গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র অগ্রন্থিত রচনা

স্যার আহমদ ফজলুর রহমান

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্মৃতিচারণামূলক লেখা খুব কমই লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে তাঁর কলেজজীবনের সহপাঠী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বাঙালি উপাচার্য স্যার এ এফ রহমানকে নিয়ে ছোট্ট একটি নিবন্ধ। তাঁকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে সহকর্মী, পরে উপাচার্য হিসেবে পেয়েছিলেন। এ এফ রহমানের মৃত্যুর এক মাসের ব্যবধানে মীজানুর রহমান সম্পাদিত জাগরণ ৪র্থ বর্ষ ৯ম সংখ্যা, ৮ এপ্রিল ১৯৪৫ সংখ্যাটি ‘এ এফ রহমান স্মৃতি-সংখ্যা’ হিসেবে প্রকাশিত হয়। সেখানেই মুদ্রিত হয় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ‘স্যার আহমদ ফজলুর রহমান’ শীর্ষক স্মৃতিচারণাধর্মী নিবন্ধটি। এটি মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কোনো গ্রন্থে সংকলিত হয়নি। বাংলা একাডেমি থেকে তিন খণ্ডে প্রকাশিত শহীদুল্লাহ্ রচনাবলীতেও নিবন্ধটি নেই। শহীদুল্লাহ–বিষয়ক প্রধানতম স্মারক-সংকলন শহীদুল্লাহ্ সংবর্ধনা গ্রন্থ (সম্পা. মুহম্মদ সফিয়্যূল্লাহ, ১৯৬৭) এবং ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ স্মারকগ্রন্থ–এ (সম্পাদক শামসুজ্জামান খান, আজহার ইসলাম ও সেলিনা হোসেন, বাংলা একাডেমি, ১৯৮৫) এই নিবন্ধ সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। প্রথমোক্ত স্মারক-সংকলনে শহীদুল্লাহর গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত রচনাপঞ্জি প্রণয়ন করেছিলেন শহীদুল্লাহপুত্র আ জা ম তকীয়ূল্লাহ্।

সংগ্রহ ও ভূমিকা: মামুন সিদ্দিকী

আমি ইং ১৯০৪ সালে হাওড়া জিলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করে প্রেসিডেন্সি কলেজে এফএ ক্লাসে পড়তে গেলুম। সেখানে সহাধ্যায়ীদের মধ্যে যাঁদের পেয়েছিলুম, তাঁদের মধ্যে ছিলেন আহমদ ফজলুর রহমান। আরও ছিলেন স্যার সৈয়দ নসীম আলী, ডা. আবুল খায়ের, ডক্টর নরেন্দ্রনাথ লাহা, পরলোকগত সৈয়দ আলতাফ আলী চৌধুরী প্রভৃতি। ফজলুর রহমান ছিলেন স্বল্পভাষী, আদব–কায়দাদুরস্ত, শান্তশিষ্ট আদর্শ ভদ্রলোক। তিনি তাঁর স্বভাবের বৈশিষ্ট্যে সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি মিশুক ছিলেন না। সকলে তাঁর সঙ্গে মিশতে সংকোচ বোধ করত। কিন্তু যারা তাঁর সঙ্গে মিশবার সৌভাগ্য লাভ করত, তারা তাঁর মধুর ব্যবহারে ও মিষ্টালাপে মুগ্ধ না হয়ে থাকতে পারত না।

১৯০৬ সালে এফএ পাস করে আমি হুগলি কলেজে বিএ পড়তে গেলুম, তখন থেকে ফজলুর রহমান সাহেবের আর কোনো খোঁজখবর রাখতে পারিনি। ১২ বৎসর পরে আবার সাক্ষাৎ হয় চট্টগ্রাম বঙ্গীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মিলনীতে। ফজলুর রহমান সাহেবের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পরলোকগত আমীনুর রহমান সাহেব ছিলেন তার সভাপতি। ফজলুর রহমান সাহেব সেই সম্মিলনীতে বিশিষ্ট নিমন্ত্রিতদের মধ্যে ছিলেন। সম্মিলনীতে তাঁর পরামর্শ ও বক্তৃতা সকলেরই মনোযোগ আকর্ষণ করে। আমি ছাত্র সম্মিলনীর সভাপতি ছিলুম। বহুদিন পরে দুই সহাধ্যায়ীর সাক্ষাৎ বড়ই মধুর হয়েছিল।

তারপর ১৯২১ সালে আমাদের আবার মিলন ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের লেকচারার ও মুসলিম হলের হাউস টিউটররূপে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করি ১৯২১ সালের ২রা জুন। ফজলুর রহমান সাহেবও ইতিহাস বিভাগের রিডার ও মুসলিম হলের প্রভোস্টরূপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকত্ব ছেড়ে ঢাকায় এসেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেরই ছাত্রাবাস সমন্বিত (রেসিডেনশিয়াল) বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ছিল না। ফজলুর রহমান সাহেবের এ বিষয়ে অক্সফোর্ড ও আলিগড়ের ব্যক্তিগত জ্ঞান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য গঠনে বিশেষ সাহায্য করে। তাঁর অনুপ্রেরণা ও চেষ্টায় মুসলিম হল একটি আদর্শ ছাত্রাবাসে পরিণত হয়। হলের প্রাক্তন ছাত্র সকলেই তাঁর নিকট চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। তিনি তাদিগে কেবল আদর্শ ছাত্র ও নাগরিক হতেই উপদেশ দেননি, তিনি মুক্তহস্তে অনেককে অর্থ দান করেছেন এবং চাকরিপ্রাপ্তিতে নানারূপে সাহায্য করেছেন। মুসলিম হল ইউনিয়নে ও হলের বাৎসরিক ভোজে তাঁর বক্তৃতা বিশেষ উপভোগ্য ছিল। তাঁর ইংরেজি রচনা যেমন মধুর ও ভাবপূর্ণ হতো, তাঁর বক্তৃতাভঙ্গিও তেমনি মনোমুগ্ধকর ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেরই ছাত্রাবাস সমন্বিত (রেসিডেনশিয়াল) বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ছিল না। ফজলুর রহমান সাহেবের এ বিষয়ে অক্সফোর্ড ও আলিগড়ের ব্যক্তিগত জ্ঞান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য গঠনে বিশেষ সাহায্য করে।

প্রভোস্ট থাকাকালে ফজলুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরূপে বাংলার ব্যবস্থা-পরিষদে সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর অন্যতর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন পরলোকগত স্যার আব্দুল্লাহ্ আল মামুন সোহ্​রাওয়ার্দ্দি। আমি যখন ফজলুর রহমান সাহেবের জন্য কলকাতায় কোনো ভোটারকে অনুরোধ করতে গিয়েছিলুম, সেখানে ঘটনাক্রমে ঐ উদ্দেশ্যেই স্যার আবদুল্লাহ্ উপস্থিত হন। তিনি আমাকে বলেন, ‘শহীদুল্লাহ্, তুমি গুরুমারা বিদ্যে শিখবে?’ আমি সবিনয়ে বলি, ‘স্যার, আপনি আমার ওস্তাদ; আমি আপনার কদমবুসি করতে বাধ্য। কিন্তু আমি মনে করি, এই সদস্যপদের জন্যে ফজলুর রহমান সাহেবই উপযুক্ত। এই জন্য আপনি আমাকে মাফ করবেন।’ আমি ১৯২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে প্যারিসযাত্রা করি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুই বৎসরের ছুটি ও অর্থঋণ পেতে তিনি আমাকে বিশেষ সাহায্য করেছিলেন। বিলাতযাত্রা সম্পর্কে তিনি আমাকে অনেক মূল্যবান উপদেশ দিয়েছিলেন।

১৯২৮ সালের ১৮ আগস্ট বিদেশ থেকে ঢাকায় ফিরে আসি। ফজলুর রহমান সাহেব ইতঃপূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমি তখন বিদেশে ছিলুম; কাজেই তাঁর কর্ম ত্যাগের কারণ সম্বন্ধে আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছুই বলতে পারি না। আমি ফজলুর রহমান সাহেবের অভাব নানা কারণে অনুভব না করে থাকতে পারিনি। যে সকল ছাত্র কখনো তাঁর সংশ্রবে এসেছিল, তারাও নিশ্চয়ই আমারই মতো তাঁর অভাব অনুভব করত। সকল ফুলের রংও এক হয় না, গন্ধও এক হয় না। প্রকৃতির এই নিয়ম। সে জন্য ক্ষুণ্ন হওয়া বিজ্ঞতার পরিচয় নয়। কিন্তু মন কি মানে?

তাঁর (ফজলুর রহমানের) অমায়িক শিষ্ট ব্যবহার ও অসাম্প্রাদায়িক ন্যায়বিচার তাঁকে শিক্ষক, ছাত্রমণ্ডলী ও জনসাধারণের বিশেষ প্রিয় পাত্র করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর এই শেষ চিরবিদায়ের কালে সকলে যেমন তাঁর উন্নতিতে আনন্দিত হয়েছিল, সেই রূপ তাঁর বিয়োগে আন্তরিকভাবে দুঃখিত হয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর মি. ল্যাংলির অবসর গ্রহণের পর ১৯৩৪ সালে ফজলুর রহমান সাহেব ঐ পদে নিযুক্ত হন। তিনি আড়াই বৎসর কাল ভাইস চ্যান্সেলর পদে ছিলেন। তারপর ফেডারেল সার্ভিস কমিশনের সদস্য হয়ে দিল্লি চলে যান। ভাইস চ্যান্সেলররূপে তিনি তাঁহার পূর্বের সুখ্যাতি বজায় রেখেছিলেন। তাঁর অমায়িক শিষ্ট ব্যবহার ও অসাম্প্রাদায়িক ন্যায়বিচার তাঁকে শিক্ষক, ছাত্রমণ্ডলী ও জনসাধারণের বিশেষ প্রিয় পাত্র করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর এই শেষ চিরবিদায়ের কালে সকলে যেমন তাঁর উন্নতিতে আনন্দিত হয়েছিল, সেই রূপ তাঁর বিয়োগে আন্তরিকভাবে দুঃখিত হয়েছিল।

বাস্তবিক স্যার এ এফ রহমান বাঙ্গালার এক বিশিষ্ট শিক্ষাবিশারদ ছিলেন। চরিত্রে তিনি শিষ্টাচারী, দানশীল, উন্নতমনা, মহানুভব ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ধর্মনিষ্ঠ ছিলেন। যত দূর সম্ভব ধর্মের বিধিনিষেধ তিনি পালন করতেন। তাঁর মৃত্যুতে বাঙ্গালা দেশ তাঁর এক কৃতী সন্তানকে হারাল। মুসলমান সমাজে তাঁর অভাব শীঘ্র পূরণ হবে বলে মনে হয় না। দয়াময় খোদা তাঁর আত্মার ওপর দয়া ও শান্তির ধারা বর্ষণ করুন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিজনকে সহিষ্ণুতা দান করুন, এই প্রার্থনা।