কালো কাঠের লম্বা ল্যাম্পস্ট্যান্ডটিকে মাতৃভাষায় কে কী বলতে পারে? কেউ বলল, ‘প্রদীপস্ট্যান্ড’—আধা বাংলা, আধা ইংলিশ। কেউ খাঁটি বাংলা ‘দীপাধার’ বা ‘প্রদীপাধার’ বলতেও ছাড়েনি। একজন বলল ‘দীপস্তম্ভ’। বাড়ির কর্ত্রী, যিনি দাদার বাড়ির অন্যূন পঞ্চাশ বছরের পুরোনো স্ট্যান্ডটি অ্যান্টিক হিসেবে রাখবেন বলে নিয়ে এসেছিলেন, তিনি বললেন, ‘আমাদের গ্রামের বাড়িতে তো এটাকে ‘কুপিদানিই’ বলত। এই যে দেখছ, এর গোল মাথাটি, এর ওপর সন্ধ্যা হতেই একটা পিতলের কুপিবাতি জ্বলত। আর কেরোসিন খেয়ে খেয়ে কাপড়ের সলতেটি কালো ধোঁয়া ছাড়ত। উঠানে খোলা আকাশের নিচে জ্বললে কিছুই হতো না; ঘরের ভেতরে বেশিক্ষণ জ্বলতে থাকলে আলনার কাপড়ে ধোঁয়া থেকে ওড়া ভস্মের স্তর জমত। তোমরা এসব কিছুই দেখোনি।’
‘মা, আমি গ্রামে যাব।’ অনন্ত বলল।
‘গেলেই কী? এখন কি আর এসবের প্রচলন আছে? এমনকি কোনো হতদরিদ্র গ্রামেও একটা হারিকেন পর্যন্ত জ্বলে না।’
‘এই কুপিবাতির আলো দেখতে কেমন ছিল?’
‘সব বাতির আলোর রংই এক। তবে এটাতে যা হতো, আলোটা নিভিয়ে দিলে পোড়া অংশটায় গোল গোল হয়ে কালি জমে থাকত। ঠিক ফুলের একধরনের পরাগের মতো। বলতে পারো, কালো পরাগ।’
অনন্ত বলল, ‘কালো পরাগ! মা তুমি তো কবি হয়ে গেলে!’
‘কেন? একটা কিছু বললাম আরকি! কবি হওয়া আমার কম্ম নয়। তোমরা কেউ কবি, কেউ শিল্পী, আমি এসবে নেই।’
‘তুমি ওসবে থাকো বা না থাকো, আমি কিন্তু কাঠ দিয়ে এই রকম কুপিদানি একটা বানাব।’
‘চারুকলার ছাত্রদের এই এক দোষ, যা দেখিস, মনে ধরলে তা-ই বানাতে হবে। এসব কুপিবাতি এখন আর চলে না। বললাম না, গ্রামেও না।’
‘তবু বানাব একটা।’
‘ঠিক হবে না।’
‘কেন মা?’
‘ঘর নোংরা হবে যে। কেরোসিনের কটু গন্ধও ছড়াবে।’
‘তাহলে জ্বালাব না।’
‘তোর যা ইচ্ছে করিস,’ মা ঈষৎ বিরক্তি প্রকাশ করল বলে মনে হলো।
‘মা, তুমি গ্রাম থেকে আরও কী কী যেন এনেছিলে? ছোট থাকতে দেখেছিলাম।’
‘আমারও তো মনে নেই। একটা বড় লাউয়ের খোলের কথা মনে আছে। একটা ছিল বাবুইয়ের বাসা, যা দাদার বাড়ির উঁচু তালগাছ থেকে ঝড়ের রাতে পড়ে গিয়েছিল। এই রকম আরও কটা ছিল, বাড়ির লোকেরা টানিয়ে রাখত। আমি একটা নিয়ে এসেছিলাম; আর সম্ভবত এনেছিলাম বাঁশের চাঁই ও ডোলা। চাঁইয়ে মাছ ধরা পড়লে ডোলায় রাখা হতো। বাঁশ-বেতের আর কী কী এনেছিলাম, মনে নেই।’
‘লাউয়ের খোলটা দিয়ে কী করা হতো?’
‘ও, এর ছিল মাল্টি-ইউজ। আমি ওটাতে তামাক খাওয়ার টিক্কা রাখতে দেখেছি।’
‘তুমি পৈতৃক বাড়ির স্মৃতি রাখতে চেয়েছিলে, সবই হারিয়ে গেল, কেবল টিকে আছে এই বাতিদানিটা। আমি এ রকম আরেকটা বানাব।’
মা মাথা নাড়িয়ে অবশেষে সম্মতি দিলেন।
অনন্ত কয়েক দিনের টানা চেষ্টায় একটা কাঠের ল্যাম্পস্ট্যান্ডের অবয়ব দান করল। এ সময় বাড়ির অনেকেই তাকে লক্ষ করেছে। ওর বাবা বলল, ‘তুমি ফাইন আর্টসের ছাত্র, প্রায়ই দেখি কাজ করো ভাস্কর কিংবা স্থপতিদের মতো।’
‘বাবা, আমি মুস্তাফা মনোয়ারের ভাবশিষ্য, তিনি সবই জানতেন। তিনি ছবি আঁকতেন, স্থাপত্য গড়তেন, পুতুল নাচাতেন, অনুষ্ঠান বানাতেন, আবার গানও গাইতেন।’
‘তুমিও তা-ই হতে চাও?’
অনন্ত বলল, ‘এখনো অনেক পথ বাকি।’ ‘মানে?’ ‘মানে আর কী, ওটাতে জীবন দিতে হবে না?’ ‘ফিলোসোফারদের মতো কথা বলছ, যাদেরকে আমি দুই চোখে দেখতে পারি না।’ ‘আর্টিফ্যাক্ট তো কেবল সাজিয়ে রাখার জিনিস নয়, এটার ব্যবহারিক মূল্যও তো আছে।’
‘হলে দোষ কী?’
‘বুঝেছি, জ্যাক অব অল ট্রেড।’
এসব কথার সময় অনন্তর মা দূরে বসে মিটমিট হাসছিলেন।
অনন্তর শিল্পীমন এটিতে কালো রং দেওয়া সংগত মনে করেনি। সে অন্য একটি রঙের কথা ভাবছে। ব্রাউন কিংবা মেটে।
এ আবাসে নিয়মিত যিনি আসেন, তিনি অনন্তর বাবার কাজিন হাবিবুর রহমান। তাঁর আচরণে অনন্তরা তাঁকে মনে করে এক ভিনগ্রহী মানুষ।
‘ও, আপনি এসেছেন, খুব ভালো হলো। এই দেখুন হাবুকাকু, আমার ল্যাম্পস্ট্যান্ডের দিকে, আজই রং করা শেষ হলো।’
‘চমৎকার! সুন্দর নকশাই শিল্পের প্রাণ।’
‘আসলে জানেন হাবুকাকু, গ্রাম থেকে মায়ের আনা এই ল্যাম্পস্ট্যান্ডটিই এ শিল্পকর্মের ইন্সপাইরেশন।’
তিনি তাকিয়ে দেখেন, পুরোনোটিতে আছে সামান্য ফাটল, ঘষা, তেলের দাগ, কোথাও আগুনের হালকা পোড়া। উল্লম্ব মূল কাঠামোটির খাঁজের মধ্যে বাড়ির লোকজন হয়তো আংটা দিয়ে আরও বাতি ঝুলিয়ে রাখত। এসব ডিজাইন এখন আর নেই, এটির বয়স হয়তো ১০০–এর কাছাকাছি। অনন্ত আর এসব ঝামেলার মধ্যে যায়নি। তবু ওরটা বেশ উপযোগী প্রদীপদানিই হয়েছে বলে মনে হলো।
অনন্তর মা চা নিয়ে এসে অতিথির হাতে দিতেই তিনি একটি সিটার টেনে ছেলেটির আরও কাছে গিয়ে বসলেন। এই ফাঁকে অনন্তর পিতা–মাতা আরেক কোনায় বসে নিজেদের আলাপে মত্ত হলেন।
‘বুঝলে অনন্ত, তোমার ল্যাম্পস্ট্যান্ডে এখনো জীবন আসেনি।’
‘কী রকম, হাবুকাকু?’
‘এটি এক নীরব চরিত্র।’
‘জড় বস্তু তো নীরবই থাকবে। এতে জীবন কীভাবে আসে?’
‘এই পুরোনো স্ট্যান্ডটি গ্রামে ৫০ কিংবা ১০০ বছর ধরে অবস্থান করে মানুষের হাসি, কান্না, ঝড়, তখনকার বিদ্যুৎহীন রাত, বিয়ে, মৃত্যু, শবযাত্রা—কত কিছুর সাক্ষী হয়েছে! তখন হয়তো উঠানে গরু দিয়ে ধান মাড়ানোর সময় এটি রাতব্যাপী আলো দিয়েছে। এখন তো গরু দিয়ে ধানই মাড়ায় না কেউ।’
‘তাহলে?’
‘তাহলে আর কী! তোমার এই জড় বস্তুকে অনেকটা সময় অতিক্রম করতে হবে। এটি হয়তো অন্যভাবে, অন্য পথে জীবন পাবে।’
‘যদি সময়ই জীবন দেয়, আমি কি তাহলে কেবল অপেক্ষাই করব?’
‘এক জীবনে জীবন চাও, ও তো হওয়ার নয় বাপু। শিল্পের মূল্য কেবল সৌন্দর্যে নয়, ব্যবহারেও। আসলে সময় নিজে জীবন দেয় না, মানুষের অভিজ্ঞতা সময়কে অর্থপূর্ণ করে। স্মৃতি হলো বস্তুর দ্বিতীয় নির্মাতা। তোমার মায়ের আনা পুরোনো স্ট্যান্ডটির দিকে তাকাও, কাঠের গায়ে যে আঁচড়গুলো, এসব কোনো ত্রুটি নয়, এগুলোই জীবনের স্বাক্ষর।’
‘আপনি কি বলতে চান হাবুকাকু, জীবন বানানো যায় না, কেবল একটি আশ্রয় তৈরি করা যায়, যেখানে জীবন এসে বাসা বাঁধে?’
‘এগজ্যাক্টলি। বিষয়টি তুমি বুঝেছ, তুমি অনেক বুদ্ধিমান জানি। আমি তোমাকে নিরুৎসাহিত করার জন্য কিছু বলিনি।’
‘আমি তা মনে করি না, কাকু।’
‘কী এমন কথা হচ্ছে কাকা–ভাইপোর?’ নিজের আসন থেকে উঠে এসে অনন্তর মা জিজ্ঞেস করলেন।
‘তেমন কিছু না, একটু শিল্পসংস্কৃতির আলাপ। তবে কথা আমাদের শেষ, ভাবি।’
‘আমার ছেলের ওপর দার্শনিকতা চাপানো হলো আরকি!’
অনন্ত রাতে শুয়ে ভাবে, এটিকে সে কেবল সাজিয়ে রাখবে না, ব্যবহারও করবে। তার ঘুমজড়ানো আবেশেই স্মৃতির ফোন আসে। সে জানতে চায়, ল্যাম্পটি বানানো শেষ হয়েছে কি না।
অনন্ত বলল, ‘এখনো অনেক পথ বাকি।’
‘মানে?’
‘মানে আর কী, ওটাতে জীবন দিতে হবে না?’
‘ফিলোসোফারদের মতো কথা বলছ, যাদেরকে আমি দুই চোখে দেখতে পারি না।’
‘আর্টিফ্যাক্ট তো কেবল সাজিয়ে রাখার জিনিস নয়, এটার ব্যবহারিক মূল্যও তো আছে।’
কিছুক্ষণ পর কয়েকটি পোকা এসে আত্মাহুতি দেয়। এ পোকার স্বভাবই এমন। এ জন্যই কি সম্রাজ্ঞী মেহেরুন্নেসা পঙ্ক্তি রচেছিলেন—‘গরিব গোরে দীপ জ্বেলো না, ফুল দিও না কেউ ভুলে/ শ্যামা পোকার না পোড়ে পাখ, দাগা না পায় বুলবুলে?’ কিন্তু এখানে তো গোর নেই, কেউ একজন চরণগুলো উদ্ধৃত করতেই একটা লম্বা ঠ্যাংয়ের ঘাসফড়িং এসে আরেক বান্ধবীর বিউটিবোনে, অর্থাৎ হাঁসুলির ওপর ধপ করে বসল; সে জর্জেট ওড়না দিয়ে এটা তাড়াতে চাইলে ফড়িংটির লম্বা পায়ের স্পাইকগুলো এতে সাময়িকভাবে আটকে গেল।
‘এই ল্যাম্পস্ট্যান্ড শহরে কীভাবে ব্যবহার করবে? কেরোসিন পাবে কোথায়? সব কিছু কেমন মেকি, দেখো না? ব্যাটারিতে যেমন রিকশা চলে, আবার ব্যাটারির মোমও আছে। এমনভাবে বানানো হয় যে মনে হয় অবিকল একটা মোমবাতি জ্বলছে।’
‘আমি ভাবছি ঘিয়ের বাতি জ্বালাব।’
‘হয়েছে হয়েছে! জ্বালাইয়া চান্দের বাতি, আমি জেগে রব সারা রাতি গো...।’
‘ইয়ার্কি বাদ দাও তো। আমি যেকোনো উপায়ে এটি ব্যবহার করব। এতে মানুষের স্পর্শ জমবে, মোমের বা চুইয়ে পড়া তেলের দাগ পড়বে, তেলের গন্ধও থেকে যাবে। কোথাও আঁচড় লেগে রং ফিকে হবে। এগুলোকে ক্ষতি ভাবলে চলবে না, এসব হবে স্মৃতির স্তর।’
‘বুঝলাম। এখন কী পর্যায়ে আছে, দেখা দরকার।’
‘একদম কমপ্লিট, একবার এসে দেখে যেয়ো, স্মৃতি।’
সে স্মৃতিকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মোতাবেক বাতিদানিটি দুই–এক দিন ব্যবহারও করে। আপাতত ছোট্ট একটি মাটির পাত্রে তেল রেখে তার ওপর এটি কাপড়ের পলতে স্থাপন করে এতে অগ্নিসংযোগ করে। অধুনা শহরের বুদ্ধিজীবীরা কোনো অনুষ্ঠান উদ্বোধনকালে প্রদীপ প্রজ্বালনের সময় যেমনটি করেন, কিংবা তরুণ-তরুণীদের প্রতিবাদ অথবা শহীদদের আত্মত্যাগের স্মরণে নীরবতা পালনের সময় যেমনটি হয়ে থাকে।
একটি অতিরিক্ত সরঞ্জাম পেলে এর প্রতি লোকজনের নির্ভরতা বাড়ে। এক সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ চলে গেলে অনন্তর পিতা এটি জ্বালিয়ে এর আলোয় পত্রিকা পড়েন। সশব্দে ছেলেকে শুনিয়ে বলেন, ‘বুঝলে অনন্ত, শিখা অনির্বাণের মতোই এ হচ্ছে শিখা অনন্ত, যদিও অনন্ত সময় এটিকে রাখবার প্রয়োজন হবে না।’
অনন্ত ঈষৎ হেসে নিজের রুমের চার্জ লাইটটি অফ করে অন্ধকারে ভাবে, আরও ২০ বা ৪০ বছর আগে হলে হয়তো ঘরভর্তি মানুষ লোডশেডিংয়ের সময় এটির চারপাশে জড়ো হয়ে বসত, শিশুরা চতুর্দিকে হইহুল্লোড় করে ঘর মাতিয়ে তুলত। আরও আরও আগে হলে হয়তো অন্য কোথাও কোনো আঁতুড়ঘরের সামনে এটির প্রদীপ পাহারা বসাত। আমি কেবল পেছন থেকে সময়কে অর্ধশতাব্দী এগিয়ে আনার কল্পনায় মত্ত হয়েছি। কল্পনাই শিল্পীর সম্পদ।
বন্ধুমহলে অনন্তর এ নির্মাণকর্মের বিষয়টি নিয়ে অতি উৎসাহ সৃষ্টি হলে সে মনে মনে রাগ করে। ভাবে, আমার যেকোনো বস্তু নির্মাণের অধিকার আছে, যা খুব স্বাভাবিক, এতে কারও তীর্যক ভাবনার সুযোগ নেই। সে এসব কেবল দুদিন ভাবতে পারে। এক সন্ধ্যায় ছেলে ও মেয়ে বন্ধুরা গিটার, মাউথঅর্গান, ইউকুলেলে বগলদাবা করে এসে অনন্তদের ছাদটা বেছে নেয়। একটা বালবের ব্যবস্থা থাকলেও তারা অনন্তর ল্যাম্পস্ট্যান্ডটি ব্যবহারের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। অতঃপর এটি নিচতলা থেকে ছাদে নিয়ে আসা হয়। স্ট্যান্ডের শীর্ষাধারটির ওপর মোটা সলতের প্রদীপটি জ্বালালে চারপাশের টবগুলোতে কিছু কিছু ফুলকে বড় অদ্ভুত ঠেকে। কিছুক্ষণ পর কয়েকটি পোকা এসে আত্মাহুতি দেয়। এ পোকার স্বভাবই এমন। এ জন্যই কি সম্রাজ্ঞী মেহেরুন্নেসা পঙ্ক্তি রচেছিলেন—‘গরিব গোরে দীপ জ্বেলো না, ফুল দিও না কেউ ভুলে/ শ্যামা পোকার না পোড়ে পাখ, দাগা না পায় বুলবুলে?’ কিন্তু এখানে তো গোর নেই, কেউ একজন চরণগুলো উদ্ধৃত করতেই একটা লম্বা ঠ্যাংয়ের ঘাসফড়িং এসে আরেক বান্ধবীর বিউটিবোনে, অর্থাৎ হাঁসুলির ওপর ধপ করে বসল; সে জর্জেট ওড়না দিয়ে এটা তাড়াতে চাইলে ফড়িংটির লম্বা পায়ের স্পাইকগুলো এতে সাময়িকভাবে আটকে গেল। সে হ্যাঁচকা টানে ওড়না খসিয়ে অমসৃণ ও খসখসে ছাদের ওপর ছুড়ে ফেলল, কিন্তু সেটি পড়ল ছোট্ট এক কাঁটাযুক্ত গাছের ওপর। তখন সিঁড়িঘরের দেয়ালে তার লম্বা ছায়া পড়ল। সঙ্গে চিৎকার যুক্ত হওয়ায় উদ্ভট শ্রুতিলোকন তৈরি হলো। হাস্য-তামাশার অন্ত নেই। দীর্ঘ রাতব্যাপী চলল গানা-বাদ্য। মাঝখানে মেয়েদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য সবাই বাতিটি জ্বালিয়ে রেখেই বের হয়ে গেল। ফিরে এসে আবার চলল ওদের গায়ন-বাদন। এতে ভালগারিটিও যুক্ত হলো। একেই বলে নিশিগীত।
‘আমাকে দাও, জোড়া লাগিয়ে দিই।’ ‘আরে, ওটা নিয়েই চোর ব্যাটা পালিয়েছে।’ ‘তাহলে?’ ‘তুমি অন্য একটা ডিজাইন করো। মাথাটা এত সাদামাটা ছিল যে আমার নিজেরই ভালো লাগছিল না। তুমি এটা নতুন নকশায় বানিয়ে নিজ হাতেই লাগিয়ে দিয়ো, এতে তোমারও একটা কিয়দংশ যুক্ত হোক।’
সবাই যার যার মতো কেটে পড়লে অনন্ত শোয়া থেকে লাফ দিয়ে উঠল। নিজেকে সে প্রশ্ন করল, সিঁড়িঘর কি লাগানো হয়নি? কলাপসেবল গেট? সে দেখতে পেল, সবই তখনো খোলা। আবছা অন্ধকার। ছাদে উঠেই তার গা কাঁটা দিয়ে উঠল। এক ছিঁচকে চোর, অথবা মহল্লাবাসীদের বয়ানে ‘হিরোঞ্চি’, হাতে ধরা ল্যাম্পস্ট্যান্ডটি নিয়ে পালাতে চাইল। অনন্ত সিঁড়িঘরের খোলা দরজা আগলে দাঁড়াল। চোর কার্নিশে লাফ দিয়ে নামার আগেই অনন্ত স্ট্যান্ডটির গোড়া ধরে ফেলল। টানাহেঁচড়ার মধ্যে দুজনই একত্রে কার্নিশে লাফ দিয়ে পড়ল। চোর হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিচে পড়ে গেল, অনন্তও পড়ল। কুপিদানির মাথাটি আলগা হয়ে গেলে চোর ওটা নিয়েই দৌড়ে পালাল। অনন্তর হাতে মাথাবিহীন স্ট্যান্ড। সে গোড়ালির ওপরে ব্যথা অনুভব করছে। হয়তো হাড় ভেঙেছে। সে ঘরে যখন প্রবেশ করল, মা-বাবার সামনে তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ব্যথা তখন চরমে উঠল।
বাড়ির লোকজন ঘটনা শুনে এবং অনন্তর কোঁকানো দেখে ভয়ে জড়সড় হলো। তারা কেবল উচ্চারণ করতে পারল—শুকরিয়া যে ওর ওপর আঘাত আসেনি, মালের ওপর দিয়ে গেছে। এ অবস্থায়ই অনন্ত ভাবছে, এ তো আমার খুঁজতে থাকা জীবনের ওপর দিয়ে গেছে।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা অনন্তর প্লাস্টার করা পায়ে টানা দেওয়া, হাড় জোড়া লাগানোর চেষ্টা। পরিবারের লোকজন ছাড়াও বন্ধুরা কমবেশি উপস্থিত। এদেরই মাঝ থেকে স্মৃতিকে সে কাছে ডেকে বলল, ‘ল্যাম্পস্ট্যান্ডের মাথাটা তো ছিঁড়ে গেছে।’
‘আমাকে দাও, জোড়া লাগিয়ে দিই।’
‘আরে, ওটা নিয়েই চোর ব্যাটা পালিয়েছে।’
‘তাহলে?’
‘তুমি অন্য একটা ডিজাইন করো। মাথাটা এত সাদামাটা ছিল যে আমার নিজেরই ভালো লাগছিল না। তুমি এটা নতুন নকশায় বানিয়ে নিজ হাতেই লাগিয়ে দিয়ো, এতে তোমারও একটা কিয়দংশ যুক্ত হোক।’