অলংকরণ: সারা টিউন
অলংকরণ: সারা টিউন

গল্প

মাৎস্য

মণ্ডলপাড়া মহল্লায় রাজা জ্যাঠার বাড়ি। ননীচরণ সাহা আর গীতারাণী সাহার এ বাড়িটার নাম ‘মধুগীতালি’। ননীচরণের ডাকনাম নাকি ছিল মধু। আহা, ননী-মধু; সব মিষ্টি মিষ্টি জিনিসের ছড়াছড়ি। তবে তামাম মহল্লায় অত তেতো লোক নাকি আর ছিল না। মহাযুদ্ধের পর ননীচরণ সাহা তাঁর বাড়ি বেচে দিয়ে চলে যান—আমাদের অনেকের নানা-দাদার মতোই রাজা জ্যাঠার পরিবার জিয়াগঞ্জ থেকে অপশন দিয়ে চলে আসে এপারে। বাড়িটার নাম তাঁরা বদলাননি। যে বয়সে আমরা ছেলেছোকরার দল, নেহাত আমসত্ত্বের কাক তাড়াতে হলে আমাদের ডাক পড়ে, কারখানার আমসত্ত্ব বা মিষ্টিকুমড়াসত্ত্ব তখনো বাজারে আসেনি, আমাদেরও বাজার পড়েনি তাই... সেই বয়সে রাজা জ্যাঠার আকর্ষণ ছিল অমোঘ। রাজা জ্যাঠার ভালো নাম রাজদুলারা। দেখতেও প্রিন্সের মতোই ছিলেন একদা, বসে থাকলেও দৈর্ঘ্য বোঝা যেত। বসার ঘরের চৌকিতে গরমের দুপুরে ঘুমিয়ে থাকলে দেখতাম রাজা জ্যাঠার ধবধপে পিঠের একটা পাশ গোলাপি-লাল হয়ে আছে রক্ত জমে। জেঠিমা মারা যাওয়ার পরে রাজা জ্যাঠা বড্ড ভেঙে পড়েছিলেন, একলা হয়ে গিয়েছিলেন। থামের মতো মস্ত স্বাস্থ্য ছিল তাঁর, অযত্নে গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল। বাড়িটায পুরনো বই আর পুঁথির মস্ত সংগ্রহ ছিল, বর্ষায় উই ধরে খাঁকরা হয়ে গিয়েছিল সেসব। অনেকগুলো ঘর ছিল বাড়িটায়, তালা দেওয়া থাকত। নোনা ধরা পাঁচিলের ভাঙা অংশে বের হয়ে পড়েছিল ইটের পাঁজা, হাতে থেবড়ে বানানো পাতলা গোল গোল ইট। ভেতরে কবেকার সাপ-বিচ্ছু থাকতে পারে। দেয়ালের ভিতের মাটি নাড়া দিলে পুরোনো মাটি থেকে কেমন কালো কালো গন্ধ উঠত। ওখানে গন্ধভাদালের মস্ত লতাটায় শরতে ফুল ফুটত। তখন তো মহল্লায় স্থানে স্থানে তালাবের কাজলমাজা চোখ তাকিয়ে থাকত, রাজা জ্যাঠা আমাদের শিখিয়েছিলেন—পুকুরে মাছ মরে ভেসে উঠলে সেটা গন্ধভাদাল মানে ভাদুল্যা পাতা দিয়ে রাঁধলে মাছের দুর্গন্ধ পাওয়া যায় না। বসার ঘরটা টালিছাত্তয়া ঘর, শীতকালে বেজায় ঠান্ডা পড়ত, গরমে উঠানের কাছের পলাশের ঝোপটা খাঁ-খাঁ লাল হয়ে উঠত। রহস্যময় একটি বাড়ি—আমরা বিকেল নাগাদ ভিড় করতাম ‘মধুগীতালি’তে, জ্যাঠা খুশি হয়ে উঠতেন। মাছ ধরার নেশা ছিল তাঁর, ভালোমন্দ রান্না করতেন, গান গাইতেন আর খুব চমৎকার গল্প বলতেন।

দারুণ শীতের একরকম সন্ধ্যা আসে না? মনে হয় না, ঘরবাড়ির জানালা-দরজা হুড়কো-খড়খড়ি সব আসলে আলগা, সব কটার ফাঁক গলে অবিরাম ঢুকে পড়বে আততায়ী শীত, শিকড়ের মতো রক্তান্বেষী? বিছানায় কাঁথাকম্বল গলে হিম জল-জল, যেন পেচ্ছাপ করে রেখে গেছে কেউ। বারান্দা কুয়াশায় ডুবে গেছে এমন। মনে হয় ধূপ জ্বালিয়ে ধোঁয়া দিয়েছে সরকার, সেই ধোঁয়াতে আকাশে প্রাচীন উপগ্রহটিও ডুব মেরেছে। সে রকম এক সন্ধ্যায় বেতের মতো কাঁপতে কাঁপতে মোটা পাঁচ ব্যাটারির টর্চ হাতে করে মাফলার মুড়ি দিয়ে হেঁটে চললাম রাস্তায়, মাঠে কারা খড়কুটো দিয়ে আগুন জ্বেলেছে দেখলাম। পাড়াগুলো এমন নাক ডেকে ঘুম মারছে যেন আর কোনো দিন মাংস রান্নার গন্ধে জেগে উঠবে না। পথের কুকুর শুধু গেঁয়ো দফাদারের চোখে আমাদের দেখে ডেকে উঠল, প্রগাঢ় সন্দেহে। অ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ, পড়ার টেবিলে হাজিরা দেওয়ার দায় নেই আর। ছেলেপুলে ঘরে নেই টের পেলে আব্বা দুই ঘা দিতে পারেন, কিন্তু আম্মা বাঁচিয়ে দেবেন নির্ঘাত। রাজা জ্যাঠার বাড়িতে যাচ্ছি বলে এসেছি আম্মাকে। আমাদের মা-কাকি-ফুফুরা রাজা জ্যাঠাকে ভালোই বাসতেন, নামেই তো জ্যাঠা, মায়েদের ভাসুরদের কি শ্বশুরদের চেয়েও বড় হবেন রাজা জ্যাঠা। জেঠিমা মারা যাওয়ার পর বাড়িতে ভালোমন্দ কিছু রান্না হলে প্রায়ই আমাদের বরাত দিয়ে পাঠাতেন আম্মা। জ্যাঠা হয়তো মনে মনে খুশিই হতেন, কিন্তু অন্নদাস হয়ে পড়ার ভয়ে প্রকাশ করতেন না।

সেই বয়সে রাজা জ্যাঠার আকর্ষণ ছিল অমোঘ। রাজা জ্যাঠার ভালো নাম রাজদুলারা। দেখতেও প্রিন্সের মতোই ছিলেন একদা, বসে থাকলেও দৈর্ঘ্য বোঝা যেত। বসার ঘরের চৌকিতে গরমের দুপুরে ঘুমিয়ে থাকলে দেখতাম রাজা জ্যাঠার ধবধপে পিঠের একটা পাশ গোলাপি-লাল হয়ে আছে রক্ত জমে।

সেদিন সন্ধ্যায় দরজা খোলা রেখেই জ্যাঠা গলা সাধছিলেন। প্রায়ই বলতেন, ‘ঠিক যেখানে বসলে আমার গলা পর্যন্ত দরিয়ার পানি থাকবে, সেখানে গিয়ে বসে পড়তাম, এরপর গলা থেকে শব্দহীন আওয়াজ বের করাই ছিল আমার রেওয়াজ।’

শামীম জিজ্ঞাসা করেছিল একবার, ‘রিচার্ড বার্টনের মতো? তিনি নাকি সমুদ্রের আওয়াজের সঙ্গে মিলিয়ে ভয়েস প্র্যাকটিস করতেন?’

জ্যাঠা সপ্রশংস দৃষ্টিতে শামীমের দিকে তাকিয়ে হেসেছিলেন, বলেছিলেন, ‘হায়, কোথায় রানী ভবানী, কোথায় বিছানামুতুনি!’

অন্য যেকোনো মানুষ যেসব মন্তব্য করলে আমাদের ড্যাপো বলত, বেয়াদব (ফজল-এ-রব থেকে বঞ্চিত) ডাকত, জ্যাঠা সেসব বললে বিরক্ত হতেন না মোটেই। যাহোক, আমি, শামীম, হাসিব, শোভন আর মুক্তি গিয়ে বসেছিলাম জ্যাঠার বৈঠকখানায়। সন্ধ্যা থেকেই বিজলিবাতির আলো ছিল না, একটা হারিকেন জ্বলছিল মেঝেয়। বদ্ধ ঘরে দেয়ালের দিকে মুখ করে চৌকিটার ওপর বসে বহুক্ষণ সুরসাধনা করলেন রাজা জ্যাঠা। শেষ হওয়ার পর আমাদের মনে হলো শার্টের কলারে আর কানচাপা চুলে যেন বিন্দু বিন্দু পানি জমে আছে, ঘরের ভেতরও নিয়র পড়ছে নাকি! টালি-খসা ছাদ হয়তো!

চায়ের সরঞ্জাম বরাবর গোছানোই থাকত, খোদ ননী মণ্ডলের ফেলে যাওয়া বিলাতি ফুলতোলা কাপ-ডিশ। চা আর টাটকা ভাজা মুড়ি এনে দিলেন রাজা জ্যাঠা। মুক্তি এক খাবলা মুড়ি চিবোতে চিবোতে জিজ্ঞাসা করল, ‘আজ আপনি কী গাইলেন জ্যাঠামণি?’

জ্যাঠা খানিকটা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে কবজির ঘড়িটার ডায়ালের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, হারিকেনের আলোয় তাঁর মাথার মস্ত ফুলকপির আকারের ছায়া পড়েছিল দেয়ালে।

শোভনও যোগ দিল, ‘জ্যাঠামণি, এই কালোয়াতি গান আপনি কোথায় শিখলেন?’

জ্যাঠা নিঃসন্তান মানুষ, গ্রামসম্পর্কের একটি মেয়েকে পালতেন, নাম লোটন। লোটন কুপী জ্বালিয়ে রান্নাঘরে বেগুনি ভাজছিল। ভাদুল্যাপাতা বেটে খেসারির ডালের বড়া, গরমাগরম নিয়ে এল। পরপর দুটো প্রশ্ন করে ফেলেছে ছেলের দল, রাজা জ্যাঠা রা করেননি, এমন অবস্থায় চুপ করে থাকাই শ্রেয়। খেয়ালি লোক, হয়তো মুড না থাকলে ঘর থেকে বের করে দিতে কসুর করতেন না। কিন্তু কথা কয়ে উঠলেন জ্যাঠা, ‘ভাজিবার মতো ভাওরেণ্ডাও যখন গ্রামে আর জুটিল না—এটা বনফুলের একটা গল্পের প্রথম লাইন ছিল বুঝলি? তা ভাজিবার মতো ভাওরেণ্ডা গ্রামে তখন এমনিতেও জুটিত না। আমাদের মোগল আমলের পাটোয়ারী বংশ, বাদশাহ বহুদূরে থাকেন তো কি, তাঁর আঁকশি আছে গ্রামে গ্রামে—রাজস্বের নির্ভুল হিসাব চলে যায় তাঁর দরবারে। তারা গ্রামে ঢুকলে ভয়ে চাষার ব্যাটার মুখ শুকিয়ে যেত, খাজনা তো পাই-পাই হিসাব করে তুলবেই, কোথায় কোন পুঁটুলিতে চাষার জমানো ধন আছে, সেই ইঁদুরের খুদকুঁড়োটুকুও নিয়ে যাবে, ভাওরেণ্ডা ভাজাও নিয়ে যাবে। কর্নওয়ালিশের আমলে পাটোয়ারীর দপ্তর গুটিয়ে দিল গোরারা। চোখের নিমেষে আন-বান-শান চলে গেল পাটোয়ারীদের। ওই থাকার ভেতর ভাঙা ইমারত, মাজা পুকুর আর সীমাহীন গর্ব। ওসব দিয়ে তো আর জীবন চলবে না। আমার বাপকে তাঁর বাপ পড়ালেখা করালেন, বউবেগমের গায়ের সোনার গয়না বেচে এলএমএফ ডাক্তার বানালেন। বাপ থাকত দেওয়ানবাড়ির আশ্রিত ডাক্তার হিসেবে। জন্মের পরপর আমি খুব ভুগেছিলাম। লোকে বলত, বংশে অভিশাপ আছে। পাড়াগাঁয়ে তখন বিস্তীর্ণ প্রান্তর, দুধ-মাখনের স্বাদ ভালো, আব্বার মন বসতে সময় লাগল না, আমারও শরীর ফিরতে দেরি হলো না। আর আমার... যাকে বলিস ওই কালোয়াতি গান—ওই দেওয়ানের আশ্রয়ে থাকতে ওটায় রুচি হলো, গান্ডা বাঁধলাম, শাগরেদ হলাম।’

হাসিব একটু বোকাটে, সে আচমকা বলে বসল, ‘মাছ ধরা শেখাও কি ওখান থেকে শুরু?’

জ্যাঠা জবাব দিতে যাবেন, উত্তরের ঘর থেকে কে বা কারা কোঁ কোঁ করে উঠল—‘হাড্ডির খিল খুইলা গেল গিয়া!’

কোঁকানি শুনে আমরা হাসলাম, জ্যাঠাও মুচকি হাসলেন।

গায়ে গায়ে ঘর, পাড়াগাঁয়ের ছোঁয়া যায়নি মহল্লার গা থেকে, এবাড়ির-ওবাড়ির কথা দিব্য শুনতে পাওয়া যেত। জ্যাঠা বললেন, ‘আগে ভেবে দ্যাখ কিসের গল্প শুনবি। রাজরাজড়ার নাকি নিকিরির পোয়ের।’

‘রাজা-বাদশার গল্প তো আমরা আকছারই পড়ি, সুলতানি আমলের ইতিহাস পড়তে পড়তে জীবন গেল। মাছ ধরার গল্পই বলেন জ্যাঠা।’

শামীম আবদার করল। লোটন উনুনের পাড় থেকে এসে বসেছিল জ্যাঠার পায়ের কাছটায়, ওর গায়ের জামাকাপড় থেকে বেগুনপোড়ার গন্ধ বের হচ্ছিল।

‘আমার মাছ ধরার শুরুও জমিদারবাড়িতে থাকাকালীন বছরগুলোতে। দেওয়ানবাড়ি মহারাজপুরে। আশেপাশে বেশ কয়েকটা বর্ধিষ্ণু গ্রাম। রাধাতলা। আডিয়ালপুর। ধপধপিয়া। মুকসুদপুর। ওই যে শুনিস আগের দিনে ডাকাত আসত রণপা চড়ে, ঢেঁকি দুলিয়ে সদর দরজা ভাঙত, সে রকম সময় তখনো কাটেনি। ডাকাত পড়লে নগদ টাকা, বাদশাহি মোহর, গয়না না শুধু, ঘরের দামি দামি বাসনকোসন নিয়ে যেত, সোনার জরির কাজ করা বিয়ের বেনারসিটাও নিত। এরপর বহুকাল ধরে সেসব গল্প লোকের মুখে চলত। এমনিতে গ্রামে চোরের ভয়ই বেশি ছিল। চোর কিছুই ফেলে যেত না, কাঁথাকানিটাও তুলে নিয়ে যেত। তবে এমনিতে আমাদের গ্রামজীবন ছিল শান্ত, নিস্তরঙ্গ। দেওয়ানবাড়ির প্রতাপ ছিল সাংঘাতিক। বাঘে-মহিষে এক ঘাটে একবারে। কয়েক গ্রাম দূরে একটা গ্রামের নাম জালশুখা, সেখানকার মুসলমান নিকিরির দল মাছ বেচতে গঞ্জে আসত। বয়সের তুলনায় আমি হাত-পায়ে বড়সড় ছিলাম, দুরন্তও ছিলাম। আব্বা আমাকে খড়মপেটা করেও শাসন করতে পারতেন না। দেওয়ান সাহেবের হাভানা চুরুট চুরি করে টান দিয়েছিলাম। দুই হাতে লিখতে পারতাম আমি। হরবোলার মতো ডাকতে পারতাম। আর... সুযোগ পেলেই চলে যেতাম জালশুখার জাউল্লাপাড়ায়। দেখতাম, সন্ধ্যায় ইলিশের তেলের প্রদীপ জ্বালিয়ে জালশুখার জেলেরা কী গভীর মনোযোগে জাল বুনছে। তেঁতুলগাছে জেলেদের ছেলেরা বড় বড় জাল শুকাতে দিত, দূর থেকে দেখতে লাগত যেন ডাইনি চুল লুটিয়ে বসে আছে। ওরা গাব জ্বাল দিয়ে আলকাতরা বানাত, আমিও ওদের সঙ্গে মিশে নৌকা উল্টে আলকাতরার রং করতাম। সাঁতরাতাম তো কুমিরের মতো ডুবসাঁতার, নদী এপার-ওপার করতে সময় লাগত না। একবার দামের তলায় আটকে পানিতে ডুবে মরতে গিয়েছিলাম, এরপর হাঁপানির অসুখ শুরু হলো। আব্বা খুব কপাল চাপড়ে কান্নাকাটি করলেন—এত লম্বা চওড়া ছেলে তাঁর হাঁপানির রোগী হয়ে গেল!

দেওয়ানবাড়ির প্রতাপ ছিল সাংঘাতিক। বাঘে-মহিষে এক ঘাটে একবারে। কয়েক গ্রাম দূরে একটা গ্রামের নাম জালশুখা, সেখানকার মুসলমান নিকিরির দল মাছ বেচতে গঞ্জে আসত। বয়সের তুলনায় আমি হাত-পায়ে বড়সড় ছিলাম, দুরন্তও ছিলাম। আব্বা আমাকে খড়মপেটা করেও শাসন করতে পারতেন না।

‘দেওয়ান মন্নাফ গাজী আব্বাকে ডেকে বললেন, “এই ছেলে দীর্ঘায়ু হবে, মরতে মরতে মরবে না, এ আমি বলে গেলাম। ডাক্তার তুমি কান্নাকাটি কোরো না।” দেওয়ান সাহেবের দিব্যদৃষ্টি ছিল, লোকে বলত, তিনি নির্ভুল ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন। তা বাপের মন কি আর প্রবোধ মানে! পানিতে নামা বন্ধ করতে আব্বা বদ্ধপরিকর। আমি শেষমেশ বাপকে বোঝালাম, “তাহলে মাছ মারব, তীরেই বসে থাকব, জলে নামব না, তাতে আপনি খুশি?”’

শামীম একটু হতাশ হলো, বলল, ‘এককথায় সাঁতার ছেড়ে দিলেন? এখন যে বলে সাঁতরালে হাঁপানি কমে?’

‘এখন লোকে অনেক বেশি জানে, বিজ্ঞান বোঝে। তখন তো আর তেমন ছিল না। লোকে বলত আমি পরি দেখেছিলাম, তাই কেশরদামে ভরা পানিতে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছিলাম।’

‘দেখেছিলেন, পরি?’ আগ্রহভরে জিজ্ঞাসা করল লোটন। অন্ধকারেই আঙুলের আন্দাজে নিজের বিনুনি খুলে আবার বাঁধছিল সে। জ্যাঠামণি আবার কবজির ঘড়িটার নীল ডায়ালের দিকে চেয়ে রইলেন খানিকক্ষণ।

‘একটা মেয়ের চেহারা আমার মনে পড়ে। সম্ভবত কারও সাপে কাটা লাশ। মাথাভরা চুল। কিন্তু ঝাঁপ দিয়ে পড়ার ওই সময়টার আগেপিছে খানিকটা সময় আমার একেবারে মনে পড়ে না। আমি বহুবার চেষ্টা করেও মনে করতে পারিনি। যাহোক। পানিতে নামা বন্ধ হলো। কিন্তু পানির আকর্ষণ আমার জীবন থেকে গেল না।’

বেগুননিতে একটা কামড় দিয়ে জ্যাঠা যেন একটু বিরক্ত হলেন, লোটনকে বললেন, ‘মায়ের কাছে অত থাকলি তবু মায়ের মতো আর পারলি না! তোশকের মতো মোটা বেগুনি!’

বেগুননির আর দোষ কী, শীতে নেতিয়ে পড়েছে। জেঠিমা আত্মঘাতী হয়েছিলেন বলে আমরা কেউ তাঁর প্রসঙ্গ তুলতাম না, জ্যাঠা-ই কোনো কোনো কথায় জেঠিমাকে স্মরণ করতেন। লোটন একটু গুটিয়ে গেল যেন, গায়ের শালটা গায়ে আরেকটু জড়িয়ে নিল। এমনিতে ওর গুণের শেষ নেই। ঘুড়ি উড়াতে পারত আমাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। মানসাঙ্কে এমনকি আমাদের ফার্স্টবয় শামীমও ওকে জুতমতো পরাস্ত করতে পারত না। মজা-পুকুরে বড়শি ফেলে বসে থাকত, লোকে বলত ভূতের আছর আছে ওর ওপর। জ্যাঠামণি শুধু শুধু খিটখিট করতেন ওর সঙ্গে। অবশ্য আমরাও কম খারাপ ছিলাম না। লোটনের মাথাটা শরীরের চেয়ে বড় ছিল বলে ওকে আমরা ‘ভালগার ফ্র্যাকশন’ ডাকতাম।

‘আমাদের সময় অল্প বয়সে বিয়ে হতো তোরা জানিস? তোদের জেঠিমণির বয়স তখন তেরো। ডাকনাম সুরেফা। নতুন শ্বশুরবাড়ি জামালপুর।’

মুক্তি বলে উঠল, ‘আমার বোনের শ্বশুরবাড়ি জামালপুর, ইসলামপুর থানা, দুরমুঠ গ্রামে। তিস্তা এক্সপ্রেসে সকালের ট্রেনে উঠে লাইনের শেষ স্টেশন দেওয়ানগঞ্জ বাজার...’

‘আমি যখনকার কথা বলছি, তখন তিস্তা এক্সপ্রেস নেই। নীলকুঠিগুলোর ধ্বংসাবশেষ তখনো বহাল আছে। যমুনার ভাঙনে তখন গ্রামকে গ্রাম শেষ হয়ে যাচ্ছে ওদিকটায়। সুরেফাদের গ্রামেরও একই দশা। কাছাকাছি নামকরা সুগার মিল আছে। চারদিকে এক শ একরের মতো এলাকা শুধু বিল। অথচ একদিন ওসব ছিল খরাপ্রবণ এলাকা। গরমে খাঁ খাঁ করত। বিশাল মাঠ ছিল, নামটা সুন্দর—নাড়াবতীর মাঠ। মাঠে নাড়াপোড়া আর এদিক-ওদিকে বনখেজুরের ঝোপ। কখনো ফসল ফলত নিশ্চয়ই, নামের ভেতর নাড়া আছে যখন। আগাছাও জন্মে না, এমন নিষ্ফলা জমি। কবে নাকি লোনাজল ঢুকে জ্বলে গিয়েছিল ফসলি জমি, এরপর থেকে ধুধু মাঠ শুধু।’

‘লোনা পানি কোত্থেকে এল? সমুদ্র তো বহুদূরে!’ শোভন জিজ্ঞাসা করল।

‘কে জানে, লোকমুখে শোনা গল্প। শেষে এক কামেল পীর এলেন ইসলাম প্রচার করতে, হাতে কাঁসার থালা। জমিদারকে ডেকে বললেন, আল্লাহপাকের হুকুম হলে এখানেও পানি পাবে। মসজিদের জন্য চার খণ্ড জমি আর পুষ্করিণীর জন্য এক শ একর নিচু ডাঙা বরাদ্দ করা হলো। পীর সাহেবের হুকুমে জমিদারবাবু নিজে কাঁসার থালাটি হাতে করে নেমে এলেন খুঁড়ে রাখা বিলের সবচেয়ে গভীর জায়গায়। দুইখানা থান ইটের ওপর থালা বসিয়ে চলে এলেন। পরদিন সেখানে হাঁটু পানি উঠে গেল, এর পরের দিন গলা পানি। আর কোনো দিন সেই বিলের পানি শুকায়নি, অথচ নদীর সঙ্গে এর যোগ ছিল না। যাহোক, পীর-ফকির-আউলিয়া-দরবেশের এমন সব চমকপ্রদ কাজের কথা বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামেই চালু আছে। ওখানে মাছ ধরতে গিয়ে একবার একটা ঘটনা ঘটেছিল।’

অলংকরণ: সারা টিউন

আমরা নড়েচড়ে বসলাম, কখন থেকে পাঁকাল মাছের মতো আকুলিবিকুলি করছে ভেতরটা। লোটন এক পেয়ালা চা নিজের জন্য ঢেলে নিল, তার কবজির কাছে দুই গাছা কাঁচের চুড়ির রং দেখলাম নীল।

‘তার আগে বলে নিই, মহারাজপুরের দেওয়ানবাড়িতে থাকাকালীন আমার মাছ মারার তীব্র নেশা দেখা দেয়। শুরুটা খুব সাধারণ। শর্ষের খৈল দিয়ে ভেতরবাড়ির পুকুরের পানিতে চুল ধুত বাড়ির বউ-ঝিরা, সন্ধ্যাবেলা সেই খৈল হাঁ করে গিলে খেত পুকুরের তেলাপিয়া। ওই পুকুরের এক পাশে ধানের তুষ জড়ো করে রাখা থাকত, মাছ ওসব খেতেও আসত, আমরা ঘাটে বসে টের পেতাম। ঘাটের কাছে সিঁড়ির ধাপে তিরতির করত চিংড়ি মাছ। পুকুরভরা মাছের ফিসফিস—বেচা, খলসে, ভাঙন, কলমিলতার আড়ালে রাক্ষুসে শোল মাছ কমলা রঙের পোনা ছাড়ত বৈশাখে। টাকি মাছের পোনা সোনালি রঙের ওপর কালো ডোরা। পুকুরে ডুব দিতে গিয়ে গ্যাংটুর পিঠের কাঁটা পুরোটা পায়ে ঢুকে যেত—বিষকাঁটালি খুঁজতাম আর ব্যথায় চেঁচাতাম।

এক কামেল পীর জমিদারকে ডেকে বললেন, আল্লাহপাকের হুকুম হলে এখানেও পানি পাবে। মসজিদের জন্য চার খণ্ড জমি আর পুষ্করিণীর জন্য এক শ একর নিচু ডাঙা বরাদ্দ করা হলো। পীর সাহেবের হুকুমে জমিদারবাবু নিজে কাঁসার থালাটি হাতে করে নেমে এলেন খুঁড়ে রাখা বিলের সবচেয়ে গভীর জায়গায়।

‘একটু বড় হতেই খাঁচি বোঝাই করে গাঙের মাছ মেরে আনতাম, আম্মা খুব বিরক্ত হতেন। অত মাছ কে কুটবে, কে রাঁধবে, কে শুঁটকি দেবে! বিলভরা তখন মাছ। রাতে  পানিতে একাকার ধানখেত-পাটখেত আর বিলবিল, চকচকে দা হাতে চলে যেতাম। অনেক রাত পর্যন্ত মাথার ওপর নুড়ি জ্বালানো মশাল ধরে মাছ মারতাম। শোল-শিং-মাগুর-টাকি। পাটখেতের কাদায় একেবারে অপেক্ষা করে থাকত অলস মেনি মাছ। আলো ধরলে আলোর নিচে মাছ এসে জড়ো হয়ে বিড়বিড় করত, ল্যাজা ছাড়া কিছুই নাচন দেখা যেত না তখন, খড়কুটোর নুড়ি বাঁশের আগায় বেঁধে জ্বালানো মশাল—সে মশালের লাল আলো মাছদের কোনো এক আলেয়া দেখাত—তারা নড়ত না। মশালের আলোতে আমারও নেশা লাগত—মনে হতো পানির তলায় পাতালরাজ্য দেখতে পাব। বিলবিলে তখন ভূতে ধরত, আমাকেও, মাছদেরও। কেউই সেই টান কাটাতে পারতাম না।’

আমি ত্যানা হয়ে যাওয়া বেগুনি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললাম, ‘খেতেন না, তবু ধরতেন?’

‘তোর কি ধারণা যে বাঘশিকারি সে বাঘের মাংসের কালিয়া খাওয়ার জন্য ধরে? শিকার একটা নেশা, শখের তোলা। আর জিয়ল মাছ দিয়ে কমিয়ে মাসকলাইয়ের ডাল রাঁধতেন আমার আম্মা, সঙ্গে নিজ হাতে তোলা ঘি। দেওয়ানবাড়ির বেগম সাহেবা খুব ভালোবাসতেন সেই রান্না। নিজেরা পোলাও-কোর্মা খাওয়া লোক তো, পূর্ব বাংলার আদি রান্না হয়তো অন্য রকম ভালো লাগত। ওভাবেই কথায় কথায় আমার মাছ মারার গল্প করেছিলেন আম্মা। ছোটতরফের কুমারের নাম ছিল আশরাফ দেওয়ান। আশরাফের ছিল বিলাতি গ্লাস ফাইবার রড, হুইল-টুইল, তার সঙ্গে মাছ ধরতে যেতে যেতে অনেক কিছু শিখে গেলাম। পিঁপড়ার ডিম, ঘিয়ে ভাজা বেসন, নারকেল তেল ও পাউরুটি মিশিয়ে কেমন করে লাড্ডু মানে টোপ বানাতে হয়। পানির নিচ দেখা গেলে ওই লেদ টোপ, আর নিচটা অপরিষ্কার থাকলে ভাসা টোপ। পানিতে কোনো সুতা অদৃশ্য হয়ে থাকে...’ বলতেই থাকলেন রাজা জ্যাঠা। আমরা যেন কঞ্চির ছিপ ফেলে পানাপুকুরে বসে থাকা বালক, আমাদের চমক লেগে গেল।

‘সবুজ অনর্গল সবুজ গ্রামবাংলার সেই ধানখেত, তার ওপর দিয়ে শর শর শব্দ করে সরে যাওয়া বাতাসও যেন সবুজ। সেচের নালায় ছায়া পড়েছে সবুজের—ওটাও বহমান সবুজ। ঘন গোছের ভেতর লুকিয়ে পড়েছে যেন সরু সিঁথি। লাল লাল শোলের পোনা সেই প্রগাঢ় সবুজ পানিতে ঝিকিয়ে উঠে গুম হয়ে যায়। ধানখেত বিলের পানিতে সয়লাব, কার কোথা সীমা বোঝার উপায় নেই। ট্যাঁটা হাতে বিলপাড়ের ঝোপে ঘাপটি মেরে বসে আছে চাষার পো বুরুজ, শোল-গজার মারবে। তার সঙ্গ ধরেছি আমি। হয় বুরুজ নয় আশরাফ গাজী, আমি তাদের পাছে পাছে সারা দিন মাছ ধরার তালে আছি। এমনই নেশা।

‘যে বিলটার কথা তখন বলছিলাম, সেটার নাম নাড়াবতীর বিল। পীর বাবার মাজারের ধার ঘেঁষেই বিল। কিছু কিছু জায়গা ছাঁটা ফেলা, ওসব মাছেদের অভয়াশ্রম, জাল ফেলা যায় না। জলের কাছে ঢোলসমুদ্রের বড় বড় পাতা ছেয়ে থাকে। তা প্রথম দিন দাদাশ্বশুরের বাড়িতে গিয়ে বিল দেখেই আমার মন নেচে উঠল। পথশ্রমের ক্লান্তিটা ভুলে গেলাম। সূর্যাস্তের আকাশে সোনার আলো ঝাপসা হয়ে গেল, সন্ধ্যার অন্ধকার ছানির মতো ঘনিয়ে তুলল চারদিক। বাড়ির পিছে মস্ত বাঁশঝাড়ে প্রচুর পাখি। আমার শালা আজীজ আর লতিফের সঙ্গে মিলেমিশে মার্বেল কিনলাম, প্যান্টের রাবার দিয়ে গুলতি বানালাম। বাঁশবাগানে একটা প্যাঁচা দেখলাম দিঘলায় আমার অর্ধেক। গুলতি তাক করে মারলাম, সারা গাছ ঝাড়া দিয়ে নাড়িয়ে প্যাঁচাটা উড়ে গেল—পাত্তা দিল না। কাচারিঘরটা তালাবদ্ধ থাকত সারা বছর। উঠানে একটা মরাটে আপেলগাছ, কোনো দিন নাকি ওটাতে আপেল ধরেনি কিন্তু ওটা আপেলগাছ। সুরেফার দাদা একসময় চেয়ারম্যান ছিলেন, অবস্থাপন্ন বাড়ি। তার ওপর নতুন জামাই গেছি। দাদিশাশুড়ি হেন জিনিস নেই রাঁধেননি। তেলতেলে বজুরি-চ্যালা-ট্যাংরার চচ্চড়ি, শীতের বিলের টাকি মাছ পোড়া, নদীর খোলা পানির তরতাজা সিলন মাছ ভুনা, কাদার রিঠা মাছ—আলু-বেগুন দিয়ে মাখা মাখা করে রাঁধা। কই মাছের ঝোল, আর পাঁচসেরি আইড় মাছ। জানতেন আমি মাছ ভালোবাসি।’

মুখে নাল-ঝোল টানলেন যেন রাজা জ্যাঠা।

‘অত মাছ একবারে খাওয়া যায় নাক?’ শোভন জিজ্ঞাসা করতেই অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকালেন তিনি।

‘রাতের খাওয়া সেরে বিড়ি খেতে বের হলাম। জাইল্লা নসুকে নিয়ে টুল পেতে মামাশ্বশুর ছিপ ফেলেছেন বিলে। দুই সেরি রুই ধরা পড়েছে একটা। মামারটা ভাসা টোপ, সিঙ্গেল কাঁটা বড়শি, আমিও খানিকটা দূরে গিয়ে বসলাম আট কাঁটা বড়শি নিয়ে। আমার টোপটা পানির নিচে গিয়ে পড়ে থাকল। চারদিক সুনসান। আমার পিছে বাজে পোড়া একটা শিমুলগাছ, এরপর অড়হর ডালের খেত, ফসলি ইঁদুরের গর্ত। তার পিছে উঁচু ভিতির ওপর তালেব মিলিটারির বাড়ি, উনি ইপিআরে কাজ করতেন একসময়। বাড়িটায় তখন আর কেউ থাকে না। আঙিনায় মস্ত ছাতিমগাছ, আশ্বিন-কার্তিক বলে চারদিক মাতোয়ারা করে দিচ্ছে ছাতিম ফুলের ঘ্রাণ। বিকালবেলায় আমরা দেখেছিলাম—তালেব মিলিটারির বাড়িটার আশেপাশে বিশাল কয়েকটা তেঁতুল-শ্যাওড়া-মহানিমের গাছ, বিকেলের রোদেও কালচে হয়ে থাকে ওদিকটা। জঙ্গলের ভেতর দৈত্যের দাড়ির মতো বটের মূল। চারদিকে তোষাখানার মোহরের মতো ঝমঝম করছে ঝিঁঝিঁ, ব্যাঙ গেছে শীতনিদ্রায়। অদেখা সুন্দরীর চুড়ির আফসানের মতো জ্বলছে পোকার রং।’

লোটন একটু নড়েচড়ে বসল। রাজা জ্যাঠার কাব্য করার ব্যারাম সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। ‘টু হুম ইট মে কনসার্ন’-এর অনুবাদ করেছিলেন তিনি—‘যে জনে বর্তায়, সে-ই যেন মাথে গায়।’

‘আমাকে বসিয়েটসিয়ে দিয়ে জাইল্লা নসু বলে গেছে, “দুলাভাই, কোনো সমস্যা আইলে ডাইকেন।” কিছুক্ষণ পরে শুনি পেছনের তুলাগাছে কটকট আওয়াজ হচ্ছে। শীতের আমেজ চারদিকে, বাতাস নেই। লাইটার তুলতে গিয়ে দেখি একটা হলদে-কালো চক্রাবক্রা জলঢোঁড়া। নির্বিষ পাইন্যা সাপ, ভয় পেলে ফণা তুলবার ভান করবে—ওটুকুই যা। সাপটাকে অন্ধকারে হঠাৎ দেখে একটু চমকে গিয়েছিলাম, বুকে সামান্য চাপ লেগেছিল। সরসর করে শব্দ হলো শুকনো পাতার ওপর। এরপর অনেকক্ষণ আর কোনো শব্দ নেই। আরেকটা বিড়ি ধরাব, শুনি একটা গুনগুনিয়ে কান্নার আওয়াজ আমার পেছন থেকে সামনের দিকে এগিয়ে আসছে, উড়ন্ত মশার শব্দের মতো শব্দটা চলমান। এরপর আবার সব চুপ। খটখটে ডাক—ওয়া আআআআআআ আ। কিছুটা এগিয়ে আসে আবার পিছিয়ে যায়। এবার শব্দটা থামতেই হাতেম কাকার গলার আওয়াজ পেলাম। বিকেলেই পরিচয় হয়েছিল। এলাকার নামকরা জেলে ছিলেন, একবার ভোর চারটায় গভীর যমুনায় দাউন বড়শি পেতেছিলেন, শত শত বড়শির মাথায় কেঁচোর টোপ গাঁথা, বিশটা বড়শির পর একটা করে থান ইট... বাগাডু ধরবেন। অর্ধেক দাউন পাতার সময় বড় ছেলেটাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল নদী। পরে যমুনার চরে পাঙাশ আর ছেলে দু-ই মরে ভেসে উঠেছিল। কাছে এসে হাতেম কাকা সামান্য সময় দাঁড়িয়ে রইলেন। এরপর ব্যস্ত হয়ে বললেন, এভা ছুভো মাছ নিয়া আহি, বোয়াল ধরমু। ছেলে যাওয়ার পরে হাতেম কাকা তো আর মাছ ধরেন না শুনেছি, হয়তো নেশা এভাবেই ডাক দেয়! মিনিট পাঁচেক পর কাকা একটা তেলাপিয়া মাছ এনে আমার হাতে দিয়ে বললেন, জামাই, সামনের দিকে তাকায়ে মাছটা পাছে ফিক্কা মারেন।

‘এলাকায় এলে স্থানীয়দের কথা শুনতে হয়, তেলাপিয়া মাছটা ছুড়ে দিতেই কান্না বন্ধ হয়ে গেল। হাতেম কাকা ভেন্নার বিচির মতো দাঁত বের করে বললেন, মাছটা ফেলনের পরে আর কোনো আওয়াজ পান? পান না? ওই গুনগুন আওয়াজ পেত্নীর। সাবধানে খেইলেন। তা পেত্নী যাওয়ার পরপরই নিঃশব্দে উড়ে এল বিকেলের বিশাল প্যাঁচাটা, গিয়ে বসল তুলাগাছের মাথায়, গুনগুন করে উঠল। পাতাকাঠি ডুবে গেল, সঙ্গে সঙ্গে টান দিলাম। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট আমাকে খেলালো মাছটা, ঘামে ভিজতে ভিজতে ধরলাম একটা সাড়ে চৌদ্দ সের ওজনের কাতল মাছ। বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর হইচই করে অত রাতে সেই মাছ কাটা হলো, কিছু ভাজা হলো, কিছু ঝোল হলো—ওই ঝোল সকাল নাগাদ জেলির মতো চাড়ুড় বেঁধে যাবে—ওটা দিয়ে ভাত খাবে সবাই। হাতেম কাকা আমার মামাশ্বশুরের সঙ্গে খুব হাসাহাসি করলেন—‘জামাই পেত্নীর কান্না শুনে চিনতে পারেনি বলে।’

মুক্তি আর থাকতে পারল না, ‘জ্যাঠা, ওটা আসলেই পেত্নী ছিল নাকি?’

‘দূর দূর! যত্তসব রাবিশ। মেছো বিড়ালের কান্নার আওয়াজ হবে হয়তো। তোদের মায়ের বাড়ির দিকে ওটাকে বাঘডোল বলে। গাঢ় হলুদ আর ধূসর ঘন পশম, কানের পিছে সাদা ফুটকি। বাড়ির বিড়ালের চেয়ে আকারে বড়। সাঁতারে দড়। জলাজমিনে থাকে, চিতাবাঘ ভেবে পিটিয়ে মারে মানুষ।’

‘ভূত দেখেননি কখনো?’ শামীম জিজ্ঞাসা করল।

প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলেন রাজা জ্যাঠা, লোটনকে বললেন, ‘আরেকটু চা দে আমাকে।’

‘রাতে কাচারিঘরে বিছানা পাতা হলো, এ ঘরে একা থাকতে পারবে না কেউ। হানাবাড়ি হিসেবে নাকি বাড়িটার এমনিতেই দুর্নাম, ভূতপ্রেতের উপদ্রব হয়। দিনদুপুরে এই তালাবদ্ধ কাচারিঘরে নাকি চেয়ার টানার শব্দ হয়, ঘর ঝাড়ু দেওয়ার শব্দ হয়। কেয়ারটেকার ছৈফুর বেড়ার দেয়ালের পাশে কান দিয়ে নিজে শুনেছে, আমাকেও নাকি শোনাবে আগামীকাল। আমারও গোঁ, আমি ওই কাচারিঘরেই থাকব। তালা খোলা হলো, সাফসুতরো করার পর তিনজনের বিছানা পাতা হলো—আমি, আজীজ আর লতিফ। বিশাল কাচারিঘরের ভেতর একদিকে পার্টিশন দিয়ে চারটা খাট, ড্যানিশ সোফা, কাঠের আলমারি। খালি খাটটায় একটা নারকেলশলার ঝাড়ু রেখে গেল চাকরানি নুরেজা, ও রকম রাখলে নাকি শয়তানে ফাঁকা খাটে এসে শোয় না। বড়শি, চার, টোপ—এসবের এমনিতেই বেশ গন্ধ হয়। মেছো গন্ধে ঘরটা ভরে গেল। ভোর পাঁচটায় উঠতে হবে। জাইল্লা নসুর ভাই সুরেশ বর্মণ আসবে, আমরা চর মানিকপুরা যাব মাছ মারতে। রাতে বিড়ি খেতে খেতে চার বানালাম আমরা। শুতে গিয়ে দেখি লেপেও কুলায় না এমন ঠান্ডা, তোশকটাকে মনে হচ্ছে জলের বিছানা। বিড়ির শলা, বিড়ি ধরানোর দেশলাই, চিরুনি, নরুন, টর্চ ইত্যাদি বহুরকম জিনিস বালিশের তলায় রেখে শোয়া আমার অভ্যাস। শুয়ে শুয়ে বিড়ি ফুঁকলাম কিছুক্ষণ। ডোরা কাটা মশারির দেয়ালে বোমারুর মতো আছড়ে পড়ছে মশা। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। হঠাৎ জেগে দেখি আজীজ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তাকাতেই সে ভীত গলায় ফিসফিস করে বলল, পার্টিশনের পাছে ছায়ার মতো ক্যাঠা য্যান যায় আর আহে দুলাভাই। ঘরের এদ্দুইল্যা আলোতে দেখা যায়, কিন্তু বাতি জ্বলাইলে দেখা যায় না। বাতি জ্বালালাম না, মশারির ভেতর থেকেই টের পেলাম একটা কড়া মিষ্টি ফুলের গন্ধে ঘর ভরে আছে। চোখ বন্ধ করে রইলাম, স্পষ্ট শুনলাম পার্টিশনের ওপাশে কে যেন নারকেলশলার ঝাড়ু দিয়ে ঘর সাফ করছে। ঘড়ি বের করে দেখি আকাশ ফর্সা হতে বেশি দেরি নেই। আজীজকে নিয়ে আলো হাতে পার্টিশনের ওপাশে গেলাম, কোথায় কী! কিছু নেই। ঠিক করলাম, ঘুম যখন ভেঙেই গেছে—আর ঘুমিয়ে কাজ নেই, সকালের অপেক্ষা করতে লাগলাম। ভূত আমার পুত, পেত্নি আমার ঝি। ভোরের গ্রামে মোরগের ডাক শোনা গেল। হাতমুখ ধুয়ে তৈরি হতে না হতে নাশতা এল। খেয়েদেয়ে চর মানিকপুরার দিকে চললাম।

আশপাশে বড় গাছ নেই আর, পেছনে নির্জন মাঠ। বনতুলসীর ঝোপ। পানি ওদিকটায় বাঁক খেয়ে ঘুরে যাচ্ছে। এদিক দিয়ে গঞ্জারের পোনার ঝাঁক গেছে নিশ্চয়ই, অনেকটা জায়গা ধরে পানির ওপর প্রচুর বুদবুদ। পাড়ের কাছে স্বচ্ছ পানি, বালির ওপর ভাঙা ঝিনুকের খোলা। ফ্লাস্কে করে আনা চা খেলাম, বড়শি ফেললাম।
অলংকরণ: সারা টিউন

‘সকাল-দুপুর সবই গ্রামে মন্থর। বের হয়ে দেখি—কোদাল করে ভাঙা আলে মাটি চড়াচ্ছিল চাষা। বাঁধাকপির খেতে নীল নীল কপির গায়ে আছড়ে পড়েছে রোদ, একদম নতুন তামার মতো লালচে রোদ। এদিকটায় আমন ধানের গন্ধে শীতের আকাশ সবুজ করে উড়ে আসে টিয়ার ঝাঁক। ধান খাবে বলে। দূরে তালেব মিলিটারির খালি ভিটার পিছে গ্রামের জমরুদ সীমা কুয়াশায় মাখামাখি। প্রথম গেলাম কলাটুয়া, ওখানে দড়িতানা নৌকার জন্য অপেক্ষা। ওপারে পুরুষ্টু আখখেত। নদী পার হয়ে মিনিট চল্লিশেক হাঁটার পর একটা জায়গায় এলাম, অবারিত আকাশের তলায় বিশাল বেগুনখেত। ঝিম ধরা সবুজ। পাশেই একটা চালাঘরে এক বুড়োমতো লোক বিড়ি খাচ্ছিল। তোদের তো আগেই বলেছি, সুরেফার দাদাশ্বশুরের বাড়ি চেয়ারম্যানবাড়ি। লোকটা চিনল, নতুন জামাই বলে ফাটাচটা মুখে খাতিরের হাসিও দিল। বলল, “সোজা চাইল্লা যান, এড়া কড়ইগাছ পাইবেন। ওই গাছটার তলে ভালো মাছ পাওয়া যায়। চাইরটার আগে ফিরবাইং, জায়গা খারাপ। খারাপ মানে ভূত-পেত্নির দুষ আছে।”

‘তা আমরা প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটার পর নদীর বাঁকে কড়ইগাছতলাটা দেখতে পেলাম। আশপাশে বড় গাছ নেই আর, পেছনে নির্জন মাঠ। বনতুলসীর ঝোপ। পানি ওদিকটায় বাঁক খেয়ে ঘুরে যাচ্ছে। এদিক দিয়ে গঞ্জারের পোনার ঝাঁক গেছে নিশ্চয়ই, অনেকটা জায়গা ধরে পানির ওপর প্রচুর বুদবুদ। পাড়ের কাছে স্বচ্ছ পানি, বালির ওপর ভাঙা ঝিনুকের খোলা। ফ্লাস্কে করে আনা চা খেলাম, বড়শি ফেললাম। মাছ ধরা আসলে প্রতীক্ষার খেলা, খেলাটা খেলতে হয় নিঃশব্দে, ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলে।

‘এক ঘণ্টা পর দেখি বাদামের বস্তা নিয়ে একটা ছোট ছেলে ধেই ধেই করে হেঁটে চলে যাচ্ছে, বাদাম ভেজে বেচে দিন গুজরান করে। গায়ে ময়লা হাফশার্ট, ধুলামাখা ফাটা পা। ওটাকে ইশারায় ডাকলাম। কাছে এল। মস্ত চালিয়াত ছোকরা, নাম শরীফুল। বসে পড়ল আমাদের পাশে। এদিকে নাকি বাগাডু ধরা যায়, তেলাপোকার টোপ দিয়ে ধরতে হয়। টাকা দিলে সে বাড়ি গিয়ে টোপ বানিয়ে এনে দেবে, সঙ্গে তার মামা হাছানকেও নিয়ে আসবে। হাছান মামা মাছ ধরার ওস্তাদ! টাকা দেওয়ার সময় আমার মন একটু ডাক দিয়ে উঠল, তবু দিলাম, নাচতে নাচতে শরীফুল চলে গেল টোপ বানাতে। বসে বসে কিছু মাছ আমরা ধরতে পারলাম। চারটা রুই মাছ, একটা কালবাউশ, তিনটা মিরকা মাছ। শীতকালের দুপুর, রোদের রংটা তখনো শর্ষেবাটা ঝোলের মতো হলুদ। কিন্তু সূর্য হেলে পড়েছে। বাদুলি ধানের খেতের ওপর কালচে রং ধরা ছায়া পড়ে গেছে। শরীফুল আর আসে না!

‘আগাম টাকা নিয়ে বিদায় হয়ে গেছে ব্যাটা!’ মুক্তি বলল। মোটা সুতোর পাঞ্জাবির গলার বোতামটা আলগা করলেন রাজা জ্যাঠা।

‘অবশেষে সে এল, বিকেলের আলো ফুটে বের হয়ে এল যেন, বয়ামে করে জ্যান্ত তেলাপোকা ধরে এনেছে সে, সঙ্গে এসেছে তার হাছান মামা। বোধ হয় হাছানের চোখ খারাপ বেশ, তার চশমার পুরু কাচে সূর্যের আলো পড়ে এমন ঝলসাচ্ছে, মনে হচ্ছে আতশ কাচের চশমা! কী আপদ, এ নাকি মাছ ধরবে। বোয়াল মারার বড় বড়শিতে হাছান এমন মালার মতো করে বারো-চৌদ্দটা তেলাপোকা বিঁধিয়ে দিল—যেন তেলাপোকা মরে না কিন্তু নড়ে। দেখে চমৎকৃত হলাম। আবার অপেক্ষার পালা। একসময় হাছান উঠে গেল আমাদের পাশ থেকে, বেলাবেলি মরিচখেতে পানি দিতে হবে, তার দেরি করা চলবে না। হাছান উঠে যাওয়ার অনেকক্ষণ পর অবশেষে বাগাডু বড়শিতে টান দিল, প্রায় এক ঘণ্টা খেললাম মাছটার সঙ্গে, কিন্তু বড়শি ছিঁড়ে মাছ চলে গেল। আবার আরেকটা বড়শি ফেললাম। শরীফুলই তেলাপোকা ফিট করে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। এবার তাকেও যেতে হবে, কলাইগাছ কেটে বস্তা বেঁধে গরুর জন্য নিয়ে যাবে। ঠান্ডা পড়ে যাচ্ছে। যেমন তড়বড়িয়ে হেঁটে এসেছিল, তেমনি বড় বড় পা ফেলে দেখলাম সে পানি-কাদার তোয়াক্কা না করে ছপছপ করে চলে যাচ্ছে বাড়ির দিকে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সাড়ে চারটা বাজে। আমরাও তাড়াতাড়ি মাছ-বড়শি গুছিয়ে নিয়ে রওনা দিলাম।

‘চর এলাকা তো, লোকের বসতি নেই। চারদিকে ফসলের আর আনাজের খেত, দু-একটা কাকতাড়ুয়া ছাড়া আর কেউ দাঁড়িয়ে নেই। চরে খেতি করতে আসে লোকে, নদীর পানি দোন দিয়ে তুলে সেচ দেয়। বিকেল হতে না হতে চলে যায়। এদিকটায় মাঠের পারে কুলের জঙ্গল, ঘেঁটু আর বেতের ঝোপ। কাঁচা মাটির পথ। চারদিকে একেবারে নিস্পন্দ সন্ধ্যা। হাওয়াও নেই। আকাশে সামান্য আলো, জোনাকির ল্যাজার আগুনিয়া রং তার। সোজা রাস্তা দিয়ে এসেছিলাম, এখন সেই রাস্তা আর খুঁজে পাই না। চরকি খাচ্ছি। কান কনকন করছে ঠান্ডায়, নাকটাক জ্বলছে। যেদিকে যাই কিছু দূর গিয়ে দেখি একটা খাল। কই, খাল পার হয়ে তো এদিকে আসিনি। যখনকার কথা বলছি, তখন পল্লী বিদ্যুতের বোর্ডই বসেনি, যে খাম্বা দেখে দিক নির্দেশ পাব। টর্চ জ্বাললে আরও অন্ধকার ঘনিয়ে আসে চারদিকে, আকাশের আলোই ভরসা। তারা মিটমিট করছে। একবার নাবাল জমিতে নেমে গেলাম। শোল মাছ জলাজমি ডিঙিয়ে লাফিয়ে পালায়, শুকনার ওপর শোল মাছ নাচছে। এদিকটায় একটা মরা গাছের গা ভরে আলকুশির লতা উঠেছিল না? ঢাল বেয়ে উঠলাম। দেখি শিমের মাচান। এদিকেই বিকেলের বুড়ো লোকটার চালাঘর ছিল না? চালাঘরটা আছে, কিন্তু তালা মেরে চলে গেছে লোকটা। খানিকটা যেতে আমরা দেখলাম লন্ঠন হাতে ওই তো বুড়োটা চলেছে, দৌড়ে গিয়ে তাকে ডাকলাম কিন্তু সে থামল না, নাগালই পেলাম না বুড়োর। পিছু পিছু কিছু দূর গেলাম, কিন্তু লোকটা যেন কুয়াশায় মিলিয়ে গেল। উল্টো দিকে রওনা হলাম এবার, যদি পথের হদিস মেলে। অনেকক্ষণ পা চালিয়ে হাঁটার পর দেখি আবার সামনে একটা বুড়ো লোক, হাতে লন্ঠন, বহুদূর দিয়ে চলে যাচ্ছে। একই লোক এখনো বাড়ির দিকে চলেছে? আমরা ডাকলাম গলা তুলে, সে ফিরেও তাকাল না। তোদের তো বলেছি আমি হরবোলার মতো ডাক নকল করতে পারতাম, কেন যেন কোড়া পাখির ডাক দিলাম একবার, এ পাখি নিজের জাতের আরেক পাখিকে ডেকে আনে। সঙ্গে সঙ্গে পেছনে একটা গাছের গুঁড়ি ভেঙে পড়ার আওয়াজ পেতেই আমরা আর কিছু ভাবতে পারলাম না, প্রাণপণে দৌড় লাগালাম। দেখি আবার সামনে খাল। আজীজ আর লতিফ হাঁপাতে হাঁপাতে সশব্দে তিনকুল পড়ছে। কাল রাতে শোনা সেই খটখটে ডাকটা শুনতে পেলাম। দৌড়ে খালেই ঝাঁপ দিয়ে পড়লাম। খাল নেই, শুকনো কাদা আর বালি চকচক করছে। যেন ঝড়ের পরে সৈকতে আছড়ে পড়া সামুদ্রিক প্রাণী আমরা, নিতান্ত বাতাসে ডুবে মরব। লতিফ বারবার পেছনে তাকাচ্ছে, আজীজ আমার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। চারদিকে নিবিড় অন্ধকার। কোথাও কেউ নেই। একটা লণ্ঠনের আলোও কোথাও জ্বলে না। চিৎকার করলেও শুধু শব্দের প্রতিধ্বনি ফিরে আসছে। অনেকক্ষণ ঘুরপাক খাওয়ার পর নদীর পাড় অবধি চলে এসেছি মনে হলো। নিচু হয়ে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখি সত্যিই কলকল করছে নদীর তরল পানি। ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠল লতিফ, যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে পেল আজীজ—শামুকে নাকি ধারালো পাতায় লেগে ওর পা কেটে গেছে টের পেল এতক্ষণে। গ্রামের লোকে বলে, কানাওলায় ধরে... আমার মতো অবিশ্বাসী দেখলাম—ওটা সত্যি।

বনের ডাইনির মতো লোটন মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে মিহি গলায় আমাদের প্রত্যেককে বলেছিল, আমার ক্ষমতা থাকলে তোমাকে কোথাও যেতে দিতাম না। শুনেছিলে, কেমন করে তার পাতানো বাবা তাকে বলতেন, দামে আটকে যাওয়ার সময় যে মেয়েটিকে একদিন তিনি দেখেছিলেন, সেই মেয়েটির মাথাভরা কালো চুল।

‘পাড়ে তো এলাম, নৌকা নেই। দৌড়ের সময় টের পাইনি, এখন শীত লাগছে। ফ্লাস্কে এক ফোঁটা চা থাকার কথা, টের পেলাম ফ্লাস্ক কোথায় ফেলে এসেছি জানি না! নৌকার অপেক্ষায় কতক্ষণ বসে রইলাম বলতে পারব না, মাথার ওপর তারভরা আকাশ যেন গোল হয়ে ঘুরছে। নদীর ওপার থেকে টর্চের আলো ফেলল কেউ। আমরাও এপার থেকে টর্চের আলো ফেললাম, ব্যাটারির আলোর তেজ কমে এসেছে। লতিফ ডাক দিয়ে উঠল, ওই পার থেকে সাড়া দিল হাতেম কাকার ছোট ছেলে, পরনে সাদা তহন—অন্ধকারেও ফটফট করছে। নৌকা এপারে আসতে আসতে টের পেলাম, ঘামে আমাদের কাপড় ভিজে উঠেছে। লতিফ সম্ভবত পেচ্ছাপও করে ফেলেছিল, এতক্ষণে উগ্র গন্ধে টের পেলাম। নৌকায় চাপলাম সবাই। শীতকালীন নদী তো, ধীরবহতা, ওপর ওপর অল্প শীতের হাওয়া খেলছে। মাঝির হাতে বৈঠা অলস, কাছিমের খোলসের মতো দেখতে নখগুলো। সে একবার শুধু বলল, “নাও এত ভার ভার লাগে ক্যান!”

‘কলাটুয়া বাজারে পৌঁছে আমরা চা খেলাম, ডালপুরি খেলাম। একটা সাইকেল রিকশা এলাকার মুহিদ্দান, জাকেরান, আশেকান ভাইবোনদের ডেকে ডেকে চলে গেল। মাছের বাজারে কুপির আলোয় চকচক করছিল পুঁটিমাছ। ঢালু জমিতে বাজার, ব্যস্ত ভ্রমরের মতো গুনগুন করছে খদ্দের। বাজারফেরত মানুষের হাতে দুগাছা আখ, দড়ির নোলক পরা মাছ, পানের বিড়া। যার যা সাধ্য। ওই পরিবেশে সন্ধ্যার অভিজ্ঞতা রীতিমতো অবিশ্বাস্য লাগছিল, হেসে ফেললেই যেন হয়, কিন্তু হাসি আসছিল না। চায়ের দোকানে গল্প করছে নিয়মিত খদ্দেররা। চর মানিকপুরা গিয়েছিলাম শুনে দোকানদার জিজ্ঞাসা করল—“মাছ কয়ডা পাইছুং?”

বললাম, তেরোটা। সে বলল, “গুইন্যা দ্যাহেন তো তেরোডা কি না।” খুলে দেখি, চারখানা মাত্র মাছ, বাকিগুলো নেই। দোকানদার বলল, “নায়ে আপনাগো সাথে সাথে খারাপ জিনিস উঠছিল, জাল দ্যাহেন ছিঁড়া নাই।” খদ্দেরদের একজন মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ—কোমরে মলিন লুঙ্গি জড়ানো, সে হাসল, বলল, “মাছ খাওনের জন্য আইছিল, এমনিতে আর কিছু করব না। চিন্তা নাই।”

অলংকরণ: সারা টিউন

‘বাড়ি পৌঁছানোর পর আমরা চর মানিকপুরা গিয়েছিলাম জেনে শ্বশুর-শাশুড়ি আঁতকে উঠলেন, মাছ মারার নেশায় ফিরত আসার সময় লক্ষ্য করিনি বলে রাগারাগি করলেন। সুরেফা তো ভয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। আমার দাদিশাশুড়ি ক্ষিপ্ত হয়ে তখনই মসজিদের কুয়া থেকে বালতি বালতি পানি আনালেন, আমাদের গরম পানিতে গোসল করালেন, লবণপানি খাওয়ালেন, আয়াতুল কুরসি পড়িয়ে শরীর বন্ধ করালেন। রাতে আর মাছটাছ ছুঁলাম না, দুধ-চিড়া খেয়ে ঘুমাতে গেলাম।’

‘এখন নিশ্চয়ই বলবেন না নৌকায় আপনাদের সঙ্গে মেছো বিড়াল উঠেছিল আর মাছ খেয়ে বিদায় নিয়েছে?’ শামীম মরিয়া গলায় বলল। জ্যাঠার চোখে সকৌতুক ঝিলিক।

রাজা জ্যাঠা ওরকমই করতেন। গল্পের শেষটা বলতেন না। যেন জানতেন ওরকম করলে আমরা আবার আসব। লোটন সন্ধ্যার আগেই মুখ ধুয়ে পমেড মেখে পরিপাটি হয়ে অপেক্ষা করত, রাজা জ্যাঠার হুকুম। যেন জানতেন ওরকম করলে আমরা আবার আসব। এসেছিলাম তো, আগেপরে বহুবার। লোটনের সঙ্গে আমাদের প্রত্যেকের অচ্ছেদ্য মিতালি গড়ে উঠেছিল। বনের ডাইনির মতো লোটন মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে মিহি গলায় আমাদের প্রত্যেককে বলেছিল, আমার ক্ষমতা থাকলে তোমাকে কোথাও যেতে দিতাম না। শুনেছিলে, কেমন করে তার পাতানো বাবা তাকে বলতেন, দামে আটকে যাওয়ার সময় যে মেয়েটিকে একদিন তিনি দেখেছিলেন, সেই মেয়েটির মাথাভরা কালো চুল। অনবধানে কালির দোয়াত ঠেলে ফেলে দিয়ে যেন সেই কালো কালির স্রোত থেকে কেউ সেই অফুরন্ত চুলের রাশি তৈরি করেছে। ঠিক যেমন লোটনের। ছোট্ট লোটনের মাথাতে ঠিক ওই রকম চুল দেখে বাবা তাকে কোলে করে এনেছিলেন এ বাড়িতে। জলকন্যা। উইধরা কাঠের দরজাটার ফ্রেমের বাইরে উঁকি মেরে সে-ও একদিন দেখেছিল মৎস্যকন্যার নাভির মতো ক্ষীণ চাঁদ, তাকে ঘিরে রুপালি আঁশের মতো ঘোলা জোছনা।

এরপর আমরা বহুদিন আর আসিনি লোটনের কাছে, মনে হয়েছে ও-ও যেন আদ্যোপান্ত গল্প। ভাগ্য তার বলশালী হাতে লোটনকে টেনে বা ঠেলে নিয়ে গেছে সামনের দিকে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে, আমরা তার খবর রাখিনি।

রাজা জ্যাঠার শেষ বয়স কীভাবে কেটেছে আমরা জানতে পারিনি। তদ্দিনে এমন সব যুগে পরিণত হয়েছি, যাদের ওপর ওর চুম্বকত্ব আর কাজ করত না। কখনো শহরতলিতে শীতের স্পর্শে জেগে উঠেছে সমস্ত পুরোনো, তার গায়ে কেরোসিন-জাদাক-সিন্দুকের বেনারসি-ফ্লানেলের জামার ঘ্রাণ। তখন কখনো মনে পড়েছে ওই টালি-খসা বাড়িটায় আমাদের সন্ধ্যাবেলার আড্ডা। সময়ের খাঁড়িতে আমরা জাল ফেলেছি, অদক্ষ তরুণ জেলের হাতে। কখনো পেয়েছি চকমকে মাছ, কখনো শুধুই গেঁড়িগুলি, কখনো ঠনঠনে পাথর। তারপর একদিন তোবড়ানো সিলভারের বাসনের মতো কাত হয়ে পড়েছি এদিক-সেদিক। সংসারে নিরবচ্ছিন্ন উপযোগিতা ফুরিয়েছে আমাদেরও, গল্প জুড়তে চেয়ে দেখেছি কেউ কাছে ভেড়ে না, যে বাইল্যা মাছ ধরতে চুমাঝাঁটিও লাগে না—সেই বাইল্যাটাও ধরা দেয় না।