‘ই চিং’ বইয়ের প্রচ্ছদ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
‘ই চিং’ বইয়ের প্রচ্ছদ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

পৃথিবী বদলে দেওয়া বই–১

ই চিং: ‘পরিবর্তনের বই’

মানুষের চিন্তা ও জীবন এবং পুরো পৃথিবীকে বদলে দেওয়া ১০০টি কালজয়ী বই নির্বাচন করেছেন ওয়ান হানড্রেড বুকস দ্যাট চেঞ্জড দ্য ওয়ার্ল্ড–এর লেখক। সে বই থেকে নিয়মিত এই লেখা। অনুবাদ করেছেন নূরুননবী শান্ত

ইতিহাসে এমন আর কোনো বই নেই, যা নিজ সংস্কৃতিকে এত গভীরভাবে ধারণ করেছে এবং সেই সংস্কৃতিকে এত দীর্ঘকাল প্রভাবিত করেছে, যেমনটা করেছে চীনের প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণীর গ্রন্থ ই চিং

‘পরিবর্তনের বই’ নামে পরিচিত বইটি খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২৮০০ সালের দিকে রচিত হয়েছে বলে ধরা হয়। সময়ের পরিক্রমায় এটি হয়ে উঠেছে বিশ্বের প্রাচীনতম এবং এখনো পঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এর রচনাকাল নিয়ে রয়েছে নানা কিংবদন্তি। গবেষকদের মতে, ই চিং-এর ষড়্​বাহু বা হেক্সাগ্রামগুলোর নকশা তৈরি হয় খ্রিষ্টপূর্ব ২৮০০ সালে, টেক্সট লেখা হয় খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ সালের দিকে, আর দার্শনিক ব্যাখ্যাগুলো রচিত হয় খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৫০০ সালে।

ধারণা করা হয়, সম্রাট ফু সি প্রথম ষড়্​বাহুর নকশা আঁকেন। বলা হয়, একটি কচ্ছপের পিঠে অদ্ভুত কিছু চিহ্ন দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি এই নকশা তৈরি করেন। এ নকশাগুলোই পরবর্তী সময়ে ই চিং-এর ভিত্তি হয়ে ওঠে।

শত শত বছর এ বইটি ঝৌ ই নামে পরিচিত ছিল। পরে হান রাজবংশের সম্রাট উ, খ্রিষ্টপূর্ব ১৩৬ সালে একে ধ্রুপদি গ্রন্থ হিসেবে ঘোষণা করেন এবং নাম দেন ‘পরিবর্তনের ক্ল্যাসিক’—ই চিং। এর পর থেকেই এটি চীনা ধ্রুপদি সাহিত্যের সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়।

ই চিং মূলত ভবিষ্যদ্বাণীর গ্রন্থ। এটি একটি প্রাচীন জিওম্যানসি বা ভূভবিষ্যদ্বাণীর পদ্ধতি। সেকালে ইয়ারোগাছের কাঠি (ইয়ারো স্টকস) মাটিতে ছুড়ে ফেলে যে নিদর্শন তৈরি হতো, তা বিশ্লেষণ করা হতো ষড়্​বাহুর মাধ্যমে। ই চিং–এ দেওয়া প্রতিটি ষড়্​বাহুর ব্যাখ্যা ও তাৎপর্যের ভিত্তিতেই সেই ভবিষ্যদ্বাণী করা হতো।

‘ই চিং’ বইয়ের প্রচ্ছদ
বইটিকে চীনের দুই প্রধান আধ্যাত্মিক ধারা—কনফুসিয়ানিজম ও তাওবাদ–এর মিলনস্থল হিসেবে দেখা হয়। এখানে দুটি বিপরীত শক্তির মিথস্ক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে: একদিকে অন্ধকার, নিষ্ক্রিয়, নারীত্বপূর্ণ শক্তি ইয়িন; অন্যদিকে আলোকিত, সক্রিয়, পুরুষতান্ত্রিক শক্তি ইয়াং।

যদিও ই চিং-এর নির্দিষ্ট কোনো রচয়িতা নেই, টেক্সটটির জন্ম পশ্চিম ঝৌ যুগে (খ্রিষ্টপূর্ব ১০৪৬–৭৭১) বলে মনে করা হয়। গ্রন্থটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘দশ পাখা’ (টেন উইংস) নামে পরিচিত একগুচ্ছ ব্যাখ্যামূলক টেক্সট, যেখানে ই চিং–এর দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ মহাব্যাখ্যা (গ্রেট কমেন্টারি)। সেখানে ই চিংকে ‘ব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ’ হিসেবে দেখা হয়। এর আধ্যাত্মিক অনুধাবনের মাধ্যমে মানুষ জগতের অন্তর্নিহিত বিন্যাস ও পরিবর্তনের ধারাকে বুঝতে পারে।

ঐতিহ্যগতভাবে এই ‘দশ পাখা’র রচয়িতা হিসেবে কনফুসিয়াসের নাম উঠে আসে। তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত থাকায় ই চিং আরও উচ্চ মর্যাদা পায় এবং হান থেকে তাং রাজবংশ পর্যন্ত এই মর্যাদা অটুট ছিল।

বইটিকে চীনের দুই প্রধান আধ্যাত্মিক ধারা—কনফুসিয়ানিজম ও তাওবাদ–এর মিলনস্থল হিসেবে দেখা হয়। এখানে দুটি বিপরীত শক্তির মিথস্ক্রিয়ার কথা বলা হয়েছে: একদিকে অন্ধকার, নিষ্ক্রিয়, নারীত্বপূর্ণ শক্তি ইয়িন; অন্যদিকে আলোকিত, সক্রিয়, পুরুষতান্ত্রিক শক্তি ইয়াং। এ দুইয়ের দ্বন্দ্ব ও সংলাপ থেকেই সৃষ্টি হয় পরিবর্তন, যা জীবনের গতি নির্ধারণ করে এবং নতুন জীবনের সম্ভাবনা তৈরি করে।

ই চিং-এর মূল টেক্সটে আছে ৬৪টি ষড়্​বাহুর বিশ্লেষণ, যেগুলোর মাধ্যমে ইয়িন–ইয়াংয়ের আন্তক্রিয়া ও তার অসীম সম্ভাবনার প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়।

বিশ শতকের প্রতিসংস্কৃতি আন্দোলনে এই গ্রন্থ বিশেষ ভূমিকা রাখে। হারম্যান হেসে, ফিলিপ কে ডিকসহ বহু লেখকের ওপর ই চিং গভীর প্রভাব ফেলেছে।

ই চিং-এর দর্শন দাঁড়িয়ে আছে তিনটি ধারণার ওপর—পরিবর্তন, ভাবনা ও বিচার। এই বিচার থেকে জীবনের সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়—সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য, অনুশোচনা কিংবা অপমান।

এ বই মানুষকে শেখায় সতর্কতা, বিনয় ও ধৈর্যের মূল্য। মনে করিয়ে দেয়, বড় অর্জনের পরও বিপদ আসতে পারে, আবার দুঃসময়ই হয়ে উঠতে পারে ভবিষ্যৎ সাফল্যের ভিত্তি।

১৯১১ সালে শিনহাই বিপ্লবের মাধ্যমে চীনে রাজতন্ত্রের অবসান হলে ই চিংকে আর মূলধারার রাজনৈতিক দর্শনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। তবে মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইয়ুং এ গ্রন্থে দারুণ আগ্রহ দেখান। ১৯২৩ সালে রিচার্ড ভিলহেল্ম বইটি জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন, যার ফলে ই চিং ইউরোপজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 

বিশ শতকের প্রতিসংস্কৃতি আন্দোলনে এই গ্রন্থ বিশেষ ভূমিকা রাখে। হারম্যান হেসে, ফিলিপ কে ডিকসহ বহু লেখকের ওপর ই চিং গভীর প্রভাব ফেলেছে।