অলংকরণ: আনিসুজ্জামান সোহেল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
অলংকরণ: আনিসুজ্জামান সোহেল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

প্রেমের গল্প

এল আজুল সোলো

পৃথিবীতে সবচেয়ে পরিণামহীন প্রেম করেছিল ইসিদোরা মোরালেস। আকাশের দূর কোণে এক নিঃসঙ্গ নক্ষত্রের প্রেমে পড়েছিল সে।

এর মধ্যে কোনো উপমা বা রূপক নেই। ইসিদোরা আক্ষরিক অর্থে একটি নক্ষত্রের কাছে সঁপে দিয়েছিল নিজেকে। তার হৃদয়ের সব উষ্ণতা, সব ভালোবাসা ধাবিত হয়েছিল অন্ধকার আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকা এক নক্ষত্রের দিকে।

ঈষৎ নীলচে আলো সেই নক্ষত্রের। যেন নীলাভ আগুন জ্বলছে সেটার বুকে। উত্তাপহীন নীলাভ আগুন।

ইসিদোরা সেই নীলাভতায় মুগ্ধ হয়েছিল, এমন বলা যাবে না। সে মুগ্ধ হয়েছিল এটার নিঃসঙ্গতায়। একেবারে একা ছিল নক্ষত্রটি। এ রকম হয় না। নক্ষত্রেরা কালেভদ্রে একা থাকে। তাদের জন্ম হয় কোনো না কোনো নক্ষত্র পরিবারে, যাদের আমরা বলি ছায়াপথ বা গ্যালাক্সি। আর কঠোর মহাকর্ষ শাসিত সেই পরিবারগুলোয় ঘনসন্নিবিষ্ট হয়ে ঘুরতে থাকে নক্ষত্রেরা।

যে নক্ষত্রের প্রেমে ইসিদোরা পড়েছিল, সেটার জন্ম আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি থেকে বহু বহু দূরে প্যানডোরা ক্লাস্টারের ওপারে এক আয়নিক কুয়াশায় ঢাকা নিথর অঞ্চলে, একটা স্পাইরাল গ্যালাক্সির বাইরের দিকের বাহুতে। তারপর ভাগ্য আর অভিকর্ষের আজব খেয়ালে সেটা ধীরে ধীরে কবে যে বেরিয়ে গেছে গ্যালাক্সির অমোঘ টান উপেক্ষা করে, কে জানে! এখন এক ছায়াপথ থেকে আরেক ছায়াপথের মাঝখানে বিছিয়ে থাকা নিকষ শিথিল শূন্যতায় সেটা অভিমানবশে ভেসে চলেছে। একা। সংস্রবহীন।

এ নক্ষত্রের একটা কেতাবি নাম আছে—এজিসি ওয়ান-নাইন-এইট-সেভেন-বিএল-ওয়ান-টু। তবে ইসিদোরা এখন আর এটিকে এ নামে ডাকে না। হিস্পানি ভাষায় সে আদর করে এটির নাম দিয়েছে ‘এল আজুল সোলো’, যার অর্থ নিঃসঙ্গ নীলাভতা। ইসিদোরার দিনলিপির পাতায় পাতায় লেখা আছে এল আজুল সোলোর কথা। প্রায় প্রতিদিন সে কিছু না কিছু লেখে এ নক্ষত্রকে নিয়ে।

কী লেখে সে? প্রতিদিন কী লেখা সম্ভব একটা নক্ষত্রের ব্যাপারে? এত দূরের একটা নীলাভ বিন্দুর কী বিবরণ দেওয়া সম্ভব?

ইসিদোরা লেখে মানুষের ভাষার সীমাবদ্ধতার কথা। সে লেখে ‘নিঃসঙ্গতা’ শব্দটা কত অর্থহীন, কতটা অকার্যকর আন্তনাক্ষত্রিক মাপকাঠিতে। আমরা যখন বলি এই লোক বা সেই লোক নিঃসঙ্গ, তখন নিঃসঙ্গতার যে অর্থ তৈরি হয়, তার সঙ্গে বিন্দুমাত্র মিল নেই এ নিঃসঙ্গতার। কেননা, এল আজুল সোলোর চারপাশে নিঃসীম, নিষ্ঠুর, নিরাবেগ শূন্যতা ছড়িয়ে আছে নিযুত ক্রোশজুড়ে। এর সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী একটি অশ্বখুরাকৃতি সোনালি নীহারিকা সাড়ে চার হাজার আলোকবর্ষ দূরে।

ইসিদোরার বয়স যখন ১২, একদিন মরিসিও টেলিস্কোপের নলে চোখ রেখে মেয়েকে দেখিয়েছিলেন কারিনা নক্ষত্রপুঞ্জের এক অবাক করা নক্ষত্র কেনোপাস। বলেছিলেন, কীভাবে প্রাচীন নাবিকেরা এই নক্ষত্র দেখে সমুদ্রপথ চিনত। আরেকবার এরিদানুস নক্ষত্রপুঞ্জের নীলাভ সাদা নক্ষত্র আচেরনারকে চিনিয়েছিলেন মরিসিও।

দিনলিপির এক স্থানে ইসিদোরা ‘বুভেত’ দ্বীপের কথা লিখেছে। আটলান্টিক মহাসাগরে পৃথিবীর নিঃসঙ্গতম এ দ্বীপের সবচেয়ে কাছের মনুষ্যবসতি দুই হাজার কিলোমিটার দূরে। এমনকি বুভেত দ্বীপও এল আজুল সোলোর নিঃসঙ্গতার কাছাকাছি যেতে পারে না, এ কথা লিখেছে ইসিদোরা। একাধিকবার।

কিন্তু নক্ষত্রের এই মহাজাগতিক নিঃসঙ্গতাই কি ইসিদোরার আর্দ্রতার একমাত্র কারণ?  বলা কঠিন। একটা নক্ষত্রের প্রতি এক হিস্পানি নারীর মুগ্ধতার কোনো চেহারাগত দিক কল্পনা করা শক্ত। দিনলিপির একাধিক স্থানে ইসিদোরা নক্ষত্রটির যে বিবরণ দিয়েছে, তাকে ‘দৈহিক বিবরণ’ বলার অবকাশ খুব কম। তবে এ কথা ঠিক যে ইসিদোরা বিশ্বাস করত, আকাশের প্রতিটি নক্ষত্র একটি থেকে আরেকটি আলাদা। প্রত্যেক নক্ষত্রের নিজস্ব স্বভাব আছে, যাকে ‘ব্যক্তিত্ব’ বললে বেশি বলা হবে না। এটা সে শিখেছে তার বাবা শৌখিন জ্যোতির্বিদ মরিসিও মোরালেসের কাছ থেকে। সে বাবার কাছ থেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে তারা দেখার বাতিক আর একটা শক্তিশালী স্মিথ-ক্যাসেগ্রেইন টেলিস্কোপ, যেটা ছিল উত্তর আমেরিকার পেশাদার জ্যোতির্বিদদের এক সমিতির তরফ থেকে পাঠানো উপহার।

উত্তর চিলির বন্দর শহর আন্তোফাগাস্তার নিভৃত শহরতলি কোভিয়েফির বাড়ির ছাদে অন্ধকার আকাশের দিকে দুরবিন তাক করে প্রহরের পর প্রহর বসে থাকত ইসিদোরা। তাদের বাড়ির কাছেই মরুভূমি এসে থেমে গেছে শহরের শেষ পানশালার দরজায়। সেখানে অনেক রাত পর্যন্ত ক্যালিপসো বাজে। আর পুরো তল্লাটের ওপর উল্টো বাটির মতো ছড়িয়ে থাকে নক্ষত্র থিকথিক করা একটা আকাশ। সেইখানে সেই পানশালার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ইসিদোরার ছাদের দিকে টানা তাকিয়ে থাকে যে ছেলেটা, তার নাম তোমাস রিকেলমে। তার চোখেও মুগ্ধতা।
ইসিদোরার জন্য। কিন্তু সেটা খেয়াল করার অবকাশ ইসিদোরার কই?

এল আজুল সোলো নক্ষত্রটি প্রথম দেখেছিলেন ইসিদোরার মরিসিও, যদিও এটি তিনি প্রথম শনাক্ত করেননি। জ্যোতির্বিদ্যার লিখিত ইতিহাসে এটি প্রথম শনাক্ত করেন আইসল্যান্ডের শৌখিন জ্যোতির্বিদ স্টেফান সিগারসন। তবে ইসিদোরার বাবা মরিসিওর নামও স্মরণ করা হয় তিনটি পৃথক নক্ষত্র শনাক্ত করার কৃতিত্বের জন্য। এর একটি অতিকায় শ্বেতবামন নক্ষত্র।

ইসিদোরার বয়স যখন ১২, একদিন মরিসিও টেলিস্কোপের নলে চোখ রেখে মেয়েকে দেখিয়েছিলেন কারিনা নক্ষত্রপুঞ্জের এক অবাক করা নক্ষত্র কেনোপাস। বলেছিলেন, কীভাবে প্রাচীন নাবিকেরা এই নক্ষত্র দেখে সমুদ্রপথ চিনত। আরেকবার এরিদানুস নক্ষত্রপুঞ্জের নীলাভ সাদা নক্ষত্র আচেরনারকে চিনিয়েছিলেন মরিসিও। অত্যন্ত উষ্ণ এ নক্ষত্র বন বন করে ঘোরে। আর তারপর ইসিদোরার বয়স যখন সাড়ে ১৩ বছর, একদিন তিনি আকাশের একটা শূন্য অংশের দিকে টেলিস্কোপ তাক করে মেয়েকে বলেছিলেন, ‘এইখানে চোখ রাখ। কী দেখছিস?’

ইসিদোরা মোরালেসের প্রেম পরিণামহীন। কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত আকারহীন থাকেনি। ২০৪৭ সালে নাসা ভয়েজারের তৃতীয় মিশন পাঠায় অনন্ত নক্ষত্রপুঞ্জের উদ্দেশে। ১৯৭৭ সালের প্রথম ও দ্বিতীয় মিশনে মানবসভ্যতার কিছু শব্দ রেকর্ড করে পাঠানো হয়েছিল, আমরা সবাই সেটা জানি। এবার তৃতীয় মিশনে এক মনুষ্যযাত্রী আরোহী হিসেবে যুক্ত হয়।

ইসিদোরা সেই দিনটার কথা ভোলেনি। কোনো দিন ভুলবে না। সেদিন প্রথম সে দেখেছিল এল আজুল সোলোকে। একটা নীলাভ বিন্দু, কালো আকাশের পটভূমিতে। শুরুতে টেলিস্কোপ কিছুটা আউট অব ফোকাস ছিল বলে ঘোলা দেখাচ্ছিল নক্ষত্রটিকে। তারপর ধীরে ধীরে ফোকাস কারেকশন করা হলে ফুটে ওঠে সেটা।

সেই থেকে প্রতিদিন ওই নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে থাকে ইসিদোরা। তার মুগ্ধতার কোনো ব্যাখ্যা সে কখনো খুঁজতে যায়নি। তোমাস রিকেলমেকেও সে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। শুধু বলেছে, এর নীলাভ আলোর কারণ সম্ভবত এটির জঠরের দানবীয় উষ্ণতা। নক্ষত্রটার কেন্দ্রের উষ্ণতা ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেখানে হাইড্রোজেন আয়নের ফিউশন ঘটে হিলিয়াম আয়ন তৈরি হচ্ছে।

ইসিদোরা মোরালেসের প্রেম পরিণামহীন। কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত আকারহীন থাকেনি। ২০৪৭ সালে নাসা ভয়েজারের তৃতীয় মিশন পাঠায় অনন্ত নক্ষত্রপুঞ্জের উদ্দেশে। ১৯৭৭ সালের প্রথম ও দ্বিতীয় মিশনে মানবসভ্যতার কিছু শব্দ রেকর্ড করে পাঠানো হয়েছিল, আমরা সবাই সেটা জানি। এবার তৃতীয় মিশনে এক মনুষ্যযাত্রী আরোহী হিসেবে যুক্ত হয়। শোনা যায়, এ রকম একমুখী যাত্রায় শামিল হতে কোনো ভলান্টিয়ার পাওয়া নিয়ে সন্দিহান ছিল নাসার জেট প্রোপালশন ইউনিট। মিশনের বিজ্ঞাপন দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে একজন আগ্রহ প্রকাশ করলে তারা অবাক হয়।

ফলে যেদিন ইসিদোরা রওনা দেয়, ২০৪৭ সালের ৪ আগস্ট, সে নিশ্চিত জানত না, জানার কোনো উপায় ছিল না, সেই নক্ষত্র তারও বহু বছর পূর্বে এক বিশাল সুপারনোভায় বিস্ফোরিত হয়ে শূন্যে বিলীন হয়ে গেছে কি না। পৃথিবীতে ইসিদোরার মতো এত পরিণামহীন প্রেম কেউ করেনি। এমন পরিণামহীন মিলনযাত্রাও আর কখনো ঘটবে না।

২০৪৭ সালের ৪ আগস্ট উৎক্ষেপণ করা হয় ভয়েজার-৩ মিশন। ইসিদোরা চেয়েছিল, তার প্রেমিকের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছাতে। এর চেয়ে অবুঝ অভিলাষ আর হয় না। তাদের মাঝখানে যে নিঃসীম দূরত্ব, জীবদ্দশায় তাতে খুব হেরফের ঘটানো সম্ভব ছিল না। পৃথিবী থেকে ওই নক্ষত্রের দূরত্ব প্রায় পাঁচ লাখ আলোকবর্ষ। আর শৌখিন জ্যোতির্বিদ হিসেবে ইসিদোরার না জানার কারণ নেই যে দূরত্ব ছাড়াও এ মিলনের পথে আরেকটি নিরেট দেয়াল আছে। সেটা সময়। ইসিদোরা আর তার প্রেমিকের ভেতর পাঁচ লাখ বছরের ব্যবধান। এ অবুঝ নারী চিরকালই তার প্রেমিকের পাঁচ লাখ বছর অতীতের ছবি দেখে এসেছে।

ফলে যেদিন ইসিদোরা রওনা দেয়, ২০৪৭ সালের ৪ আগস্ট, সে নিশ্চিত জানত না, জানার কোনো উপায় ছিল না, সেই নক্ষত্র তারও বহু বছর পূর্বে এক বিশাল সুপারনোভায় বিস্ফোরিত হয়ে শূন্যে বিলীন হয়ে গেছে কি না।

পৃথিবীতে ইসিদোরার মতো এত পরিণামহীন প্রেম কেউ করেনি। এমন পরিণামহীন মিলনযাত্রাও আর কখনো ঘটবে না।