অলংকরণ: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
অলংকরণ: মাসুক হেলাল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

কালবৈশাখী

কয়দিন হলো ঢাকায় চড়া রোদ, সারা দিনটাই যেন ঝিমধরা দুপুর। ঘামে ভেজা শরীরটা জোর করে টেনে নিয়ে যেতে যেতে সবার মনে ক্ষীণ আশা, আজ আসবে কালবৈশাখী। বিকেলে কিছুটা মেঘ করেছিল, ক্লাসের ফাঁকে জানালা দিয়ে আকাশ দেখে দ্বীপ। দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি হয়তো হয়েছে, জানা নেই, কিন্তু সন্ধ্যার আকাশে মেঘের চিহ্নটুকুও দেখা গেল না আর। ঘরের সিলিং ফ্যানটাও নষ্ট, রাতে ভেজা গামছা জড়ায় মেঝেতে ঘুমানোই ভরসা। এর চেয়ে খালপারে বসে একটু ঠান্ডা হয়ে রাত করে বাড়ি ফেরাই ভালো।

তবে ভ্যাপসা গরমটা না পড়লেও, দ্বীপ আজ যেত খালপারে। প্রতিদিনই সে যায়, সন্ধ্যার পর, কখনো বন্ধুবান্ধব নিয়ে, কখনো একা। যদিও একা যাওয়া প্যারাই, কাটিং করার সময় কেউ কাগজ ধরে রাখলে সুবিধা। কিন্তু এই গুমোট আবহাওয়ায় কাজকর্ম, চিন্তাভাবনা সবই স্থবির, কাউকে ডাকতেও আলস্য লাগে। দ্বীপ তাই আজ একাই যায়। খালপারের এককোণে আধো আলোয় হাঁটু গেড়ে বসে জয়েন্ট বানায়। আগুন ধরাতে গিয়ে দেখে, পকেটে লাইটার নাই। একটা গোল করে দাঁড়ায় থাকা গ্রুপের কাছ থেকে লাইটার চেয়ে আগুন ধরায় নেয় দ্বীপ। এরপর বসে পড়ে ফাঁকা বেঞ্চে।

সন্ধ্যার পর খালপার জায়গাটা দ্বীপের ভালোই লাগে। ফটোকপির দোকানগুলোর পেছনে ড্রেনের লাইন আর আবর্জনার স্তূপ, তার পাশেই পরিষ্কার করে এই ফাঁকা জায়গাটুকু বানায় নেওয়া। আশপাশের কলেজ-ভার্সিটির ছাত্রছাত্রী বা অফিসফেরত নানান লোক আসে এখানে। অন্ধকারেও তাই সকলেই সকলের মুখচেনা। সবকিছুর ভেতরই একটা পরিচিত ধারাবাহিকতা একে অপরের সাথে সবকিছু মিলেমিশে একাকার। যেমন এই তো এখন গান বাজছে, কিন্তু দ্বীপ বুঝতে পারছে না, ইউকুলেলে হাতে ছেলেটা গান গাচ্ছে নাকি গান বাজছে ফোনে। অথচ এখনো দুই টানও দেয়নি সে। পাশে একটা ফাঁকা দোকানঘরে সব সময়ই কিছু ছেলে ভিড় করে, কী আছে সেখানে? প্রতিদিনই দ্বীপের জানতে ইচ্ছা করে।

এখন খালপারে বসে সেই সব দিন অবাস্তবই লাগে। এই আলোর শহরে বসে বিশ্বাস হইতে চায় না যে এত অন্ধকার, এত নীরব হওয়াও সম্ভব পৃথিবীর পক্ষে! সাদা আকাশের নিচে বুক ভরে ধোঁয়া টানতে গিয়ে চোখে ভাসে মাঝিপাড়ার মাটির কল্কিগুলা। গাঁজার পুরের সাথে সেখানে দিতে হতো ছোট একটা নারকেলের ছোবার বল। এরপর তাতে আগুন দিয়ে সেই কল্কি মাথায় ঠেকায় একটান। সেই আয়োজনে ভরা দুনিয়া থেকে কোথায় চলে এল সে! আবর্জনায় ভরা দুর্গন্ধের পাশে বসে করতে হয় স্বস্তির আয়োজন!

ঢাকা শহরের প্রায় সব জায়গাতেই একা যাওয়া অস্বস্তির। কিন্তু খালপার জায়গাটায় একা এসেই শান্তি। ইচ্ছেমতো চিল্লাচিল্লি করা যায় অথবা চুপচাপ বসে জোন-আউট হওয়া যায়। দ্বীপ আসে মূলত দ্বিতীয়টার জন্যই, বাড়ির কথা ভাবার মতো একটা নির্ঝঞ্ঝাট অবসরের খোঁজেই দ্বীপ আসে এখানে। সেখানকার আকাশ এ সময় হতো হালকা গোলাপি আর চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। দ্বীপদের গ্রামটাই তমসাচ্ছন্ন, বেশির ভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না, বাকি বেলায় অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে যায় দুই-চারটা হলুদ বাল্বের আলোয়। সেই অন্ধকারে দ্বীপের ঘরে বিছানার নিচে ঘুমায় থাকত দুটা ছাগলছানা। রাতে ঘুম না এলে কখনো তারা বের হয়ে ছোটাছুটি করত আর দ্বীপের বাবা টর্চ জ্বালায়ে তাদের খুঁজে বেড়াত ঘরময়। বাবা মারা গেল গত বছর। মড়া পোড়ানোর পরদিন জাউভাত খেয়ে রাতে মেঝেতে শুয়ে বিছানার নিচের অন্ধকারে দ্বীপ দেখতে পেল না ছাগলগুলোকে। জাউভাত, সেলাইবিহীন কাপড়, ধূপের ধোঁয়া আর রাতভরা কীর্তনের ভেতর পরে আর খোঁজ নেওয়ার অবসর হলো না। এর মধ্যেই দ্বীপের ঘরে উঠে এল ছোট কাকারা। দ্বীপ তো ঢাকায় পড়তেই যাচ্ছে দুদিন পর, ঘরগুলো দেখাশোনার লোক তো লাগবে...! শ্রাদ্ধের পরদিনই ব্যাগ হাতে ঢাকায় চলে এল দ্বীপ, হলে জায়গা নাই বলে কাকাই এসে তাড়াহুড়ো করে সাবলেটের ব্যবস্থা করে দিল। এভাবেই দ্বীপের ঘর হলো এই শহরে আর ছাগল দুটো যে কার গোয়ালঘরে আশ্রয় পেল, তা আর জানা হলো না কখনো।

এখন খালপারে বসে সেই সব দিন অবাস্তবই লাগে। এই আলোর শহরে বসে বিশ্বাস হইতে চায় না যে এত অন্ধকার, এত নীরব হওয়াও সম্ভব পৃথিবীর পক্ষে! সাদা আকাশের নিচে বুক ভরে ধোঁয়া টানতে গিয়ে চোখে ভাসে মাঝিপাড়ার মাটির কল্কিগুলা। গাঁজার পুরের সাথে সেখানে দিতে হতো ছোট একটা নারকেলের ছোবার বল। এরপর তাতে আগুন দিয়ে সেই কল্কি মাথায় ঠেকায় একটান। সেই আয়োজনে ভরা দুনিয়া থেকে কোথায় চলে এল সে! আবর্জনায় ভরা দুর্গন্ধের পাশে বসে করতে হয় স্বস্তির আয়োজন!

দ্বীপ চোখ খুলে তাকায়। কালবৈশাখী এসেছে। চারদিকে উড়তে থাকা ধুলায় ভরে যায় মুখ আর প্লাস্টিকের ব্যাগ, বোতল এসে বেঁধে যায় শরীরে। এরপর ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি... শরীরে সুচের মতো বিঁধতে থাকা সেই জলরাশির মধ্যে বসে ক্ষণপ্রভার দিকে তাকায় থাকতে থাকতে দ্বীপ বুঝতে পারে, সে মেয়েটাকে আগলে রাখতে চায় আর একবার জিজ্ঞাসা করে দেখতে চায় সেই ছাগল দুটোর কথা।

হাতের জয়েন্টটা শেষ হয়ে গেলে চোখ খুলে তাকায় দ্বীপ। সামনের মুখোমুখি ফাঁকা বেঞ্চে একটা মেয়ে বসেছে। প্রথম দেখায় অস্বস্তি হয়, অজানা নারীর সামনে ভালনারেবল অবস্থায় ধরা পড়ায়, অথবা মেয়েটার ব্যতিক্রমী মুখশ্রীর জন্য। কমবয়সী শারীরিক গড়নে মাথাভর্তি সাদা চুল তার অথবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক কারণে যা দ্বীপের এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।

কী কারণ হতে পারে? কী তার মনে পড়ছে না? দ্বীপ অস্থিরভাবে স্মৃতি হাতড়ায়। মেয়েটার সাথে চোখাচোখি হয় কয়বার। সে হয়তো জয়েন্টে দুইটা টান দিতে চায়, এই জন্য আসছে, পকেটে পয়সা নাই; এ রকম বহুলোক এখানে ঘুরে বেড়ায়, এর-ওর থেকে চেয়েচিন্তে দুইটা টান দেয়। এদের অগ্রাহ্য করে যাওয়াই শ্রেয়। দ্বীপ চোখ বুজে আবারও না চাইতেও হারায় যাইতে থাকে স্মৃতির বহু গভীরে। ভুলে যাওয়া কত কিছু পরপর চলে আসে। বহু আগে কোনো একদিন, ভাষা কী, তখনো ওর জানা নাই... শুয়ে ছিল চিরচিরে রোদে, তেষ্টায় পেট জ্বলছে, হাত-পা ছুড়ে সর্বশক্তি দিয়ে কান্না করে তাই জানাইতে চায় সে তার ক্ষুধার কথা, কিন্তু কেউ ফিরেও আসে না… এরপর অন্য কোনো একদিন... ক্লাসের শেষ বেঞ্চটায় বসে জানালার বাইরে তাকায় দেখছিল কতগুলা কিচিরমিচির করা পাখির দলকে… আর কিছু না বুঝে উঠতেই ঠাসঠাস করে হাতে বেতের বাড়ি… এরপর আরেক দিন বৃষ্টিতে চুপি চুপি দ্বীপ গেল পুকুরপাড়ে.. গিয়ে দেখে পানিতে ভেসে যাচ্ছে পাশের বাড়ির ছোট বাচ্চাটা… কত চিৎকার আর কোলাহল! এরপর আরেক দিন... বাঁশঝাড় পার করে যেদিকটায় পরিত্যক্ত ঘরগুলা, সেখানে ফিরে এল কিছু মানুষ। আর একটা বাঁশগাছের পিছে নিজের ছোট শরীরটাকে আড়াল করে সেদিকে তাকায় ছিল সে… দেখছিল শহুরে লোকগুলার হাত ধরে আসা ছোট মেয়েটাকে... মাথাভর্তি সাদা চুল তার, কিন্তু সাজগোজে এতই সাদামাটা যে ওড়না দিয়ে ঢেকে রাখা সেই চুল দ্বীপের চোখে পড়ে নাই সেদিন… কিন্তু আজ দ্বীপের মনে পড়ে যায়, এই তো সেই মেয়ে… কী নাম তার? মন বলে, ওর নাম ক্ষণপ্রভা… পরক্ষণেই… না, সে ক্ষণপ্রভা না… ক্ষণপ্রভা তো দিদার নাম… সেই ছোট মেয়ের নাম দ্বীপ জানত না… এই মেয়ের নামও দ্বীপ জানে না… আর এই মেয়ে সেই মেয়ে না–ও হইতে পারে…

দ্বীপ চোখ খুলে তাকায়। কালবৈশাখী এসেছে। চারদিকে উড়তে থাকা ধুলায় ভরে যায় মুখ আর প্লাস্টিকের ব্যাগ, বোতল এসে বেঁধে যায় শরীরে। এরপর ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি... শরীরে সুচের মতো বিঁধতে থাকা সেই জলরাশির মধ্যে বসে ক্ষণপ্রভার দিকে তাকায় থাকতে থাকতে দ্বীপ বুঝতে পারে, সে মেয়েটাকে আগলে রাখতে চায় আর একবার জিজ্ঞাসা করে দেখতে চায় সেই ছাগল দুটোর কথা।

দ্বীপ হাত বাড়ায় দেয়, ক্ষণপ্রভা সাবলীলভাবে হাত রাখে সেই হাতে, যেন সে এতক্ষণ অপেক্ষাতেই ছিল। এরপর দুজনে দৌড়ে দৌড়ে খুঁজতে থাকে একটা নিরাপদ সানসেট।