
দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের মরমি কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তারের তাজকিরাত আল-আউলিয়া ফারসি ভাষায় রচিত সুফিদের জীবনীভিত্তিক একটি আকর গ্রন্থ। বাংলায় এর আক্ষরিক অর্থ ‘সাধুদের জীবনী’। মূল বইটির পরিসর অনেক বিস্তৃত, কিন্তু ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ এবং তাসাউফ ও ফারসি সাহিত্যের পণ্ডিত এ জে আরবেরি (১৯০৫-১৯৬৯) এই বইটির একটি অ্যাব্রিজড বা সংক্ষিপ্ত ভার্সন প্রকাশ করেছেন। ২০০০ সালে ইংরেজি ভাষায় এটি মুসলিম সেইন্টস অ্যান্ড মিস্টিকস নামে বের হয়। বইটিতে ৩৮টি এপিসোডে ভাগ করে সুফি সাধক ও তাঁদের জীবনের নানা লোকাতীত ঘটনার উল্লেখ করেছেন আরবেরি। এর একটি এপিসোড কুফার প্রখ্যাত সুফি সাধক দাউদ-ই-তায়ির নামে। সেখান থেকে এই অধ্যায়টি মূলানুগ অনুবাদ করা হয়েছে।
• ভাষান্তর: রাব্বী আহমেদ
কুফার আবু সোলায়মান দাউদ ইবনে নুসাইর আত-তায়ি ছিলেন বরেণ্য একজন পণ্ডিত—ইমাম আবু হানিফার ছাত্র। পরে তিনি হাবিব আর-রায়ির হাতে সন্ন্যাসজীবনের দীক্ষা লাভ করেন। সেই সঙ্গে নিজের সব বইপত্র ছুড়ে ফেলে দেন ইউফ্রেতিস নদীতে। হিজরি ১৬০ থেকে ১৬৫ (৭৭৭-৭৮২ সাল)-এর মধ্যে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
শুরু থেকেই দাউদ আত-তায়ি এক গভীর অন্তর্গত দুঃখে ভারাক্রান্ত থাকতেন, আর সর্বদা এড়িয়ে চলতেন তাঁর সতীর্থ মানুষের সমাজ। তাঁর বৈরাগ্যজীবনে প্রবেশের মুহূর্তটি আসে তখন—যখন দুঃখবতী এক নারীকে তিনি আবৃত্তি করতে শোনেন এই পঙ্ক্তিগুলো—
তোমার কোন গাল থেকে শুরু হয়েছে পচন?
আর কোন চোখ থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে অশ্রু?
এক মহাদুঃখ ঘিরে ধরল তাঁর মন—আর নিজেকে একটুও সামলে রাখতে পারলেন না। এমন এক অবস্থায় তিনি যোগ দিলেন তাঁর শিক্ষক ইমাম আবু হানিফার পাঠদানে। ‘কী করে তোমার এমন দশা হলো?’ আবু হানিফা জানতে চাইলেন। দাউদ তাঁকে আগের সব ঘটনা খুলে বললেন। ‘পৃথিবী আমার কাছে তার আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে’—আরও বললেন, ‘আমার অন্তরে এমন কিছু একটা ঘটেছে, যা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না, না কোনো বই কিংবা আইনে এর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছি।’ ‘তুমি চেনা সংস্রব থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেলো’, আবু হানিফা নির্দেশ দিলেন। দাউদ তাই অন্য সব লোক থেকে তাঁর মুখ ফিরিয়ে নিলেন, আর নিজেকে অন্তরিন করে রাখলেন নিজের ঘরে।
এক দীর্ঘ বিরতির পর, আবু হানিফা গেলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে।
‘এ তো কোনো সমাধান নয় যে তুমি তোমার ঘরে লুকিয়ে থাকবে আর একটা কথাও বলবে না। তোমার জন্য সঠিক পন্থা হলো এই—তুমি ইমামদের পায়ের কাছে বসে থাকবে, আর মনোযোগ দিয়ে শুনবে তাঁরা নতুন যেসব চিন্তা প্রস্তাব করেন। তোমাকে অবশ্যই তাঁদের বক্তব্য শুনতে হবে ধৈর্য ধরে, একটা কথাও না বলে। তাহলে তাঁদের চেয়ে তুমি সেসব বিষয় আরও ভালো করে জানতে পারবে।’ আবু হানিফা যা বলেছেন, তাতে মঙ্গল আছে—এ উপলব্ধি থেকে দাউদ আবার তাঁর পঠনপাঠন শুরু করলেন। পরের এক বছর বসে থাকলেন ইমামদের চরণের কাছে। এর মধ্যে একটাবারও মুখ খুললেন না আর ধৈর্যের সঙ্গে মেনে নিলেন তাঁরা যা বলেন। শুধু শোনার মধ্যেই সন্তুষ্ট থাকলেন, কোনো কিছুর প্রত্যুত্তর করলেন না। ‘সেই এক বছরের ধৈর্য’, ওই সময় শেষ হলে পরে তিনি মন্তব্য করেন, ‘৩০ বছরের কঠোর পরিশ্রমের সমান।’ এরপর তিনি এলেন হাবিব আর-রায়ির সান্নিধ্যে। তিনি তাঁকে নিগূঢ় পথের দীক্ষা দিলেন, আর দৃঢ়তার সঙ্গে দাউদ সেই পথে অগ্রসর হলেন। তাঁর সব বইপত্র ছুড়ে ফেললেন নদীতে—আর লোকচক্ষুর আড়ালে গিয়ে অন্য মানুষের কাছ থেকে ছিন্ন করলেন সব প্রত্যাশা।
দাউদ আত-তায়ি বললেন, ‘আমার অন্তরে এমন কিছু একটা ঘটেছে, যা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না, না কোনো বই কিংবা আইনে এর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছি।’ ‘তুমি চেনা সংস্রব থেকে নিজেকে সরিয়ে ফেলো’, আবু হানিফা নির্দেশ দিলেন।
এর মধ্যে পারিবারিক সূত্রে তিনি কুড়িটি দিনার পেলেন। তিনি সেই অর্থ খরচ করলেন বিশ বছর ধরে। এ কারণে কিছু শায়খ (আধ্যাত্মিক শিক্ষক বা গুরু) তাঁকে ভর্ৎসনাও করেছিলেন। ‘এই পথটাই হলো অন্যদেরকে দিয়ে দেওয়ার, নিজের কাছে সঞ্চয় করে রাখার নয়।’ ‘কেবল মনের শান্তি নিশ্চিত করতে এই পরিমাণ অর্থ আমি জমিয়ে রেখেছি,’ তিনি বুঝিয়ে বললেন। ‘মরার আগপর্যন্ত এটা দিয়েই আমার চলে যাবে।’
এমন কোনো কঠোরতা নেই, যা তিনি নিজের ওপর আরোপ করেননি। এমনকি রুটি পানিতে ভিজিয়ে সেটা তিনি পান করতেন আর বলতেন, ‘এই পানি আর রুটি খাওয়ার অন্তর্বর্তী সময়ে, কোরআনের পঞ্চাশটা আয়াত আমি তিলাওয়াত করে ফেলতে পারি। আমি কেন আমার জীবনকে নষ্ট করব?’
আবু বকর-ই আইয়াশ বর্ণনা করেছেন, ‘আমি দাউদের ঘরে গেলাম আর দেখতে পেলাম এক টুকরা শুকনো রুটি হাতে তিনি কান্না করছেন। “দাউদ, কী হয়েছে তোমার?”, আমি জানতে চাইলাম। “এই রুটিটা আমি খেতে চাইছি। কিন্তু সেটা বৈধ উপায়ে অর্জিত নাকি অবৈধ, তা তো জানি না।”’ অন্য এক ব্যক্তি বলেছেন, ‘আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলাম, আর দেখলাম রোদে একটা পানির কলসি রাখা। “আপনি এটাকে ছায়ায় রাখছেন না কেন?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম। “যখন রাখি, তখন এটা ছায়াতেই ছিল,” তিনি উত্তর দিলেন, “এখন নিজেকে ভোগবিলাসের মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে, আল্লাহর কাছে আমার চরম সংকোচ হয়।”’
বলা হয়ে থাকে, প্রকাণ্ড এক প্রাসাদ ছিল দাউদের, যার ছিল অগণন কুঠুরি। তিনি সে পর্যন্তই একটা কুঠুরিতে থাকতেন, যে পর্যন্ত না সেটা জীর্ণ হয়ে ভেঙে পড়ত। এরপর তিনি চলে যেতেন অন্য কোনো কুঠুরিতে। ‘আপনি কুঠুরিটা ঠিকঠাক করছেন না কেন?’ তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়। ‘আমি আল্লাহর সঙ্গে চুক্তি করেছি, এই পৃথিবীকে আর মেরামত না করার,’ জবাবে তিনি বললেন। ধীরে ধীরে পুরো প্রাসাদই একটা সময় ধসে পড়ল। শুধু প্রবেশপথের বারান্দা ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকল না। যে রাত্রে দাউদ মারা গেলেন, সেদিন ওই বারান্দাটাও পড়ে গেল। ‘এই কুঠুরির ছাদে তো ফাটল ধরেছে’, আরেক দর্শনার্থী একবার মন্তব্য করলেন। ‘এটা এক্ষুনি ভেঙে পড়বে।’ ‘গত ২০ বছর আমি এর ছাদের দিকে তাকাইনি’, দাউদ উত্তর দিলেন।
‘আপনি বিয়ে করছেন না কেন?’ দাউদকে জিজ্ঞাসা করা হয়। ‘কোনো বিশ্বাসী নারীকে আমি ঠকাতে পারব না’, জবাবে তিনি বললেন। ‘সেটা কী রকম?’ ‘যদি কোনো নারীকে আমি বিয়ের প্রস্তাব দিই, তার মানে হলো এই—আমি তার জীবনের সব দায়িত্ব গ্রহণ করছি। যেহেতু আমি আমার ধর্মীয় কর্তব্য আর পার্থিব কাজ, একসঙ্গে দুই দিকে মনোযোগ দিতে পারব না, সুতরাং এর অর্থ হলো আমি তার সঙ্গে প্রতারণা করব’, দাউদ বুঝিয়ে বললেন। ‘বেশ, অন্তত আপনার দাড়িটা তো আঁচড়ে নিন’, তাঁরা বললেন। ‘এর মানে হলো এই কাজ করার মতো অবসর আমার আছে’, উত্তরে তিনি বললেন।
এক জ্যোৎস্না রাতে দাউদ তাঁর প্রাসাদের ছাদে উঠলেন আর তাকালেন আকাশের দিকে। আল্লাহর রাজ্যের শ্রেষ্ঠত্বের কথা চিন্তা করে তিনি ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়লেন, আর কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। তাঁর ছাদ থেকে ছিটকে পড়লেন প্রতিবেশীর ছাদে। প্রতিবেশী ভাবলেন, তাঁর ছাদে হয়তো কোনো চোর এসে পড়েছে। তাই তিনি তলোয়ার হাতে ছুটে এলেন। দাউদকে সেখানে দেখতে পেয়ে তাঁর হাত ধরলেন আর জানতে চাইলেন, ‘কে আপনাকে এখানে ছুড়ে ফেলেছে?’ ‘আমি তো সেটা জানি না’, দাউদ জবাব দিলেন। ‘আমি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম, একটুও ধারণা আমার নেই।’
একবার দাউদকে দেখা গেল তড়িঘড়ি করে তিনি নামাজে যাচ্ছেন। ‘এত তটস্থ কী কারণে?’ তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়। ‘শহরের প্রবেশপথে যে সেনাবাহিনী অপেক্ষা করে আছে, তাদের কারণে,’ উত্তরে তিনি বললেন। ‘ওরা আমার জন্য প্রতীক্ষায় আছে।’ ‘কোন সেনাবাহিনী?’ বিস্ময়ে তাঁরা বলে উঠলেন। ‘কবরস্থানের অধিবাসীরা’, দাউদ উত্তর দিলেন।
‘আপনি কুঠুরিটা ঠিকঠাক করছেন না কেন?’ তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়। ‘আমি আল্লাহর সঙ্গে চুক্তি করেছি, এই পৃথিবীকে আর মেরামত না করার।’ যে রাত্রে দাউদ মারা গেলেন, সেদিন ওই বারান্দাটাও পড়ে গেল।
হারুন-আল-রশীদ একদিন আবু ইউসুফকে অনুরোধ করলেন, যেন তিনি দাউদের সঙ্গে তাঁকে দেখা করতে নিয়ে যান। আবু ইউসুফ গেলেন দাউদের বাড়িতে; কিন্তু তাঁকে ভেতরে ঢুকতে মানা করা হলো। অনুমতি পেতে তিনি দাউদের মায়ের কাছে মিনতি জানালেন। ‘ওনাকে আসতে দাও,’ বিনীতভাবে তাঁর মা বললেন। ‘পার্থিব মানুষ আর যারা মন্দ কাজ করে বেড়ায়, তাদের সঙ্গে আমার কী এমন লেনদেন থাকতে পারে?’ প্রত্যাখ্যান করে দাউদ উত্তর দিলেন। ‘আমি তোমাকে শপথ দিচ্ছি আমার দুগ্ধের, তাকে ভেতরে আসতে দাও।’ ‘হে আল্লাহ! তুমিই তো বলেছ, “তোমরা তোমাদের মায়ের অধিকারকে রক্ষা করো, কেননা তাঁর সন্তুষ্টিতেই নিহিত আমার সন্তুষ্টি।” তা না হলে এদের সঙ্গে আমার কীসের সম্পর্ক?’
দাউদ তখন তাঁদের সাক্ষাৎ দিলেন। তাঁরা ঢুকলেন আর আসন গ্রহণ করলেন। দাউদ বক্তব্য দেওয়া আরম্ভ করলেন, আর ঝরঝর করে হারুন কাঁদতে লাগলেন। যখন তিনি প্রস্থান করলেন, একটা স্বর্ণমুদ্রা রেখে গেলেন। ‘এটা বৈধভাবে উপার্জিত’, তিনি বললেন। ‘এটাকে সরিয়ে নাও’, দাউদ বললেন। ‘আমার এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। এ রকম একটা বাড়ি আমি বিক্রি করে দিয়েছি, যা পবিত্র উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলাম, আর এখন সে–ই অর্থ দিয়েই আমার জীবন-খরচা চালাই। আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি—যখন সেটাও শেষ হয়ে যাবে, তখন তিনি যেন আমার প্রাণটাকে নিয়ে নেন, যাতে আমাকে আর কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে না হয়। আমি আশাবাদী যে আল্লাহ আমার প্রার্থনা গ্রহণ করেছেন।’
এরপর হারুন আর আবু ইউসুফ প্রাসাদে ফিরে এলেন। আবু ইউসুফ গেলেন কোষাধ্যক্ষের কাছে। ‘দাউদের অর্থের আর কী পরিমাণ অবশিষ্ট আছে?’ তিনি জানতে চাইলেন। ‘দুই দিরহাম’, কোষাধ্যক্ষের জবাব। ‘তিনি প্রতিদিন একটা করে রৌপ্যমুদ্রা খরচ করতেন’, আবু ইউসুফ হিসাব কষে বললেন। অন্য এক দিন, মিহরাবের (ইমাম দাঁড়ানোর স্থান) দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করলেন, ‘আজকে দাউদ মারা গেছেন।’ অনুসন্ধান করা হলো, আর দেখা গেল ঘটনা সত্যি। ‘আপনি কী করে জানলেন?’ তাঁরা প্রশ্ন করলেন। ‘আমি তাঁর ব্যয় হিসাব করে দেখলাম, আজ তাঁর কাছে আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই’, আবু ইউসুফ বুঝিয়ে বললেন। ‘আমি জানতাম তাঁর প্রার্থনা কবুল হবে।’