ওয়াং জিবিংয়ের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
ওয়াং জিবিংয়ের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

ওয়াং জিবিং

ফুড ডেলিভারিম্যান থেকে ‘ডেলিভারি পোয়েট’

ওয়াং জিবিং। লোকে তাঁকে আদর করে ‘ডেলিভারি পোয়েট’ বলে ডাকে। চীনের জিয়াংসু প্রদেশের কুনশানে ফুড ডেলিভারির কাজ করে তাঁর জীবন চলে। ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলারে চেপে দিনমান মানুষের বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দেন। আর কাজের ফাঁকে চলে কবিতা লেখা। কেননা কবিতাই তাঁর ধ্যানজ্ঞান, পরম আশ্রয়।

আর দশজন কবির মতো টেবিলে বসে কবিতা লেখার সুযোগ তাঁর নেই। ফুড ডেলিভারির ফাঁকে সামান্য যে বিরতি, তখনই নিজের ভাবনারাশিকে কবিতায় রূপ দেন ওয়াং। মনের গূঢ় অনুভূতি আর পথে দেখা মানুষের গল্পকে তুলে আনেন কবিতার পঙ্‌ক্তিতে। সহজ সাবলীল আটপৌরে তাঁর কবিতার ভাষা। তবে তাতে প্রগাঢ় উপলব্ধি, অনুভবের জাদু, অর্থসৌন্দর্য আর দার্শনিক উদ্ভাসের এতটুকু কমতি নেই। তাঁর কবিতায় রাজ করে সাধারণ মানুষ ও তাদের প্রতিদিনের স্বরকল্লোল।

কবি হিসেবে ওয়াং এখন বিশ্বজুড়ে পরিচিত এক নাম। সাধারণ কবিতাপ্রেমী থেকে শুরু করে বোদ্ধা সমালোচক, সবার অকুণ্ঠ প্রশংসা কুড়িয়েছে তাঁর কবিতা। কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ-নিবন্ধও লিখে থাকেন ওয়াং।

ওয়াং জিবিং
ওয়াং-এর ভাষায়, ‘লোকেরা যেসব শব্দকে, লেখাকে বাতিল ভেবে ছুড়ে ফেলে দেয়, আমি সেগুলোকে কুড়িয়ে নিই পরম যত্নে। ঘষেমেজে অভিনব আর মূল্যবান করে তুলি। শব্দে-শব্দে জীবনের অপ্রাপ্তি ও শূন্যতাকে ভরাট করতে পারাতেই আমার আনন্দ।’

৫৭ বছর বয়সী ওয়াং এরই মধ্যে পেয়েছেন বেশ কয়েকটি নামকরা সাহিত্য পুরস্কার। চলতি ২০২৬ সালে ফ্লাইং লো কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন বিখ্যাত লু সুন পুরস্কার। তাঁর এই হঠাৎ পাওয়া সফলতা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে ব্যাপক আলোচনা ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। এটা ব্যক্তিগত অর্জন শুধু নয়; বরং চীনা ‘শ্রমিক-সাহিত্য’-র পুনর্জাগরণের ঘণ্টাধ্বনি।

তাঁর যে-জীবন ‘কর্মের প্রহারে পাংশু’, সে-জীবনে কবিতা এক রজতরেখা। অতি সাধারণ জীবন আর অতি সাধারণ যাপন থেকেও যে শিল্পসৃজন সম্ভব—ওয়াং জিবিং তারই দুর্মর প্রমাণ।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রোমে ইতালিয়ান রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনে প্রদর্শিত হয় ‘থ্রি ইন দ্য আফটারনুন: দ্য গ্লোবাল ইকো অব আ ডেলিভারি পোয়েট’ শীর্ষক একটি প্রামাণ্যচিত্র। সেখানে ওয়াং-এর শ্রমঘন জীবন ও অদম্য কবিতাযাপনকে তুলে ধরা হয়েছে।

৫৭ বছর বয়সী ওয়াং তিন দশকের বেশি সময় ধরে লিখেছেন ছয় হাজারেরও বেশি কবিতা। তাঁর তৃতীয় কবিতার বই ফ্লাইং লো চলতি বছরই ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত হবে।

ওয়াং-এর জন্ম চীনের জিয়াংসু প্রদেশের এক অজপাড়াগাঁয়ে। জীবিকার তাগিদে মাত্র ১৯ বছর বয়সে বাড়ি ছাড়েন। টিকে থাকার জন্য কখনো নির্মাণশ্রমিক, কখনো বালুশ্রমিক আবার কখনো-বা ছোট দোকানের কর্মীর কাজ করেছেন। হাড়ভাঙা খাটাখাটুনির মধ্যেও কবিতা লেখায় এতটুকু ছেদ পড়ে না। কবিতা তাঁর কাছে ‘শব্দে-শব্দে দুঃখের প্রশমন আর শান্তিলাভের পরম মাধ্যম’।

২০১৮ সালে ফুড ডেলিভারির কাজকেই চূড়ান্ত পেশা হিসেবে বেছে নেন ওয়াং। কাজের ফাঁকে-ফাঁকে কখনো টুকরা কাগজে, কখনো ডেলিভারি স্লিপের উল্টো পিঠে, কখনো-বা নিজেরই হাতের তালুতে লিখে চলেন কবিতা। শহুরে কোলাহলে সতীর্থ ডেলিভারি কর্মীদের মনের সব চাপা পড়া কথা তাঁর কবিতায় প্রকাশের ভাষা খুঁজে পায়। জীবনের তাবৎ বিষয়, শিব ও অশিব, এমনকি গৃহহিংসা—সবকিছুই অবলীলায় উঠে আসে তাঁর কবিতায়।

ওয়াং-এর ভাষায়, ‘লোকেরা যেসব শব্দকে, লেখাকে বাতিল ভেবে ছুড়ে ফেলে দেয়, আমি সেগুলোকে কুড়িয়ে নিই পরম যত্নে। ঘষেমেজে অভিনব আর মূল্যবান করে তুলি। শব্দে-শব্দে জীবনের অপ্রাপ্তি ও শূন্যতাকে ভরাট করতে পারাতেই আমার আনন্দ।’

‘আমাদের সবারই আলাদা আলাদা জীবন। প্রত্যেকেরই উচিত নিজের মতো করে সুখ খুঁজে নেওয়া’—এভাবেই শব্দে-শব্দে নিজের সুখ খুঁজে বেড়ান ওয়াং।

মাত্র পাঁচটি কবিতাবই তাঁর। প্রথম বই আ ম্যান ইন আ হারি প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালে। সেবছরই বেরোয় দ্বিতীয় বই আই ক্লামজিলি লাভ দিস ওয়ার্ল্ড। তারপর ২০২৪ সালে বেরোয় ‘ফ্লাইং লো’।

অন্য বইগুলো হচ্ছে হোল্ডিং আ বিম অব লাইট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড, দ্য ওয়ার্ল্ড লাইটস মি আপ। পাঁচটি বই নিয়ে ২০২৫ সালে বেরিয়েছে তাঁর কবিতাসংগ্রহ

কাজের ফাঁকে রাস্তাতেই লিখছেন ওয়াং জিবিং
‘থ্রি ইন দ্য আফটারনুন’ কবিতার শিরোনাম সম্পর্কে বলতে গিয়ে ওয়াং বলেছিলেন: বিকেল তিনটে হলো ডেলিভারি কর্মীদের জন্য শান্ত, বিরল এক মুহূর্ত। তখন তারা কিছুটা হলেও জীবনের আঁচ ও উত্তাপ টের পায়। একজন ডেলিভারি রাইডারের জীবন যদি প্রতিদিন-গেলা তেতো ওষুধের মতো হয়, আমার কবিতা সেই ওষুধের পরে চিনি।

নিজের পেশার সঙ্গে মিল রেখে ২০২২ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওয়াং ‘আ ম্যান ইন আ হারি’ (‘ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলা লোক’) শিরোনামে একটি কবিতা পোস্ট করেন। রাতারাতি সেটি ভাইরাল হয়ে যায়। পৃথিবীর নানা প্রান্তের লাখ লাখ কবিতাপ্রেমী তাঁর ভক্ত বনে যায়। অচেনা ডেলিভারি কর্মী থেকে ওয়াং হয়ে ওঠেন সময়ের আলোচিত, নন্দিত এক কবি—‘এলাম, দেখলাম আর জয় করলাম’।

এখন তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে গেছে ভালোবাসার এক নতুন তকমা—‘দ্য ডেলিভারি পোয়েট’।

কবিতা লিখে বিপুল খ্যাতি ও অর্থের মালিক হয়েছেন ওয়াং। তাঁর সামনে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় পদপদবির হাতছানি। তবে এসবে তাঁর মন মজেনি। এখনো দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন ডেলিভারি রাইডারের কাজ। ইলেকট্রিক বাইকে চেপে ওয়াং জিবিং এরই মধ্যে প্রায় পৌনে দুই লাখ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছেন। সামনে পড়ে আছে আরও দুস্তর পথ—মাইলস টু গো বিফোর হি স্লিপস...

লু সুন সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্তির পর তাঁকে প্রশ্ন করা হয়:

এখনো কেন ফুড ডেলিভারির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন?

ওয়াং-এর জবাব:

এটাই আমার জীবন। আমি জানি, কে আমি!

ওয়াং মনে করেন, ফুড ডেলিভারি ছেড়ে দিলে সাধারণ মানুষজন ও কবিতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হবে। প্রতিদিনের জীবনের ‘ধোঁয়া আর আগুন’ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে কবিতা হারায় তার প্রাণবেগ ও স্পন্দন। ওয়াং-এর পৃথিবীতে কাজ ও কবিতা, লক্ষ্মী ও সরস্বতী—এ দুয়েরই অটল আসন পাতা।

‘থ্রি ইন দ্য আফটারনুন’ কবিতার শিরোনাম সম্পর্কে বলতে গিয়ে ওয়াং বলেছিলেন: বিকেল তিনটে হলো ডেলিভারি কর্মীদের জন্য শান্ত, বিরল এক মুহূর্ত। তখন তারা কিছুটা হলেও জীবনের আঁচ ও উত্তাপ টের পায়। একজন ডেলিভারি রাইডারের জীবন যদি প্রতিদিন-গেলা তেতো ওষুধের মতো হয়, আমার কবিতা সেই ওষুধের পরে চিনি।

খাবারের প্যাকেট হাতে আরও বহুকাল বহু মানুষের দুয়ারে কড়া নাড়বেন ডেলিভারিম্যান ওয়াং জিবিং। আরও বহুকাল অনুভূতির জাদুমাখা শব্দে মানুষের মনের দুয়ারে কড়া নাড়বেন কবি ওয়াং জিবিং।

বৌদ্ধধর্মের করুণা, সহমর্মিতা আর মানবিক মর্যাদার ধারণাটি ওয়াং জিবিংয়ের কবিতায় অলক্ষ্যে ব্যাপ্ত হয়ে আছে।
একদম নিখরচায় ওয়াং রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে নিজ এলাকার শিশুদের স্কুলে পৌঁছে দেন, বাড়ি ফিরিয়েও আনেন। ডেলিভারির সময় সঙ্গে রাখেন বাড়তি একটা রেইনকোট। লাগাতার ঝুম বৃষ্টিতে আটকে পড়া চেনা-অচেনা মানুষদের দিকে সহায়তার হাত বাড়ান। তাঁর কবিতায় নিজের পেশার কথা বারবার উঠে এলেও ওয়াং মনে করেন, কবিতা লেখা পেশানিরপেক্ষ এক ভালোবাসার নাম। কবিতা লেখাকে তুলনা করেন রোমাঞ্চকর এক প্রেমের সঙ্গে: সেই প্রেমকে বেছে নেওয়ার অধিকার সবারই আছে।
খাবারের প্যাকেট হাতে আরও বহুকাল বহু মানুষের দুয়ারে কড়া নাড়বেন ডেলিভারিম্যান ওয়াং জিবিং। আরও বহুকাল অনুভূতির জাদুমাখা শব্দে মানুষের মনের দুয়ারে কড়া নাড়বেন কবি ওয়াং জিবিং।
চেন দু ও শিসেং চেন-এর করা ওয়াং জিবিং-এর তিনটি কবিতার ইংরেজি অনুবাদের বাংলা রূপ পড়ুন :

ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলা লোক

হাওয়ার থেকে বাতাস ধরি,
বাতাস থেকে ছুরি
হাড়ের থেকে আগুন আর
আগুন থেকে জল।

সময়ের সঙ্গে যারা পাল্লা দিয়ে ছোটে
এক ঠিকানার পরেই ফের অন্য ঠিকানা
কপালে নেই চার ঋতুর, সব ঋতুর স্বাদ

ওয়াং পরিবার যে-গাঁয়ে থাকে, ঠিক সেটির মতো
             পৃথিবী স্রেফ একটি স্থানের নাম

ডেলিভারি দিতে দিতে, মানবীয় আগুনের তৃষ্ণা মেটাতে যারা
মাটির ওপর দিয়ে হাতুড়ি ঠোকার মতো পা ঠুকে দৌড়ায়
তাদের সঙ্গে আমার দেখা হবে প্রত্যেক দিন, আমি জানি!

আমাকে ওয়াং জিবিং বলে ডাকো

ভাই বলে আমাকে ডেকো না,
ভাই সে তো চলে গেছে অন্য শহরে
বাবা-মা ও ছেলেপুলে, এখনো সবাই তারা
ফেলে-আসা গাঁয়ে বাস করে

আমার দুচোখে আজ সব স্পষ্ট—
সবকিছু ছেড়েছুড়ে কোথাও যাইনি আমি, তবু
একটিবার কেউ আমার নামটি বলে না

শেষের লোকটি, পরের লোকটি—
তোমরা আমায় যে নামে খুশি ডাকো

নিচু দিয়ে ওড়া

কে বলেছে, ডানা মেললেই উড়তে হবে খুব উঁচুতে?
নিচু দিয়ে ওড়াটাও আলবত ওড়া
পাখির ডাকের মতো শব্দ করে সরসর হাওয়া ছুটে যায়, আর
ছিটকে-পড়া তারার মতন চাকাগুলো দ্রুত ছুটে চলে
খাবারের প্যাকেটের গায়ে এক সাদা-কালো ডেলিভারি নোট—
তার মানে, জরুরি দলিল আর মন্ত্রের মতন জরুরি

তিন শ ষাট কিসিমের পেশার ভিড় ঠেলে-উজিয়ে
জন্ম নেয় এক নতুন পেশা
আর চব্বিশটি সৌর ঋতু থেকে জন্ম নেয়
ডেলিভারিম্যানদের জন্য একটি নতুন ঋতু—
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলা মানুষেরা
এক ঘণ্টা সময়ের ভেতর থেকে কুড়িয়ে নেয় একষট্টি মিনিট,
আর সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে দিতে তারা
মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয় মায়া ও কোমলতা।

চলার পথে রাস্তার ওপর তারা
বিছিয়ে রাখে মিনিট আর সেকেন্ডের কাঁটা
রাস্তাটি তখন হয়ে ওঠে যত্নে সাজানো এক সাদা-কালো কি–বোর্ড
কে বলতে পারে, উচ্চাঙ্গ সংগীতের শ্রোতা-গায়ক কম হলেই
তার মূল্য কমে যায়?
মাটির খুব কাছ থেকে উঠে আসা সুরই
ওপরে-উঠতে-চাওয়া সবকিছুর মহাসিম্ফনি

মানুষের পৃথিবীতে পঞ্চম ঋতু বলে যদি কিছু থাকে,
ডেলিভারি কর্মীদের জন্য সেটি নিশ্চয় বসন্তের ঋতু