অলংকরণ: আনিসুজ্জামান সোহেল
অলংকরণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

গল্প

সময়হীন কক্ষে

সকাল আর সন্ধ্যাবেলার মধ্যে ইদানীং কোনো পার্থক্য করতে পারি না আমি। দরজার বাইরে থেকে যে একচিলতে ম্লান আলো আসে, তাতে মনে হয়, সব আলোর রেখা একই রকম সরু, আবছা, শান্ত আর মোলায়েম। দূরে কোথাও গলির মধ্যে টিং টিং করে বেল বাজিয়ে রিকশা চলার শব্দ শুনলাম। সত্যিই কি শুনলাম? নাকি আমার মনের ভুল? এখন কি রাত্রি শেষে সকাল হলো, নাকি দিন শেষের সন্ধ্যা? কিছুই বুঝতে না পেরে অস্থির বালকের মতো ছটফট করে উঠি আমি, ‘কী হইছে, স্যার? বাথরুমে যাইবেন?’

পাশ থেকে আবু তালেব জিজ্ঞেস করলে আমার বিরক্ত লাগে। ‘খাইবেন আর বাথরুমে যাইবেন’ ছাড়া লোকটার মুখে যেন আর কোনো প্রশ্ন নেই। আমি কপাল কুঁচকে বেলা আন্দাজ করার জন্য জানতে চাইলাম, ‘এখন কয়টা বাজে?’

‘হে হে হে, টাইম দিয়া আপনে কী করবেন! আপনের তো আর অফিসে যাওয়ার তাড়া নাই! আপেল কাইট্যা দিই, খাইবেন?’

সাধারণত বিকেলবেলাতেই তো ফল খেতে দেয়, নাকি নাশতার পর সকালবেলা? আবার সব গুলিয়ে যায় আমার। এই রুমের দেয়ালে লটকানো বন্ধ ঘড়িতে সব সময় স্থির হয়ে আড়াইটা বেজে থাকে। ভোর, দুপুর, রাত কোনো পরিবর্তন নেই। কথায় আছে, নষ্ট ঘড়িও দিনে একবার ঠিক সময় দেয়। কিন্তু সেই সঠিক সময় কোনটা, তা বুঝতেও তো দিনের আলোর নানা রকম মেজাজের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। জাহাজ কোম্পানির একটা পুরোনো ক্যালেন্ডারও দেয়ালে ঝুলে স্থবির হয়ে আছে দুই হাজার আঠারো সালের সেপ্টেম্বর মাসের দিন তারিখ মেলে ধরে।

‘কী লেখো, আবু তালেব?’ আবু তালেব মিটিমিটি হাসে। ‘কবিতা লিখি, স্যার। বন্দীর বন্দনা। হা হা হা।’ ‘আমাকে কি তোমরা বন্দী করে রেখেছ? আমি কি অপরাধী?’ আমি অধৈর্য ভঙ্গিতে জানতে চাই। এবার কোনো উত্তর আসে না।

এটা কত সাল চলছে, কোন মাস, কী বার—কিছুই আমার মনে পড়ে না। একটা জানালাহীন প্রাচীন বদ্ধ কক্ষে এই ভুলে যাওয়ার গোলকধাঁধার মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া আমিটাই–বা কে? সামনের সাদা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করি, বলো তো, আমি কে? দেয়ালে একটা টিকটিকি লেজ নাড়িয়ে হেঁটে যায়।

আবু তালেব পাশ থেকে বলে, ‘কিছু বললেন নাকি স্যার?’

‘আমার নাম...মনে হয় ভুলে গেছি।’

‘হে হে হে, সেটাই ভালো স্যার। ভুলে যান। এই সব তুচ্ছ নামধাম মনে রাখার দরকার নাই!’

আমি আবু তালেবকে দেখি। তার শারীরিক গঠন দেখে বয়স ঠিক বোঝা যায় না। বত্রিশ বা বিয়াল্লিশ যেকোনোটাই হতে পারে। মাথায় কমে আসা কাঁচাপাকা চুল। গালে পাতলা দাড়ি। শক্তপোক্ত পোড় খাওয়া চেহারা। নীল শার্টের ওপর সাদা রঙের একটা বিবর্ণ অ্যাপ্রন আর চেক কাপড়ের পায়জামা পরে আছে। আবু তালেব আমাকে সময় সময় খাবার দিয়ে যায়, বাথরুমে যেতে চাইলে একটা সরু করিডর দিয়ে বাথরুমে নিয়ে যায়।

বাকিটা সময় রুমের এককোনায় বসে বসে একটা সাদা খাতায় কী যেন লেখে।

‘কী লেখো, আবু তালেব?’

আবু তালেব মিটিমিটি হাসে।

‘কবিতা লিখি, স্যার। বন্দীর বন্দনা। হা হা হা।’

‘আমাকে কি তোমরা বন্দী করে রেখেছ? আমি কি অপরাধী?’

আমি অধৈর্য ভঙ্গিতে জানতে চাই। এবার কোনো উত্তর আসে না। মাটিতে পা ঠুকে আমি আবার জিজ্ঞেস করি, ‘হ্যালো, আবু তালেব শুনতে পাচ্ছ, বলো, আমি কে? আমি কবে মুক্ত হব? কেন আমাকে আটকে রেখেছ?’

‘প্রশ্ন করবেন না, স্যার। অতি প্রশ্ন বিপদ ডেকে আনবে। আপনি তখন এমন জায়গায় যাইতে বাধ্য হবেন, যেটা আপনার জন্য ভালো হবে না।’

‘অস্ত্রগুলো কোথায় রেখেছেন?’ ‘কিসের অস্ত্র?’ মাস্টার সাহেবের চোখে তাচ্ছিল্য, ঠোঁটের কোনায় বিদ্রূপের হাসি। আমি মরিয়া হয়ে বলি, ‘দেখুন আমি একজন শিল্পী। রংতুলি ছাড়া শিল্পীর কোনো অস্ত্র নেই। থাকতে পারে না।’

আবু তালেব ঠান্ডা গলায় আমাকে সতর্ক করে চলে গেলে আমার আবছা মনে পড়ে, একসময় আমি হয়তো ছবি আঁকতাম। একটা কাঠের ইজেলে সাদা কাগজ চাপিয়ে ব্রাশ দিয়ে, তুলি দিয়ে আমি বহুরঙা বিচিত্র আকৃতির স্বপ্ন আঁকতাম। অথবা আমি হয়তো গল্প লিখতাম। সময়, সমাজ ও প্রেমের গল্প। মিনু তার মধুর কণ্ঠে কোকিলের মতো সুর করে গান গাইত, ‘পিয়া গেছে কবে পরদেশ, পিউ কাঁহা ডাকে পাপিয়া...’ মিনু আমার স্ত্রীর নাম। তালেবের ফেলে যাওয়া বলপেনের শিষ দিয়ে ঘষে ঘষে আমি দেয়ালের এককোনায় ছোট্ট করে মিনুর নাম লিখি, যাতে পরে আবার ভুলে না যাই। তারপর আবার লিখি, আবার, তিনবার, চারবার। যেন মিনুর নাম লিখলে আমার ভুলে যাওয়া নিজের নামটাও মনে পড়বে।

আমাদের কি কোনো সন্তান ছিল? হাসিখুশি, আদুরে, চঞ্চল মায়াময় কোনো দেবশিশু? বারান্দার কোনায় লতানো মানিপ্ল্যান্ট, ছায়াপ্রিয় পাতাবাহার, নয়নতারা বা নীল ডেইজি ফুলের ঝাড়? ছিল কি? আমি যেন সামনের নিরেট নিথর দেয়ালের কাছেই প্রশ্ন করি। সাদা দেয়ালটাকে হঠাৎ এডগার অ্যালান পোর দ্য র‍্যাভেন–এর মতো মনে হয়, যেন সাদা নয় কালো অন্ধকার কাকের মতো একটা দেয়াল আমার সামনে বসে মাথা ঝাঁকিয়ে অনবরত বলে যাচ্ছে, ‘আর কখনোই নয়’ ‘নেভার মোর’। আর কখনোই আমি মিনুর কাছে ফিরতে পারব না। আর কখনোই আমার বিস্মৃত নামটি মনে পড়বে না। এই অনন্ত বন্দিদশা থেকে কখনোই আমি মুক্তি পাব না।

আমি চিৎকার করে দেয়ালটিকে সরে যেতে বলি, কিন্তু দেয়ালের ভেতর থেকে এক শটা কাক একসঙ্গে ডেকে ওঠে। ওফ্, কী কর্কশ সেই ডাক। দুই হাতে কান চেপে আমিও হুশ হুশ করে কাক তাড়াই। বলি, যা, যা, ভাগ। কিন্তু দেয়ালটা যেন জীবন্ত প্রাণীর মতো আমার দিকে দুই পা বাড়িয়ে এগিয়ে আসে, আরও চেপে ধরতে চায়। আমি দুহাত দিয়ে ঠেলেও তাকে সরাতে পারি না।

‘স্যার, স্যার, ঘুমাইছেন? স্যার...’

চোখ মেলে দেখি, আবু তালেব আমার মুখের ওপর ঝুঁকে আছে। আমি একঝটকায় উঠে বসি। সারা গা ঘামে ভিজে চপচপ করছে, গলা শুকিয়ে কাঠ।

‘পানি খাইবেন, স্যার?’

আবু তালেব একগ্লাস পানি এগিয়ে দিলে ঢকঢক করে সেটা খাই এবং তখনই ঘরের ভেতর আরেকজন লোকের অস্তিত্ব অনুভব করি। একে কি আগেও দেখেছি? মনে করতে পারি না। শুকনা, লম্বা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা পরা একজন ক্লিন শেভড মানুষ। হাতে একটা বেত থাকলে মনে হতো কোনো প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। অবশ্য আজকাল তো আবার বেত ব্যবহার নিষিদ্ধ। বরং তার হাতে চক–ডাস্টার থাকলে মানাত বেশি।

ঘরের একমাত্র চেয়ারটিতে বসে মাস্টার সাহেব শিকারি বিড়ালের মতো একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আমাকে পানি খাইয়ে আবু তালেব চলে গেছে। মাস্টার সাহেবের শীতল দৃষ্টির সামনে আমার কেমন শীত লাগতে থাকে আর নিজেকে ভীষণ অসহায় লাগে।

‘অস্ত্রগুলো কোথায় রেখেছেন?’

‘কিসের অস্ত্র?’

মাস্টার সাহেবের চোখে তাচ্ছিল্য, ঠোঁটের কোনায় বিদ্রূপের হাসি। আমি মরিয়া হয়ে বলি, ‘দেখুন আমি একজন শিল্পী। রংতুলি ছাড়া শিল্পীর কোনো অস্ত্র নেই। থাকতে পারে না।’

‘হেঁয়ালি করবেন না। সরাসরি উত্তর দিন।’

‘আমি জানি না।’

‘আপনি কার হয়ে কাজ করছেন? বলুন, কোনো তথ্য আড়াল করবেন না। কারা মদদ দিচ্ছে আপনাকে? কত টাকা পেয়েছেন? কোথায় সেই টাকা? চুপ করে থাকবেন না। বলুন!’

এই সব প্রশ্ন আমি বহুবার শুনেছি। শুনতে শুনতে আমার হাই ওঠে, ভয়ানক ক্লান্ত লাগে, প্রচণ্ড রাগ হয়, সবকিছু অসহ্য লাগে। খুব ঘুম পায়। চোখের পাতা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসে। শরীর শিথিল হয়ে যায়। আমি বোধ হয় সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ি। অথবা আমি ঘুমিয়েই ছিলাম। ঘুমের মধ্যে নাকি অথই অতল জলের মধ্যে ডুবে যেতে যেতে ঘুমের স্বপ্ন নাকি গুমের স্বপ্ন দেখি বুঝতে পারি না!

আবু তালেব হাসি হাসি মুখে ফিসফিস করে বলে, ‘আপনি তো আত্মগোপনে আছেন স্যার। স্বেচ্ছায় নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন, গুমটুম বাজে কথা! আপনি বুঝতে পারছেন না। আপনি আসলে গা ঢাকা দিয়ে আছেন!’

আমি বিভ্রান্ত হয়ে যাই।

‘কেন? কেন আমি ইচ্ছা করে লুকিয়ে থাকব? কী কারণে? কী করেছি আমি?’

‘সেটা আপনিই ভালো জানেন, স্যার! আমরা তো শুধু আপনাকে শেল্টার দিয়েছি, আরামে রাখছি।’

আবু তালেব হাসি হাসি মুখে ফিসফিস করে বলে, ‘আপনি তো আত্মগোপনে আছেন স্যার। স্বেচ্ছায় নিজেকে লুকিয়ে রেখেছেন, গুমটুম বাজে কথা! আপনি বুঝতে পারছেন না। আপনি আসলে গা ঢাকা দিয়ে আছেন!’ আমি বিভ্রান্ত হয়ে যাই।

আবার আমার সবকিছু গুলিয়ে যায়। যেন আমি এক অতল সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি। একবার মাথা তুলছি আবার ডুবে যাচ্ছি। দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার! আমি কি তাহলে নিজের ইচ্ছাতেই আটকে আছি এই সময়হীন কক্ষে! নাকি আমাকে কেউ আটকে রেখেছে! সে যা–ই হোক, সত্য হচ্ছে আমি একজন অবরুদ্ধ মানুষ, যার জীবন একটা চৌকোনা রুমে থমকে আছে। কত দিন ধরে জানি না। আমি বিচ্ছিন্ন বাইরের পৃথিবী থেকে, আমার সমস্ত সঙ্গ নিষেধ, দৈনন্দিন চলাচল নিষেধ, যেন আমি এক স্থবির পাথর, চলৎশক্তিহীন, নষ্ট ঘড়ির কাঁটার মতো স্থির।

‘তোমার সঙ্গে আর কারা ছিল, বলো!’

একটা দশাসই চেহারার নিষ্ঠুর অচেনা মানুষ আমার মুখের ওপর প্রায় ঝুঁকে পড়ে প্রশ্ন করে।

‘বলো, কী তাদের নাম, কী পরিচয়? কী তাদের উদ্দেশ্য? কারা তোমার সঙ্গী?’

‘আমি একজন নিঃসঙ্গ মানুষ। আমার কোনো সঙ্গী নেই, বন্ধু নেই। আমি ওই আকাশের মতো একা!’

‘একদম মিথ্যা কথা বলবি না।’

‘না, বলছি না।’

সঙ্গে সঙ্গে একটা শক্ত হাতের পাঁচটা আঙুল আমার গালে আছড়ে পড়ে। একের পর এক চপেটাঘাতে আমি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। আমার ঠোঁট কেটে রক্ত বের হয়। আমি নেতিয়ে পড়ি। মাথা ঘুরতে থাকে। পেট গুলিয়ে বমি আসতে চায়। যখন প্রায় অজ্ঞান হওয়ার অবস্থা তৈরি হয়, তখন সম্ভবত ক্লান্ত হয়ে সে থামে।

হাঁপাতে হাঁপাতে আমার মনে হয়, যদি সত্যিই আমি অজ্ঞাতবাসে থাকি তবে আমার ওপর এই অত্যাচার কারা করছে, কেন করছে? কী চায় তারা? কেন এই জুলুম? আমি কি সত্যি কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত? আমি কে? কী নাম আমার?

দৃশ্যপটে আবার আবু তালেবকে দেখা যায়। তার মুখে চকচকে হাসি। সে নিজস্ব ভঙ্গিতে সেই পুরোনো প্রশ্নটিই জিজ্ঞেস করে, ‘বাথরুমে যাইবেন, স্যার?’

আমি ছটফট করে উঠি, ‘আমি বাইরে যাব। আমি এই চার দেয়ালের বাইরে যেতে চাই।’

আবু তালেব নির্বিকার কণ্ঠে বলে, ‘যান। যেখানে ইচ্ছা যান। আপনি তো মুক্ত। স্বাধীন।’

যেন পাঁচতলা থেকে ধপ করে নিচে পড়লাম—এমন একটা শূন্যতার অনুভূতি হয় আমার। হতবিহ্বল লাগে। ও কি সত্যি বলছে, নাকি আবারও আমাকে ধোঁকা দিয়ে বিভ্রান্ত করতে চাইছে! এটা কি ওদের কোনো ফাঁদ? সত্যি কি আমি আবার মিনুর কাছে, আমার পরিচিত পৃথিবীর কাছে ফিরতে পারব?

আবু তালেব যেন আমার মনের প্রশ্নগুলো বুঝতে পেরে আবার বলে, ‘আপনি চাইলেই কিন্তু চলে যেতে পারেন! যেখানে মন চায় সেখানে! কেউ বাধা দেবে না। যান!’

এবার আমি একটু ধাতস্থ হয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। কিন্তু মনে হয় আমার পা দুটোতে কোনো জোর নেই। যেন পায়ের জায়গায় দুটো অসাড়, শক্তিহীন কাষ্ঠখণ্ড বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আতঙ্কের একটা ঢেউ আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায়। আমি হাঁচড়েপাঁচড়ে দেয়াল খামচে ধরে কোনোমতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। কিন্তু এরপর আর পা ফেলতে পারি না। পা দুটি যেন ভীষণ ভারী স্থবির পাথর। নিজেকে মনে হয় ডানা কেটে ফেলা এক অসহায় পাখি। ওড়ার ইচ্ছা বুকে নিয়ে মাটিতে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে।

‘তোমরা আমার হাঁটার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছ!’ আমি আর্তনাদ করে উঠি।

আবু তালেব হো হো করে হাসে। চারপাশের দেয়ালে সেই হাসি প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।