
অনেকেই ক্লান্ত, ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত করতল বিছিয়ে শুয়ে থাকা বুড়ো সান্তিয়াগোর মধ্যে যিশুর খোঁজ পান। ১৯৫৪ সালে ভাগ্য ও সমুদ্রের সঙ্গে লড়তে থাকা এক বৃদ্ধ জেলের কাহিনি নিয়ে লেখা দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি উপন্যাসের জন্য নোবেল পুরস্কার পান আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। আফ্রিকার গভীর জঙ্গলে শিকারে গিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হলে সে বছর তিনি সুইডিশ একাডেমিতে সশরীর উপস্থিত হতে পারেননি। তবে তাঁর লিখিত বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পাঠ করেছিলেন। পরে সুস্থ হয়ে উঠলে হেমিংওয়ে সেই বক্তব্য নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করেন। তিনি ছিলেন গত শতকের সবচেয়ে জনপ্রিয় আমেরিকান ঔপন্যাসিক। তাঁর সময়ে খুব কম লেখকই ছিলেন, যাঁদের জীবন ছিল এতটা বর্ণিল ও বিচিত্র। জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি কিউবায় কাটিয়েছিলেন। এখানে তিনি একটি খামারবাড়ি ক্রয় করে মৎস্য শিকারসহ নানা ধরনের অ্যাডভেঞ্চার এবং সাহিত্যের নানামুখী প্রচারণা ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। শেষ সময়টা তাঁর গেছে বরং বিরূপ সমালোচনায়। ১৯৫০ সালে লেখা তাঁর উপন্যাস অ্যাক্রস দ্য রিভার অ্যান্ড ইনটু দ্য ট্রিজ অসফল হলে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টা বেশ সমস্যাকীর্ণ হয়ে পড়ে। জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ এক কর্নেলের জীবনকাহিনি নিয়ে উপন্যাসটি রচিত।
মাত্র ৩ বছর বয়সে তিনি তাঁর হাতে তুলে দেন মাছ ধরার বড়শি এবং ১১ বছর বয়সে বন্দুক। শৈশবের দিনগুলো কেটেছে বন্দুক ঘাড়ে জঙ্গলে জঙ্গলে অথবা কোনো বৃহৎ দিঘিতে মাছের সন্ধানে নৌকা বেয়ে। খোলা আকাশের নিচে তাঁবু খাটিয়ে রাতে লণ্ঠনের আলোয় বই পড়া ছিল তাঁর শখ।
১৯৫২ সালে দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি প্রকাশিত হলে তিনি আবার পাঠকদৃষ্টিতে চলে আসেন। এ উপন্যাস প্রকাশের পর ১৯৫৩ সালে তাঁকে পুলিৎজার পুরস্কার দেওয়া হয় এবং পরের বছরই তিনি নোবেল পুরস্কার পান।
১৮৯৯ সালের ২১ জুলাই এই আমেরিকান ঔপন্যাসিক ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের ওক পার্কে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম আর্নেস্ট মিলার হেমিংওয়ে। তাঁর বাল্য ও অবকাশ সময়টা কেটেছে মিশিগানে মৎস্য শিকারে ও হান্টিংয়ে। তাঁর বাবা ছিলেন একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক এবং শৌখিন খেলোয়াড়। মা ছিলেন সংগীত ও চিত্রকলায় পারদর্শী। বালকের ভবিষ্যৎ নিয়ে মা–বাবার মধ্যে বিরোধ ছিল। মা চেয়েছিলেন ছেলে সংগীতে তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটাক। অপর পক্ষে বাবা তাঁকে বাইরের জগতে টানছিলেন। বাবাই জয়ী হয়েছিলেন অবশেষে। মাত্র ৩ বছর বয়সে তিনি তাঁর হাতে তুলে দেন মাছ ধরার বড়শি এবং ১১ বছর বয়সে বন্দুক। শৈশবের দিনগুলো কেটেছে বন্দুক ঘাড়ে জঙ্গলে জঙ্গলে অথবা কোনো বৃহৎ দিঘিতে মাছের সন্ধানে নৌকা বেয়ে। খোলা আকাশের নিচে তাঁবু খাটিয়ে রাতে লণ্ঠনের আলোয় বই পড়া ছিল তাঁর শখ। স্কুলে পড়াকালীন তিনি ডিবেটিং ক্লাবের সদস্য ছিলেন এবং ওয়াটার বাস্কেটবল টিমের ক্যাপ্টেন হিসেবে সাফল্যের সঙ্গে টিম পরিচালনা করেছেন। ভালো সাঁতারু হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সেই স্কুলজীবন থেকেই।
অ্যাগনেসের বয়স তখন ২৬ আর হেমিংওয়ের ১৮ বছর। বয়সের ব্যবধানের কারণে অ্যাগনেস তাঁকে বিয়ে করতে রাজি হননি। আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস–এর ক্যাথরিন বার্কলের মধ্যে অ্যাগনেসকে খুঁজে পাওয়া যায়।
স্কুলে পড়াকালীন ইংলিশ কোর্সের ছাত্র হিসেবে তিনি ফিকশনের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং তখন থেকেই বিভিন্ন লিটারেরি ম্যাগাজিনে লিখতে শুরু করেন। স্পোর্টস রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার আগ্রহও তখন থেকেই দেখা যায় তাঁর মধ্যে। ১৯১৭ সালে ওক পার্ক স্কুল থেকে তিনি গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন ১৯১৮ সালে রেড ক্রসের অধীন স্বেচ্ছাসেবক অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার হিসেবে ইতালিয়ান আর্মির সঙ্গে কর্মরত থেকেছেন। যুদ্ধের মাঠের অভিজ্ঞতা আমরা দেখতে পাই তাঁর বিভিন্ন উপন্যাস ও গল্পে। ১৯১৮ সালের ৮ জুলাই তিনি যখন ইতালিয়ান আর্মিদের চকলেট বিতরণ করছিলেন একটি অস্ট্রেলিয়ান মর্টার এসে তাঁকে আঘাত করলে তিনি গুরুতর আহত হন এবং তাঁকে মিলানের রেড ক্রস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই আঘাতে তিনি এমনভাবে আহত হয়েছিলেন যে তাঁকে প্রায় তিন মাস হাসপাতালেই কাটাতে হয়। এখানেই হেমিংওয়ে অ্যাগনেস ভন কুরোস্কির প্রেমে পড়েন। তিনি ছিলেন আমেরিকান রেড ক্রসের একজন সেবিকা। অ্যাগনেসের বয়স তখন ২৬ আর হেমিংওয়ের ১৮ বছর। বয়সের ব্যবধানের কারণে অ্যাগনেস তাঁকে বিয়ে করতে রাজি হননি। আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস–এর ক্যাথরিন বার্কলের মধ্যে অ্যাগনেসকে খুঁজে পাওয়া যায়।
১৯৩৬ সালের ১৬ জুলাই স্পেনে ফ্যাসিস্ট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তিনি রিপাবলিকানদের পক্ষ নেন এবং স্পেনের কৃষকদের নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি সিনেমা দ্য স্প্যানিশ আর্থ বানানোর জন্য ১৯৩৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯ মে পর্যন্ত স্পেনে অবস্থান করেন।
যুদ্ধের শেষে হেমিংওয়ে শিকাগোতে ফিরে আসেন এবং ১৯২১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর হ্যাডলি রিচার্ডসনকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি টরন্টো স্টার পত্রিকার জন্য ভ্রাম্যমাণ করেসপন্ডেন্ট হিসেবে সারা ইউরোপ ভ্রমণ করেন। তাঁর হেড অফিস ছিল প্যারিস। প্যারিসে পৌঁছে তিনি ফোর্ড মেডক্স ফোর্ড, শেরউড অ্যান্ডারসন, জেমস জয়েস, এজরা পাউন্ড ও গার্ট্রুড স্টেইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় পত্রিকা অফিস থেকে তাঁর লেখা বারবার ফিরে এলে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অবশেষে ১৯২৬ সালে দ্য সান অলসো রাইজেস প্রকাশিত হলে তিনি লেখক হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেন। এই উপন্যাসে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে প্যারিসে থেকে যাওয়া হতভাগ্য আমেরিকানসহ অন্য ইউরোপিয়ানদের বোহেমিয়ান, রুটলেস জীবনযাপনের সচিত্র প্রতিবেদন এঁকেছেন, যখন কোনো নতুন মূল্যবোধ দানা বেঁধে ওঠেনি; গার্ট্রুড স্টেইন যাদের ‘লস্ট জেনারেশন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। এরপর প্রকাশিত হয় আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস (১৯২৯) তাঁর বহুল পঠিত উপন্যাস। এ উপন্যাসে যুদ্ধের সময়ে একজন আমেরিকান সৈনিক এবং ইংলিশ নার্সের মধ্যকার ট্র্যাজিক প্রেমকাহিনি বর্ণিত হয়েছে। প্রথম বিয়ে ভেঙে গেলে হেমিংওয়ে পলিন ফেইফারকে বিয়ে করেন ১৯২৭ সালে। মেয়েটি প্যারিসেই একটি পত্রিকা অফিসে কাজ করতেন এবং তাঁদের বিয়ে প্যারিসেই অনুষ্ঠিত হয়। ১৯২৮ সালে তিনি তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীসহ যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন এবং ফ্লোরিডার কি ওয়েস্টে বসবাস শুরু করেন। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত তিনি কি ওয়েস্টেই বসবাস করেন এবং একজন স্পোর্টসম্যান হিসেবে বেশ খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয় গ্রিন হিলস অব আফ্রিকা। সামাজিক অবক্ষয়সহ সাহিত্য ও শিকারের নানা কাহিনি এ বইয়ের উপজীব্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
১৯৩৬ সালের ১৬ জুলাই স্পেনে ফ্যাসিস্ট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তিনি রিপাবলিকানদের পক্ষ নেন এবং স্পেনের কৃষকদের নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি সিনেমা দ্য স্প্যানিশ আর্থ বানানোর জন্য ১৯৩৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯ মে পর্যন্ত স্পেনে অবস্থান করেন। ১৯৩৭ সালের ১৪ আগস্ট হেমিংওয়ে আবার স্পেনে যান এবং সেখানে ১৯৩৮ সালের ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত অবস্থান করেন। এ সময়ে এখানে তাঁর পরিচয় হয় মার্থা গেলহর্নের সঙ্গে। মার্থা তখন কলিয়ার্স ম্যাগাজিনের হয়ে গৃহযুদ্ধ নিয়ে লিখছিলেন। ১৯৩৮ সালের মে মাসে হেমিংওয়ে হাভানায় গেলে মার্থাও তাঁর সঙ্গী হন। ১৯৪০ সালে পলিনের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হলে হেমিংওয়ে মার্থাকে বিয়ে করেন।
পেইন্টিং ও মিউজিক থেকেও তিনি সাহিত্যশিল্পের অনেক কিছু গ্রহণ করেছেন এবং সে বিষয়ে তিনি নিজেই বলেছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে। দ্য নিউ ইয়র্কার পত্রিকার লিলিয়ান রসের সঙ্গে এ বিষয়ে তাঁর আলাপের অংশ—‘প্যারিসের লুক্সেমবার্গ মিউজিয়ামের পেইন্টিংগুলো দেখেও আমি লেখার অনেক কৌশল রপ্ত করেছি। আমি পল সেজানের কাছে শিখেছি কীভাবে ভূদৃশ্য আঁকতে হয়।’ তিনি আরও বলেছেন, বিখ্যাত মিউজিশিয়ান জোহান সেবাস্তিয়ান বাখের কাছ থেকে তিনি শিল্পের সংগতিবিষয়ক দীক্ষা পেয়েছেন।
ইতিমধ্যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে এবং হেমিংওয়েও সক্রিয়ভাবেই আছেন যুদ্ধের মাঠে। এ সময়ে তিনি প্যারিসে অসুস্থ হয়ে পড়লে মার্থা তাঁকে কোনো রকম সেবাযত্ন না করায় তাঁদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তাঁর এ দুঃসময়ে মেরি ওয়েলশই তাঁকে সেবাযত্ন করেছিলেন এবং হেমিংওয়ে পরে তাঁকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় ছোটগল্প সংকলন দ্য ফিফথ কলাম অ্যান্ড ফার্স্ট ফর্টিনাইন স্টোরিজ, এই সংকলনে স্থান পায় তাঁর বিখ্যাত দুটি গল্প—‘দ্য শর্ট হ্যাপি লাইফ অব ফ্রান্সিস ম্যাকোম্বর’ ও ‘দ্য স্নোজ অব কিলিমানজারো’। তিনি ছিলেন মূলত বিশ্ব ভ্রামণিক। কখনো শিকারের নেশায় চলে গেছেন আফ্রিকার গভীর জঙ্গলে, কখনো সমুদ্রের টানে, আবার কখনো স্পেনে ষাঁড়ের লড়াই দেখতে। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় সাংবাদিক হিসেবে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানেও উপস্থিত হয়েছেন। সেসব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লিখেছিলেন ফর হুম দ্য বেল টোলস (১৯৪০)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আবার তিনি সাগ্রহে ছুটে যান যুদ্ধের মাঠে। যুদ্ধ শেষ হলে চলে যান কিউবায়। ইতিমধ্যে পাপা নামে সারা বিশ্বে তিনি পরিচিতি লাভ করেছেন। কিউবায় অবস্থানকালে তাঁর অনেক বন্ধু জুটে যায়, যাঁদের পেশা ছিল মাছ ধরা, শিল্পসাহিত্যের সঙ্গে বলতে গেলে তাঁদের কোনো সংশ্রবই ছিল না।
তাঁর শেষ ও চতুর্থ স্ত্রী মেরি ওয়েলশ হেমিংওয়ে ১৯৪৬ সালে বিয়ের পর থেকে হেমিংওয়ের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তাঁর পাশে ছিলেন। তাঁকে নিয়ে তিনি কিউবায় বসবাস শুরু করেন। হেমিংওয়ে তাঁর লেখার স্টাইল উন্নয়নে অনেকের দ্বারাই প্রভাবিত হয়েছেন এবং তিনি তা স্বীকারও করেছেন। তিনি এক জায়গায় বলেছেন যে মার্ক টোয়েনের অ্যাডভেঞ্চারস অব হাকলেবেরি ফিন আমেরিকান সাহিত্যে গতি এনেছিল। এই বিশেষ সাহিত্যকর্ম থেকে তিনি শিখেছেন সেই ভাষা, যা একজন আমেরিকান বালক অনায়াসে বলতে পারে। এই গ্রন্থের সাহিত্য উৎকর্ষ তাঁকে শিখিয়েছে উন্মুক্ত প্রান্তরের কবিতা আর আমেরিকান কথোপকথনের সজীবতা। মার্ক টোয়েনের অ্যাডভেঞ্চারস অব হাকলবেরি ফিন এবং হেমিংওয়ের নিক অ্যাডামসের একটি সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে দেখা যায় দুজন আমেরিকান তরুণের জীবনে কীভাবে সন্ত্রাস ও মৃত্যু এসে হানা দেয়। হেমিংওয়ে তাঁর গ্রিন হিল ইন আফ্রিকা লেখার ব্যাপারে স্টিফেন ক্রেনের কাছে ঋণ স্বীকার করেছেন। তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন যে তিনি জোসেফ কনরার্ডের কাছেও অনেক কিছু শিখেছেন। হেমিংওয়ের দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি এবং শেরউড অ্যান্ডারসনের আই ওয়ান্ট টু নো হোয়াই–এর মধ্যে বেশ মিল রয়েছে।
পেইন্টিং ও মিউজিক থেকেও তিনি সাহিত্যশিল্পের অনেক কিছু গ্রহণ করেছেন এবং সে বিষয়ে তিনি নিজেই বলেছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে। দ্য নিউ ইয়র্কার পত্রিকার লিলিয়ান রসের সঙ্গে এ বিষয়ে তাঁর আলাপের অংশ—‘প্যারিসের লুক্সেমবার্গ মিউজিয়ামের পেইন্টিংগুলো দেখেও আমি লেখার অনেক কৌশল রপ্ত করেছি। আমি পল সেজানের কাছে শিখেছি কীভাবে ভূদৃশ্য আঁকতে হয়।’ তিনি আরও বলেছেন, বিখ্যাত মিউজিশিয়ান জোহান সেবাস্তিয়ান বাখের কাছ থেকে তিনি শিল্পের সংগতিবিষয়ক দীক্ষা পেয়েছেন।
শিল্পীর সততা বলতে যা বোঝায়, তা হেমিংওয়ের ছিল; যে কারণে তিনি যেসব সোর্স থেকে গ্রহণ করেছেন, যাঁদের উপদেশ ও পরামর্শ তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে, তাঁদের কাছে ঋণ স্বীকারে তিনি কখনো কার্পণ্য করেননি। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, অচিরেই তিনি তাঁর লেখার নিজস্ব স্টাইল তৈরি করে ফেলেন এবং অন্যের কাছে মডেলে পরিণত হন।
কবি এজরা পাউন্ড (যিনি তাঁর সময়ের প্রায় সব কবি-লেখকের ওপরই বলতে গেলে ওস্তাদগিরি করেছিলেন) প্রথম আবিষ্কার করেন হেমিংওয়ের সৃষ্টিশীল প্রতিভার ঔজ্জ্বল্য। সে সময়ের তরুণ প্রতিভাধর শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে তিনি স্বেচ্ছায় বন্ধুত্ব করেছেন এবং তাঁদের প্রতিভা বিকাশে নানাভাবে সহযোগিতা দিয়েছেন। এই উদার ও প্রশান্ত হৃদয়ের মানুষটিকে স্পষ্টভাবে চেনা যায় হেমিংওয়ের কথায়—‘তিনি নিজের বিষয়ে তাঁর প্রতিভা ও শক্তির মাত্র এক–পঞ্চমাংশ খরচ করতেন আর বাকি সব সময় দিতেন তাঁর বন্ধুদের শিল্পচর্চার উন্নয়ন ও উন্নত জীবনযাপনের চেষ্টায়।’ বন্ধুরা কেউ সমালোচনায় আক্রান্ত হলে তিনি যেমন তাঁদের রক্ষা করতেন যুক্তির প্রাখর্যে, তেমনি কোনো পত্রিকায় কারও ব্যাপারে লিখে তাঁকে বৃহৎ পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতেন। এজরা পাউন্ড হেমিংওয়েকে শিখিয়েছিলেন লিটারেচার ও রিপোর্টিংয়ের পার্থক্য। তিনি যেমন এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’কে কেটে-চিরে ঠিকঠাক করে দিয়েছিলেন (এলিয়ট অবশ্য তাঁর সব কাটাচেরা গ্রহণ করেননি), তেমনি তিনি হেমিংওয়ের প্রথম দিকের অনেক লেখাই কাটাচেরা করে শিষ্যের মতোই তাঁকে সাহিত্য করার দীক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন ঘন ঘন অ্যাডজেক্টিভ ও অ্যাডভার্ব ব্যবহার না করতে। তিনি বলতেন, সজীব কথ্যভাষায় যেটুকু প্রয়োজন কেবল সেটুকুই বলতে হবে এবং ভাষার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। ইমেজিস্ট আন্দোলনের প্রবক্তা হিসেবে তিনি তাঁর কালের কবি ও ফিকশন রচয়িতাদের ওপর এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিলেন। হেমিংওয়ের গদ্যের ওপর এজরা পাউন্ডের উপদেশের বাস্তব প্রভাব লক্ষ করা গেছে নানাভাবে। এখানে উল্লেখ্য, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালি রেডিওতে ফ্যাসিস্টদের পক্ষে প্রচার চালানোয় তাঁকে পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিনা বিচারে অনেক দিন কারাগারে রাখা হলে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। এজরা পাউন্ডের এই দুর্দিনে টি এস এলিয়টসহ যাঁরা তাঁর মুক্তির জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন এবং তাঁকে দেশ ছাড়ার শর্তে মুক্ত করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে হেমিংওয়ের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
সে সময়ের উল্লেখযোগ্য লেখক গার্ট্রুড স্টেইন হেমিংওয়ের একজন শিল্পী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। এজরা পাউন্ডের মতো তিনি তাঁর লেখায় কলম চালাননি ঠিকই, তবে তিনি উপদেশ ও কথোপকথনের মধ্য দিয়ে তাঁকে লেখার স্টাইল উন্নয়নে সহায়তা করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি এজরা পাউন্ডের চেয়ে গার্ট্রুড স্টেইনের প্রতি ছিলেন বেশি আস্থাশীল। হেমিংওয়ে নিয়মিত তাঁর সঙ্গে দেখা করতেন এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁর কথা শুনতেন। স্টেইন তাঁর প্রথম দিককার পাণ্ডুলিপিগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়তেন এবং কঠোরভাবে সমালোচনা করতেন। তিনি তাঁকে জার্নালিস্টিক কাজকর্ম ছাড়ার কথাও বলেছিলেন। আরও বলেছিলেন অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ বর্ণনার বিষয়ে সচেতন থাকতে। তিনি সব সময় বলতেন যে লেখা কাজটিই মূলত একটি শৃঙ্খলার ব্যাপার। এজরা পাউন্ডের মতো তিনিও তাঁকে বেশি বেশি অ্যাডজেক্টিভ ও অ্যাডভার্ব ব্যবহার না করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
শিল্পীর সততা বলতে যা বোঝায়, তা হেমিংওয়ের ছিল; যে কারণে তিনি যেসব সোর্স থেকে গ্রহণ করেছেন, যাঁদের উপদেশ ও পরামর্শ তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে, তাঁদের কাছে ঋণ স্বীকারে তিনি কখনো কার্পণ্য করেননি। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, অচিরেই তিনি তাঁর লেখার নিজস্ব স্টাইল তৈরি করে ফেলেন এবং অন্যের কাছে মডেলে পরিণত হন। তিনি বলেছেন, ‘ধ্রুপদ সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হলো তা হবে সম্পূর্ণ নতুন, যেখানে তার পূর্ববর্তী ক্ল্যাসিকসের কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। পৃথিবীতে কোনো কোনো লেখকের জন্মই হয় অন্যকে অন্তত একটি বাক্য লিখতে সহায়তার জন্য।
এর মানে এই নয় যে এটা আগের ক্ল্যাসিকস থেকে সে সরাসরি গ্রহণ করবে বা তার মতো হবে।’ স্টাইলকে তিনি তুলনা করেছেন স্বচ্ছ ঝরনা থেকে তুলে আনা সেই নুড়ি-পাথরের সঙ্গে, যা সজীব, সুন্দর ও স্বতন্ত্র। হেমিংওয়ে তাঁর লেখার ক্ষেত্রে শেষমেশ সেই স্টাইলই খুঁজে পেয়েছিলেন এবং তাঁর সমসাময়িক লেখকেরা দ্বিধাহীনভাবে স্বীকার করেছেন, উনিশ শতকের আমেরিকান শিল্প–সাহিত্যের বন্ধ্যা মরুভূমিকে তিনি কল্পনাতীত শস্যভূমিতে পরিণত করেছিলেন। হেমিংওয়ের ‘হিমশৈল তত্ত্ব’ (আইসবার্গ থিওরি), একে ‘থিওরি অব অমিশন’ অর্থাৎ ‘বর্জনের তত্ত্ব’ও বলা হয়, এটি তাঁর নিজের সাহিত্যরীতির একটি মৌলিক দিক। সমুদ্রে ভাসমান একটি বিশাল হিমশৈলের যেমন ৮ ভাগের ১ ভাগ জলের ওপরে দেখা যায়, বাকি ৭ ভাগ জলের নিচে থাকে। তিনি মনে করতেন, সাহিত্যও ঠিক সে রকমই। কাহিনির সব কথা লেখক পরিষ্কার করে প্রকাশ করবেন না। পাঠককেই আবিষ্কার করতে হবে গভীরের অপ্রকাশিত অনেক বিষয়। হেমিংওয়ে তাঁর সাহিত্যদর্শন, বুলফাইটিং, স্মৃতিকথা এবং আরও নানা বিষয় নিয়ে লেখা আলোচনা গ্রন্থ ডেথ ইন দ্য আফটারনুন–এর (১৯৩২) ১৭তম অধ্যায়ে ‘আইসবার্গ থিওরি’ নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘একজন গদ্যলেখক যদি তাঁর লেখার বিষয়ে গভীরভাবে জানেন, তাহলে তিনি অনেক কিছুই ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়ে বলতে পারেন। একজন পাঠক সেই না-বলা বিষয়গুলোর উপস্থিতি এমন গভীরভাবে অনুভব করবে, যেন সেগুলো স্পষ্টভাবেই লেখা হয়েছে।’ এ ক্ষেত্রে একজন লেখককে কতখানি প্রাজ্ঞ ও দক্ষ হওয়া প্রয়োজন, তা সহজেই অনুমেয়।
১৯৬১ সালের ৩০ জুন চিকিৎসা শেষে তিনি কেচামের বাড়িতে ফিরে আসেন। থেরাপি দেওয়ার পর তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি ক্রমেই তাঁর স্মৃতিশক্তি ও লেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন।
১৯৫৯ সালে কিউবার বিপ্লবের পর ফিদেল কাস্ত্রো কিউবা থেকে আমেরিকানদের তাড়াচ্ছিলেন এবং সে সময়ে হেমিংওয়ের অনেক ছবি, বই ও স্মৃতিবহ জিনিস জড়ো হয়েছিল। ১৯৬০ সালের ২৫ জুলাই তাঁরা কিউবা ত্যাগ করেন। কিছু জিনিস ঠিকই নিয়ে এসেছিলেন। তবে যা আনতে পারেনি, তার জন্য তাঁর কষ্টও কম ছিল না। তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছিল যুক্তরাষ্ট্রের আইডাহো শহরের কেচামে। সেখানে তিনি একটি বাড়ি কিনেছিলেন এবং স্ত্রী মেরি হেমিংওয়ের সঙ্গে বসবাস করতে শুরু করেন। এখানে তাঁর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্রমেই অবনতি হতে থাকে। সন্দেহপ্রবণতা, লিখতে না পারার অক্ষমতা, পুরোনো আঘাতগুলোর ব্যথা-বেদনা, তীব্র বিষণ্নতা—সব মিলিয়ে এক দুঃসহ যস্ত্রণার মধ্যে তাঁর দিন কাটছিল। তাঁকে ১৯৬০–এর ৩০ নভেম্বর প্রথমবার এবং ১৯৬১ সালের ২১ এপ্রিল আত্মহত্যার চেষ্টার পর ২৫ এপ্রিল দ্বিতীয়বার মায়ো ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি একাধিকবার ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপি গ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালের ৩০ জুন চিকিৎসা শেষে তিনি কেচামের বাড়িতে ফিরে আসেন। থেরাপি দেওয়ার পর তাঁর মনে হচ্ছিল, তিনি ক্রমেই তাঁর স্মৃতিশক্তি ও লেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন। তাঁর শেষ জীবনের ট্র্যাজেডির বিবরণ তাঁর নিজের কথায়: ‘যে মানুষের বয়স বাষট্টি বছর হতে চলেছে, সে যখন উপলব্ধি করে যে সে কোনো গল্প কিংবা কোনো বই লিখতে অপারগ, যা একদিন সে নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞা করেছিল—আপনারাই ভাবুন, তার কী ঘটেছে? অথবা এমন কোনো বিষয়, যা একদিন সে তাঁর সুসময়ে নিজের কাছেই অঙ্গীকার করেছিল।’
আত্মহননের ব্যাপারটি ছিল তাঁর জীবনের শেষ অ্যাডভেঞ্চার। তিনি পরাজিত হতে চাননি, তাই বেছে নিয়েছিলেন ধ্বংসের পথ—অনেকের কাছে এ-ও হয়তো জীবনের একধরনের পরাজয়ই; এ নিয়ে বিস্তর বিতর্কও হতে পারে। বিশ্বসাহিত্যের এই মহান দিকপালের প্রতি রইল আমাদের অশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
১৯৬১ সালের ২ জুলাই দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সির সেই প্রচণ্ড আশাবাদী মানুষটি, যিনি উচ্চারণ করেছিলেন ‘আ ম্যান ক্যান বি ডেস্ট্রয়েড বাট নট ডিফিটেড’ (মানুষ ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু পরাজিত হয় না), একদিন বন্দুকের গুলিতে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তাঁর জীবনীকার কার্লোস বেকার লিখেছেন, ‘এই আত্মহনন ছিল একজন অসুস্থ মানুষের করুণ পরিণতি।’ তাঁর স্ত্রী মেরি ওয়েলশ প্রথমত এটাকে আত্মহত্যা না বলে দুর্ঘটনা বলেই চালিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ, তখনকার দিনে আত্মহত্যার ব্যাপারটি ছিল চরম নিন্দনীয় কাজ। পরে ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ হাউ ইট ওয়াজ–এ তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘হেমিংওয়ে সত্যি সত্যিই সেদিন আত্মহত্যা করেছিলেন।’ আত্মহননের ব্যাপারটি ছিল তাঁর জীবনের শেষ অ্যাডভেঞ্চার। তিনি পরাজিত হতে চাননি, তাই বেছে নিয়েছিলেন ধ্বংসের পথ—অনেকের কাছে এ-ও হয়তো জীবনের একধরনের পরাজয়ই; এ নিয়ে বিস্তর বিতর্কও হতে পারে। বিশ্বসাহিত্যের এই মহান দিকপালের প্রতি রইল আমাদের অশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি।