রিকশা মিনহাজকে নামিয়ে দেয় বাজারের প্রান্তঘেঁষা বাসস্ট্যান্ডে। শ্রীবৃন্দারামপুরের বাজারটি জমজমাট হলেও এ স্ট্যান্ড থেকে সারা দিনে জোর তিনটি বাস খানিক দূরের একটি রেলওয়ে জংশনে যাতায়াত করে। ভোরবিহানে একটি বাস অবশ্য প্যাসেঞ্জার হলে মহকুমা শহর অবধি পাড়ি দেয়। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, কালিঝুলিমাখা ড্রাইভার মুড়ির টিন শেপের একটি বাসের হুড তুলে ইঞ্জিনে কী যেন খুলিবিলি করছে। খানিক ইতস্তত করে মিনহাজ ভারী কালো ব্যাগটি নিয়ে এক–পা দু–পা করে সামনে বাড়ে। নিপাট কালো প্যান্টের সঙ্গে মেরুন রঙের হাতা গোটানো শার্টে তাকে লুঙ্গি পরা গামছা কাঁধে কিংবা কিস্তি টুপি মাথায় হাটুরেদের ভিড়ভাট্টায় একটু ভিন্ন দেখায়। সে থেমে গোল্ডফ্লেকের প্যাকেটটি বের করে গ্যাসলাইটারে সিগ্রেট ধরাতে যায়। নাড়াচাড়ায় পকেট থেকে র্যাবোন সানগ্লাস খুলে পড়ে নুড়িপাথর ছড়ানো কাঁচা সড়কে।
ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগ্রেট কামড়ে ধরে সে উবু হয়ে রোদচশমাটি তুলে রুমালে মুছতে মুছতে আরও দু’কদম সামনে বাড়ে। বিকেলের ট্রেনে জেলা শহর থেকে স্টেশনে নেমে, রিকশা ধরে মিনহাজ মাত্র বাজারে এসে পৌঁছেছে। ট্রেনটি ঘণ্টাখানেক লেট হওয়ায় সন্ধ্যা হতে চলল। তা হোক, সমস্যা কিছু নেই, একটি বিদেশি ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ মিনহাজ। জেলা সদর থেকে ঢাকা ফেরার পথে সে বাজারটি কাভার করতে চাচ্ছে। এখানে ফার্মেসির সংখ্যা তিন। ঢাকাগামী মেল-ট্রেনে তার স্লিপিংকারের বার্থ রিজার্ভ করা আছে। রাত সাড়ে দশটার ভেতর স্টেশনে ফিরে গেলেই হলো।
খানিক দূরের মসজিদ থেকে মাইকে মাগরিবের আজান শোনা যায়। এ সময় সে কোনো ফার্মেসিতে ঢুকতে চাচ্ছে না। সময় কাটানোর অসিলায় মিনহাজ এদিক–ওদিক তাকায়। ভাবে, টিকিটঘর থেকে বাসের সময়সূচি জেনে নিলে খারাপ হয় না। দুই-আড়াই মাস পর পর তাকে এ বাজারে আসতে হয়। কোনো কোনো সময় জংশনসংলগ্ন ছোট্ট টাউনের ফার্মেসিগুলোও সে একই সঙ্গে কাভার করে। এখানে টেম্পো বা বেবিট্যাক্সি সহজে পাওয়া যায় না আর ট্রেনে করে যাতায়াতে লেটের বিষয়টা মাথায় রাখতে হয়।
মিনহাজ উঠে আসে টিকিটঘরের বারান্দায়। একটু আগে বিজলিবাতিগুলো জ্বলেছে, তার আলোয় দেখে, কাউন্টারের পেছনে টেবিলটি ঘিরে জমে উঠেছে তাসের আড্ডা। একজন কার্ড ডিল করতে করতে তার দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চোখ ফিরিয়ে তাস বাটতে শুরু করে। টিকিট উইন্ডোর পাশে আঠা দিয়ে লাগানো ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’ সিনেমার পোস্টার। ছবিতে নায়িকা ববিতার গণ্ডদেশে কে যেন টিপকলমে এঁকে দিয়েছে চাঁদতারা। একটু নজর দিতেই বাস অ্যাসোসিয়েশনের সিল–ছাপ্পড় মারা টাইপ করা সময়সূচি দেখতে পায়। পকেট থেকে নোটবুক বের করে মিনহাজ টুকে নেয় বাস ছাড়ার তথ্য।
ঠিক তখনই স্ট্যান্ডের অন্ধকারাচ্ছন্ন কোণে রাখা পেট্রলের ড্রামগুলোর পেছন থেকে ভেসে আসে, ‘কার লাগি রে মন কান্দ...’। সিঁড়ির ধাপ থেকে নিচে নামতে নামতে মিনহাজ যেন চমকে ওঠে! সুরেলা আওয়াজটি বন্ধ হয়ে গেছে, চিকন গলার কণ্ঠস্বর রীতিমতো রেওয়াজ করে মাজা। মিনহাজ দু–পা এগিয়ে ড্রামগুলোর দিকে নিরিখ করে তাকায়, গুনগুনিয়ে সামান্য সুরও যেন খেলে, তারপর সবকিছু নীরবতায় সুনসান হয়ে ওঠে। কী ভেবে মিনহাজ একটু অপেক্ষা করে। ফের দু-পা এগিয়ে গিয়ে উঁকি দেয়, তখনই স্যাঁতসেঁতে কচুবনের ভেতর দিয়ে ছরছরিয়ে কে যেন ছুটে যায়। একটি নেড়ি কুকুর পড়িমরি করে ভুকভুকিয়ে ছোটে ওই দিকে।
বাজারের ভেতর দিকে, যেখানে কুপি জ্বালিয়ে, মাটিতে ছালার টাট বিছিয়ে চলছে আনাজপত্র, গুড় বা কেরোসিনের বিকিকিনি, ওদিকে হাটুরেদের ভিড় বাঁচিয়ে সাবধানে হাঁটতে গিয়ে মিনহাজ একটু অবাক হয়! কেবল একটি চরণের সুরেলা কণ্ঠস্বর তার মন থেকে মুছে যাচ্ছে না। কী কারণে জানি গলাটি ভারি চেনা মনে হয়!
একটি ছাপড়ামতো চায়ের দোকানে কড়াইয়ে ভাজা হচ্ছে পেঁয়াজু, গন্ধে পরিসর চনমনে হয়ে উঠেছে। দাঁড়িয়ে পড়ে মিনহাজ আকাশ–পাতাল ভাবে। এসএসসি পাস দেওয়ার বছর দেড়েক আগে সামান্য দিনের জন্য সে জড়িয়েছিল বাম রাজনীতির আন্ডারগ্রাউন্ড এক চক্রের সঙ্গে। মনোযোগ দিয়ে চেয়ারম্যান মাও সে–তুংয়ের রেডবুকও পড়েছিল। স্কুলের আরও তিনটি সতীর্থ ছেলের সঙ্গে মিলেঝিলে গড়ে তুলেছিল গুপ্ত রেডগার্ড স্কোয়াড।
তাদের কাজ ছিল, রাতের আঁধারে স্থানীয় পোস্ট অফিস, হাইস্কুল ও ইউনিয়ন কাউন্সিলের সাতচালা ঘরের চুনকাম করা দেয়ালে লাল কালিতে চিকা মারা। রূপবান টিন কেটে চিকার সাঁচে গোটা গোটা হস্তাক্ষরে তারা লিখেছিল, ‘নকশালবাড়ীর লাল আগুন/দিকে দিকে জ্বলবে দ্বিগুণ’, ‘বাংলার কমরেড বন্ধু/এইবার তুলে নাও হাতিয়ার...’ ইত্যাদি। তাদের সশস্ত্র বিপ্লবের পরিকল্পনা এর চেয়ে বেশি দূর আগুয়ান হতে পারেনি। গ্রামে রক্ষী বাহিনী নেমেছিল। সর্বত্র ছড়িয়ে ছিল ‘নকশাল দেখিলেই গুলি করিবেন’ নির্দেশজনিত সশঙ্কিত প্রতিক্রিয়া।
মাঝরাতে স্কোয়াডের আরেকটি ছেলের সঙ্গে একত্রে বাড়ি ছেড়েছিল মিনহাজ। রেললাইন ও বাসস্ট্যান্ড অ্যাভয়েড করে তারা তেরো-চৌদ্দ মাইল হেঁটে গিয়ে পৌঁছেছিল আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপের এক মুরব্বি গোছের কমরেডের বসতবাড়িতে। তাঁর সাংকেতিক ভাষায় লেখা চিঠি নিয়ে অতঃপর তারা রাতের ট্রেনে বেশ কয়েকটি স্টেশন উজিয়ে গিয়ে উঠেছিল ছোট্ট এক শহরে। এদিকে—কাছেই অন্য ছেলেটির বোন-দুলাভাইয়ের বাসা। তবে মিনহাজ চিঠির জরিয়ায় শেল্টার পেয়েছিল এখানকার অচেনা এক কন্ট্রাক্টরের বাসায়।
দিন কয়েক ওখানে মিনহাজ দরজা–জানালা বন্ধ একটি কামরায় স্রেফ শুয়ে-বসে কাটিয়েছিল। কাজের লোকজন দরজায় টোকা দিয়ে সরপোশে ঢাকা ডাল-ভাত-তরকারি পৌঁছে দিত। বাইরে বেরোনো সে নিরাপদ বোধ করেনি। তখন ভোরবিহানে, রোদ তেতে ওঠার আগে, ভেতর দিককার কোনো কামরায় হারমোনিয়াম বাজিয়ে একটি মেয়ে রেওয়াজ করত। মিনহাজ বিছানায় শুয়ে শুয়ে নীরবে শুনে যেত—‘যে ছিল আমার স্বপনচারিণী/ তারে চিনিতে পারিনি...’। না, মেয়েটিকে সে কখনো চোখে দেখেনি, তার নামটি জানার কোনো সুযোগও হয়নি। তবে সেই থেকে হারমোনিয়াম ও তবলার সঙ্গে সংগত করে বাজানো সংগীতের প্রতি মুগ্ধতা জন্মেছিল।
বোধ করি বেবাটের মতো চায়ের দোকানটির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল মিনহাজ। কাঁধে করে কাটা বাঁশের আঁটি বয়ে নিয়ে, কাঁচা বাজারের দিকে যেতে যেতে গামছা কাঁধে এক লোক খিস্তি করে ওঠে। মিনহাজ দু-পা সরে যায়। চায়ের দোকানে আটার কাইয়ে খামিরা তৈরি করতে করতে একটি বালক হেসে ওঠে। সচেতন হয়ে মিনহাজ লজ্জিতভাবে সামনের দিকে পা বাড়ায়। আস্তে-ধীরে হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবে—‘কার লাগি রে মন কান্দ...’ গাওয়ার ভঙ্গির সঙ্গে ‘যে ছিল আমার স্বপনচারিণী...’ গাওয়া মেয়েটির কণ্ঠস্বরের কোথায় যেন মিল আছে।
রবিনহুড ফার্মেসিতে ঢুকতে গিয়ে মিনহাজ ইতস্তত করে। ওখানে ডাক্তার আকদ্দস মোল্লাকে ঘিরে জটলা পাকাচ্ছে বেশ কয়েকজন রোগী। ভাবে—কিছুক্ষণ পর ঢুঁ মারলেও চলে। তো সে ক্রিং ক্রিং করে বেল বাজানো রিকশার পাশ কেটে চলে আসে মসজিদের কাছে। মিনারঘেঁষা জারুলগাছের আধো অন্ধকারে একটু দাঁড়ায়।
মাগরিবের পাঞ্জেগানা নামাজ সেরে মুসল্লিরা ফিরে গেছেন নিজ নিজ দোকানে। সদকায়ে জারিয়ার আবেদন জানানো মাইকটি নীরব হয়ে আছে। পুরোনো দিনের নোনাধরা মসজিদটির গম্বুজের শীর্ষে চিত্রার্পিত হয়ে উঠেছে পঞ্চমীর চাঁদ। ফিনফিনে জালিতে বোনা একটি সফেদ টুপি—সম্ভবত কোনো মুসল্লির বেখেয়ালে খুলে পড়ে আটকে আছে গেটে লোহার রেলিংয়ে। ধানখেত থেকে অজু-গোসলের পুকুরটি পাড়ি দিয়ে উড়ে আসছে ব্যাকুল হাওয়া। তাতে গঙ্গাফড়িংয়ের ডানার মতো শুভ্র টুপিটি মৃদু মৃদু নড়ছে।
ঘাড় বাঁকিয়ে মিনহাজ খানিক দূরের রবিনহুড ফার্মেসির দিকে তাকায়। জটলা কমে গেছে। তবে দুজন রোগীকে আকদ্দস ডাক্তার তর্জনী তুলে জোরেশোরে কিছু বলছেন। মিনহাজ অধৈর্য হয়ে সিগ্রেট ধরায়। তখনই অজুর ঘাটলা থেকে ফের ভেসে আসে সুরেলা আওয়াজ। সে উদ্গ্রীব হয়ে কান পাতে, পয়লা চরণটির কথা ধরতে পারে না, রিকশার ক্রিং ক্রিং আওয়াজে পুঁটি মাছের ঘাইয়ের মতো তা যেন মৃদু তরঙ্গ তুলে মিলিয়ে যায়, তবে ‘হুম হু...হু...উ..উ...’ করে সুরটুকু খেলতে থাকে।
কবজিতে ঝলমলে সিকো ফাইভ ঘড়ি বাঁধা, শহুরে কেতার মিনহাজ, কয়েক কদম আগ বাড়িয়ে, উঁকি দিয়ে ঘাটলার দিকে তাকানো সুবিবেচনার কাজ মনে করে না। তাই জোরালো ইচ্ছাশক্তিতে কৌতূহলকে চেপে রেখে সে রবিনহুড ফার্মেসির দিকে পা বাড়ায়। তখনই সুস্পষ্ট স্বরে ভেসে আসে বোধ করি দ্বিতীয় চরণ—‘হাওয়ার ডালে দড়ি বান্ধ...’। স্বরটি কার, মনে হয় মিনহাজ এবার ঠিকঠাকমতো ধরতে পেরেছে। ভাবে, আরেকটু সময় দাঁড়িয়ে ফের শুনবে।
না, কণ্ঠস্বরটি ফের ধ্বনিত হয় না। তবে জারুলগাছের তলায় দাঁড়িয়ে থেকে মিনহাজ একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হয়, কিশোর বয়সে কন্ট্রাক্টরের বাসায় শেল্টার নিয়ে শোনা অদেখা মেয়েটির কণ্ঠস্বর এটা নয়। রেওয়াজ করা এ আওয়াজের সঙ্গে বরং শিউলি পালের গায়কির বেশ খানিকটা মিল আছে।
বছর দুয়েক পর, এসএসসি পরীক্ষায় গোটা দুই লেটার নিয়ে উতরানো মিনহাজ—তার গ্রাম থেকে বেশ দূরের একটি মফস্সল শহরের কলেজে ভর্তি হয়। তখন কিশোর-বয়সে নকশালপন্থীদের সঙ্গে তার যৎসামান্য যোগাযোগের বিষয়টি সে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলতে চাইছে। পার্টি বদল করে মস্কোপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হয়। একই সঙ্গে শামিলও হয় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকর্মে। গানবাজনায় হাতেখড়ির সূত্রপাতে ‘মারো জোয়ান হেঁইও মারো কষে টান...’, বৃন্দ কেতায় অনুশীলন করতে গিয়ে তার সাক্ষাৎ ঘটেছিল শিউলি পালের সঙ্গে।
গার্লস স্কুলের শেষ ধাপে পড়ুয়া কিশোরীটি যখন সবার সমবেত কণ্ঠে গলা মিলিয়ে গেয়ে উঠত, ‘তালে তালে ফেলো বৈঠা নদীতে উজান...’, কণ্ঠস্বরের তুমুল তোড়ে তার গ্রীবা বেঁকে যেত আর পুঁতির মালা পরা কণ্ঠার নিচে আধফোটা কলির মতো উথলে উঠত শরীরের নওল শোভা। আড় চোখে তাকিয়ে, মিনহাজের ভেতরে যেন অলীক জোছনায় ফুটে উঠত থোকা থোকা কমলা রঙের বোঁটায় রোশনি ছড়ানো শুভ্র ফুল।
শিউলির সঙ্গে তার কথাবার্তার পরিসর একটি-দুটি বাক্যের সীমান্তে আটকে ছিল। তবে মেয়েটি যখন শহরের কোনো বিচিত্রা অনুষ্ঠানে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইত, ‘সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে...’ কিংবা ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে...,’ মিনহাজ হলরুমের পেছন দিকের চেয়ারে বসে থেকে চোখ দুটি আধবোজা করে ভাবত, বছরখানেকের ভেতর শিউলি যখন কলেজে ভর্তি হবে, তখন তার সঙ্গে দিলখোলা মিথস্ক্রিয়ায় তেমন কোনো অন্তরায় থাকবে না।
ঘটনাটি মিনহাজ যেভাবে কল্পনা করেছিল, সে ভাবে ঘটেনি। শিউলি পাল প্রত্যাশিতভাবে কলেজে এসেছিল, মিনহাজের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসেওছিল, কিন্তু উদীচীতে চেনাজানা হওয়া ছেলের সঙ্গে দু–দণ্ড আলাপে তার আগ্রহ ছিল না। তত দিনে সে শাড়ি পরতে শুরু করেছে, কপালে টিপ ও খোলা চুল প্রভৃতির কল্যাণে হঠাৎ করে বেড়ে ওঠা তার দেহলতায় ফুটতে শুরু করেছে রাবীন্দ্রিক আভা।
সাত মাসের মাথায়, কলেজের বেলবটম প্যান্ট পরা ইংরেজির চ্যাংড়ামতো এক প্রভাষকের সঙ্গে শিউলির সম্পর্ক নিয়ে ক্যানটিনে তুমুল কথাবার্তার কিছুটা মিনহাজের কানে আসে। তারপর শোনা গেল, মেয়েটি সঙ্গোপনে ঢাকায় পাড়ি দিয়ে ম্যারেজ রেজিস্টারের দপ্তরে কথিত লেকচারারের সঙ্গে বিবাহিত হয়েছে। ভিন্ন ধর্মের শিক্ষককে লাভ ম্যারেজ করার কারণে বিষয়টা থানা-পুলিশ অবধি গড়িয়েছিল। তবে শিউলি ও তার অধ্যাপনা খোয়ানো বর আর কখনো কলেজ ক্যাম্পাসে ফিরে আসেনি। এ ঘটনায় খুব যে ব্যথিত হয়েছিল মিনহাজ, তা–ও নয়। তবে তার মুগ্ধতার ঘোর বেশ খানিকটা ফিকে হয়ে এসেছিল।
রবিনহুড ফার্মেসির কাছাকাছি এসে সে খেয়াল করে, ফরফরে ফ্যানের তলায় দাঁড়িয়ে আকদ্দস ডাক্তার গাব্দাগোব্দা চেহারার এক রোগীকে শাসানোর ভঙ্গিতে হাত বাতাসে ছুড়ে তুছতাছ করছেন। মিনহাজ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে একটু ইতস্তত করে। সাথে সাথে তার অবচেতনের যুক্তিবাদী সত্তা সচেতন হয়ে ওঠে। কণ্ঠস্বর কিংবা গায়কিতে যথেষ্ট সাযুজ্য থাকলেও শিউলি পালের ঝোঁক ছিল মূলত রবীন্দ্রসংগীতের দিকে। ঠেকায় পড়ে সে হয়তো দু-একটা সমবেতভাবে গাওয়া গণসংগীতেও গলা মেলাতে পারে। তবে পল্লিগীতি–জাতীয় সুরছন্দের সঙ্গে মিনহাজ তাকে মেলাতে পারে না। আর এদিককার একটি অজপাড়াগাঁয়ের বাজারে তার আউলাঝাউলা হালতে গান গেয়ে ঘুরপাক করারও কোনো সংগত কারণ নেই।
ব্লাডপ্রেশার মেশিনের ফিতা খুলতে খুলতে বাইফোকাল চশমার ফাঁক দিকে ডাক্তার মিনহাজকে দেখতে পেয়ে তেজি গলায় আওয়াজ দেন, ‘দাঁড়াইয়া কী দেখতেছেন, আসেন, ভেতরে আসেন।’ ফার্মেসিতে ঢোকামাত্র ইশারায় তাকে বসতে বলে, হাঁক পেড়ে দেয়ালের সঙ্গে লাগোয়া টি–স্টলের মেসিয়ারকে চা দিতে বলেন। অতঃপর তিনি মোটাসোটা রোগীটিকে রীতিমতো খেদিয়ে পর্দার ওপাশে পাঠান। তিনিও পেছন পেছন ঢুকে পড়েন পরীক্ষা করার খুপরিমতো কামরায়।
মিনহাজ ব্যাগ খুলে টেবিলের ওপর ওষুধের স্যাম্পল ও গ্লসিপেপারে ছাপা প্যামফ্লেটগুলো গুছিয়ে রাখে। ডাক্তারের ডেস্কটপ নেমপ্লেটটির পাশে রাখা দুটি বইয়ের একটি মৌলানা আবুল কালাম আজাদের ‘মৃত্যুর দুয়ারে মানবতা’ এবং অন্যটি ‘দস্যু মোহন ও রমা’। গ্রন্থ দুটি অত্যধিক ব্যবহার এবং বয়সের ভারে বেজায় জরাজীর্ণ। আকদ্দস ডাক্তার অবসরে বইপত্র ঘাঁটতে পছন্দ করেন।
আকদ্দস ডাক্তার নাকি তারুণ্যে আড়াই বছরের মতো মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেছেন। এমবিবিএস ডিগ্রি অবধি পৌঁছালেন না কেন, বলা মুশকিল। তাঁর হাতযশ আছে, সহজে রেগে ওঠেন, রোগীদের ওপর চোটপাট করেন, তাদের অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করেন, প্রয়োজনে ইনজেকশনও ফোড়েন। তবে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে তাঁর সন্দেহ প্রচুর। নিজের অসুখবিসুখে আকদ্দস ডাক্তার নির্ভর করেন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায়।
কবজির কাছাকাছি পুরোনো একজিমা বেশ কিছুদিন পর চুলবুল করে উঠলে, মিনহাজ চুলকাতে চুলকাতে কাউন্টারের তলার দিককার র্যাকের দিকে তাকায়। ওখানে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাবিষয়ক গোটা চারেক বইয়ের পাশে ছোট্ট একটি কাঠের বাক্স। তার ওপর কোনো বই থেকে ব্লেডে কেটে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ডাক্তার হ্যানিম্যানের ছবি। এ বাক্সে আকদ্দস ডাক্তার হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ছোট শিশিগুলো রাখেন।
কবজির কাছে চুলকানির প্রকোপ বাড়লে কপাল কুঁচকে মিনহাজ শার্টের গোটানো আস্তিন খুলে চর্মরোগের কর্কশ দাগটি ঢেকে ফেলে। সে সচেতন যে, কোনো কারণে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়লে বা কোনো কিছুর হিসাব মেলাতে না পারলে ক্ষতটি তাতিয়ে ওঠে, তীব্র হয় খাউজ। একটু আগে শোনা ‘কার লাগি রে মন কান্দ...’ চরণটির কণ্ঠস্বর আদতে কার, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে গিয়েও হানড্রেড পার্সেন্ট শিওর হতে পারছে না সে, সম্ভবত এ কারণে খাউজটি থেকে থেকে তাতিয়ে উঠছে।
একটু আগে রোগীর দুজন আত্মীয় এসে খুপরিতে ঢুকেছে। ডাক্তার তেজি গলায় তাদের জেরাজবর করছেন। তিনি বেরিয়ে এলে তাঁর সামনে চুলকানোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। মাস তিনেক আগে যখন মিনহাজ রবিনহুড ফার্মেসিতে এসেছিল, তখন ভিন্ন একটি মানসিক সংঘাতে সম্ভবত তার চুলকানি বেহদভাবে বেড়ে গিয়েছিল। বিষয়টা ডাক্তারের নজরে পড়লে, তিনি তাকে হোমিওপ্যাথিকের কয়েকটি পুরিয়া দিয়েছিলেন। ওই ওষুধ মিনহাজ ব্যবহার করেনি, এ নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথাবার্তায় সে আগ্রহী নয়।
একটি হকার ছেলে ফার্মেসিতে ঢুকে কাউন্টারের ওপর ইত্তেফাক পত্রিকা রেখে কোনো কথা না বলে চটজলদি বেরিয়ে যায়। ডাক্তার খুপরিতে প্রচুর সময় নিচ্ছেন। মিনহাজ পত্রিকাটি হাতে নেয়। পয়লা পৃষ্ঠায় বেশ বড় হেডিং দিয়ে ছাপা হয়েছে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবর্গ তথা সর্বজনাব আবদুল মালেক উকিল, ডক্টর কামাল হোসেন, তোফায়েল আহমদ প্রমুখের দিল্লিযাত্রার সংবাদ। নির্বাসনে থাকা মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা ওয়াজেদ স্বদেশে ফিরে দলের সভানেত্রীর পদ গ্রহণে সম্মত হয়েছেন।
ডাক্তার বেরিয়ে এসে রোগীসহ তার আত্মীয়স্বজনকে ওষুধপত্র বুঝিয়ে দিচ্ছেন। ফার্মেসির ছোট্ট পরিসরে পথ্য ইত্যাদি নিয়ে আঞ্চলিক জবানে কথাবার্তা হচ্ছে প্রচুর। সবকিছু ছাপিয়ে মসজিদের দিক থেকে পরিষ্কার আওয়াজে ভেসে আসে, ‘কার লাগি রে মন কান্দ/ হাওয়ার ডালে দড়ি বান্ধ...’। একটি প্রায়-চেনা নারীকণ্ঠ সামান্য বিরতি নিয়ে সুরছন্দ বহাল রেখে ‘জলদি দড়ি বান্ধ…’ আওয়াজ দিলে, তার পেছন পেছন ছুটে আসা পথশিশুরা হাততালি দিয়ে হল্লা করে ওঠে। সড়কে আধো অন্ধকারে আলুথালু বসনের একটি নারীদেহের পেছনে ছুটে আসা গোটা আষ্টেক ছেলেমেয়ের প্রোফাইল ফুটে উঠতেই বিদ্যুৎ চলে যায়।
আকদ্দস ডাক্তার মোমবাতি জ্বালাতে জ্বালাতে গজ গজ করে বলেন, ‘অল ভিলেজ লিভিং আনএডুকেটেড স্টুপিডস।’ উঠে পড়ার উদ্যোগে ব্যাগটি হাতে নিয়ে মিনহাজ মনে মনে বোঝার চেষ্টা করে, ডাক্তারের ইংরেজিতে অভিযোগের উদ্দিষ্ট কে বা কারা? আত্মীয়স্বজনসুদ্ধ রোগী অবশ্যই গ্রামের বাসিন্দা, এদের তথাকথিত ‘আনএডুকেটেড’ হওয়ার সম্ভাবনা ষোলো আনা আর পেছনে এক দল পথশিশুসহ গান গাইয়ে আউলাঝাউলা নারীটিরও শহর থেকে শ্রীবৃন্দারামপুরের বাজারে এসে ঘুরপাক করার সম্ভাবনা কম। তার ভাবনা বেশি দূর অগ্রসর হওয়ার মওকা পায় না। কবজির কাছের বিখাউজটি চুলবুল করে ওঠে।
ডাক্তারের সামনে আস্তিন গুটিয়ে খাউজানো শুধু রিস্কি না রীতিমতো...আউট অব কোয়েশ্চন। তো মিনহাজ ব্যাগ থেকে পেনসিল-টর্চ বের করে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসে রবিনহুড ফার্মেসি থেকে। শ্রীবৃন্দারামপুরের বাজারে বোধ করি মাঝেমধ্যেই বিজলি গায়েব হয়, তখন করণীয় কী, দোকানদাররা ভালো করেই জানে। দুই পাশের প্রতিটি দোকানে পাম্প করে হ্যাজাক জ্বালানোর তৎপরতা চলছে। কবজি চুলকাতে চুলকাতে মিনহাজ জোরেশোরে পা চালায়। সড়ক অন্ধকার থাকতে থাকতে সে এই সুযোগে কাছ থেকে নারীটিকে অবলোকন করতে চাচ্ছে। প্রয়োজনে না হয় পেনসিল টর্চটি ব্যবহার করবে। সে নিশ্চিত যে এই নারী তার চেনা এবং বিষয়টা নিশ্চিত না হওয়া অবধি চুলকানির যে নিষ্পত্তি হবে না, মিনহাজ এ ব্যাপারেও সচেতন।
মসজিদের দিক থেকে ফের সুরেলা গলার আওয়াজটি ভেসে এসে পথশিশুদের হল্লা-চিৎকারে চাপা পড়ে। নিজেকে সামলাতে না পেরে মিনহাজ ছুটে যায় ওই দিকে। জারুলগাছের কাছে এসে বেবি-পেট্রোম্যাক্সের চোখধাঁধানো আলোয় থমকে দাঁড়ায় সে। একটু দূরে লাল সালু দিয়ে উজ্জ্বল আলোর উৎস ঘিরে তৈরি করা হয়েছে বর্গক্ষেত্রের আকৃতি। ভেতরে জানু বিড়িয়ে বসে মোল্লা-মুন্সি গোছের এক সুদর্শন যুবক হ্যান্ডমাইকটি অ্যাডজাস্ট করছে। হাটুরেরা থেমে পড়ে তাবিজ বিক্রির আলো-ঝলমলে থানটির দিকে উদ্গ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছে। বিক্রেতা তরুণ মাইকে দোয়াদরুদ পড়ে, আতশিকাচে দর্শকদের দেখাচ্ছে মিনিয়েচার একটি পবিত্র কোরআন শরিফ। তাবিজের এবারতেও অনেকগুলো পবিত্র সুরা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হরফে লেখা।
কয়েক পা পিছিয়ে মিনহাজ সরে আসে গাছের তুলনামূলকভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন ছায়ায়। ফের সুরেলা আওয়াজের হাসুমিছু স্বর শোনা যায়, ‘...হাওয়ার ডালে দড়ি বান্ধ.../ জলদি দড়ি বান্ধ...হুম...হু ...হু ...হু...উ...উ...’। মিনহাজ দারুণ কনসেনট্রেশনে চরণ দুটি শুনতে শুনতে স্বরাঘাতের বিশেষ ভঙ্গিতে ফের বেজায় অবাক হয়! বুঝতে পারে, আগের অনুমান দুটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, কণ্ঠস্বরের মালকিনের পরিচিতি সম্পর্কে এবার তার মনে আর কোনো সন্দেহ থাকে না।
কিন্তু বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও কয়েক পা হেঁটে অজু-গোসলের পুকুরপাড় অবধি গিয়ে নিশ্চিত হওয়ার উৎসাহ সে পায় না। নিরিবিলিতে দাঁড়িয়ে ফস করে ধরায় এক শলা গোল্ডফ্লেক। জোরে দম নিয়ে ধোঁয়া ছাড়তেই তার যাপিত জীবনের আরেকটি অধ্যায় স্মৃতিময় চালচিত্রে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। মেধাবী ছাত্র মিনহাজ ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষাও বেশ ভালো হালতেই উতরেছিল। কিন্তু নানা কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডমিশন পেল না। মফস্সলের কোনো কলেজে অনার্স পড়ার আগ্রহও হারিয়েছিল সে। সামান্য দিন চেষ্টা করে গানবাজনা শেখার, কিন্তু আর্থিক সংকট লেগেই ছিল এবং কোনো কিছুতেই সুশার হচ্ছিল না।
আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপের মুরব্বি কমরেড তত দিনে দল পাল্টিয়েছেন। তিনি সামরিক শাসনের ছত্রচ্ছায়ায় সংগঠিত একটি রাজনৈতিক দলের টিকিটে সংসদীয় নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। তাঁর নির্বাচনী প্রচারের হিল্লা ধরে মিনহাজ বছর চারেক পর পৈতৃক ভিটায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ পায়। সংসদের সদস্য নির্বাচনের কিছুদিন পর ওই মুরব্বি তার ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তির ব্যাপারটি নিশ্চিত করেন।
পরের বছর ওই মুরব্বি পার্লামেন্টারি দলের ডেপুটি লিডার হিসেবে ভ্রমণ করেন ইউরোপের কয়েকটি দেশ। ফিরে অন্য কারও নামে মতিঝিলে একটি বিজনেস ফার্ম খোলেন। ওই সূত্র ধরে মিনহাজেরও একটি পার্টটাইম কাজ জোটে, এতে একাডেমিক পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় বটে, তবে তারুণ্যে এই প্রথম মিনহাজ কিছুটা পয়সার মুখ দেখে। মাসে অবশ্য তিন-চারবার তাকে যেতে হতো চট্টগ্রামে। আমদানি করা একটি পণ্যের চালান নিয়ে রাত-নিশীথে ঢাকার দিকে আসা ইন্টারডিস্ট্রিক্ট ট্রাকের ড্রাইভারের পাশে বসে ঝিমানো তার অ্যাসাইনমেন্ট হয়ে দাঁড়ায়।
সিগ্রেট ফুঁকতে ফুঁকতে কী রকম এক স্মৃতিবিধুর ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল মিনহাজ। চোখেমুখে বাজারি কোনো মানুষের টর্চবাতির আলো এসে পড়লে সে হকচকিয়ে ওঠে। সাথে সাথে ক্রিং ক্রিং বেল বাজিয়ে পাশে এসে দাঁড়ায় চেনা রিকশাওয়ালা। বাজারি মানুষটি মনে হয়, ‘ওরে নীল দরিয়া...আমায়...দে...রে...’ গাইতে গাইতে এগিয়ে আসছিল। সে শিগগিরই চুপ হয়ে গিয়ে, বাতি অফ করে, সাথে সাথে নাকে এসে লাগে রমনা সিগ্রেটের কড়া গন্ধ। আলো সরে যেতেই দেখে সামনে দাঁড়িয়ে চেনা রিকশাওয়ালা। তাকে ঘণ্টাখানেক পর জয় বাংলা ফার্মেসি থেকে তুলে নিতে বলে সে ওই দিকে আগ বাড়ে।
যেতে যেতে ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী মান্নান ডাক্তারের সঙ্গে আজ কী ধরনের আলাপ হতে পারে, তা আন্দাজ করার চেষ্টা করে। একটু বয়স্ক গোছের ডাক্তার কী কারণে জানি মিনহাজকে বিশ্বাস করেন। চিকিৎসায় তাঁর আগ্রহ কম, হামেহাল দেশি কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনীতির কোনো না কোনো ঘটনা নিয়ে উত্তেজিত থাকেন। তবে ফার্মেসিতে যখন রোগী কিংবা ওষুধবিষুধ কেনার লোকজন থাকে না, তখন তিনি কাঁচি সিগারেটে আগুন দিয়ে, মিনহাজের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে নিজের জীবনবৃত্তান্ত শেয়ার করেন। তাঁর সম্পর্কে অত্র এলাকায় প্রচলিত গালগল্প প্রচুর, কোনোটাই চিকিৎসা–সম্পর্কিত নয়। তবে কাহিনিগুলো নিঃসন্দেহে মুখরোচক।
প্রতিবারই স্টেশন থেকে বাজারে আসার পথে চেনা রিকশাওয়ালার মুখে মিনহাজ শুনতে পায়, মান্নান ডাক্তার–সম্পর্কিত সাম্প্রতিক কোনো না কোনো ঘটনা। যেমন গেলবারের ট্রিপে সে অবগত হয়েছে, গাঁওগেরামের বাসিন্দারা ডাক্তারকে আড়ালে–আবডালে সম্বোধন করে থাকে ‘কাপড়িয়া ডাক্তার’ অভিধায়। রিকশাওয়ালা এ লকাবের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যাও দিয়েছিল। ডাক্তার হওয়ার আগে পাকিস্তানি আমলে মান্নান সাহেব নাকি ছিলেন বাজারের সবচেয়ে বড় কাপড়ের দোকানের মালিক। দোকানটিতে এখনো তাঁতের শাড়ি, লুঙ্গি, আদ্দির লাখা পাঞ্জাবি ও কাফনের কাপড় পাওয়া যায়। ঈদে-চান্দে ওখানে বোরকা এবং দু-তক্তি টুপিও বিক্রি হয়।
কাগজপত্রে কাপড়ের দোকানের মালিক মান্নান ডাক্তার হলেও, ব্যবসাটি তাঁর পয়লা পক্ষের হোন্ডা হাঁকড়ানো মারকুটে কিসিমের ছেলে জবরদখল করে আছে। প্রথম পক্ষের বিবি এখনো জিন্দা আছেন, তবে মহিলার দূর সম্পর্কে আত্মীয়া, নিতান্ত কাঁচা বয়সের এক বিধবাকে ডাক্তার সঙ্গোপনে শাদি করে সংসার পাতলে, তিনি নাকি প্রতিজ্ঞা করেছেন, সোয়ামিকে হাতের কাছে পেলে বঁটি-দা দিয়ে ছেদিয়ে জখম করবেন। তো ঘরছাড়া ডাক্তার জয় বাংলা ফার্মেসির পেছনে বাসা বেঁধে ওখানে ছোট পক্ষকে তুলেছেন।
ফার্মেসির জয়েলে এসে মিনহাজ দেখতে পায়, ছাদ থেকে ঝোলানো ডেলাইটের তুমুল আলোর নিচে মান্নান ডাক্তার গালে হাত দিয়ে বসে আছেন। মিনহাজ চৌকাঠ পাড়ি দিতেই তিনি আগের মতো সমাদর করে তাকে বসান। তবে লিয়াকত ক্যাপ পরা চাপ দাড়িওয়ালা মানুষটিকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখায়। মনে হয়, এই মাস তিনেকে তাঁর দাড়িগুলো পেকে বেজায় রকমের ধূসর হয়ে উঠেছে।
মান্নান ডাক্তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলেন, ছোট বিবির ডেলিভারি নিয়ে ভারি সংকটে আছেন, গ্রামের দাই-বেটি গেল নয়-দশ ঘণ্টা ধরে তত্ত্বতালাবি করছে, কিন্তু খালাস হচ্ছে না। মাতৃমঙ্গলের নার্সকে আনানোর জন্য বেবিট্যাক্সি পাঠিয়েছেন ঘণ্টা দেড়েক আগে। পেছনের কামরার পর্দা সরিয়ে ফার্মেসির ধুতি পরা টেকো অ্যাসিস্ট্যান্ট বেরিয়ে এসে চোখের ইশারায় কিছু বললে, হন্তদন্ত হয়ে ডাক্তার ছুটে যান ওদিকে।
কবজিতে চুলকানির প্রকোপ ফের বাড়লে মিনহাজ অ্যাসিস্ট্যান্টকে বলে অ্যান্টিহিস্টামিন ট্যাবলেট নেয়। হ্যাজাকটি ঘিরে মহাশূন্যে ঘূর্ণমান একাধিক উল্কাপিন্ডের মতো ঘুরুন্টি মারছে আলোপ্রিয় কয়েকটি পোকা। ট্যাবলেটের তাসিরে একটু ঝিমিয়ে পড়ে রিলাক্স হওয়ার প্রত্যাশায় চুপচাপ বসে থাকে সে। তার করোটিতে আলোপোকার মতো ঘোরাফেরা করে মান্নান ডাক্তারের বৃত্তান্ত। মাস তিনেক আগের ট্রিপে তিনি চুপিসারে মিনহাজকে বলেছিলেন তাঁর ছোট পক্ষের হামেল হওয়ার কথা। সন্তানের জন্মদান প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়া নিয়ে মিনহাজের মধ্যে কোনো উদ্বেগ হয় না। সে নিরাসক্তভাবে অ্যাসিস্ট্যান্টকে ওষুধের স্যাম্পল ও প্যামফ্লেটগুলো বুঝিয়ে দেয়।
চুপচাপ বসে থেকে কেন জানি মাথায় কেবলই মান্নান ডাক্তারের বিষয়-বৃত্তান্ত ফিরে ফিরে আসে। ভদ্রলোক ডাক্তারির তেমন কিছু জানেন বলে মনে হয় না। একবার অন্তরঙ্গ বাতচিতে মিনহাজ জানতে চেয়েছিল, কোথায় তিনি চিকিৎসাবিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন? সরাসরি জবাব না দিয়ে, চোখেমুখে রাজ্যের বিরক্তি ফুটিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর প্রয়াত পিতা নাকি মহকুমা শহরের সবচেয়ে চালু ফার্মেসির মালিক ছিলেন। রানি ভিক্টোরিয়ার সিংহাসনারোহণের পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত লাগাতার উৎসবের বছর জুবিলি ফার্মেসির শুরুয়াত হয়েছিল। সাইনবোর্ডে আঁকা ছিল টায়রাসুদ্ধ মুকুট–পরা মহারানির বিরাট ছবি। অতঃপর আর অধিক কোনো তথ্য না দিয়ে ডাক্তার ফস করে ধরিয়েছিলেন কাঁচি সিগ্রেট।
এই মুহূর্তে মিনহাজের সময় যেন কাটতে চায় না, একঘেয়েমি এড়ানোর অসিলায় মেডিসিনের আলমারিগুলোর দিকে সে খুঁটিয়ে তাকাতে শুরু করে। কোনার দিকে টুলের ওপর চার ব্যান্ডের রেডিওটি সাফসফা একটি তোয়ালে দিয়ে ঢাকা। পাশেই পড়ে আছে পাখির পালকে তৈরি ঝাড়ন। এগুলোর ওপরে, আলমারির শিরানায় ঝোলানো কাচের ফ্রেমটি ভেঙেচুরে শিশিরস্নাত মাকড়সার জালের মতো ঝলমলে হয়ে আছে। তবে খানিক দূর থেকেও ফাটাচাটা কাচের ভেতর দিয়ে স্পষ্ট পড়া যাচ্ছে, ‘দ্য আজাদ পাকিস্তান ফার্মেসি’র মলিন হয়ে ওঠা লাইসেন্স।
ঘোমটা মাথায় ঝি-বেটি এক পেয়ালা চা নিয়ে আসে। অ্যাসিস্ট্যান্ট কৌটা থেকে বের করে, ধুতির খুঁটে পিরিচ মুছে তাতে রাখে দুখানা মেরি বিস্কুট। সে চায়ে ভিজিয়ে বিস্কুট খেতে খেতে ফের খেয়াল করে, লাইসেন্সটির কাচভাঙা ফ্রেমে মুখোমুখি বসেছে দুটি আলোপোকা। তারা পরস্পরের দিকে শুঁড় নাড়াচাড়া করে যেন ইশারায় বাতচিত করছে। মিনহাজের স্মৃতিতে মান্নান ডাক্তারের কিছু স্বতঃপ্রণোদিত বয়ান ফিরে আসে।
মান্নান ডাক্তার নিজেই তাকে বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের বছর কয়েক আগে, স্বদেশে যখন চলছিল ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের তমতমি, তখন মুসলিম লীগ না করে ব্যবসা-বাণিজ্য করার কোনো কুদরত ছিল না। এটা সত্য যে তিনি তথাকথিত বনিয়াদি গণতন্ত্রের ব্যানার নিয়ে ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বার হয়েছিলেন। কিন্তু মনে মনে সদাসর্বদা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার অনুসারী। প্রমাণ হিসেবে জোর দিয়ে উল্লেখ করেন, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে যখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জেলা শহরে আসেন, তখন তিনি চোঙা দিয়ে নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ার জন্য গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিতেন। এ ঘটনার সরেজমিন সাক্ষীদের দু-একজন এখনো বেঁচেবর্তে আছেন।
মান্নান ডাক্তারের জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুকে তিনি কখনো সামনাসামনি দেখেননি। তবে শেখ সাহেব যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভায় অ্যান্টিকরাপশন মিনিস্টার হিসেবে যোগ দিলে, তিনি পোস্টকার্ডে সংক্ষিপ্তভাবে লিখে স্থানীয় একটি দুর্নীতি বিষয়ে তাঁকে অবহিত করেছিলেন।
খান সেনাদের কলাবরেটার হিসেবে মান্নান ডাক্তারের বছর দুয়েক জেল খাটা বাবদেও তিনি মিনহাজকে গুছিয়ে একটি ব্যাখ্যা দেন। পাকিস্তানি আর্মি নাকি কোন চোগলখোরের পরামর্শে তাঁকে ক্যাম্পে ডেকে নিয়ে চড়-থাপ্পড় মেরেছিল, উর্দুতে ধুনফুন কিছু একটা বলে সে যাত্রা তাঁর জান রক্ষা হয়েছিল। তারপর পাঞ্জাবি ভাষায় বস্তপচা খিস্তি করা হার্মাদ সৈনিকরা শ্রীবৃন্দারামপুরের বাজারে টহল দিতে এলে, তাঁর ফার্মেসিতে এসে বসে রেডিও পাকিস্তান থেকে প্রচারিত ফৌজি প্রোগ্রাম শুনতে চাইত। তাদের তিনি রসমালাই, খাজা কিংবা জিলাপি খাইয়ে আপ্যায়নও করেছিলেন বারকয়েক। কিন্তু অন্তরে কখনো তিনি তাদের দুঃশাসনকে সমর্থন করেননি। আর জেল থেকে ছাড়াও পেয়েছিলেন তিনি বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমার কল্যাণে, বিষয়টা তিনি শুধু মনে রাখেননি, জেলা শহর থেকে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় চিঠি লিখে তাঁর প্রশাসনের ভূয়সী তারিফও করেছিলেন। টেবিলে আয়নার তলায় উক্ত চিঠির কাটিংটি সংরক্ষিত আছে।
ফার্মেসির সামনে একটি বেবিট্যাক্সি এসে থামে। অ্যাসিস্ট্যান্ট ছুটে গিয়ে হাত কচলে বিধবার থান পরা এক নার্স মহিলাকে পেছন দিকের বাসাতে নিয়ে যায়। ঠিক তখন কাঁপা গলায় অসময়ে আজানের ধ্বনি এসে পৌঁছে মিনহাজের কানে। সে বুঝতে পারে, ছোট পক্ষের ডেলিভারি সম্পন্ন হয়েছে। অ্যাসিস্ট্যান্ট ছুটে এসে আলমারি থেকে ডেটল–ফেটল ও ইনজেকশনের সিরিঞ্জ প্রভৃতি নিয়ে ফের ছুটে যায় পর্দার অন্তরালে।
মিনহাজের রিকশা তাকে তুলতে এখনো এসে পৌঁছায়নি। রাতও বেশি হয়নি। বাজারে ঘোরাফেরা করা জনা-চারেক মানুষ এসে ফার্মেসিতে ঢোকেন। তাঁরা সবাই বিবিসি শুনতে এসেছেন। মিনহাজকে তাঁরা শ্রীবৃন্দারামপুরের বাজারে আগেও দেখেছেন। হাত মিলিয়ে সে পরিচিত হয়। তাঁদের মধ্যে স্থানীয় স্কুলের হেডমাস্টার ও তহসিলদারও আছেন।
বিবিসি চালু হওয়ার কাঁটায় কাঁটায় মিনিটখানেক আগে ফিরে আসেন ডাক্তার। চোখেমুখে নিরাসক্তভাব বজায় রেখে তিনি আগতদের সালাম-আলেক করে রেডিও থেকে তোয়ালেটি সারান। ঝাড়ন দিয়ে মুছেটুছে, অ্যান্টেনা তুলে দিয়ে, রেডিওর মিটার অ্যাডজাস্ট করেন। শোনা যায় নিউজকাস্টার সিরাজুর রহমানের গলা। সংবাদের শিরোনামজুড়ে প্রিন্স চার্লসের লেডি ডায়ানা স্পেনসারের সঙ্গে বাগদানের খবর। তার পরই নয়াদিল্লি থেকে মার্ক টালির বরাত দিয়ে জানা যায় মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা ওয়াজেদের আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর পদ গ্রহণের জন্য স্বদেশে ফেরার আনুমানিক দিনক্ষণ।
এ নিয়ে তহসিলদার ও হেডমাস্টারের মধ্যে নিচু গলায় কথাবার্তা চলে। রেডিওতে দুজন নভোচারী নিয়ে কলোম্বিয়া নামের একটি মহাশূন্যযানের যাত্রার কথা আলোচিত হচ্ছে। আওয়াজ কমিয়ে দিয়ে ভারি চিন্তিত মুখে ডাক্তার তার মুখের দিকে তাকান। তাদের চোখাচোখি হলে, মিনহাজের কৌতূহলকে আমলে নিয়ে তিনি পকেট থেকে বের করেন পাইলট কলমটি, সোনালি ক্যাপ দিয়ে দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে অবশেষে একটি চিট-কাগজে বিমর্ষভাবে লেখেন চারটি ইংরেজি শব্দ, যথা:‘সান বর্ন, মাদার ক্রিটিক্যাল।’ রিকশাওয়ালা তাকে পিক করতে এসে ফার্মেসির সামনে দাঁড়িয়ে ক্রিং ক্রিং আওয়াজ দেয়। ডাক্তারকে অভিনন্দন না জানিয়ে, নীরবে হাত মিলিয়ে মিনহাজ ব্যাগটি হাতে উঠে পড়ে। বারান্দার দিকে যেতে যেতে চোখের কোণ দিয়ে সে দেখে, কাচভাঙা ফ্রেমে বসা আলোপোকা দুটি পরস্পরের কাছাকাছি এসে দৈহিকভাবে অন্তরঙ্গ হচ্ছে।
রিকশায় বসামাত্র চুলকানির প্রকোপ বাড়ে। মিনহাজ আরেকটি হিস্টামিন ট্যাবলেট গিলে নিয়ে কান খাড়া করে, কিন্তু ভেসে আসে না ঈপ্সিত কোনো আওয়াজ। একটি ছাপড়া চায়ের দোকানে তাওয়া তুলে নিয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে পানি, অঙ্গার নিভে যাওয়ার শব্দের সঙ্গে নাকে এসে লাগে ধোঁয়ার ভেজা গন্ধ। খানিক দূরে ‘ওয়ান টু থ্রি...’ আওয়াজ দিয়ে মাইক টেস্ট করা হচ্ছে। রিকশা এসে থামে, ‘আল শিফা মেডিকেল হল’ নামের দুটি আলমারি ও মাত্র একখানা চেয়ার নিয়ে চিপাচাপা একটি ফার্মেসির সামনে।
খানিক বিরক্তির সঙ্গে মিনহাজ রিকশা থেকে নামে। ওষুধের স্যাম্পল টেবিলে রাখতেই পানের বোঁটা থেকে চুন মুখে নিতে নিতে, চোখে সুরমা দেওয়া মুসল্লি গোছের কম্পাউন্ডার তাকে চা খেয়ে যেতে অনুরোধ করেন, কিন্তু সে রাজি হয় না।
রিকশা তাকে নিয়ে কাঁচাবাজারের পাশ দিয়ে চলে। হাট ভেঙে যাচ্ছে, অনেকগুলো কুপি নিভে গেছে। যেগুলো এখনো টিমটিমিয়ে জ্বলছে, তার পাশে বসে ক্লান্ত বিক্রেতারা হিসাবকিতাব করে টাকাপয়সা খুঁতিতে পুরছে। মাছআঁটির দিকে রাজ্যের সব নেড়ি কুকুর ভুকভুকিয়ে ঘোট পাকাচ্ছে। মিনহাজের শ্রবণ-সত্তা সজারুর কাঁটার মতো উদ্গ্রীব হয়ে আছে। বাসস্ট্যান্ডের পাশ দিয়ে বাজার ছেড়ে যাওয়ার সময় পেছন পেছন আসা একটি রিকশায় মাইকিংয়ের শব্দ শোনা যায়, ‘সম্মানিত এলাকাবাসী...’। মিনহাজের ইচ্ছা হয় কানে তুলা গোঁজার।
ট্যাবলেটের তাসিরে একটু ঝিমিয়ে পড়েছিল মিনহাজ। ঠান্ডা পড়েছে, কিন্তু ব্যাগের তলা থেকে উইন্ডব্রেকার বের করে পরতে ইচ্ছা হচ্ছে না। পথপাশের দিঘির পাড় ধরে লন্ঠন হাতে হাটুরেরা বাড়ি ফিরছে। একটি টর্চবাতির আলোও মাঝেমধ্যে ঝিলিক দিয়ে উঠছে। কেমন যেন স্বপ্নের ঘোরে মিনহাজ মজা-জলে চলমান রোশনির প্রতিফলন দেখতে থাকে, তখন ‘কার লাগি রে মন কান্দ...’ লিরিকটি স্পষ্ট আওয়াজে তার পাঁজরে প্রতিধ্বনিত হয়। আর সে সচেতন হয়ে ওঠে, বেশ কয়েক বছর আগের যে যাপিত জীবনের কথা সে ভাবতে চায় না, তা যেন হরেক ডিটেলের সমাহারে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ফিরে আসছে তার হৃদ্মাঝারে।
হঠাৎ করে কাকতালীয়ভাবে মিনহাজের রোজগার বেড়ে গিয়েছিল। সংসদ সদস্য হওয়া সাবেক কমরেডের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছিল কি না, সে ঠিক জানত না। তবে এর সূত্রে হাতে হানড্রেড সিসির একটি মোটরবাইক এসে যাওয়াতে সে খুশিই হয়েছিল। সাথে সাথে তার অ্যাসাইনমেন্টে যুক্ত হয়েছিল নতুন একটি টাস্ক।
সাংসদের পানে কোনো আসক্তি ছিল না, বিবাহ-বহির্ভূত নারীসঙ্গ নিয়েও তাঁর নামে কখনো কোনো রটনা রটেনি। তবে তিনি মিনহাজের নামে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে তাতে মাঝেমধ্যে আয়োজন করতে শুরু করেন নৈশ পার্টির। নগরীর নির্দিষ্ট একটি ক্লাব থেকে রকমারি পানীয় ও খাবারের প্যাকেট তুলে নিয়ে বাড়িতে যথাসময়ে সরবরাহ করার দায়িত্ব বর্তায় মিনহাজের ওপর। কোনো কোনো সময় নূপুরের বোল তোলা গাইয়ে গোছের যুবতিদের মাঝরাতে ড্রপ করে দেওয়ার জন্য মিনহাজের ডাক পড়ত। ড্রাইভারের পাশে বসে থেকে তাদের নির্দিষ্ট বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিত করতে হতো।
এ রকমের নৈশ অ্যাসাইনমেন্টে পেছনের সিটে বসেছিল বোরকা পরা এক নারী। রাত দেড়টার মতো বাজে। মেয়েটি সম্ভবত ছিল বেহেড ড্রাংক। টলতে টলতে এসে কোনোক্রমে গাড়িতে উঠে সে খিলখিলিয়ে হাসতে শুরু করে। এতে কৌতূহলবশত মিনহাজের ঘাড় পেছন দিকে ঘুরে গিয়েছিল, গাড়ি নিশিরাতের ট্রাফিকবিহীন সড়কে কেবল স্পিড পিক করেছে। মেয়েটি সম্ভবত বোরকার ভেতরে আরেক প্রস্থ নেকাবে মুখ আড়াল করে বসেছিল, তাই তাকে দেখার কোনো কুদরত ছিল না। কিন্তু কণ্ঠস্বর সে শুনেছিল, নারীটি রূঢ় কণ্ঠে বলেছিল, ‘হোয়াট আর ইউ লুকিং অ্যাট?’ থতমত খেয়ে ঘাড় ফেরাতে ফেরাতে মিনহাজ বলেছিল, ‘সরি’। মেয়েটি ফের শাসানোর স্বরে কথা বলেছিল, ‘আমাকে আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করবে না, অসুবিধা হবে...বলে দিচ্ছি।’
প্রতিক্রিয়ায় মিনহাজ নীরব থাকে, কিন্তু কেবলই মনে হয়, এ কণ্ঠস্বরটি তার চেনা! সে মনে মনে তর্পণ করে, কে হতে পারে। না, মেয়েটি তার কোনো ক্লাসমেট নয়। তখনই পেছনের সিটে জড়ানো কণ্ঠস্বরে বোরকাবৃতা নারী গেয়ে ওঠে, ‘ইমাজিন দেয়ার ইজ নো হেভেন...’। এবার ভারি আতান্তরে পড়ে মিনহাজ, তার চেনাজানা মেয়েদের সংখ্যা একে কম, আর সে নিশ্চিত যে এদের কেউ কস্মিনকালেও ইংরেজি গানের সুর ভাজবে না।
ফের পেছনের সিটে খিলখিলানো হাসি উথলে ওঠে, সঙ্গে চুড়ির মৃদু নিক্কন, গাড়ি মিন্টো রোডে ঢুকতেই তাবত কিছু মিইয়ে আসে। ইন্টারকনের কাছে এসে গাড়ি ফার্মগেটের দিকে বাঁক নেয় আর ফের ঝংকৃত হয় গীতল কণ্ঠে সুর ভাজা, গানের কথাও ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ‘হরি মন মজায়ে লুকালে কোথায়...’।
একটি পশ হোটেলের পার্কিং লটে থামতেই মিনহাজ নেমে পড়ে পেছনের দরজা খুলে। হাইহিলে বেজায় কসরতে ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে মেয়েটি যেন হোঁচট খায়। মিনহাজ তার বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরে আসন্ন পতন সামাল দেয়। দাঁড়িয়ে হেঁচকা টানে মেয়েটি তার মুঠো থেকে হাত খুলে নেয়, সাথে সাথে ল্যাম্পপোস্টের আলো পড়ে অনামিকায় ঝলসে ওঠে আংটির ডায়মন্ড কিংবা পোখরাজ পাথর। গাড়িবারান্দা অবধি মিনহাজ মেয়েটির পাশে পাশে হাঁটে। ডোরম্যান দরজা খুলে দেয়, কিন্তু দাঁড়িয়ে পড়ে মেয়েটি রাগত স্বরে বলে, ‘আই হেট হোয়েন সাম স্টুপিড ডাজন্ট লাইক মাই সং।’ বলেই টলতে টলতে ঢুকে পড়ে হোটেলের লবিতে।
মিনহাজ ফিরে আসে গাড়িতে, মাঝরাতে স্টুডেন্টস হলের দিকে ফিরতে ফিরতে কেবলই ইংরেজিতে উচ্চারিত বাক্যটি নিয়ে ভাবে। সে প্রায় নিশ্চিত, এ কণ্ঠস্বর রেডিও কিংবা টেলিভিশনে সে একাধিকবার শুনেছে। তার কবজির কাছে শুরু হয় বেজায় চুলকানি।
রিকশা স্টেশনের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। এদিকে রাস্তা খুব খারাপ। ড্রাইভার নেমে পড়ে টানতে থাকে। মিনহাজ জারকিংয়ের ভেতর হঠাৎ করে স্পষ্ট হয়ে ওঠা স্মৃতি নিয়ে কী করবে, ঠিক বুঝতে পারে না। তার অনুমান যদি সঠিক হয়, তার পরও আজ সন্ধ্যাবেলা শ্রীবৃন্দারামপুরে বাজারে শোনা গানের কলির সঙ্গে আসলেই কী এ ঘটনার কোনো যোগসূত্র আছে? থাকলেই সে তা দিয়ে কী করবে। মিনহাজের ভারি বিভ্রান্ত লাগে, সাথে সাথে সারা দিনের ছোটাছুটির ক্লান্তিও ঝেঁপে আসে। কেমন যেন ঘুম পেতে থাকে, তার চোখের সামনে রেলওয়ে আউটার সিগন্যালের লাল-সবুজ বাতি দুটি হালকা কুয়াশায় অস্পষ্ট হয়ে ওঠে।