু সেই না-দেখানোই হয়ে উঠেছিল একধরনের ঘোষণা। আর এই অপরাধে পাকিস্তানি আর্মি খুঁজতে থাকে তাঁকে। এরপর যুদ্ধ, কলকাতা এবং শরণার্থীশিবির।
চিত্রশিল্পী থেকে টেলিভিশনের নতুন ভাষার কারিগর
ম্যাট্রিকের পর কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছিলেন কিন্তু মন টেকেনি। শিল্পের টানে ভর্তি হন কলকাতা সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে।
১৯৫৯ সালে চারুকলায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক নিয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি। দেশে ফিরে শিক্ষকতা শুরু করেন ঢাকা আর্ট কলেজে।
কিন্তু তাঁর সামনে তখন আরও একটি নতুন ক্যানভাস ‘টেলিভিশন’–এর আগমন ঘটে।
১৯৬০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তানে টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হলে মুস্তাফা মনোয়ার বুঝতে পেরেছিলেন—এই নতুন মাধ্যম শুধু বিনোদনের জন্য নয়। ঘরে ঘরে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি ও বাঙালির নিজস্ব নন্দনতত্ত্ব পৌঁছে দেওয়ার অসাধারণ মাধ্যম হবে এই নব্য আগত টেলিভিশন।
তাই চারুকলার শিক্ষকতার নিরাপদ জগৎ ছেড়ে তিনি টেলিভিশনে যোগ দিলেন।
যাত্রা শুরু হলো পৃথিবীর নতুন মাধ্যম টেলিভিশনশিল্পের কলাকৌশল আর দৃশ্যকল্পের নন্দনতত্ত্বের গল্পের।
‘আজব দেশ’: পাপেটের আড়ালে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ
ষাটের দশকের টেলিভিশনে তাঁর ‘আজব দেশ’ ছিল এক অভিনব প্রয়াস। বাঘা ও মেনি নামের পাপেট চরিত্রের মাধ্যমে তিনি সমাজ ও সময়ের নানা অসংগতি তুলে ধরতেন। গল্পে গল্পে পাকিস্তানি শাসকদের বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী অবস্থান নিয়েও ব্যঙ্গ করা হতো এই অনুষ্ঠানে।
সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য সব সময় বলা সম্ভব হয় না। কিন্তু পুতুলের মুখে বলা যেত অনেক কথা।
এই জায়গাটিই মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পীসত্তার বিশেষত্ব। তিনি শুরুতেই এই আলোছায়ার মাধ্যমকে বুঝতে পেরেছিলেন। আর সূক্ষ্মভাবেই জানতেন কখনো সরাসরি আর কখনো ইঙ্গিতে পাপেটের একটি চাহনিই যথেষ্ট।
স্মৃতি ২৩ মার্চ ১৯৭১: পতাকা না দেখানোর সেই রাত
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের জীবনের সবচেয়ে সাহসী অধ্যায়গুলোর একটি ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ।
সেদিন ছিল পাকিস্তান দিবস। তৎকালীন টেলিভিশনের নিয়ম অনুযায়ী দিনের অনুষ্ঠান শেষে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা দেখানোর নিয়ম ছিল। কিন্তু মার্চের সেই উত্তাল সময়ে বাঙালির মন তখন স্বাধীনতার দিকে। মুস্তাফা মনোয়ারসহ টেলিভিশনের কয়েকজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন—সেদিন পর্দায় পাকিস্তানের পতাকা দেখানো হবে না।
কীভাবে সম্ভব হলো
অনুষ্ঠান সাধারণত রাত ১০টার দিকে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু সেদিন অনুষ্ঠানসূচি বাড়াতে বাড়াতে রাত ১২টা পার করে দেওয়া হলো। তারিখ বদলে গেল। ২৩ মার্চ শেষ হয়ে ২৪ মার্চ শুরু হলো। ফলে পাকিস্তান দিবসের নিয়ম মেনে পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শনের প্রয়োজন আর রইল না।
আজকের চোখে সেই ঘটনাটি হয়তো একটি সম্প্রচার-সিদ্ধান্ত বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক শাসনের অধীনে এটি ছিল বড় ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ।
টেলিভিশনের পর্দা সেদিন একটি পতাকা দেখায়নি। কিন্তু সেই না-দেখানোই হয়ে উঠেছিল একধরনের ঘোষণা। আর এই অপরাধে পাকিস্তানি আর্মি খুঁজতে থাকে তাঁকে। এরপর যুদ্ধ, কলকাতা এবং শরণার্থীশিবির।
এই পাপেট শোর দৃশ্য মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিনের ক্যামেরায় ধারণ করা হয়। অনেক পরে সেই ফুটেজের কিছু অংশ ব্যবহার করে তারেক মাসুদের বিখ্যাত প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’ ও আমার পরিচালিত ‘পাপেট ৭১’ অনুষ্ঠানটি নির্মাণ করা হয়। অর্থাৎ শরণার্থীশিবিরের সেই ছোট্ট পুতুলমঞ্চ একসময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক দৃশ্যপটের অংশ হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই মুস্তাফা মনোয়ার কলকাতায় পালিয়ে চলে যান। প্রথমে ভারতের আগরতলা পৌঁছান, কলকাতায় গিয়ে স্বাধীনতার পক্ষে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। তিনি ওয়াহিদুল হক আর সন্জীদা খাতুনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি নিজেকে যুক্ত করেন।
কলকাতায় গিয়ে তিনি যে দৃশ্য দেখলেন, তা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
শরণার্থীশিবিরে হাজার হাজার মানুষ। খাদ্য আছে, কাপড়ও আছে, আশ্রয়ের চেষ্টা চলছে কিন্তু কারও মুখে হাসি নেই। শিশুরা খেলছে না।
চারদিকে যুদ্ধের আতঙ্ক, ঘর হারানোর কষ্ট, স্বজন হারানোর বেদনা সবারই মুখে। এ দৃশ্য দেখে মুস্তাফা মনোয়ার ভাবলেন—এই মানুষগুলোর জন্য শুধু খাবার নয়, একটু আনন্দও দরকার। মনে বল দেওয়া আরও বেশি প্রয়োজন! তাই সেখান থেকেই শুরু হলো পাপেট শো।
তিনি কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে পুতুল তৈরি করলেন। কৃষক, মুক্তিযোদ্ধা, ইয়াহিয়া খান—এসব চরিত্র নিয়ে জিয়াউদ্দিন তারিক আলী, সাইদুল আনাম টুটুলকে পাপেট আর্টিস্ট করে তৈরি হলো পাপেট নাটক। দর্শকদের ঠিক সামনে লাকড়িতে আগুন জ্বালিয়ে তৈরি করা হতো মঞ্চে পাপেটের জন্য আলো। ‘আগাছা’, ‘রাক্ষস’ ও ‘একজন সাহসী কৃষক’-এর মতো পাপেট নাটক শরণার্থীশিবিরে প্রদর্শিত হতে লাগল।
‘আগাছা’ ছিল বিশেষভাবে প্রতীকী। জমির ক্ষতিকর আগাছা যেমন ফসল নষ্ট করে, তেমনি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কীভাবে বাংলার সমাজ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নষ্ট করছে—পাপেটের সহজ ভাষায় সেই কথাই বলা হতো। একটি পাপেট নাটক তখন হয়ে উঠত যুদ্ধের ভাষা। আর এই পাপেট সবার মনে শক্তি ও মুখে হাসি ফুটিয়ে ছিল।
শরণার্থীশিবিরে পাপেট দেখানোর সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল দর্শকের প্রতিক্রিয়া। যুদ্ধের ভয় ও দুঃখে মুখ ভার হয়ে থাকা শিশুরা যখন হাসতে শুরু করল, তখন মুস্তাফা মনোয়ার বুঝলেন—তিনি শুধু একটি অনুষ্ঠান করেননি; তিনি মানুষের মন থেকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও যুদ্ধের অন্ধকার সরিয়ে দিতে পেরেছেন।
তিনি আমাদের বলতেন, শরণার্থীরা খাবার ও কাপড় পাচ্ছিল কিন্তু মানুষের জীবনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় মুখের হাসি হারিয়ে গিয়েছিল। পাপেট শোর মাধ্যমে আমি সেই হাসিটুকু ফিরিয়ে আনতে করেছিলাম।
এই পাপেট শোর দৃশ্য মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিনের ক্যামেরায় ধারণ করা হয়। অনেক পরে সেই ফুটেজের কিছু অংশ ব্যবহার করে তারেক মাসুদের বিখ্যাত প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’ ও আমার পরিচালিত ‘পাপেট ৭১’ অনুষ্ঠানটি নির্মাণ করা হয়। অর্থাৎ শরণার্থীশিবিরের সেই ছোট্ট পুতুলমঞ্চ একসময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক দৃশ্যপটের অংশ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের বহু প্রযোজক, শিল্পনির্দেশক, ক্যামেরাশিল্পী ও কলাকুশলী তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন। আলোর গতিপথ, কীভাবে আলো ব্যবহার করতে হয়, ফ্রেমের কম্পোজিশন কীভাবে সাজাতে হয়, একটি গল্পের আবেগ কীভাবে দৃশ্যের রূপ পাল্টে দিতে পারে। তিনি শুধু ক্লাসে বক্তৃতা দিতেন না; জাদুকরিভাবে কাজের মধ্য দিয়ে, চিত্র এঁকে শেখাতেন। মন্ত্রমুগ্ধ হতাম আমরা।
স্বাধীনতার পর পাপেটের নতুন জীবন
স্বাধীনতার পর শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার ফিরে এলেন নতুন বাংলাদেশের টেলিভিশনে।
১৯৭২ সালে শুরু হলো শিশুদের প্রতিভা অন্বেষণের অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’। যার রূপকারও তিনি। পরে অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের বহু প্রজন্মের শিশুর স্বপ্নের মঞ্চ হয়ে ওঠে।
‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানে এল পারুলসহ নানা চরিত্র। তাঁর সৃষ্টি ‘পারুল’ পরবর্তীকালে দক্ষিণ এশিয়ার কোটি শিশুর পরিচিত চরিত্র ‘মীনা’র সৃষ্টির ক্ষেত্রেও অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
পুতুলকে তিনি কখনো কৃত্রিম করে তোলেননি। কাঠ, বাঁশ, মাটি, কাপড়ের সহজ উপকরণে তৈরি পুতুলকে তিনি প্রাণ দিতে পাপেটের চিত্রকল্পে অভিনয়, আলো, সুর-সংগীত, কণ্ঠ আর গল্পের জাদুর মধ্য দিয়ে আমাদের নিয়ে যেতেন রূপকথার কল্পনার জগতে। সিসিমপুরের উপদেষ্টাও ছিলেন তিনি। আর মীনার কথা তো আগেই বলেছি।
‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ থেকে ‘রক্তকরবী’
মুস্তাফা মনোয়ার শুধু শিশুদের পাপেট অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। টেলিভিশন নাটকেও তিনি নতুন দৃশ্যকল্পের নন্দনতত্ত্ব দেখিয়েছেন।
মুনীর চৌধুরীর অনুবাদে শেক্সপিয়ারের ‘দ্য টেমিং অব দ্য শ্রু’–এর টেলিভিশন রূপ ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ। ছোট্ট স্টুডিও প্রযুক্তিহীন সময় আর সীমিত অর্থ থেকে সেট, লাইট, শব্দ আর ক্যামেরায় দৃশ্য ধারণে তিনি অসাধারণ দৃশ্যকল্প তৈরি করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ টেলিভিশন নাটকের রূপ ও শৈলীতে তাঁর শিল্পীসত্তার অনন্য এক পরিচয় পাওয়া যায়। এই কাজগুলো পরবর্তীকালে যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টেলিভিশনের ‘ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি অব টিভি ড্রামা’ প্রকল্পে স্বীকৃতি পায়। চিত্রশিল্পী হওয়ার কারণে তাঁর ক্যামেরা ছিল তুলির মতো।
আলো ছিল অনুভূতি প্রকাশের রং। সেট শুধু একটি ঘর ছিল না, ছিল চরিত্রের মানসিক জগৎ তৈরির ক্ষেত্র। আর ক্যামেরার ফ্রেম ছিল একটি চলমান ক্যানভাস।
‘মিশুক’: শিল্পীর আরেক পরিচয়
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের সৃজনশীলতার বিস্তার বোঝা যায় ‘মিশুক’ নামটির মধ্যেও। দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাসকট ‘মিশুক’-এর নকশাও তাঁর সৃষ্টি।
একজন শিল্পী একই সঙ্গে পাপেট তৈরি করছেন, টেলিভিশন নাটক নির্মাণ করছেন, শিশুদের অনুষ্ঠান বানাচ্ছেন, জাতীয় প্রতীকের নকশায় কাজ করছেন—এমন বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতা বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে বিরল।
শিক্ষক মুস্তাফা মনোয়ার
তাঁর আরেকটি বড় পরিচয়, তিনি ছিলেন সর্বদা শিক্ষক। বাংলাদেশ টেলিভিশনের বহু প্রযোজক, শিল্পনির্দেশক, ক্যামেরাশিল্পী ও কলাকুশলী তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছেন। আলোর গতিপথ, কীভাবে আলো ব্যবহার করতে হয়, ফ্রেমের কম্পোজিশন কীভাবে সাজাতে হয়, একটি গল্পের আবেগ কীভাবে দৃশ্যের রূপ পাল্টে দিতে পারে। তিনি শুধু ক্লাসে বক্তৃতা দিতেন না; জাদুকরিভাবে কাজের মধ্য দিয়ে, চিত্র এঁকে শেখাতেন। মন্ত্রমুগ্ধ হতাম আমরা। আমার মতো অনেক শিক্ষার্থীর স্মৃতিতে সেই শিক্ষাই জীবন্ত স্মৃতি।
তাঁর কাছে শিল্পকর্ম কখনো শুধু সৌন্দর্য ছিল না—শিল্পকর্ম ছিল প্রতিবাদ, ভালোবাসা, মুক্তি এবং মানুষের মুখে হাসি ফিরিয়ে দেওয়ার একটি উপায়। এ কারণেই তিনি চলে গিয়েও থেকে গেছেন আমাদের হৃদয়ে। একটি পুতুলের চোখে। একটি শিশুর হাসিতে। একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের ফ্রেমে। আর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দীর্ঘ স্মৃতিতে।
প্রশাসনের বড় পদেও পাপেট ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার বাংলাদেশ টেলিভিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ডিরেক্টর জেনারেল হয়েও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন, শিশু একাডেমিসহ বহু প্রতিষ্ঠানে সরাসরি শিল্পকলার নানা বিষয়ে সরাসরি কাজ করেছেন।
পদ যত বড় হয়েছে কিন্তু পাপেট তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যায়নি। কারণ, তাঁর কাছে পাপেট ছিল শুধু শিশুদের বিনোদন নয়, পাপেট ছিল মানুষের কাছে পৌঁছানোর সহজতম ভাষাগুলোর একটি। শেষ পর্যন্ত তিনি থেকে গেছেন শিশুদের মনন গঠনে আর বড়দের চিত্তে।
২০০৪ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন মুস্তাফা মনোয়ার। ২০১৭ সালে পান দ্য ডেইলি স্টার ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের আজীবন সম্মাননা। কিন্তু পুরস্কারের তালিকা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় নয়, তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো সেই শিশু, যে টেলিভিশনের সামনে বসে পারুলকে দেখছেন। সেই শরণার্থী শিশু, যে যুদ্ধের মাঝখানে তাঁর পাপেট দেখে হেসেছিল। সেই কিশোর, যে ‘নতুন কুঁড়ি’ দেখে নিজের স্বপ্ন বুনে ছিল। সেই তরুণ নির্মাতা, যে তাঁর কাছ থেকে শিখেছে আলো দিয়ে কীভাবে গল্প বলা যায়। আর সেই দর্শক, ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ বা ‘রক্তকরবী’ দেখে বুঝেছেন টেলিভিশনও একটি মনন গঠনের শিল্পমাধ্যম হতে পারে।
মুস্তাফা মনোয়ার ২০২৬ সালের ২৯ জুন চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর জীবনের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, তিনি আসলে একটিমাত্র শিল্পের মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন সময়ের শিল্পী। ১৯৫২-তে তাঁর হাতে ছিল প্রতিবাদের কার্টুন। ১৯৭১-এ ছিল পাপেট। টেলিভিশনে ছিল ক্যামেরা ও আলো। শিশুদের জন্য ছিল পারুল। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ছিল মিশুক। আর তাঁর ছাত্রদের হাতে রেখে গেছেন শিল্পের ভাষা।
তাই মুস্তাফা মনোয়ারকে শুধু ‘পাপেটশিল্পের রূপকার’ বললে তাঁর প্রতি হয়তো পুরো সুবিচার হয় না। তিনি ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি পুতুলের ভেতর মানুষ খুঁজেছেন, মানুষের ভেতর শিশুকে খুঁজেছেন এবং শিল্পের ভেতর স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছেন।
যুদ্ধের শরণার্থীশিবিরে যখন চারদিকে কান্না, তখন তিনি পুতুল নাচিয়েছেন—শিশুরা যেন হাসে।
১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ যখন পাকিস্তানের পতাকা দেখানোর নিয়ম ছিল, তখন তিনি টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বাড়িয়ে দিয়েছেন—পতাকা দেখানো এড়াতে।
১৯৫২ সালে যখন বাংলার দাবিতে রাজপথ উত্তাল, তখন এক কিশোর শিল্পী কার্টুন এঁকে জেলে গেছেন। এই দৃশ্যগুলো পাশাপাশি রাখলেই যেন দেখা যায় শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের পুরো জীবন:
তাঁর কাছে শিল্পকর্ম কখনো শুধু সৌন্দর্য ছিল না—শিল্পকর্ম ছিল প্রতিবাদ, ভালোবাসা, মুক্তি এবং মানুষের মুখে হাসি ফিরিয়ে দেওয়ার একটি উপায়। এ কারণেই তিনি চলে গিয়েও থেকে গেছেন আমাদের হৃদয়ে। একটি পুতুলের চোখে। একটি শিশুর হাসিতে। একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের ফ্রেমে। আর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দীর্ঘ স্মৃতিতে।
আসলাম শিকদার: সাংবাদিক, নির্বাহী পরিচালক, ক্রিয়েটিভ উইংস, বাংলাদেশ।