অলংকরণ: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
অলংকরণ: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

মুক্তগদ্য

আবার তাসনিয়া মিস

কনক, তাসনিয়া সারওয়াত হুদা, আমাদের তাসনিয়া মিস, আমাদের ওয়ান অ্যান্ড অনলি বোন। সে আমাদের ছোট বোন। আমাদের ভাইবোনদের ভেতর সবচেয়ে বেশি মেধাবী। কারণ, আম্মার উদ্ভট আর জটিল প্রত্যাশার সমাধান একমাত্র সে-ই করতে পারে।

ছবি তোলার সময় আমাকে বলল, ‘মেজ ভাই, আমরা দুজন দুদিকে তাকিয়ে থাকব। তাহলে মনে হবে আমাদের সামনে অনেক ক্যামেরা আছে। কেবল সেলিব্রিটিদের সামনে অনেক ক্যামেরা থাকে।’

ঈদে আমরা ভাইবোন সবাই বাড়ি গেছি। বাড়ি মানে স্নেহময়ী, কুষ্টিয়া। স্নেহময়ী আমাদের বাড়ির নাম।

বাড়ি এলে সবার মন ভালো থাকে। আনন্দ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাসনিয়া মিসের মন খারাপ। বিষণ্ন মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ঘটনা কী!

ঘটনা ইশকুলে ঈদের ছুটির আগের দিনের। ক্লাসে বল্টু মন খারাপ করে বসে আছে। পড়ায় মনোযোগ নেই। জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে মাঠের দিকে।

তাসনিয়া মিস জিজ্ঞেস করল, ‘বল্টু, তোমার কী হয়েছে, মন খারাপ কেন?’

বল্টু বলল, ‘মিস, আমার প্রিয় নীল কলমটা হারিয়ে গেছে। আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছে।’

তাসনিয়া মিস বলল, ‘মন খারাপ করে থেকো না। ক্লাস ছুটি হলে আমরা খুঁজে দেখব কোথায় আছে তোমার প্রিয় নীল কলম।’

তাসনিয়া মিস বলল, ‘বল্টু, তুমি এ রকম কেন করলে? নিজের কলম পকেটে রেখে আমাকে এত কষ্ট করালে!’ বল্টু বলেছে, ‘মিস, ইশকুল থেকে সারা দিন পর বাড়িতে গিয়ে আপনার দেওয়া হোমওয়ার্ক করতেও আমাদের কষ্ট হয়। সেটা বোঝাতেই এটা করেছি।’ তাসনিয়া মিসকে বললাম, ‘বল্টুকে বলিসনি অন্যকে ফাঁকি দিলে নিজেও ফাঁকিতে পড়তে হয়?’

ক্লাস শেষ হয়ে গেলে তাসনিয়া মিস আর বল্টু গেছে ইশকুল মাঠে। বড় বড় সবুজ ঘাস সরিয়ে তারা পুরো মাঠ খুঁজে ফেলেছে। কোথাও সেই কলম পাওয়া যায়নি। উবু হয়ে কলম খুঁজতে গিয়ে তাসনিয়া মিসের কোমর ব্যথায় টনটন করছে। বাসায় ফেরা দরকার। ইশকুল থেকে সবাই চলে গেছে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। বল্টুর মন ভালো হচ্ছে না।

তাসনিয়া মিস বলল, ‘চলো বল্টু, তোমাকে অমন আরেকটা নীল কলম কিনে দিই। তখন সেটাও তোমার প্রিয় কলম হয়ে যাবে।’

বল্টু রাজি হয়েছে। তাসনিয়া মিস বল্টুকে নতুন নীল কলম কিনে দিয়েছে। তখন বল্টু প্যান্টের পকেট থেকে তার নীল কলম বের করেছে। দুটো কলম হাতে নিয়ে হিহি করে হাসছে।

তাসনিয়া মিস বলল, ‘বল্টু, তুমি এ রকম কেন করলে? নিজের কলম পকেটে রেখে আমাকে এত কষ্ট করালে!’

বল্টু বলেছে, ‘মিস, ইশকুল থেকে সারা দিন পর বাড়িতে গিয়ে আপনার দেওয়া হোমওয়ার্ক করতেও আমাদের কষ্ট হয়। সেটা বোঝাতেই এটা করেছি।’

তাসনিয়া মিসকে বললাম, ‘বল্টুকে বলিসনি অন্যকে ফাঁকি দিলে নিজেও ফাঁকিতে পড়তে হয়?’

তাসনিয়া মিস বলল, ‘বলেছি। বল্টু আমাকে সরি বলেছে। কিন্তু বল্টুকে বলতে গিয়ে একটু বকা দিয়ে ফেলেছি। এখন তাতে মন খারাপ লাগছে।’

বললাম, ‘বল্টুর মায়ের ফোন নম্বর দে। আমি বল্টুর সাথে কথা বলছি।’

তাসনিয়া মিস কঠিন গলায় বলল, ‘মেজ ভাই, বল্টুর মায়ের ফোন নম্বর কেন? কেন বল্টুর বাবার ফোন নম্বর নয়?’

তাসনিয়া মিসের ঘর অন্ধকার। আলো জ্বালিয়ে দেখি তার চোখ ফুলে আছে। বুঝলাম সারা সন্ধ্যা কেঁদেছে। ঘটনা তার মানে ভয়াবহ। বললাম, ‘কী হয়েছে তোর?’ তাসনিয়া মিস বলল, ‘মেজ ভাই, আমি আর চাকরি করব না। ঈদের পর আমি ঢাকায় যাব না।’ বললাম, ‘আচ্ছা বেশ, তোকে আর এই চাকরি করতেও হবে না, ঢাকাতেও যেতে হবে না। এখন বল ঘটনা কী হয়েছে।’

খুব শান্ত গলায় বললাম, ‘তোর কাছে বল্টুর বাবার পারসোনাল ফোন নম্বর থাকবে, এ আমি বিশ্বাসই করি না।’

ঘটনা সেখানেই থেমে গেল। তবে তাসনিয়া মিসের মন ভালো হলো না। তাসনিয়া মিসের মন খারাপ দেখলে আমার অস্থির লাগে।

আচমকা আমার অস্থিরতা শুরু হয়েছে। ঈদের দিন তাসনিয়া মিস মন খারাপ করে বসে আছে।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিরে, কী হয়েছে?’

তাসনিয়া মিস বলল, ‘বল্টুকে ঈদ মোবারক জানানোর জন্য ফোন করেছিলাম।’

অবাক হয়ে বললাম, ‘ভালো তো। ভালো কথা।’

তাসনিয়া মিস বলল, ‘বল্টুর ছোট খালা বিশাল ধনী। বল্টুকে ঈদের সালামি দিয়ে বলেছে—এই নে তোর ঈদ সালামি। কিন্তু এটা কাউকে বলবি না।

বল্টু বলেছে, এই ঈদ সালামি কি তোমার ব্ল্যাক মানি খালামণি?

তখন বল্টুর ছোট খালা তাকে ডবল সালামি দিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বলেছে। বল্টু নাকি তাকে আইনি জটিলতার ভয় দেখিয়ে ডবল সালামি আদায় করেছে। তুমি বুঝতে পারছ, এই ট্যালেন্টেড জেনারেশন কীভাবে করাপশনে ইনভলভ হয়ে যাচ্ছে!’

আমি অস্থির হয়ে বললাম, ‘তুই এক্ষুনি বল্টুর ছোট খালার ফোন নম্বর জোগাড় করে দে। দেখি মহিলা কত টাকার মালিক! আর আইনের ভয়ে কেমন ভীত হয়।’

অমনি চোখ শুকনো করে, খরখরে গলায় তাসনিয়া মিস বলল, ‘বল্টুর কোনো ছোট খালার সঙ্গে তোমার কথা বলতে হবে না, মেজ ভাই। বল্টুর মা কিংবা ছোট খালা কারও সঙ্গে কথা বলতে হলে আমি বলব। তুমি আগ বাড়িয়ে বল্টুর মা কিংবা ছোট খালাকে খুঁজতে যাবে না।’

আমি খাসির মাংসের বাটিতে কলিজা আছে কি না, তাই খুঁজতে গভীর মনোনিবেশ করলাম।

তারপর অনেকক্ষণ তাসনিয়া মিসের খবর নেই। সন্ধ্যার পর মা এসে বলল, ‘ও দীপু দেখ তো, মেয়ের কী হলো। আসার পর থেকে মন খারাপ করে আছে।’

তাসনিয়া মিসের ঘর অন্ধকার। আলো জ্বালিয়ে দেখি তার চোখ ফুলে আছে। বুঝলাম সারা সন্ধ্যা কেঁদেছে। ঘটনা তার মানে ভয়াবহ।

বললাম, ‘কী হয়েছে তোর?’

তাসনিয়া মিস বলল, ‘মেজ ভাই, আমি আর চাকরি করব না। ঈদের পর আমি ঢাকায় যাব না।’

বললাম, ‘আচ্ছা বেশ, তোকে আর এই চাকরি করতেও হবে না, ঢাকাতেও যেতে হবে না। এখন বল ঘটনা কী হয়েছে।’

আদর মেশানো গলায় তাসনিয়া মিসকে বললাম, ‘মিস তো তুই একা না, পৃথিবীতে বল্টুও একজন না। তোর কলিগ, অন্যান্য মিস আর তোর বান্ধবীদেরও বলবি আমার ছবি বাঁধিয়ে সঙ্গে রাখতে। মন খারাপ হলেই আমার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকবে। মন ভালো হয়ে যাবে।’ আচমকা কী হলো বুঝতে পারলাম না। তাসনিয়া মিস আছাড় দিয়ে আমার বাঁধানো ছবির কাচ ভেঙে টুকরা টুকরা করে ফেলল। রাগে গরগর করতে করতে বলল, ‘তোমার ছবি বাঁধানোটাই আমার ভুল হয়েছে।’

তাসনিয়া মিস বলল, ‘বল্টুর মা ফোন করেছিল। বল্টু সারা দিন মোবাইলে এনগেজড থাকে। বল্টুকে বললাম তুমি সারা দিন মোবাইলে কী করো?’

বল্টু বলল, ‘গবেষণা করি।’

জানতে চাইলাম, ‘কী গবেষণা?’

বল্টু বলল, ‘মোবাইলে কতটুকু চার্জ বাকি আছে দেখি। সেই চার্জ দিয়ে মোবাইল আর কতক্ষণ চালানো যেতে পারে, সেই গবেষণা করি।’

একদিন ক্লাসে সবাইকে প্যারাগ্রাফ লিখতে বলেছিলাম। বল্টু দেখি চিটিং করছে। পাশের জনের খাতা দেখছে। আমি বললাম, ‘বল্টু, তার খাতা তুমি দেখছ কেন?’

বল্টু বলল, ‘মিস, সে আমার খাতা দেখে লিখেছে কি না, সেটা চেক করছি।’

তাসনিয়া মিসের মাথায় হাত দিয়ে বললাম, ‘তুই কি জানিস পৃথিবীতে সবচেয়ে ধৈর্যশীল কারা?’

তাসনিয়া মিস বলল, ‘হিমালয়ের সন্ন্যাসীরা।’

আমি বললাম, ‘না। পৃথিবীর সবচেয়ে ধৈর্যশীল হচ্ছে শিক্ষকেরা। যাদের বল্টুর মতো স্টুডেন্টদের সামলাতে হয়। তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ বানিয়ে দিতে হয়।’

তাসনিয়া মিস অমনি কলকল করে বলল, ‘তুমি শোনো মেজ ভাই, বল্টু কী করেছে! সে সব সময় পেছনের বেঞ্চে বসে। আমি বললাম বল্টু তুমি সব সময় পেছনের বেঞ্চে কেন বসো। বল্টু বলল, আপনিই তো বলেছেন মিস, পিছিয়ে পড়াদের এগিয়ে নিতে হবে। আমি পিছিয়ে পড়েছি। আপনি আমাকে এগিয়ে নিন।’

তাসনিয়া মিসকে আদর দিয়েছি। তাসনিয়া মিসের মেজাজ ভালো হয়েছে।

পরের দিন দেখলাম তাসনিয়া মিসের মন খুবই ভালো। সে সেজেগুজে বাড়ির ভেতর ঝলমল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

তাসনিয়া মিসকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঘটনা কী, অধিক আনন্দে আছিস মনে হচ্ছে!’

তাসনিয়া মিস খলবল করে বলল, ‘ও মেজ ভাই, আর কখনো আমার মন খারাপ হবে না। তোমার একখানা ছবি বাঁধিয়ে এনেছি। সব সময় কাছে রেখে দেব। বল্টু যন্ত্রণা করলেই তোমার ছবি দেখব। মন ভালো হয়ে যাবে।’

আদর মেশানো গলায় তাসনিয়া মিসকে বললাম, ‘মিস তো তুই একা না, পৃথিবীতে বল্টুও একজন না। তোর কলিগ, অন্যান্য মিস আর তোর বান্ধবীদেরও বলবি আমার ছবি বাঁধিয়ে সঙ্গে রাখতে। মন খারাপ হলেই আমার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকবে। মন ভালো হয়ে যাবে।’

আচমকা কী হলো বুঝতে পারলাম না। তাসনিয়া মিস আছাড় দিয়ে আমার বাঁধানো ছবির কাচ ভেঙে টুকরা টুকরা করে ফেলল। রাগে গরগর করতে করতে বলল, ‘তোমার ছবি বাঁধানোটাই আমার ভুল হয়েছে।’

সেই থেকে তাসনিয়া মিস আমার সঙ্গে কথা বন্ধ করে আছে।