রোদ-টোড উঠে গেছে। পথে গাড়ি চলছে। ট্রাক, বাস মাটি কাঁপিয়ে চলে যাচ্ছে। আব্বাসের ঘুমও ভেঙে গেছে। ছেঁড়া কম্বলে সবকিছুকে জড়িয়ে নিয়ে পড়ে থাকতে ভালো লাগছে বলে উঠছে না। একটা ভাঙা পা, ভারী দেহ, একবোঝা ময়লা চুলের মাথা, তার সত্তা, স্নায়ু, স্মৃতি, ভূত-ভবিষ্যৎ—সবকিছুকে ওই কম্বলে জড়িয়ে পড়ে আছে। ভারি ওম্ হয়েছে। এ কম্বলে জমিলার মায়ের দেহটা যখন ছিল, তখন একরকমের আরাম হয়েছিল। এখন নেই, কখন উঠে গেছে; এখন বেশ অন্য রকমের আরাম লাগছে। মনে হচ্ছে, আমার আরামটাকে আমি একাই ভোগ করছি। পথচারীদের পায়ের জুতো ঘষার শব্দগুলোকেও ভালো লাগছে কানে। অচেতন আর চেতনের মাঝখানে যে দশা, ওই দশা বেশ আরামের।
কিন্তু কম্বলের ভেতরে যে অন্ধকার, সেটা ময়লা। বাইরে তাজা আলো ফুটেছে বোঝা যায়। ভেতরে অর্ধেক ঘুম, বাইরে জাগরণ। ভেতরে ও বাইরে হি হি ঠান্ডাও বটে। বোঝা যায়, কাছে–দূরে হলুদ রঙের রোদগুলো থাবা গেড়ে বসে আছে। জমিলা উঠেছে, পাশে বসে আছে, তা–ও বোঝা যায়। আব্বাসের মনে হয়, সমুদ্রে ভেসে আছে, কিন্তু কাছেই রয়েছে সব চর, ওই সব রোদ, এই জমিলা, জমিলার ধুমসি মা-টা ইত্যাদি।
তখন জমিলা ওকে নাড়া দিল। এই বাপ, কত ঘুমাইবা?
আব্বাস তখন শরীরটাকে লম্বা করে ছড়িয়ে দিল। পা দুটো বেরিয়ে পড়ল। কালো সূর্যের মতো মাথাটাও যেন ময়লা মেঘের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ল। কোনো কাকলাসের মতো এলোপাথাড়ি আড়িমুড়ি ভাঙল। তারপর উঠে বসল। বলল, জমিলা, তোর মা কই?
দুই হাঁটু আঁকড়ে ধরে দাঁতে দাঁত ঠুকে কাঁপছে জমিলা। বলল, জানি না। আব্বাস শেষ হাইটা তুলে চারদিকে তাকিয়ে দেখল। এই বাসযাত্রীদের ছাউনিতে শীতের রাতে যারা মাথা গুঁজে ছিল, সেই ফকির, মিসকিন, ভবঘুরেদের কেউ আর এখন নেই। এদিকে চটে ঢাকা ছোট একটা শরীর কেবল পড়ে রয়েছে। ও সেই পা-কাটা হাবু। এখনই উঠে এক পা আর দুই হাতে হেঁটে হাবাগোবা অভিনব কোনো জন্তুর মতো ফুটপাতের ওই রোদে গিয়ে বসবে, বসে চিত্কার জুড়ে দেবে, বাবা গো, ল্যাংড়া এতিমটারে দয়া করেন। ঝাঁঝালো, কিন্তু মিষ্টি গলা ওর।
কিন্তু কই, জমিলার মা কোথায় গেল? যদি গেল, ফেরে না কেন?
তখন সে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, জমিলা, টোপলা কই? জমিলা বলে, জানি না।
আব্বাস গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। এক পায়ের ওপর শরীর চাপিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। যেন ভাঙা পর্বত। একটু একটু দুলছে। যেন এখনই ভেঙে পড়বে মাথার ওপর। তোর মায়ে ভাগছে নিহি? সে বলল। জমিলা বলে, জানি না।
আব্বাস তখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গিয়ে জমিলার মাথার চুল বাম হাতে মুঠো করে ধরল। ঠিকেই জানস। ক কই গেছে, ক। জমিলা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। দুই হাতে আব্বাসের খোড়া পা চেপে ধরল। বলল, না গো, বাপ, আমি জানি না। কোন আঙ্গাইর ভোরে আমার ঘুম ভাঙছে। দেখি, মা নাই।
বড় কাতর অশ্রু জমিলার চোখে। আব্বাস তাকে ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, তখন কিশোরগঞ্জের সেই হারামিরে দেখছস?
তোর মায়ে সেই হারামির লগে ভাগছে, বুঝছনি, জমিলা? সব নিয়া ভাগছে।
বেদনা, ঘৃণা, হতাশা তার কণ্ঠে। কম্বলের ধুলো ঝেড়ে ভাঁজ করতে করতে বলল, যাউক গা। জমিলাও তাড়াতাড়ি গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
বাপ, তুমি আমারে নিবা না? বলল সন্ত্রস্তভাবে।
আব্বাস জবাব দিল না। এই ঠান্ডা সকালবেলায় সূর্যটা হঠাৎ কালো হয়ে গেছে। রোদগুলোও কালো। কাঁধে কম্বল ফেলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সে হেঁটে গেল। জমিলা নাকে সর্দি ঝরিয়ে কাঁধে ঝাঁকি মেরে মেরে ছোঁক ছোঁক করে কাঁদছে।
আব্বাস খানিকটা হেঁটে গিয়ে এদিকে–ওদিক তাকাল। ফুটপাতের পিঠ জোড়া কাঁটাতারের বেড়া, বেড়ার গা ঘেঁষে সব থোপা-থোপা ফুলগাছের ঝোপ। সেখানে বসে পেচ্ছাব করল। উঠে দাঁড়িয়ে ডাকল, আয়।
অমনি এক দৌড়ে জমিলা তার কাছে এসে দাঁড়াল। আব্বাস বলল, ল, যাই গিয়া।
বলল, জমিলারে, এই দুনিয়ায় বিশ্বাস বইলা কিছু রইল না। সবটি বিশ্বাসঘাতক। আমার একখান প্ল্যান আছিল, জমিলা, তোর মায়ে মাইনষের বাড়ি কাম করব। আমি কাগজের ঠোস বানামু। তোরে স্কুলে দিমু। তুই স্যানা হবি, চাকরি নিবি। আমাগো বুড়াকালে দিন একরকম যাইব গিয়া।
বাপ, আজ তুমি এক জাগায় বইবা, আমি এক জাগায় বমু। জমিলা বলে, একলগে বমু না। দুই জায়গায় বইলে ভিক্ষা পামু বেশি। হ?
আব্বাস বলে, জমিলা রে, আমার একখান পাও গেল, এই দুঃখ। না হলে আমিও বিলডিং দিতাম, হ।
অর্থাৎ আব্বাস ছিল মুক্তিযোদ্ধা, গাঁয়ের কৃষকের ছেলে। পরে হয়েছিল ডাকাত। গেরস্তরা তার একখানা পা ভেঙে ছেড়ে দিয়েছিল। হাসপাতালে কম দিন থাকেনি। ওই হাসপাতাল থেকেই সে ভিক্ষা শুরু করে। জমিলার মা ছিল কার না কার বিধবা। পথে পরিচয়। তাকে সঙ্গে নিয়েছিল। তার আগেও আর এক অল্প বয়সের ছুঁড়িকে নিয়েছিল। কিন্তু কেউ তার সঙ্গে থাকে না। এবার যদি কাউকে নেয়, হ্যাঁ, নেবে দুই চোখই নাই, এমন কোনো কানিকে। খোঁড়ায়–কানায় মিলে, হ্যাঁ যোটিক হবে ভালো।
ঝাঁকিয়ে শীত পড়েছে নগরে। এই শীত যেন খ্যাপা বাঘ। খোলা শরীরটাকে ছিঁড়ে–খুঁড়ে ফালা ফালা করে দিচ্ছে। ভদ্রলোকেরা গরম কাপড়ের খাঁচায় নিজেদের আটকে রেখেছেন, তাদের নধর গায়ে ওই বাঘ নখ বসাতে পারছে না।
একসময় ওই বাঘটা আব্বাসের পোষা ছিল। যত ঋতু, তার মধ্যে শীতই ছিল তার প্রিয়। গ্রীষ্মকেই অপছন্দ করত। এই রকম হয়। কারও গরম ভালো লাগে, কারও শীত। মা বলত, তুই জাড়ের মাসে পয়দা হইছিলি, জাড়ই তো তোর ভালো লাগার কথা।
দেশের ফসল শীতেই ওঠে বারো আনা। সোনার ধানে ভরে যায় মাটি। ধানের তাপে শীতের সময় গ্রামের মানুষের দেহ তপ্ত থাকে। বড় গেরস্তর দেহ অবশ্য টগবগিয়ে ফোটে। আব্বাসদের মতো খেত-মজুর, ভাগ-চাষিদের জমি-জিরাত থাকে না। তবু পরের জমিতে ঘাম ঝরিয়ে দু-চার মুঠি ফসল এই সময়েই যা ঘরে তোলা যায়। অঘ্রাণ-পৌষের ফসলের ওই উত্তাপে আবার একটা সুবাস মাখানো থাকে। তারপর ধরো, এই শীতে আবার আখ মাড়াই হয়, রস জ্বাল দিয়ে গুড় করার ধুম পড়ে যায়। মস্ত চুলার সামনে বসে আখের শুকনা পাতা, তার সঙ্গে টক গন্ধ জড়ানো আখের ছাবেড়ার জাল ঠেলতে ঠেলতে গুড়ের ওই গরম গন্ধে ডুবে যাওয়া, আহা, সে ভারি মজার সুখগুলি ছিল। গ্রামের শীতই ছিল তার সুখের মরশুম।
দিনটা খারাপ গেল। ঝিপ ঝিপ বৃষ্টি পড়ছে, হি হি বাতাস বইছে। শীত মাংস ভেদ করে পৌঁছে গেল হাড়ের ভেতরে। ভিক্ষার পক্ষেও এদিন খারাপ। আব্বাসের দুই রকমের ভিক্ষা। জুৎমতো ফুটপাতে বসে খোঁড়া পা–টা বের করে রেখে ভিক্ষার বুলি আওড়ানো। আর এক হচ্ছে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো। আজ এক জায়গায় বসে পড়াই উচিত ছিল। কিন্তু রোখ চেপে গিয়েছিল মাথায়। জমিলাকে নিয়ে লেংচে লেংচে ঘুরছে, ভিজছে, কারও দরজায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, হাঁক পাড়ছে, আবার হাঁটছে।
সেই শীত এ নগরে তাকে খ্যাপা বাঘ তো নয়, পাগলা কুত্তার মতো কামড়াচ্ছে। দিনের বেলা লেংচে লেংচে শহরময় ভিক্ষা করে বেড়ায়। শরীর গরমই থাকে। রাত কাটতে চায় না। মেয়েটাকে নিয়ে আরও মুশকিল হলো। পথের ধারে সব পুরোনো উলের জামা বিক্রি হচ্ছে। সস্তা, কিন্তু আটটা-দশটা টাকাই বা কে দেয়। পা, তুই খোঁড়া হয়ে গেলি, কী যে সর্বনাশ করলি। না হলে এই আব্বাস আলী একাত্তরের অসমসাহসী যোদ্ধা কি আর না খেয়ে শীতে কুঁকড়ে মরার নেড়ি কুত্তার এ জীবন মেনে নিত? মানুষের ঘরে ঘরে কত সুখ! সে কি আর তার হিসাব নিত না?
হায় রে আব্বাস! হিসাব নিতে গিয়েই তো তোর এক পা নষ্ট করলি। হাসপাতালে শুয়ে কমাস সে কত যে চিন্তা করেছে! ছিল মুক্তিযোদ্ধা, হলো ডাকাত! ডাকাত হওয়া কি তার উচিত ছিল? অনেক চিন্তা করেছে। সকল সবল পুরুষের বুকেই ডাকাত থাকে। না হলে সে মুক্তিযোদ্ধা হয় কী করে? না হলে সে বিপ্লবী হয় কেমন করে? ধরো, আকাশযানে চড়ে চলে গিয়ে নামে কেমন করে, এভারেস্টের চূড়ায় ওঠে কেমন করে? চিন্তায় আলোড়ন তোলা বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সাহিত্যিক হয় কেমন করে? হ্যাঁ, সেই রকম মানুষ থাকে, যারা অশিক্ষিত, যাদের বিদ্যা হয়নি, বিবেকও জাগেনি, এদিকে পেটে তাদের ভাতও নাই, কিন্তু মাথায় এভারেস্টের সমানই অপমানের বোঝা আছে, তাদের কারও কারও বুকে যদি থাকে সুনিশ্চিত প্রতিভাধর দুঃসাহসী ডাকাত, সে তাহলে কী করবে? অকর্মা যত অথর্ব মানুষের ঘরে সুখের যত ইমারত গড়ে উঠেছে বললা, তার দু–একটা সোনার ইট খসিয়ে নেবার অভিযানে তারা বেরোবে না? বেরোবে। তাদের জাগ্রত চঞ্চল ঘা-খাওয়া বিবেকই তাদের বলবে, ওঠো হে, জাগো, বেরিয়ে পড়ো, হানা দাও!
কিন্তু না, এ রকমের চিন্তা আর আব্বাস করবে না, এটা সে মনস্থির করে নিয়েছে। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সেবার এক সিদ্ধিপ্রাপ্ত বাবাজির সঙ্গে তার কদিনের সহবাস হয়েছিল। অনেক তত্ত্বসাধনের কথা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। বাবাজি বলেছিলেন, না হে আব্বাস মিয়া, তোমার চিন্তার শিকলখানা যথেষ্ট মজবুত নয়, যা–ই বলো না কেন। বলছ, বলবান পুরুষের বুকে বিবেক একটা থাকবে যে জাগ্রত চঞ্চল। না বাপু, বিবেক জাগ্রত হতে পারে, চঞ্চল হতে তো পারে না। না বেটা, বিবেক চঞ্চল হয় না। আচ্ছা মনে করো, তোমার, এই যে কত লক্ষ ঘোড়ায় টানতেছে, ওই যে তোমার সূর্যের রথ, ওর কাজ কী? পৃথিবীকে আলো করা, নাকি? বজ্রও তো তোমার পৃথিবীকে আলো করে। কিন্তু তা কেমন তোমার আলো? আসমানে মেঘের কালো বুকে বিদ্যুৎ জমে, জমে আর জমে। তখন সে তোমার আন্ধার দুনিয়াটারে কী দেয়? আলো দেয়? না আলোর দেয় ঝিলিক? আঘাত দেয়। আব্বাস, ওই চঞ্চলকে নাশ করতে হইবে।
বাবাজি আব্বাসকে অভিভূত করেছিলেন, সোজা কথা। সে পণ করেছে, না, মানুষের ধনের ওপরে নজর দেওয়ার মন্দ পথে সে আর পা বাড়াবে না। তিনি বলেছিলেন, মানুষের ভালো সুখে তোমার অংশ নাই, মন্দ সুখেও নাই, আব্বাস। বাবাজি হঠাৎ উধাও হয়ে গেলেন। তবু আব্বাস সিদ্ধান্ত করেছিল, সুফি দরবেশদের ওইটা হইল গিয়া মহব্বতের তরিকা। ওইটা তাহলে তারও তরিকা। আর একটা গুরুর সন্ধানে ছিল। তখন ওই দৃশ্যটা দেখে মাথাটা তার চক্কর খেয়ে গেল। একজনের দুই পা–ই নাই হাঁটুর ওপর থেকে। রাস্তায় সমস্ত শরীরটাকেই সে গড়িয়ে দিচ্ছে সাইকেলের মতন। হাতে একটা এলমুনির গামলা, তাতে ঠকাস ঠকাস পয়সা পড়ছে, ধুলোমাখা ভূতের মতন সমস্তটাই তার গড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু গামলা কিছুতে ওলটায় না। ওলটাইলে কী হইত? ওলটাইলে পয়সাগুলোও পথে গড়াইত। বাপরে বাপ, পা দুইটা থাকলে ও তো পাহাড় ডিঙাইত পয়সার লাইগা। এখন যেটা করতেছে, ওটা পাহাড় ডিঙানোর চেয়ে সহজ না। কিন্তু আব্বাস, তারে যে আবার ডবল চক্কর, একের জায়গায় দুই মোহ। জমিলার মায়ে যদি ভাগল, নিজের পেটের মাইয়াটারে তুই গর্ভপাতের মতো ফালাইয়া গেলি ক্যান রে হারামজাদি? এখন তার বোঝা আমি বয়ে বেড়াব নাকি?
ও মেয়ের এ শীতে সন্ধ্যা নামার আগেই এমন কষ্ট শুরু হয় যে সে সহ্য হয় না। আটটা–দশটা টাকা জমলে একটা পুরাতন যেমন-তেমন গরম জামা কেনা যায়।
দেখো, এ অবস্থায় আকাশে আবার মেঘ। মেঘটা আসে–যায়, কিসের যেন চক্রান্ত করে কদিন থেকে। শীতের দিনে ফকির-ভিখিরির রয়েছে যা কিছু, সে তো ওই আকাশের মিঠা রোদ। এখন ঠান্ডায় ওইগুলো মরে শেষ হয়ে যাবে। এবার বাতাস দিল হি হি। বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। জমিলা মিষ্টান্নের দোকানে সামান্য কার্নিশের নিচে দাঁড়িয়ে শো-কেসের কাচে নাক ঘষছিল। কিরে, একটা রাজভোগ খাইবি? আব্বাস বলল। জমিলার মুখটি সুন্দর। তাতে ভাবুনে ধরনের বিলাসী বিলাসী ভাব একটু আছে ওর মা–টার মতো। আব্বাস তার দিকে তাকিয়ে থাকে। হ বাপ, খামু। খেলাইবা? জমিলা বলে।
আব্বাস তখন ঠা ঠা করে হেসে ওঠে। জমিলার মুখের সেই ভাব, তাতে মুখে নুন-পড়া কেঁচোর মতো কুঁকড়ে-মুকড়ে পাক খায়, তারপর সেটা দ্রুত মিলিয়ে গেলে তাতে একটু লজ্জা যেন ফোটে। দোকানের লোকও এসে তাড়া লাগায়। লোকটা ঠান্ডা বাতাসে বরফকুচির মতো খিস্তিও কিছু ছড়িয়ে দেয়। আব্বাস জমিলার হাত ধরে টান মারে, তাকে নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে নেমে পড়ে। ডান হাতে লাঠি, কাঁধে ঝোলা, ছেঁড়া কম্বল, বাম হাতে জমিলা। ছড়ছড় করে গাড়িগুলো ছুটছে। নোংরা ঠান্ডা জল–কাদা ছিটে গায়ে এসে লাগছে। কিন্তু আব্বাসের প্রাণ কেঁদে ওঠে। জমিলাকে একটা মিষ্টি কিনে দেওয়ার মুরোদ তার নাই বলে নয়, তাকে ওই অট্টহাসির আঘাত করার জন্য। যাত্রাগানের ভিলেনটার মতো অট্টহাসি হাসলি? আসলে কাপুরুষে হাসে অট্টহাসি!
দিনটা খারাপ গেল। ঝিপ ঝিপ বৃষ্টি পড়ছে, হি হি বাতাস বইছে। শীত মাংস ভেদ করে পৌঁছে গেল হাড়ের ভেতরে। ভিক্ষার পক্ষেও এদিন খারাপ। আব্বাসের দুই রকমের ভিক্ষা। জুৎমতো ফুটপাতে বসে খোঁড়া পা–টা বের করে রেখে ভিক্ষার বুলি আওড়ানো। আর এক হচ্ছে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো। আজ এক জায়গায় বসে পড়াই উচিত ছিল। কিন্তু রোখ চেপে গিয়েছিল মাথায়। জমিলাকে নিয়ে লেংচে লেংচে ঘুরছে, ভিজছে, কারও দরজায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, হাঁক পাড়ছে, আবার হাঁটছে।
প্রায় কিছুই জোটেনি। অভুক্ত সারা দিন। জমিলা ঠকঠক করে কাঁপছে আর ছোঁক ছোঁক কাঁদছে। তার মাথায় যে পাখির বাসা, তার থেকে পানি পড়ছে টুপ টুপ করে। পরনের প্যান্টটি ভিজে লেপটে রয়েছে।
দেয়াল হাতড়ে সুইচ টেপে। চোখ আলোয় ধাঁধিয়ে যায়! কলাপসিবল গেটের ফাঁক দিয়ে দেখে, বৃষ্টি পড়ছে না। এদিকে ছোট একটা ভেতরে যাওয়ার দরজা। ঠেলে। ওদিক থেকে বন্ধ। অনেক ঠেলেও একচুল নড়ানো যায় না। খোলার উপায় করা যায় কি না, খুব করে দেখে। যায় না। নাহ, তাহলে বলো, ওই সাদা ধপধপ ভদ্রলোককে তুমি ফেরেশতা বলো কেমন করে? কই, তাকে তো ওনার বিশ্বাস হয়নি। দরজাটি তো বেশ নিপাট বন্ধ করে তবে শুয়েছেন।
সন্ধ্যা হতে দেখে, কী এক পাড়ায় এসে পৌঁছেছে। বড়লোকের পাড়া। বড়লোকের পাড়ায় কিছু পাওয়া যায় না। দোকানপাট নাই; দালানের পর দালান। বড় বড় গেট। গেটগুলোকে নিয়েই হলো গিয়ে মুশকিল। গেটের পাশের কুঠরিগুলিতে আলোয় বা অন্ধকারে দারোয়ান রয়েছে। সে হাঁকাড় মারছে যে গেটে দারোয়ান নাই, তালা রয়েছে। সর্বনাশ, এ কোন পৃথিবীতে এসে পড়ল তাহলে! রাস্তায় গাড়ি আছে, লোক নাই। বাস চলে না এ রাস্তায়। বাসস্টপের ছাউনিও নাই ফুটপাতে। কোথায় গুঁজবে মাথা? বাতাস বইছে এখন শনশন করে। দুর্গগুলিতে নিরাপদ আলোগুলি জ্বলছে। হায়রে! আমরা পথের কুকুর, শীতে–বৃষ্টিতে কাইকুই করে মরছি। জমিলা, ওরে, আজ রাত্রেই বুঝি আমরা মরে যাব। সে–ই ভালো। আয়, আজ আমরা মরে যাই। জমিলা বলে, বাপ, ওই যে দেখো, একটা শজনার ডাল মনে লয় পথে আইয়া পড়ছে। আমারে কয়ডা পাতা পাইড়া দাও, বাপ, চাবাই।
এক গেট পাওয়া গেল, দারোয়ান নাই, তালাও নাই। ঠেলে ওরা ভেতরে গেল। ঘাসের সবুজ পাড়ঘেরা ড্রাইভওয়ে ওদের পোর্টিকোতে নিয়ে গেল। আব্বাস হাত তুলে বোতাম টিপল। ওহ! ভেতরে কোথায় ঝনঝন করে উঠল। নিজেই সে চমকে গেল। বুঝল, অপরাধ যা করার, করে ফেলেছে। দরজা খুলে মাঝবয়েসি একজন দাঁড়ালেন। তিনি হাসলেন। না বাপু, তোমাদের জন্য তো অপেক্ষা করছি না। তিনি বললেন।
আব্বাস বলে, স্যার, আমি মুক্তিযোদ্ধা। বিশ্বাস যদি করেন, স্যার, আমি মুক্তিযোদ্ধা। এই যে দেখেন, স্যার, আমি আমার পা বিসর্জন দিছি, কার লেইগা, স্যার? হাসপাতাল থেকা বারইয়া দেখি, কেউ পোছে না। কেবল মাইকে গান বাজে, স্যার, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। স্যার, বউ গেছে, এই মেয়ে শুধু রইছে। আজ কী ভয়ংকর রাত, স্যার! ওইখানে আপনার ওই সার্ভেন্ট ঘরের সিঁড়ির নিচে আমাগোরে এট্টু মাথা গোঁজবার দেন। সারা দিন খাই নাই, স্যার। দুইজনারে দুইমুঠ ভাত দেন।
সার্টিফিকেট আছে? তিনি বলেন।
আছিল। ফালাইয়া দিছি।
কেন?
কোনো দাম নাই, স্যার।
ভদ্রলোক বলেন, আচ্ছা, এসো।
তিনি এবার দরজা বন্ধ করবেন। আব্বাস আরও জোরে চেঁচিয়ে ওঠে; আমার মেয়ের অবস্থা দেখেন, স্যার। স্যার, দয়া করেন। ঠান্ডায় আজ দম বারাইয়া যাইব গিয়া। স্যার, আপনি মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া আর কেউরে কি ভিক্ষা দেন না, স্যার? মিথ্যুককে দিই না ভিক্ষা। উনি বললেন।
আব্বাস অস্থিরভাবে বলে, স্যার, খাওন লাগব না, কেবল রাতটা মাথা গুঁজবার দেন।
ততক্ষণে ভদ্রলোকের পাশে একটি ষন্ডামার্কা ছেলে এসে দাঁড়িয়েছে নীল পুলওভার গায়ে। হাতে টেবিল-টেনিসের ব্যাট। বলে, আর একটা কথা বললে, এইটা দিয়ে মাথা ভেঙে দেব। সন্ধ্যা থেকে একটা গেম দিতে পারিনি।
আবার ওরা পথে নামে, বৃষ্টিতে নামে। আরেক বাড়ির ওই রকম গেট ঠেলে ভেতরে যায়। দরজা খটখটায়। কে? বলে একজন হাঁক পাড়েন ভেতর থেকে। আব্বাস বলে, দরজাটা এট্টু খোলেন, বাবা। আমরা মুসাফির।
মুসাফির? তা এখানে কেন? হোটেল আছে, সেখানে যান।
না বাবা, আমরা অন্য মুসাফির।
দরজাটা দয়া করে খুলে গেল। ইনিও মাঝবয়েসি ভদ্রলোক। বলেন, কী? স্যার, আমি মুক্তিযোদ্ধা। হাসপাতাল থেকে বেরিয়েছি, স্যার।
আব্বাসকে ভদ্রলোক আর বলতে দেন না। বলেন, দেখে তো মনে হয়, জেলখানা থেকে বেরিয়েছ?
না স্যার, মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম, ভিখারি হইছি। আব্বাস বলে, স্যার, শুধু আইজকার রাতটা এট্টু আশ্রয় দেন। কী ভয়ংকর রাত, স্যার। আমার মেয়েটা ঠান্ডায় মরে যাবে, স্যার। সারা দিন পেটে এউকগা দানা পড়ে নাই, স্যার। শুধু এট্টু মাথা গোঁজার ঠাই, দুখান পোড়া রুটি, স্যার।
আর কথা না বলে দরজাটি তিনি বন্ধ করে দেন। জমিলা বুকে দুই হাত জোড়া করে ঠকঠকিয়ে কাঁপতে থাকে আর আব্বাস বন্ধ দরজার এদিকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কতক্ষণ ধরে চেঁচিয়ে মরে।
পথে নেমে জমিলা বলে, বাপ, আমার নাক দিয়া রক্ত পড়ে। জমিলা; আব্বাস বলে, ওই রক্ত দিয়া পথের পাথরে লেইখা রাখ, এই পৃথিবীর সর্বনাশ হইব, এই পৃথিবী ধ্বংস হইব।
আরও দু-তিন বাড়ি ওরা কড়া নেড়েছিল বা বেল বাজিয়েছিল। এক আশ্চর্য ভদ্রলোককে শেষে পাওয়া গেল। তিনি অনেকক্ষণ ধরে সেই ভাঙা গ্রামোফোনের রেকর্ড শুনলেন। ভারি ধৈর্যবান শ্রোতা। শোনেন আর খালি মাথা নাড়েন। আহা, কোন দেশে আমরা বাস করছি, বাছা। তিনি বলেন। এ কোন পৃথিবী? এসব কথা আর শুনতে ভালো লাগে না, বুঝলে? এসব দৃশ্য আর দেখতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু কোথায় তোমাদের থাকতে দিই? এ খোলা বারান্দায়? না, গ্যারেজটা খালি আছে, গাড়ি সার্ভিসিংয়ে গেছে, ওখানে মনে হয় ভালোই থাকবে। জায়গাটা গরম হবে। ওরে ইদরিস, শোন বাবা, গ্যারেজের চাবিটা আন। দাঁড়াও তোমরা, হ্যাঁ, দেখি, তোমাদের খাবারও কিছু দেওয়া যায় কি না। চাকর ইদরিস আপত্তি করেছিল। খাওন দেন, থাকতে দেওয়ার কাম কী? খাইয়া যাউক গিয়া।
কিন্তু ভদ্রলোক শুনলেন না। তিনি দাঁড়িয়ে থেকে গ্যারেজ খোলালেন। বাতিটা জ্বেলে দিলেন। তারপর চলে গেলেন। চাকর দুই থালা গরম ভাত-তরকারি দিয়ে গেল।
খাওয়া সেরে জমিলাকে কম্বলের ভেতর বুকের মধ্যে নিয়ে আব্বাস শুল। মানুষ না, ফেরেশতা। বলল আব্বাস। জমিলা বলে, হ, আল্লায় হ্যাগো ভালো করব।
বলতে বলতে সে ঘুমিয়ে পড়ে। তার ছোট বুকটি আব্বাসের পেশল বুকে নিশ্চিন্তে ওঠানামা করছে পাখির হালকা বুকটির মতো। তার ভেজা স্যাঁতসেঁতে পাখনাগুলি দেখতে দেখতে শুকিয়ে গরম হয়ে গেছে। মবিল পেট্রল লোহার গন্ধ আর বাইরে বৃষ্টির ঝিপঝিপ শব্দ তার স্নায়ুগুলিকেও রিমরিমিয়ে অসাড় করে আনছে। আব্বাস ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু একটা চিন্তা যেন তার মাথার মধ্যে ছিলই। কতক্ষণ নাক ডাকিয়েছে জানে না, কিন্তু ঘুম ভেঙে গেছে। উঠে বসে। কত রাত কে জানে। বিড়ি খাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সে অতৃপ্তি এখনো বুকের মধ্যে নড়ছে। আর অন্য একটা গন্ধ পাচ্ছে সে। ওটা বড়লোকদের গন্ধ। আব্বাস যখন থেকে ডাকাত হয়েছে, ওই বাতিকে ধরেছে তাকে। বড়লোকের গন্ধ পেলে রক্ত কেমন করে।
দেয়াল হাতড়ে সুইচ টেপে। চোখ আলোয় ধাঁধিয়ে যায়! কলাপসিবল গেটের ফাঁক দিয়ে দেখে, বৃষ্টি পড়ছে না। এদিকে ছোট একটা ভেতরে যাওয়ার দরজা। ঠেলে। ওদিক থেকে বন্ধ। অনেক ঠেলেও একচুল নড়ানো যায় না। খোলার উপায় করা যায় কি না, খুব করে দেখে। যায় না। নাহ, তাহলে বলো, ওই সাদা ধপধপ ভদ্রলোককে তুমি ফেরেশতা বলো কেমন করে? কই, তাকে তো ওনার বিশ্বাস হয়নি। দরজাটি তো বেশ নিপাট বন্ধ করে তবে শুয়েছেন।
ঘুম ভেঙে যায়। আবার তখনই তলিয়ে যায় ঘুমে। আবার সেই জরদগব স্বপ্ন। শীতের ময়াল সাপের মতো লম্বা ঘুম থেকে জাগল আব্বাস। দেখে, একেবারে অন্ধকার। জমিলাকে দেখতে পায় না। অন্ধকারে বসে থাকে। এখানে কুয়াশা মাটির অল্প ওপরে। তার ওদিকে আলোয় সব মানুষের ছায়া দেখা যায়। আব্বাস জমিলাকে ডাকতে শুরু করে। কাতর স্বরে ডাকে। অন্ধকারে জেগে উঠে শিশু যেমন মাকে ডাকে, সেই রকম ডাকে।
এখানে এ গ্যারেজে রয়েছে কেবল ফাটা টায়ার একটা, তেল–কালিমাখা ন্যাকড়া, গোটা দুই মবিলের টিন, খালি পানির বোতল—এই সব আবর্জনা। গ্যারেজে থাকেই বা কী! গাড়িটা থাকলে তবু হেডলাইটের কাচ, বাল্বগুলো, পারলে উইন্ডশিন্ডগুলো খুলে নেওয়া যেত।
আরে আব্বাস, এ কী, এ তুই কী চিন্তা করছিস? সেই তস্কর তার বুকের মধ্যে এভাবে জেগে উঠল? একটু আগে যাকে ফেরেশতা বলেছিস, এ নিদারুণ রাতে কেউ ছিল না, কেবল যে তোকে আশ্রয় দিল, খেতে দিল, তারই ঘরে চুরি করার জন্য এভাবে চঞ্চল হয়ে উঠলি? ধিক, তোকে ধিক!
সে আবার কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে। কিন্তু না, ঘুম আসে না।
আবার উঠে বসে। একটা বিড়ির জন্য সত্যি মনটা আনচান করছে।
আচ্ছা, ওটা কী? ওই যে এই কোণে চুপটি করে বসে রয়েছে বাঁদরের পিচ্চি বাচ্চার মতো? মন নিমেষে নেচে ওঠে। ওটা জ্যাক, ইলিয়াস মুনশির গ্যারেজে ও জিনিস দেখেছে। এই বাজারে ও জিনিসেরও অনেক নাম। ইলিয়াস মুনশির নামটা কবার জপল।
উঠে গিয়ে জ্যাকটাকে তুলে আনে। বেশ ভারী। ঝোলার মধ্যে ভরে তলায় হাত দিয়ে ধরে থাকতে হবে। নাহলে ছিঁড়ে পড়ে যাবে। জমিলা, জমিলা, ওরে জমিলা, ওঠ!
চাপা গলায় জমিলাকে ডাকছে, প্রবল নাড়া দিচ্ছে। অনেক কষ্টে ঘুম ভাঙানো যায়। কম্বল ভাঁজ করে কাঁধে ফেলে। বলে, ল জমিলা, আমরা যাই গিয়া। জমিলা বলে, ক্যান বাপ, এখনো তো সকাল হয় নাই?
আব্বাস কোনো কথা না বলে ঝোলা কাঁধে ঝুলিয়ে কলাপসিবল গেট ফাঁক করে ওর হাত ধরে বেরিয়ে পড়ে। বাহ, গেটে তালা-টালা নাই। গেট খুলে রাস্তায় নামে। না, রাত বেশি বাকি নাই। বৃষ্টি নাই। বড় রাস্তা ছেড়ে তাড়াতাড়ি ছোট রাস্তায় যায়।
ইলিয়াস মুনশির গ্যারেজে পৌঁছাতে বেলা নটা হলো। একদম ভেতরে ঢুকে গিয়ে মুনশিকে ধরল। একটা জিনিস আনছি। বলল। মুনসিব মতো দাম পেলে আপনারেই দিমু। আপনার লগে অনেক দিনের পরিচয়। জ্যাকটা বের করলে মুনশি বলে, কই পাইলা? কিনছি। কম দামে পাইলাম, কিইনা ফালাইলাম।
টাকা পাইলা কই? মুনশি জানতে চায়।
অধৈর্য আব্বাস বলে, টাকা ছিল। অহন কত দিবেন, কন। জ্যাকটাকে রেখে আব্বাসকে মুনশি দরজার কাছে নিয়ে আসে। আহো, এদিকে আহো। পকেট থেকে দশ টাকার নোট বের করে ধরে। নাও।
আব্বাস চোখ কপালে তোলে, কী দ্যান? দশ টাকা?
তো আর কত দিতাম? লও, বেশি দিছি।
আব্বাস চেঁচিয়ে ওঠে। অন্তত পাঁচ শ দাম। আমারে আড়াই শ টাকা দেওন লাগব।
মুনশি বলে, আরে যাও যাও, বেশি প্যাঁচাল পাইড়ো না কইলাম। মুনশি বলে। অহন ভাগো, নইলে...
নইলে কী? আব্বাস জানতে চায়।
একদিন আইয়া আর পাঁচ টাকা নিয়া যায়ো। আজ নাই। জিনিসের দাম জান না। অখন যাও, নইলে পুলিশ ডাকমু।
ইলিয়াস মুনশি ভেতরে চলে যায়। আব্বাস চোখের মধ্যে অক্ষম আগুন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে।
বাপ, কী হইছে? জমিলা জিজ্ঞাসা করে।
কিছু হয় নাই। আব্বাস বলে। আমার পাপের শাস্তি হইছে। ল, যাই গিয়া। জমিলাকে নিয়ে সে যায় মিষ্টির দোকানে। আট টাকায় দুইটা টসটসে রাজভোগ কেনে। দুটাকার বিড়ি কেনে। পথের ওদিকে আঁস্তাকুড়ের ওদিকটায় জারুলগাছের নিচে ওখানে গিয়ে ওরা বসে।
মেঘ কেটেছে, কিছু আছে। কিন্তু ঠান্ডা কনকনে। বাপ, বড় শীত করে। জমিলা বলে।
আমার কোলে আয়। আব্বাস বলে। আয়। জমিলাকে কোলে বসিয়ে কম্বল জড়িয়ে নেয়। বলে, হ্যাঁ রে, তোর একটা গরম জাম্পার কিনতে হইব না, তোরে যে রাজভোগ খেলাইতেছি? পয়সা জমাইতে হইব না? রাজভোগের ঠোঙা সামনে ধরে বলে, খা। জমিলা বড় আনন্দে একটা রাজভোগ তুলে নেয়। একটু দেখে, তারপর কামড় বসায়। বলে, বাপ, তুমি খাও না।
তুই খা।
দোনোটাই খামু?
হ।
তুমি খাইবা না?
না। জমিলা বলে, ক্যান, না বাপ, তুমি একটা খাও।
আব্বাস বলে, না রে, তুই খা।
জমিলা বলে, ক্যান, খাইবা না ক্যান?
আরে পাগলি, জীবনে অনেক খাইছি। আব্বাস বলে। তুই খা। আমাদের দিন শ্যাষ হইছে। জমিলা বলে, না, তুমি খাও। আমার দিন তো পইড়া রইছে। কত খামু! আব্বাস খেল না। একটা বিড়ি ধরাল। জমিলা দ্বিতীয় রাজভোগটাও খেল। ততক্ষণে তার শরীরটাও গরম হয়েছে। হঠাৎ তার নীড়ের কোটা থেকে একটা চঞ্চল সুখের পাখির মতো সে ফুড়ৎ করে উড়ে বেরিয়ে গেল ওই যে ওই ব্যস্ত ফুটপাতটার দিকে। ওই তো ঝলমারা পোশাক পরা এক মহিলাকে পেয়েছে। হাত পাতল। আব্বাস জারুলতলায় কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। সারা দিন আর উঠল না। খোঁড়া পা-টা পাহাড়ের মতো ভারী হয়ে গেছে। বারবার একটা স্বপ্ন দেখছিল জরদগব ধরনের। পাহাড়ের মতো ভারী পা-টাকে একদল ছেলেমানুষ মুক্তিযোদ্ধা একটা জ্যাক লাগিয়ে যতবার ওঠাবার চেষ্টা করছে, পড়ে যাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা বুটমার্চ করে চলে গেল পৃথিবীর ওই পিঠে। তখন সেই ধপধপে ভদ্রলোক, যিনি নিদারুণ রাতে আশ্রয় আর আহার দিয়েছিলেন, তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছেন। আব্বাস তা–ই দেখে গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে ওঠে। তুমি হাসছ কেন? জানো না, তোমার করুণাকে আমি ঘৃণা করি, আমি ভালোবাসি আমার পাপকে।
ঘুম ভেঙে যায়। আবার তখনই তলিয়ে যায় ঘুমে। আবার সেই জরদগব স্বপ্ন। শীতের ময়াল সাপের মতো লম্বা ঘুম থেকে জাগল আব্বাস। দেখে, একেবারে অন্ধকার। জমিলাকে দেখতে পায় না। অন্ধকারে বসে থাকে। এখানে কুয়াশা মাটির অল্প ওপরে। তার ওদিকে আলোয় সব মানুষের ছায়া দেখা যায়। আব্বাস জমিলাকে ডাকতে শুরু করে। কাতর স্বরে ডাকে। অন্ধকারে জেগে উঠে শিশু যেমন মাকে ডাকে, সেই রকম ডাকে।