জিয়ানজিয়াকোমো ফেলত্রিনেল্লির (১৯ জুন ১৯২৬—১৪ মার্চ ১৯৭২) প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
জিয়ানজিয়াকোমো ফেলত্রিনেল্লির (১৯ জুন ১৯২৬—১৪ মার্চ ১৯৭২)  প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

ফেলত্রিনেল্লির জন্মশতবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

প্রকাশক থেকে সশস্ত্র বিপ্লবী

একদিকে ধনকুবেরের বিলাসী জীবন, অন্যদিকে চে গুয়েভারার বিপ্লবের স্বপ্ন সাকার করার আকাঙ্ক্ষা। এক হাতে বিশ্বে তোলপাড় ফেলে দেওয়া বইয়ের পাণ্ডুলিপি, অন্য হাতে ‘অস্ত্র’। গত শতকের ইউরোপীয় ইতিহাসে জিয়ানজিয়াকোমো ফেলত্রিনেল্লির চেয়ে রহস্যময় ও বৈপরীত্যে ভরা চরিত্র কি আছে? যিনি সমাজতন্ত্রের টানে আভিজাত্যকে হেলায় দূরে ঠেলে দিয়েছেন; সোভিয়েত ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বিশ্বসাহিত্যকে উপহার দিয়েছিলেন ডক্টর জিভাগোর মতো ধ্রুপদী উপন্যাস; আবার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে নিজেই নেমেছেন সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধে। কিংবদন্তি প্রকাশক, আজীবন বিদ্রোহী ফেলত্রিনেল্লির শততম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা।

ফেলত্রিনেল্লি তাই কেবল সমাজতন্ত্রের তত্ত্বে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বিশ্বজুড়ে চলমান সব মুক্তিকামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন। সেই সূত্রে তিনি কিউবা ভ্রমণ করেন। ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ১৯৬৭ সালে চে গুয়েভারার মৃত্যুর পর, আলবার্তো কোর্দার তোলা চে-র সেই ঐতিহাসিক ছবির স্বত্ব ফেলত্রিনেল্লি নিজের দূরদর্শিতায় সংগ্রহ করেন। ছবিটির লাখ লাখ পোস্টার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেন।

তবে ফেলত্রিনেল্লির জীবন কেবল বইয়ের জগতে সীমাবদ্ধ ছিল না। ষাটের দশকের শেষ দিকে ইউরোপজুড়ে যখন ছাত্র আন্দোলন, ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ এবং বিপ্লবী রাজনীতির উত্থান ঘটছে, তখন ফেলত্রিনেল্লি আরও সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। তিনি কিউবার বিপ্লবের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, লাতিন আমেরিকার গেরিলা আন্দোলন নিয়ে আগ্রহী ছিলেন এবং নিজেও ইতালিতে বিপ্লবী পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন।

ফেলত্রিনেল্লি তাই কেবল সমাজতন্ত্রের তত্ত্বে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বিশ্বজুড়ে চলমান সব মুক্তিকামী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন। সেই সূত্রে তিনি কিউবা ভ্রমণ করেন। ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ১৯৬৭ সালে চে গুয়েভারার মৃত্যুর পর, আলবার্তো কোর্দার তোলা চে-র সেই ঐতিহাসিক ছবির স্বত্ব ফেলত্রিনেল্লি নিজের দূরদর্শিতায় সংগ্রহ করেন। ছবিটির লাখ লাখ পোস্টার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেন। আজকের দিনে চে–কে দেখা হয় বিদ্রোহ ও তারুণ্যের প্রতীক হিসেবে, এর পেছনে ফেলত্রিনেল্লির ভূমিকাও কিন্তু কম নয়।

জিয়ানজিয়াকোমো ফেলত্রিনেল্লি
বিলাসী জীবন, প্রকাশকের পরিচয়, খ্যাতি—সব ত্যাগ করে তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। ছদ্মনাম ও ছদ্মবেশ ধারণ করে তিনি হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকার অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তি।

১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে ইতালির রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা শুরু হয়, যা ইতিহাসে ‘সীসার বছর’ নামে পরিচিত। ডানপন্থী সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থানের আশঙ্কায় ফেলত্রিনেল্লি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে ইতালিতে নব্য-ফ্যাসিবাদী অভ্যুত্থান অনিবার্য। এই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ১৯৭০ সালে নিজেই গঠন করেন সশস্ত্র বামপন্থী গেরিলা সংগঠন—গ্যাপ (গ্রুপ্পি দি আজিওনে পার্তিজিয়ানা)। বিলাসী জীবন, প্রকাশকের পরিচয়, খ্যাতি—সব ত্যাগ করে তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। ছদ্মনাম ও ছদ্মবেশ ধারণ করে তিনি হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকার অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তি।

১৯৭২ সালের ১৫ মার্চ মিলানের অদূরে সেগ্রাতে এলাকার একটি বিদ্যুতের পিলারের নিচে ফেলত্রিনেল্লির ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সরকারি তদন্ত ও পুলিশের দাবি অনুযায়ী, আগের দিন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ধ্বংস করার জন্য বোমা বাঁধার সময় অসাবধানতাবশত বিস্ফোরণে তাঁর মৃত্যু ঘটে। তবে তাঁর সহযোদ্ধা ও সমসাময়িক বহু বুদ্ধিজীবীর মতে, এটি ছিল ইতালীয় গোপন সংস্থা বা ডানপন্থীদের দ্বারা সংঘটিত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

ফেলত্রিনেল্লির শততম জন্মবার্ষিকীতেও তাই ইতালির সংস্কৃতি ও প্রকাশনা জগতে তাঁর নাম সমান উজ্জ্বল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনী এবং বইয়ের চেইন শপ ‘লিবরেরিয়ে ফেলত্রিনেল্লি’ ইতালির অন্যতম বৃহত্তম এবং সফল ‘বইয়ের সাম্রাজ্য’ হিসেবে টিকে রয়েছে। ফেলত্রিনেল্লি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন এমন একজন মানুষ হিসেবে, যিনি পুঁজিবাদের চূড়ায় বসেও গেয়েছিলেন ‘সাম্যের গান’।

ফেলত্রিনেল্লির আকস্মিক ও বিতর্কিত মৃত্যুর পর কেটে গেছে বহু বছর। মাত্র ৪৬ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বই কখনো কখনো শুধু ‘বই’ নয়। একটি পাণ্ডুলিপি রাষ্ট্রকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে, একটি প্রকাশনা রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে, একজন প্রকাশক ইতিহাসের গতিপথেও প্রভাব ফেলতে পারেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, লেখক যেমন ইতিহাস তৈরি করেন, কখনো কখনো প্রকাশকও ইতিহাসের নেপথ্য নায়ক হয়ে ওঠেন। প্রকাশনার ইতিহাসে এমন উদাহরণ খুব বেশি নেই।

ফেলত্রিনেল্লির শততম জন্মবার্ষিকীতেও তাই ইতালির সংস্কৃতি ও প্রকাশনা জগতে তাঁর নাম সমান উজ্জ্বল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনী এবং বইয়ের চেইন শপ ‘লিবরেরিয়ে ফেলত্রিনেল্লি’ ইতালির অন্যতম বৃহত্তম এবং সফল ‘বইয়ের সাম্রাজ্য’ হিসেবে টিকে রয়েছে। ফেলত্রিনেল্লি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন এমন একজন মানুষ হিসেবে, যিনি পুঁজিবাদের চূড়ায় বসেও গেয়েছিলেন ‘সাম্যের গান’।