গল্প

আন্ডারগ্রাউন্ডে ওয়াহাব মাস্টারের পয়লা রাত

তেমন একটা শীত পড়েনি। সাটিয়াজুরী স্টেশনে কোনো দারোগা জনাকয়েক বন্দুকধারী কনস্টেবল সঙ্গে নিয়ে ওয়ারেন্ট হাতে অপেক্ষায় দাঁড়িয়েও নেই। তারপরও ঝোলা-কাঁধে ট্রেনের সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে ভীত হয়ে হোঁচট খান ওয়াহাব মাস্টার। অজানা এক আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে চাদর টেনেটুনে মাথামুখ পেঁচিয়ে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন তিনি। রাত হবে বড়জোর সাড়ে আটটা, ইতিমধ্যে পাড়াগাঁর মফস্​সল স্টেশনটি এমন নিশ্চুপ হয়ে আছে যে মাঝেমধ্যে একটি-দুটি নিশাচর পাখির ডাক তাঁকে শিউরে তুলছে। ট্রেন থেকে আরও যে দু-একজন যাত্রী নেমেছিল, তারাও চলে যাচ্ছে যে যার পথে। একজন যেতে যেতে দাঁড়িয়ে দেশলাই ঠুকে জ্বালিয়ে নেয় নাসির বিড়ি, তারপর ঈশান কোণ নিশানা করে হেঁটে যায় সটান। মানুষটি বোধ করি খোঁড়া, তাই তার হাঁটাহাঁটিতে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ওঠে-নামে বিড়ির আগুন।

ফিনফিনে কুয়াশায় আবছা হয়ে আসা সিগন্যালের লালবাতিটির দিকে তাকিয়ে কেবলই থাকুমুকু করেন ওয়াহাব মাস্টার। কিছুতেই তাঁর পা সামনে বাড়াতে চায় না। ট্রেনের কামরায় মাত্র ঘণ্টা তিনেক বসেছিলেন তিনি, কিন্তু টেনশনে ওই যাত্রাকে পুলসিরাত পাড়ি দেওয়ার মতো মনে হতে থাকে। ভেবেছিলেন, সাঁঝবেলার ট্রেনে বাতিফাতি কিছু থাকবে না, চেনা কারও চোখেও তিনি পড়বেন না। বগিটিতে কসাইয়ের চোখের মতো আলো ছড়াচ্ছিল কটকটে একটি বাল্ব। তার তলায় বসেছিল বেলবটম প্যান্ট পরা যুবকটি, পাশে অবহেলায় পড়েছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাবিষয়ক চটি পুস্তক, আর হাতে ছিল সাপ্তাহিক বিচিত্রা, মুখের কাছে নিয়ে সে সেটি পড়ছিল। উল্টো দিকের বেঞ্চে বসেও ওয়াহাব মাস্টার পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছিলেন প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, একটি স্বপ্ন একটি প্রকল্প’ প্রভৃতি। তার কেবলই মনে হচ্ছিল, তরুণটি গোয়েন্দা বিভাগের ইনফরমার। কম্বিং অপারেশনে তাদের গ্রামে পুলিশ এসে পিকআপ হাঁকিয়ে যাচ্ছে তাদের বাড়ির দিকে, পড়িমরি ছুটে আসা সাবেক এক ছাত্রের মুখে এ সংবাদ শুনে তিনি আর দেরি করেননি, কেয়াবন মাড়িয়ে, কাঁটার ঘষায় ক্ষতবিক্ষত হয়ে ছুটেছিলেন স্টেশনে। সাঁঝবিকেলের ট্রেনটি আসতে তখনো হাতে ছিল ঢের সময়, তাই চেনা নাপিতের সেলুনের পেছন কামরায় ঘণ্টা দুয়েক কাটিয়েছেন অপেক্ষায়। বিচিত্রা পড়তে থাকা যুবকটি তাঁকে অনুসরণ করে নামেনি ট্রেন থেকে, তারপরও আতঙ্কের অভিঘাত মাস্টারকে আচ্ছন্ন করে দিতে থাকে।

পাড়াগাঁয়ের হাইস্কুলে একাধিক বিষয় পড়ানো মাস্টারের ভীত না হওয়ার কোনো কারণ নেই। মুক্তিযুদ্ধে তিনি শরিক ছিলেন, মূলধারার বাঙালি জাতীয়তাবাদ তাঁকে শুধু প্রাণিত করেনি, উদ্বেলিতও করেছিল, তবে মুক্তিফৌজে শামিল হয়েও তার আগাগোড়া আনুগত্য ছিল বামধারার রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি; বিশ্বাসও করেছিলেন ভিয়েতনামের মতো দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা গেরিলাযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হবে পূর্ব বাংলা। স্বদেশ মুক্ত হওয়ার পর ঘরে ফিরে দেখেন, হানাদারেরা শুধু তার ভিটেমাটি পুড়িয়ে দেয়নি, একমাত্র ভাইকেও নির্মমভাবে খুন করেছে এবং তিন বছরের শিশুসন্তান নিয়ে তাঁর স্ত্রী গিয়ে উঠেছে পাশের গ্রামে বাপের বাড়িতে। সাত-পাঁচ বিবেচনা করে তিনি চাকরি নেন হাইস্কুলে, তবে যুদ্ধের সময়কার কমরেডদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ অব্যাহত থাকে, সমর্থনও করতে থাকেন তাঁদের সশস্ত্র সমাজবিপ্লবের জন্য কর্মকাণ্ড।

মাস্টারি পেশায় প্রতি মাসে বেতন না জুটলেও সংসারে খানিকটা স্থিতি এসেছিল, কিন্তু স্বদেশের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী কিংবদন্তিপ্রতিম জনপ্রিয়তায় মাতোয়ারা হয়ে জনসভায় ‘লাল ঘোড়া দাবড়িয়ে’ দেওয়ার ঘোষণা দিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয় রাতারাতি। গ্রামগঞ্জে নামে রক্ষীবাহিনী, পুলিশ বিভাগও তৎপর হয়, এখানে-ওখানে শুরু হয় কম্বিং অপারেশন, পাকস্থলীতে কৃমিকীটের প্রজননের মতো হাটে-ঘাটে, ট্রেনে ও স্টিমারে গোয়েন্দাদের টহল বাড়ে। ওয়াহাব মাস্টারের ভীত না হয়েই–বা উপায় কী? কাঁধ-ঝোলায় খোঁজাখুঁজি করে তিনি বের করেন নিভিয়ে রাখা আধখানা বগুলা সিগারেট, তাতে আগুন দিতে গিয়ে খেয়াল হয়, তাঁকে নামিয়ে দেওয়া ট্রেনটি দাঁড়িয়ে আছে এখনো। দেশলাই খোঁজেন তিনি, গণশক্তি, হককথা, অনীক, কপোত প্রভৃতি পত্রিকার বান্ডিলের কাছে পড়ে আছে রবিনসন্স বার্লির টিন। ঘরে ছোট্ট মেয়েটির জ্বরজারি চলছে দিন দুই হতে চলল। সে মুখে কিছু তুলছে না, তাই দোকান–বাকিতে বার্লির টিনটি কিনেছিলেন, কিন্তু ঘর অবধি পৌঁছাতে পারলেন না, তাকে সাঁঝবেলার ট্রেন ধরে এসে পৌঁছাতে হলো সাটিয়াজুরী স্টেশনে। দেশলাই আর খুঁজে পান না মাস্টার, বিরক্ত হয়ে সিগারেট পায়ে পিষে পা বাড়ান। সঙ্গে সঙ্গে রাতের হিমভেজা রেলগাড়িটি দীর্ঘ ভেঁপু বাজিয়ে চলতে শুরু করে।

উঁচু প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে রেললাইনের পাথর ছিটকিয়ে হাঁটতে শুরু করেন মাস্টার। কমরেড ফেরদৌসের বাড়ি সাটিয়াজুরী স্টেশন থেকে ফার্লং তিনেক পশ্চিমে। শিশিরে ভেজা ধুলাবালু স্যান্ডেলে মেখে তিনি আগ বাড়ান। ঝিঁঝির রহস্যময় ধ্বনির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জুনিপোকারা জ্বালছে সোনালি-সবুজ আলো, তাতে অন্ধকার যেন বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠছে। বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর তাঁর পেছন ফিরে তাকাতে ইচ্ছা হয়, কিন্তু হিম্মত করে উঠতে পারেন না। কৈশোরে যাত্রার পালাগান দেখে রাতদুপুরে বাড়ি ফেরার সময় মেছো ভূতকে মহাভয় পেতেন, কিন্তু এখন তো মধ্যবয়স। ১৯৬২ সালে ছাত্র আন্দোলনে মফস্​সলের একটি কলেজে নেতৃত্ব দেওয়া ওয়াহাব আলী জিন্দেগির হরেক রকমের ঝড়ঝাপটা বালা-মসিবত সামলে–সুমলে, ডুবতে ডুবতে সাঁতরে–সুতরে এ বয়সে পৌঁছেছেন, ছেলেবেলাকার ডানপিটেপনার কথা মনে পড়তেই তিনি অবজ্ঞার ভাব নিয়ে পিছু ফেরেন, পাঁজরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বালক বয়সের ভূতভীতির মতো অনুভূতি ফিরে আসতেই শিউরে উঠে আবার পথ চলেন। সামনে জোনাক-জ্বলা নিবিড় অন্ধকার ছাড়া তেমন কিছু চোখে পড়ে না। দূর থেকে মনে হয় খটাং খটাং আওয়াজ তুলে এগিয়ে আসছে একটি মালগাড়ি। না, স্টেশন থেকে বেশি দূরে আসতে পারেননি। মালগাড়ির হেডলাইটের আলো যেন অদৃশ্য এক বুরুশে গাছপালার পত্রপল্লবে সোনালি রং লেপে দিয়ে ঢিমেতালে আগুয়ান হচ্ছে। হাঁটার গতি বাড়ান মাস্টার।

কমরেড ফেরদৌসের বাড়ির কুত্তাটা নেহাত ভদ্র, তাঁর গলা খাঁকারি শুনে বেরিয়ে এসে তাকে শোঁকে, কিন্তু খামোখা ভুকভুকিয়ে গোলমাল পাকায় না। কাছারিঘরের ভেজানো দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে লন্ঠনের মৃদু শিখা। মাস্টার আবার গলা খাঁকারি দিয়ে কপাট ঠেলে ঢুকে পড়েন ঘরে। আধময়লা সোয়েটার পরে চৌকিতে বসে কমরেড খালি একখানা ব্লেড দিয়ে আয়নায় চোখ রেখে দাড়ি কামানোর চেষ্টা করছেন। ওয়াহাব আলীর উপস্থিতি টের পেয়ে আয়না থেকে চোখ তুলে বলেন, ‘মাস্টারসা’ব আপনি…?’ তার চমকানো এতই অপর্যাপ্ত যে রেজারবিহীন ব্লেড কোনো আঁচড় না কেটে আবার কামাতে শুরু করে গণ্ডদেশ। মাস্টার দু-তিন বাক্যে থড়বড়িয়ে তাঁদের গ্রামে কম্বিং অপারেশনের কথা, বিশেষ করে তাঁর বাড়িতে পুলিশ রেইডের সম্ভাবনার কথা জানান। কমরেড ফেরদৌস এ রকম কিছু একটা ঘটবে, এটা যেন আগে থেকেই আন্দাজ করেছিলেন। শান্ত গলায় তিনি বলেন, ‘গ্রামে পুলিশি রেইড যখন হয়েই গেছে, মাস্টার সাব, ওখানে আর ফিরতে পারবেন না আপাতত…আপনার জন্য আন্ডারগ্রাউন্ডের বন্দোবস্ত করতে হবে,’ বলেই মগের পানিতে ৫৭০ সাবানের টুকরা ভিজিয়ে গালে ঘষতে শুরু করেন। মগের ঠান্ডা পানি দিয়ে শেভ করা দেখে ওয়াহাব আলীর শরীরে শীত আরেক দফা চাড়া দিয়ে ওঠে।

মাস্টারের কাঁপুনি দেখে কমরেড জানতে চান, ‘শীতের কাপড়, লুঙ্গিটুঙ্গি কিছু নিয়ে আসেননি?’ জবাবে ওয়াহাব আলী নীরব থেকে টেবিলে পড়ে থাকা রমনা সিগারেটের প্যাকেট থেকে এক শলা বের করে, তাতে আগুন দিয়ে বলতে শুরু করেন, কীভাবে পুলিশের হাত থেকে জানে বেঁচে এত দূর এসে পৌঁছেছেন? তাঁকে থামিয়ে দিয়ে কমরেড অনুরোধ করেন, ‘আস্তে কথা বলেন মাস্টার সাব, খাওয়াদাওয়া হয় নাই তো, ঠিক আছে, আমারও খাওন জুটে নাই, একটু বাইরে যেতে হবে।’ কমরেডের কথাবার্তা শুনে মাস্টার চোখ তুলে তাঁর মুখের দিকে তাকালে ফেরদৌস ভেতর-বাড়ির দিকে ইশারা দিয়ে জানান, বামপন্থী হওয়ার কারণে দেওবন্দে তালিম নেওয়া তুখোড় আলিম বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছে। বাবা চান না ছেলের হিল্লা ধরে তাঁর বাড়িতে হুলিয়া মাথায় নিয়ে কোনো বামপন্থী নাস্তিক এসে রাত গুজরান করুক। মাওলানা সাহেবের ধারণা, কাঁঠালের ভুতির গন্ধে যেমন উড়ে আসে ডুমো মাছি, তেমনি তাঁর কাছারিঘরে বামপন্থীদের আনাগোনা হলে তাঁদের পিছু পিছু পুলিশের আসতেও বিশেষ দেরি হবে না। মাস্টার এসেছেন জানতে পারলে মাওলানা ঝাঁটা নিয়ে তাড়া করতে পারেন। সুতরাং এখানে রাতের বেলা ভাতটাত কিছু পাওয়া যাবে না। তো ফেরদৌস তাঁকে চুপচাপ বসে থাকতে বলে লন্ঠনটি দাবিয়ে দিয়ে অন্ধকারে বেরিয়ে যান চিড়ামুড়ির তালাশে এবং গ্রামের কোথাও তাঁর জন্য শেল্টারের বন্দোবস্ত করতে।

ক্লান্ত ওয়াহাব আলী চৌকিতে শুয়ে পড়ে শরীরের ওপর সুজনি কাঁথা টেনে নেন। দুটি তিফিল বাচ্চা নিয়ে তরুণী স্ত্রী বাড়িতে একা। তাঁর রাজনীতিতে জড়ানোর কারণে পড়শিদের সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো নয়। এত দিন তারা মাথা তোলেনি, এখন সুযোগ পেয়ে যে দুশমনি করবে না, তার নিশ্চয়তা কী? মাস্টারের অনুপস্থিতিতে বাজার-হাট ম্যানেজই–বা করবে কে? স্কুলে গেল মাসের মাইনা এখনো ইস্যু হয়নি…। এ অবস্থায় মাস্টার যে বাড়িতে কাউকে কিছু না বলে আন্ডারগ্রাউন্ডের অনিশ্চিত পথে পা বাড়ালেন, ফেরারি আসামির স্ত্রীর সঙ্গে রক্ষীবাহিনী বা পুলিশের সদস্যরা সলুক করবে তো? ঘরের আলমারিতে রাখা আছে মার্ক্সীয় ধারার বইপত্র ও নিষিদ্ধ পার্টি লিটারেচার। সার্চ নিশ্চয়ই করবে? এ পরিস্থিতিতে জ্বরজারিতে ভোগা ছোট্ট মেয়ে ও কোলের শিশুসন্তান নিয়ে বিপন্ন স্ত্রীর কথা ভেবে তিনি চিন্তিত মুখে রমনা সিগারেটের প্যাকেট থেকে তুলে নেন আরেক শলা সিগারেট। দাবানো লন্ঠনের চিমনি তুলে তাতে সিগারেটটি ধরান। কষে দম দিতে দিতে, কম্বিং অপারেশনের নামে বিভিন্ন এলাকায় গৃহবধূদের সঙ্গে পুলিশের অত্যন্ত খারাপ আচরণের কথা ভেবে অস্থির হয়ে তিনি আধপোড়া সিগারেটটি স্যান্ডেলে পিষে কপালের দুই পাশ চেপে ধরে চোখ মুদলেন। ছাদে জোড়া টিকটিকি যেন অজানা কোনো উল্লাসে ডেকে ওঠে, চোখ খোলেন মাস্টার। লন্ঠনের মৃদু আলোয় টেবিলে ছড়িয়ে রাখা মাও সে–তুংয়ের রেডবুক, ব্লেড, মগ ও শেলফে রাখা ‘মোখসেদুল মুমিনিন’ ও তাজকেরাতুল আউলিয়া প্রভৃতি পবিত্র পুস্তক যেন অবাক হয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডের অনিশ্চিত পথের পথিককে অবলোকন করে।

ফিরে আসেন কমরেড ফেরদৌস। লন্ঠনের শিখা উসকিয়ে দিয়ে জানান, ‘শীতের রাইত তো, দোকানটোকান সব বন্ধ, ওঠেন মাস্টার সাব, রওনা দিই।’ কম্পনরত শরীরে মাস্টার উঠে দাঁড়ালে নিজের সোয়েটারটি খুলে তাঁর দিকে বাড়িয়ে দেন কমরেড। তারপর চৌকিতে পড়ে থাকা সুজনি তুলে চাদরের মতো করে পরে নিয়ে কপাট খোলেন, পিছু পিছু সিঁড়ি বেয়ে অন্ধকারে নামেন মাস্টার।

বেশিক্ষণ হাঁটতে হয় না তাঁদের। কাদামাটির দেয়ালঅলা ছনের ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে কমরেড চাপা স্বরে বলেন, ‘শেল্টার ঠিক করে দিচ্ছি, দিন চারেক পর আবার দেখা করব। থাকুন এখানে, কষ্ট একটু হবে, আজকের রাতটা দুজনে না খেয়েই কাটাই…কী বলেন মাস্টার সাব, বিপ্লব কোনো ভোজসভা নয় যে ইচ্ছামাফিক খাওয়াদাওয়া করা যাবে।’ ভোজসভাবিষয়ক উল্লেখে স্পষ্টত প্রচ্ছন্ন হাস্যরস, কিন্তু ওয়াহাব আলী তা উপভোগ করতে পারেন না। এদিকে কমরেড চাপা স্বরে, ‘আমানুল্লা…এ্যাই… এ্যাই, দরজা খুলো’ বলে হাঁক পাড়েন। ডাকাডাকিতে ঘর থেকে মৃদু সাড়া আসে। মাস্টারের কানের কাছে মুখ নিয়ে কমরেড জানান, ‘আমানুল্লা পার্টির কৃষক স্কোয়াডের লোক, শ্রেণিগতভাবে ভূমিহীন না হলেও গরিব চাষি, জমিজিরাত একটু আছে।’

থুতনিতে চুটকি দাড়িঅলা আমানুল্লা কুপি হাতে বেরিয়ে আসে। কমরেড তাকে ওয়াহাব আলীর দায়দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে ‘মাস্টার সাব, চলি’ বলে বাঁশঝাড়ের ঘন অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে যান। আমানুল্লার মাটির ঘরে কামরা মাত্র দুটি। একটিতে তার পরিবার, অন্যটিতে হাড়জিরজিরে বলদ ও বাঁশের মাচা, তাতে রাখা তেল চিটচিটে বালিশ ও কাঁথা, তাতে শুয়ে পড়ার ইশারা দিয়ে কুপি নিভিয়ে সে কাশতে কাশতে অন্য কামরায় চলে যায়। গোবরের গন্ধে মাস্টারের গা গুলিয়ে ওঠে। গরুটি কেবলই জাবর কেটে চলছে, তার জোড়া চোখ অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে, মাঝেমধ্যে লেজ দিয়ে মশা তাড়ানোর আভাসও পাওয়া যায়। মাস্টার কাঁথা-বালিশের স্তূপে হেলান দিয়ে বসে নিশ্বাস নিতে চেষ্টা করেন। একটি মশা সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়ে তাঁর গলায়। তিনি প্রাণপণে কেশে থুতু ফেলেন, আওয়াজে বলদটি নড়েচড়ে ওঠে। দুর্গন্ধে মাস্টারের পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করে, কিন্তু যাবেনই–বা কোথায়? মশা তাড়াতে তাড়াতে তিনি উঠে পড়েন, এক কদম সামনে বাড়তেই গোবরে পা পিছলে পড়েন বলদটির গতরে। ভীত হয়ে গবাদিপশুটি ছরছরিয়ে চোনায়। গরুর মুতের গরম ছিটা এসে গায়ে লাগে। তিনি অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে বাঁশের ছাপ্টা দেওয়া জানালাটি খোলেন। ঝিঁঝির শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে ওঠে। আসমানে অফুরান সবুজ-নীল নক্ষত্র, একটি তারকা খসে পড়ে দূরদিগন্তে। ওয়াহাব আলী হিমেল হাওয়া টেনে নেন ফুসফুসে।