অলংকরণ: আরাফাত করিম
অলংকরণ: আরাফাত করিম

গল্প

মনরো

সে স্মৃতিভ্রষ্টের মতো বসে-শুয়ে থাকে।

নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে চার দিন আগে সে এখানে আসে, আস্তানা গাড়ে। এক পাশে ধানমন্ডি লেক, অন্য পাশে ব্যস্ততম সড়ক। সেই সড়কে ঢোকার আগের একটি মোড় এটি। পিক আওয়ারেও এখান দিয়ে খুব বেশি লোকের আনাগোনা চোখে পড়ে না। কিছু অসুবিধা এরই মধ্যে দেখা গেছে, তবু সে ভাবে, কিছুটা মানিয়ে নিতে হবে, এই যা!

আশপাশে তিনটি চায়ের দোকান। দুটোতে অফিস আওয়ারে কাস্টমার বেশি হয়, অন্যটা প্রায়ই বন্ধ থাকে, মালিক বিরাট বাদাইম্যা, বোঝা যায়। রাস্তার বিপরীত দিকে এক শ মিটার দূরে স্বামী পরিত্যক্ত মোমেনা ও তার ছেলে ডান্ডিবয় রাজুর সাম্রাজ্য। পরিত্যক্ত বিল্ডিংটি নিজের দখলে নিয়েছে মোমেনা। শুরুতে ওদিকেই আশ্রয় নেবে বলে মনস্থির করেছিল সে, কিন্তু মোমেনার সঙ্গে পেরে উঠবে না বলে চেষ্টাও করেনি। ডান্ডিবয়টার স্বভাব বোঝা যায় না। কখনো কখনো খুব ভালো, কখনো এতটাই খারাপ যে গলায় কামড় বসাতে ইচ্ছা করে! এদিকে একটা নতুন আপদ হাজির। কবি কবি চেহারা, চা স্টলে বেঞ্চ থাকার পরও ওর কাছাকাছি এসে ফুটপাতে এমনভাবে বসে আর তাকিয়ে থাকে, বিব্রত লাগে। ওর ইচ্ছা করে, গলা বাড়িয়ে বলে, ‘মরার কবি দূরে গিয়া মরতে পারস না!’ সে কিছু বলে না, সে শুধু ভাবে আর ঘুমের বাইরের সময়টুকু অবলোকন করে তো করেই চলে, এটাই তার কাজ, ডেইলি রুটিন কিংবা নিয়তি।

আশপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে হঠাৎ ঝিমুনি ভাব আসে চোখে, দুনিয়াটা ব্লার হতে হতে আন্ধার হয়ে মগজের ভেতরে ঢুকে যায়। এরপর, এরপর…! কয়টা মিনিট যায় কে জানে। সে হঠাৎ ব্যথায় চিল্লিয়ে ওঠে, ওর আর্তচিৎকারে চা–দোকানি হারামিটা ভ্যা ভ্যা করে হাসে, সঙ্গে সঙ্গে একটা হাসির মব ওঠে কাস্টমারদের মধ্যে! সব কয়টার সাদা-হলুদ দাঁত দেখা যায় হাসির গমকে। ওদিকে কবি ভাব মানুষটা কিছুটা আতঙ্কভরা চোখ নিয়ে তাকালেও পরক্ষণেই সিগারেট ফুঁকতে থাকে, যেন কিছুই ঘটেনি আর মোমেনা কান খাড়া করে একবার এদিকে তাকায় আর নোয়াখালীর ভাষায় দোকানিকে কী যেন জিজ্ঞেস করে, পথচারী দু–একজন দেখেও না দেখার ভান করে চলে যায় ফুটপাতের কংক্রিটে স্যান্ডেলের বিরক্তিকর ঘষা রেখে রেখে। একটা সামান্য চিৎকার এত মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে, সে ভাবে, বিস্মিত হয়! কিন্তু যার ব্যথা সেই বোঝে, কী রকম যন্ত্রণাদায়ক ঘটনার পর এমন আর্তনাদ বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে, তীব্রভাবে! সে বোঝার চেষ্টা করে ঠিক কী ঘটেছিল। সে অনুমান করতে করতে পুরোপুরি নিশ্চিত হয় যে কোত্থেকে এক জেনজি-মার্কা ছেলে ফুটপাতে বাইক তুলে দিয়ে পেছনের চাকায় তার একটা পা মাড়িয়ে দিয়েছে, তাতেই ভাতঘুম নাকি আধঘুম, সেটা ভেঙে যায় এবং বিকট চিৎকার দিতে সে বাধ্য হয়, আর তাতেই এত এত আমজনতা হেসে ওঠার সুবর্ণ সুযোগ লুফে নেয় ও দাঁত কেলিয়ে হাসে এবং ওরা কিছু একটা জয়ের বিমলানন্দ লাভ করে।

গর্ভবতী সে।

পেটের অবস্থা বেগতিক আর ভারী। অতএব আপাতত এই এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার সাধ্য নেই ওর। এমনিতেই চলতে–ফিরতে অসুবিধা, তারপর যুক্ত হয়েছে পায়ের নতুন যন্ত্রণা। সোনায় সোহাগা ব্যাপার! কোথায় যাবে সে, যাবে কার কাছে! এটা ওর এলাকা নয়, পেটের তাগিদে ঘুরতে ঘুরতে চলে এসেছে। নিরাপদ আশ্রয় বলে কিছু হয় না, সে ভাবে। সবখানে মানুষ। মানুষ বড় বেরসিক ও নিষ্ঠুর। পাশের গলির কুকুরগুলোও বজ্জাত, ডিস্টার্ব করে, গালাগালির ভাষায় কানের কাছে এসে ঘেউ ঘেউ করে, চলে যেতে বলে। গত চার দিনের মধ্যে দুবার এসে উৎপাত করে গেছে পাড়ার চাঁদাবাজ-মাস্তানদের মতো। কাল ডান্ডিবয় না থাকলে কী যে হতো! এই ডান্ডি-রাজুই লোকাল কুকুরদের হাত থেকে ওকে সেভ করেছিল, বেশ ভালো কথা, তো কাজ শেষে ফিরে যা-না ঘরে, মায়ের কোলে! তা না, কে জানত ফিরে যাওয়ার আগে ডান্ডিবয় আচমকা ওর পেটে এমন একটা খোঁচা মারে, জানটা বের হতে হতেও হয়নি। বদমাশ একটা।

তেষ্টা পায় ওর।

সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। জুলাইয়ের বাতাস থেকে বৃষ্টির গন্ধ আসছে। যদিও কিছুটা অসুবিধা হবে, তবু সে অপেক্ষা করে বৃষ্টির, পিপাসা দূর করা যাবে। এই শরীরে এখান থেকে নড়বে, সেই শক্তি ও সাহস নেই ওর। এ কী, কে যেন একটা পাউরুটি রেখে গেছে, হয়তো ফেলে গেছে, ও খেয়ালই করেনি! খেতে শুরু করে সে। খেতে খেতে পিপাসা আরও তীব্র হয়। আকাশে সে মেঘের ডাক শুনতে পায় কি? কে জানে পেটের ভেতরেই হয়তো মেঘ ডাকছে, অসময়ের মেঘ, এত ভারী! ভেতরে কয়টা বাচ্চা কে জানে!

এটা কার গায়ের গন্ধ!

চোখটা বুজে এসেছিল আবার। হঠাৎ একটা গন্ধ খুব পরিচিত লাগে। চট করে গন্ধটা নাকে লাগামাত্র ওর ঝিমুনি ভাব যায় ছুটে। সে তাকিয়ে দেখে লোকটা ওর নাক ঘেঁষে দ্রুত পায়ে তাকে অতিক্রম করে চলে গেছে দশ-বারো হাত দূরে! যা, ব্যাটা চলেই যাচ্ছে! পেছন থেকে অবিকল বেলায়েত কাকার মতো দেখতে, আর গন্ধটাও তো কাকার গায়েরই, চেনা! সে ভাঙা পায়ে উঠে দাঁড়ায় ঠিকই, কিন্তু ছুটে যেতে সাহস পায় না। সমস্ত শক্তি দিয়ে ডাকতে গিয়েও পারে না। ওর বারবারই মনে হয় ছোটাছুটি করলে হয়তো সময়ের আগেই ডেলিভারি ঘটে যাবে! হায় প্রভু! বেলায়েত কাকা মিলিয়ে গেল গণমানুষের ভিড়ে! এই সেই বেলায়েত কাকা, তেজগাঁও বস্তির পাশে যার ভাতের হোটেল, যে কিনা ওকে ডাকত ‘রকিবের বউ’ বলে!

রকিব! এই তো কয়েক মাস আগেও রকিবের সঙ্গে তার ছিল ভাব-ভালোবাসা। এত ভালোবাসা, মাখামাখি যে ‘রকিবের বউ’ বলে খেপাত বস্তির অন্য লোকজনও। রকিবও এনজয় করত বিষয়টা। কে কী বলল, সে বিষয়ে রকিব কাউকে পাত্তাই দিত না, এতই ডাকসাইটে, একগুঁয়ে। কে জানত এত দ্রুত রকিবের সঙ্গে বিচ্ছেদ রচিত হবে আর সুখের দিনগুলো হারিয়ে যাবে ওর জীবন থেকে, মুছে যাবে নাম-পরিচয়-ঠিকানা, হারাতে হবে আশ্রয়! আর ধীরে ধীরে সে স্মৃতিহারা হতে থাকবে অমোঘ নিয়তি মেনে! কিন্তু সে তো এখনই স্মৃতিহারা নয়, ঠিকই মনে পড়ে রকিবের চাঁদমুখটা! বেচারাকে প্রথম দিন দেখার ঘটনাটাও খুব খুব মনে আছে ওর। রকিবের মাথায় লম্বা কোঁকড়া চুল। ২৪-২৫ হবে বয়স। মাঝেমধ্যে নেশাপানি করে, তবে বিড়িটিরি খায় না। মা নেই। বাবা থেকেও নেই। ভাঙারির দোকানে কাজ করে। প্রথম পরিচয়ের ঘটনাটা নাটুকে নয়, সাদামাটা। রকিব ভেবেছিল তার পিছু নিয়েছে কেউ। আসলে তা নয়, রকিব যে পথে যাচ্ছিল, সে–ও যাচ্ছিল। ভুল ভেবে হলেও পিছিয়ে এসে রকিব ওর সঙ্গী হয়েছিল। এটাই ছিল তার জন্য পরম-রকিব-প্রাপ্তি! রকিবই আগ বাড়িয়ে এসে সৌজন্য কথা বলে অতঃপর ওর বস্তির বাসায় নিয়ে যায়। রকিবের গানের গলা খুব ভালো। প্রথম দিনই গান গেয়ে মন জয় করে নিয়েছিল ছেলেটা। পরদিন ভালোবেসে ওকে একটা নাম দিয়েছিল রকিব। আদর করতে করতে বলেছিল, ‘তুই তো সুন্দরী, তোর একটা সুন্দর নাম লাগব। শোন, সাদা চামড়ার একটা নায়িকারেই আমার ভাল্লাগে, বুঝলি! হের কুনু সিনামা দেহি নাই, পেপারে ছবি দেখসি, মইরা গেছে কত আগে, অহনও দেখলে জীবন্ত লাগে নতুন নায়িকার মতো, হের বয়স বাড়ে না, ল, হের নামডাই তরে দিলাম…’।

মনরো!

নিজের নামটাই যে ভুলতে বসেছিল সে! কত দিন কেউ ডাকে না, মনরো কিংবা রকিবের বউ! এ এলাকায় ওর কোনো নাম নেই, পরিচয় নেই, সে আগন্তুক, অনাহূত, উপদ্রব। লোকজনের মনে তার হয়তো কোনো নাম আছে, কিন্তু সেটি জানার উপায় নেই। সবাই কেবল তাড়িয়ে দেয়, কাছে ডাকে না। ভালোবেসে নাম দেবে তারপর সেই নাম ধরে ডাকবে—কে আছে এমন নরাধম! তাড়িয়ে দেওয়ার সময় লোকেরা খিস্তিখেউর করে, ‘ধুর, ধ্যাত, সর, যাস্শালা, ভাগ’, আরও কত কী বলে! ভাবটা এমন যেন, রাস্তা, ফুটপাত সবই তাদের বাপের সম্পত্তি, কেবল তারা নিজেরাই থাকবে জগতে, বাকিরা ভ্যানিশ হয়ে যাবে! এরা সেই গোত্রের যারা কয়েক হাত জায়গা-জমির জন্য ভাইকে, বাবাকে খুন করে! অমানুষ।

অতঃপর, বৃষ্টি…।

এত রাতে বৃষ্টিতে বসে আছে কবি ভাব লোকটা। মনরোর দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। সে কি সম্মোহনী শক্তির পরাক্রমশালী কেউ! মনরোর কেমন যেন বোধ হতে থাকে। লোকটার মধ্যে রকিবের ছায়া দেখতে পায় সে। রকিবের দাড়ি ছিল না, এই লোকের দাড়িগুলো সুন্দর, তবে পরিপাটি নয়। রকিবের মতো ভালো লোক দুনিয়াতে কমই আছে। এই লোক যদি ভালো কেউ হতো, নিশ্চয়ই রকিবের মতো করে এগিয়ে আসত, যেচে কথা বলত, খোঁজ নিতে পারত, তা না সে দূরে ধ্যানগম্ভীরভাবে বসে আছে! কথা না বলুক, অন্তত পাউরুটি, বিস্কুট, কেক খাওয়ার জন্য কিছু একটা অফার তো করতে পারে! ‘আমি কি হের গবেষণার মাল হয়া গেলাম নাকি!’—মনরো তাচ্ছিল্যের সঙ্গে এতটুকু ভাবতে পারে, তারপর জোর করে ভাবনায় ইস্তফা দিয়ে পলিথিনে জমা হওয়া বৃষ্টির পানি খেতে থাকে অপ্রকৃতস্থের মতো। অতঃপর একটু ঢেকুর, যার অনুবাদ: বৃষ্টির পানি চেটে খেতে মেলা স্বাদ!

দেশে কী যে শুরু হলো!

সকালটা আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে। কয়েক দিন ধরে কথায় কথায় মিছিল বের হচ্ছে, আজও ব্যতিক্রম ঘটে না। পুলিশের দৌড়ানি খেয়ে গলিঘুপচির মধ্যে ঢুকে পড়ছে ছেলেমেয়েরা! এই এলাকায় আন্দোলন ফান্দোলন মনে হয় বেশিই হয়। ভারী পেট নিয়ে মনরো গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকে ফুটপাতে, দেয়াল ঘেঁষে। যদি পারে দেয়ালে সেঁটে যায় সে, পোস্টারের মতো! পারে না। এত বড় ঢাকা শহর—ওর এতটুকু জায়গাতেও এসে লাগে হাঙ্গামার ঢেউ! দশটাও বাজে না, সকাল থেকে দৌড়াদৌড়ি, উত্তেজনা, পুলিশের গাড়ির সাইরেন, ইটপাটকেল, গুলির শব্দ, অ্যাম্বুলেন্স, স্লোগান! মনরো কিছুই বুঝতে পারে না। তার বোঝার কথাও নয়। সে রাজনীতির কচুটা বোঝে। রকিব তো এসব ব্যাপারে কোনো আলাপই করেনি কখনো! রকিব ভাবত, একটা চাকরি পাবে। সম্মানের চাকরি। এত দিনে তো ওর চাকরি পেয়ে যাওয়ার কথা! মনরো ওর সুখের দিনে পাশে থাকতে পারছে না, আফসোস! আফসোস, মনরোর সাজানো সংসারটা ভেঙে গেল গড়ে ওঠার আগেই। কে ভাঙল! কে?

কপাল!

কোনো শেষ কথা ছিল না! না ছিল শেষ দেখা! জলজ্যান্ত একটা মানুষ উধাও হয়ে গেল শহরের বুক থেকে! ম্যাজিক নাকি? কোনো মিডিয়া জানে না, রকিব কেন সে রাতে ঘরে ফেরেনি, কেন পরদিন ফেরেনি, কেন কোনো দিনও ফিরবে না। কেউ জানে না, জানলেও বলবে না, তা বুঝে গেছে মনরো। মনরোর সঙ্গে রকিব ইচ্ছা করে বিচ্ছেদ ঘটায়নি, ঠিক। তাই বলে, এত দিনেও একটা মানুষ ফিরবে না নিজের ঘরে? মনরো কত দিন অপেক্ষা করত! ওই এলাকার পরিচিত মানুষেরাও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চোখপাল্টি দিয়েছে। নিখোঁজের পরদিনই রকিবের ঘরে এসে ওঠে কয়েকজন, একেবার অচেনা। হয়তো পরিবার। মনরোকে ওরা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল, নো এক্সকিউজেস! মনরোকে বস্তির ত্রিসীমায় দেখলেই ওরা চেঁচামেচি করে, মারতে আসে! অনেকে এই ভেবে পর করে দিয়েছে যে রকিবের নিখোঁজ হওয়ার জন্য মনরোই দায়ী! কিন্তু বেলায়েত কাকাও কি এমনটা ভাবে? সে তো এখানে সেখানে খোঁজ নিয়েছে, থানা অবধি গিয়েও রকিবের হদিস বের করতে পারেনি। শেষে একদিন অনেক আলাপের ভিড়ে মনরোকে বেলায়েত চাচা বলেন, ‘রকিব রে তুই ভুইল্যা যা…’।

রকিব নেই, তবু প্রায়ই, গর্ভবতী হওয়ার আগেও, একটা আশার তরী বেয়ে ওই এলাকায় ছুটে যেত মনরো। চোখ পালিয়ে রকিবের ঘরটার দিকে তাকিয়ে থাকত, আশপাশ দিয়ে ঘুরঘুর করত, সুযোগ পেলে দরজার সামনের পেয়ারাগাছটার কাছে গিয়ে বসত, রকিবের ঘ্রাণ, স্পর্শ আর স্মৃতি খুঁজত। কিন্তু গত মাসে আগুনে সব শেষ। সব। বস্তি বলে কিছু নেই, সব ছাই। বেকার। সেদিন থেকেই স্মৃতিগুলো ঝাপসা হতে থাকে মনরোর। কাকে বলবে এত কথা! তত দিনে বেলায়েত কাকাও উধাও, তার ভাতের হোটেলটাও নেই! সেখানে এখন বড় বিল্ডিং উঠছে।

এত সব ভাবতে ভাবতে মনরোর মন হেসে ওঠে। কিন্তু পরক্ষণে ভাবে, আজকের সকালটা কেমন যেন, অশনিসংকেতময়। আবার ঝিমুনি আসে। এক ঘুমে দুপুর পার। অতঃপর মনে হয়, পেটে ব্যথা বাড়ছে, সঙ্গে খিদে। রোদের তাপ অসহ্য ঠেকে। মিছিলের হল্লা আসে, আবার যায়। বিজয় কি এসে গেল নাকি! আজ কেন যেন সবাইকে খুশি খুশি লাগে। একইভাবে সে দেয়ালে সেঁটে গিয়ে মিছিলের মানুষকে যেতে দেয়। এ খুশি যেন তারও, সে–ও আনন্দের ভাগীদার হতে চায়, কিন্তু নিয়তি তাকে অথর্ব করে ফেলে রাখে সেই জীর্ণ ফুটপাতে। অতঃপর আরেকটা বিজয় মিছিল আসে, এরপর আরেকটা। সে জানপ্রাণ দিয়ে দেয়ালে লেপ্টে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু এবার যেন জনস্রোতের তোড়ে সে ভেসেই যাবে, এত তীব্র সে স্রোত! হয় কি, কিছু একটা বুঝে ওঠার আগেই মনরোর মাথাটা প্রচণ্ড জোরে বাড়ি খায় দেয়ালের সঙ্গে, এরপর ছিটকে পড়ে সে মূল রাস্তায়, এবার যেন সে ফুটবল, কোথাও যেন রেফারি ঠিকই আছে, খেলাটা দেখছে! মনরো লোকের পায়ে পায়ে, রক্তাক্ত অবস্থা, একের পর এক মানুষের পায়ের তলায় সে পিষ্ট হতে থাকে, কেউ ভ্রুক্ষেপ করে না, স্লোগানে মুখর মানুষ, উত্তেজিত, উদ্বেলিত জনতা, মাটির দিকে তাকানোর অবকাশ নেই, উফ! এত বড় মিছিল যেন শেষই হয় না, মনরোর প্রাণ ওষ্টাগত, সে পিষ্ট হচ্ছে, পিষ্ট হচ্ছেই, এতক্ষণে পেটের বাচ্চাগুলোর বেঁচে থাকার কথা নয়, আঘাত লেগেছে মনরোর মাথা-কান-বুকে-হাড়-মজ্জায়, লম্বা জিবটা বেরিয়ে এসেছে, লেজটা শেষবার একটুখানি নড়ে উঠেছিল প্রায় এক মিনিট আগে, এরও কয়েক সেকেন্ড আগে মনরো পৃথিবীকে শুভবিদায় জানাতে নাকি ক্ষোভের স্বরে নিজের ভাষায় শেষবারের মতো একটা চিৎকার দেয়, যা মৃদু আর্তনাদ হয়ে ভিড়ের স্লোগানে মিশে যায়, যা কেউ শুনতে পায়নি…

‘ঘেউ’।