অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

গল্প

ভোলা

পৌষের দ্বিতীয় সপ্তাহ। ঢাকা শহরে শীত তেমন একটা পড়েনি। মূল শহরের ভেতর টের পাওয়া যায় না। তবে শহরের সীমান্তে ঠিকই শীত বোঝা যায়। সকালে কেউ যদি আমিনবাজার পার হয়, বাসের মধ্যেই শীত করবে। কিংবা নন্দীপাড়া ছাড়িয়ে গেলেও একই অবস্থা। কিন্তু ভোলা এসব জায়গার কোনোটিতেই যায় না। সে ঘুমিয়ে থাকে সদরঘাটের পল্টুনে। এই ভোলাকে চট দিয়ে একটা জামা বানিয়ে দিয়েছে মানুষ ভোলা। সেটা পরেই ঘুরে বেড়ায় দিনে আর ঘুমিয়ে থাকে রাতে।

ছেলেবেলার কথা ভোলার তেমন একটা মনে পড়ে না। কেবল মাঝে মাঝে স্বপ্নের মতো করে ভেসে আসে চার ভাইয়ের সঙ্গে মারামারি করে মায়ের দুধ খাওয়ার স্মৃতি। তখন ভোলা সদরঘাটে ছিল না, কাছাকাছি কোথাও ছিল। জায়গাটার নাম হয়তো লক্ষ্মীবাজার। মানুষের মুখে শুনেছে ভোলা। সে তো উচ্চারণ করতে পারে না। ভোলাদের কোনো শব্দভান্ডার নেই। কেবল ঘেউ ঘেউ করতে পারে।

অবশ্য সেটা মানুষের চোখে আর মানুষেরই জগতের হিসাবে। নয়তো ভোলাদেরও নিজস্ব ভাষা আছে। মায়ের কাছে ঘেঁষতে পারত না যখন, একটু দূরে সরে করুণ চোখে তাকিয়ে থাকত। বাকি চার ভাই ছিল শক্তিশালী। মায়ের স্তনে তাদেরই দখল ছিল বেশি।

তবে মা তো মা। তাই সাদা-হলুদ মেশানো তার মা-টা একটা সময় অন্য ছেলেদের ঠেলে সরিয়ে দিত। মোলায়েম স্বরে একটা ঘেউ করে উঠত। সেটা ছিল ভোলার আনন্দের সময়। দুধের বাঁটে মুখ রেখে আরামে পান করত।

কিন্তু সেটা সব সময় নয়। কেননা ভোলার মা মনে করত, তার এই দুর্বল ছেলেকে লড়াই শিখতে হবে। মানুষের দুনিয়ায় টিকে থাকতে হলে তার যেমন অন্য কুকুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে, তেমনি মানুষ, মানুষের তৈরি যন্ত্রের সঙ্গেও যুদ্ধ করতে হবে।

ছেলেবেলার কথা ভোলার তেমন একটা মনে পড়ে না। কেবল মাঝে মাঝে স্বপ্নের মতো করে ভেসে আসে চার ভাইয়ের সঙ্গে মারামারি করে মায়ের দুধ খাওয়ার স্মৃতি। তখন ভোলা সদরঘাটে ছিল না, কাছাকাছি কোথাও ছিল। জায়গাটার নাম হয়তো লক্ষ্মীবাজার।

ভোলার দুটো ভাই মারা গেছে ট্রাকচাপায়। অল্প বয়সে দুটো গিয়েছিল বাকল্যান্ড বাঁধে ফূর্তি করতে। মা বারবার মানা করেছিল, কোনোটাই শোনেনি। শেষ রাতে একটা ট্রাক এসে পিষে দিয়েছিল দুজনকে একসঙ্গে। ভোলা সেখানে ছিল না। দুই দিন পর মায়ের সঙ্গে দেখা হলে সে জানিয়েছিল। আর ‘হক ভওক’ শব্দ করে বলেছিল, ‘আমরা রাত জেগে পাহারা দিই দুনিয়া। কিন্তু আমাদের পাহারা দেওয়ার কেউ নাই। যখনই রাতে বড় রাস্তা দিয়ে যাবি, চোখ কান খোলা রাখবি।’

ভোলা অক্ষরে অক্ষরে সেই কথা পালন করেছে। কৈশোর পার করতে করতেই তার শরীর সবল হয়েছে। সে দাপিয়ে বেড়াতে পারত পুরো এলাকা। তার ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত সূত্রাপুরের একেকটা কুকুর। তখনই প্রথম প্রেমেও পড়েছিল ভোলা। তারপর জন্ম দিয়েছিল অনেকগুলো সন্তান।

অবশ্য কোনোটার সঙ্গেই তার আর যোগাযোগ নেই। হয়তো কিছু মরে গেছে। কিছু চলে গেছে অন্য কোনো পাড়ায়। আর দিনে দিনে ভোলার বয়স বেড়ে সে হয়ে গেল বুড়ো। তাকে এখন আর কোনো কুকুরই তেমন মানে না। মোসাদ্দেকের দোকানের আশেপাশে ঘুরঘুর করে সে। মুরগির নাড়িভুঁড়ি ফেলে দিলে সেসব নিয়ে দৌড় দেয়। সব দিন দৌড়াতেও পারে না। জিহ্বা বের হয়ে আসে তার। আর সেই সব দিন অন্য পাড়ার কুকুরের পাল্লায় পড়ে যায়। আগে খুব বাধা দিত ভোলা, মারামারি করত। কিন্তু এখন পারে না। মাঝে মাঝেই তার মুখের খাবার নিয়ে যায় স্বজাতির কেউ। তখন ভুখা দিন কাটে ভোলার।

মা ওকে বলেছিল মানুষের দুনিয়ায় কুকুর ঘৃণ্য। মানুষ ওদের দেখলে তেড়ে মারতে আসে। বহুবার মানুষের তাড়া খেয়েছে ভোলা। ওর দিকে ছুড়ে মেরেছে ফুটন্ত পানি। লাঠি নিয়ে মেরেছে পায়ে। ওর দুটো ভাইকে গাড়িচাপা দিয়ে মেরেছে। ওর বন্ধুদের ধরে নিয়ে জননক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু এই মানুষেরই কেউ কেউ আবার তার দিকে ছুড়ে দেয় বাসি রুটি, বিস্কুট কিংবা মানুষের অখাদ্য কিছু। সেসব হয়তো করুণা। তবে শেষ জীবনে ভোলা একজন বন্ধু পেয়েছে মানুষের মধ্যে।

সদরঘাটে ভোলা কবে নেমেছিল, তা নিজেরই মনে নেই। আর তার নামও ভোলা ছিল না কোনো কালে। আবদুস সামাদ একদিন ভোলা হয়ে গিয়েছিল নিজের অজান্তেই।

সামাদের তখন বয়স চল্লিশের মতো। একদিন ভোলা থেকে ছেড়ে আসা একটা লঞ্চ থেকে তাকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল সদরঘাটে। লঞ্চের খালাসি মোমিন দেখেছিল, একটা লোক দুই দিন ধরে ঢাকায় আসছে, একই লঞ্চে ভোলায় ফিরছে। সেই কথা মোমিন বলেছিল সারেং আবদুল বারেককে। বারেক লোকটাকে ধরে নিয়ে বার কয়েক জিজ্ঞেস করেছিল তার সাকিন–সুলুক। কিন্তু আবদুস সামাদ তখন অপ্রকৃতস্থ। জানাতে পারেনি নিজের কোনো পরিচয়। যেকোনো প্রশ্নে উত্তরেই বলত, ‘ভোলা’।

সামাদ তত দিনে ভোলা হয়ে গেছে। সদরঘাটে কুলিমজুর থেকে শুরু করে ভিখারি–ভবঘুরেরা নতুন কাউকে সহজে আপন করে নেয় না। তাদের মধ্যে প্রথমেই থাকে আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্ব। কিন্তু ভোলার অপ্রকৃতস্থ অবস্থাই তাকে সাহায্য করেছিল। ওকে কেউ শত্রু মনে করেনি।

লঞ্চে এমন পাগল রাখা যায় না। মোমিনকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল লোকটাকে নামিয়ে দেওয়ার। মোমিন আর সোবহান তাকে নামিয়ে দিয়েছিল পল্টুনে। দুই দিন পর ভোলা থেকে ফিরে এসে দেখা গেল, ময়লা কোট পরে সে পল্টুনেই ঘুমাচ্ছে। মরমর অবস্থা। তারপর মোমিনই মাথায় তেল ঘষে, পানি খাইয়ে লোকটাকে সুস্থ করেছিল। তার পর থেকে ভোলা সদরঘাটেই থাকে। কেউ কোনো প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে পারে না। কেবল বলে, ‘ভোলা’। এভাবেই তার নামও হয়ে গেল ভোলা।

আবদুস সামাদ নিজের পরিচয় মনে করতে পেরেছিল ছয় মাস পর। দৌলতখানে সামাদদের বড় গেরস্তি ছিল। হয়তো এখনো আছে। কিন্তু গেরস্তিতে মন ছিল না ভোলার। সে সিনেমা দেখে বেড়াত। ভোলায় তখনো সিনেমা দেখা অত সহজ ছিল না। দৌলতখানে দুটো বাড়িতে ছিল ডিভিডি প্লেয়ার। আর বাজারের দোকানে একটা। সেখানেই পড়ে থাকত সামাদ। বাপের খেতখামার, মাছের চাষ দেখার কোনো ইচ্ছা ছিল না।

সামাদের বাবা আবদুর রাজ্জাকের দুই স্ত্রী। দ্বিতীয় স্ত্রীর ছেলে আফজাল চালাক–চতুর। সিনেমাপাগল ভাইকে সে একটু একটু করে মদের নেশায় চুর করে ফেলে। তার সঙ্গে আরও কী খাওয়াত, তা সামাদ জানে না। তবে সদরঘাটে এক সকালে ঘুম ভেঙে সামাদের মনে হলো ভাই তাকে মুরগির নাম করে চিলের মাংসই খাইয়েছিল।

সামাদ তত দিনে ভোলা হয়ে গেছে। সদরঘাটে কুলিমজুর থেকে শুরু করে ভিখারি–ভবঘুরেরা নতুন কাউকে সহজে আপন করে নেয় না। তাদের মধ্যে প্রথমেই থাকে আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্ব। কিন্তু ভোলার অপ্রকৃতস্থ অবস্থাই তাকে সাহায্য করেছিল। ওকে কেউ শত্রু মনে করেনি।

ভোলাও তাই আর কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। নিজের স্মৃতি ফিরে পেলেও তা জানায়নি। তবে শারীরিকভাবে সুস্থ হওয়ার পর কুলিগিরি শুরু করেছিল। কাল্লু সর্দার তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে কুলির কাজ। বোঝা মাথায় তুলে লঞ্চে তুলে দেয় ভোলা। দরদস্তুর করে দেয় অন্য কোনো কুলি। তাদের সঙ্গেও ভোলার কথা হয় না। মাঝে মাঝে দুই একটা শব্দ উচ্চারণ করত, এটুকুই।

তারপর এক শীতের সকালে নিজের পাশে একটা কুকুরকে শুয়ে থাকতে দেখে ভোলা। মাঘের শীতে কুকুরটা কাতর হয়ে পড়েছিল হয়তো। মুখের পাশ দিয়ে লালা গড়িয়ে পড়েছিল। তখন সম্প্রতি গাঁজা ধরেছে ভোলা। নেশা নয়, শরীর গরম রাখতে। আর ভোলার তেমন শীতও করে না। তাই নিজের লেপ সে তুলে দেয় কুকুরটার গায়ে।

সেদিন থেকে সদরঘাটে দুটো ভোলাকে দেখা যায়। একটা মানুষ ভোলা, প্রায় মূক। মাঝে মাঝে একটা–দুটো শব্দ উচ্চারণ করে। আরেকটা কুকুর। সেটা প্রথমে কুঁই কুঁই করে শব্দ করত। এরপর ভোলার যত্নআত্মি পেয়ে একটু চাঙা হয়ে ঘেউ ঘেউ শুরু করে। সেই সময়ই সবাই কুকুরটার নামও দেয় ভোলা। সদরঘাটে ভাসমান কুলি আর ভিখারিদের বন্ধু হয়ে ওঠে সে। তবে সবচেয়ে বেশি বন্ধুত্ব মানুষ ভোলার সাথে। কোনো কোনো সকালে সূর্য ওঠার আগে তারা হাঁটতে বের হয়। সূর্যোদয়ের সময় ফিরে আসে। দূর থেকে তাদের দেখলে মনে হয় কোনো পৌরাণিক মানব কিংবা দেবতা তার বাহনকে পাশে নিয়ে চলছেন।