অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান
অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের প্রথম গল্প

তৃতীয় সমর্পণ

লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতার জনক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সাহিত্যজীবনের সূচনালগ্নে লেখা ও তাঁর প্রকাশিত প্রথম ছোটগল্প ‘দ্য থার্ড রেজিগনেশন’। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত এই গল্পে মৃত্যুচেতনা, অস্তিত্বের অনিশ্চয়তা এবং মানবিক নিঃসঙ্গতার যে নির্মাণ দেখা যায়, তা পরবর্তী সময়ে মার্কেসের বিখ্যাত কাজগুলোর পূর্বাভাস হয়ে ওঠে।

অনুবাদ: আনিসুজ জামান

আবার সেখানে সেই শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সেই শীতল, কান চিরে দেওয়া, সোজা নেমে আসা শব্দ—যে শব্দটিকে সে ভালো করেই চিনত; কিন্তু এবার সেটি ফিরে এসেছে আরও তীক্ষ্ণ ও পীড়াদায়ক হয়ে, যেন এক দিনের মধ্যেই বদলে গিয়েছে তার অভ্যস্ততা।

শব্দটি মাথার শূন্য খুলিজুড়ে ঘুরছিল—ভোঁতা অথচ খাপরার ভেতরে ঢুকে সুচ দিয়ে খোঁচানোর যন্ত্রণা দিচ্ছিল। তার খুলির চারটি দেয়ালে খুঁচিয়ে মৌচাক তৈরি করেছে শব্দটি। ক্রমেই তা ভেতর থেকে মেরুদণ্ড কাঁপিয়ে দেওয়া বেসুরো কম্পনে আঘাত করতে করতে একের পর এক সর্পিল বৃত্তে বেড়ে উঠছে। এটা তার শরীরের স্বাভাবিক ছন্দের সঙ্গে বেমানান। মানুষ হিসেবে তার দৃঢ় দেহের গঠনশৈলীতে কিছু একটা ভেঙে গেছে—এমন কিছু যা ‘আগে’ স্বাভাবিকভাবে কাজ করত, অথচ এখন তা খুলির ভেতরে শুকনা ও শক্ত আঘাত হয়ে ধাক্কা মারছে, একটি কঙ্কালসার হাতের হাড় তাকে ভেতর থেকে পিটিয়ে যাচ্ছে, আর তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে জীবনের সব তিক্ত অনুভূতিকে। হঠাৎ কপালের দুই পাশে ফুলে ওঠা নীলচে বেগুনি ধমনি চেপে ধরার জন্য হাতে জান্তব ইচ্ছাশক্তি জড়ো করতে পারল। তার ইচ্ছা হচ্ছিল দুটি সংবেদনশীল হাতের তালুর মধ্যে হীরার ধারের মতো বিঁধা শব্দটাকে ধরে ফেলতে। কল্পনার চোখে জ্বরে আক্রান্ত মাথার আনাচকানাচে যন্ত্রণাবাহী শব্দটি ঘুরে বেড়াতে দেখে গৃহপালিত বিড়ালের মতো এক ঝটকায় তার হাতের পেশিগুলো সংকুচিত হলো। সে প্রায় ধরে ফেলেছিল; কিন্তু না।

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস [৬ মার্চ ১৯২৭—১৭ এপ্রিল ২০১৪]

শব্দটির গা ছিল পিচ্ছিল—প্রায় অদৃশ্য; কিন্তু সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল তার সব হতাশার শক্তি দিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য, চিরতরের জন্য তাকে ধরার জন্য, বহুবার শেখা কৌশল কাজে লাগিয়ে তার সব হতাশার শক্তি দিয়ে তাকে চেপে ধরার জন্য।

সে আর কোনোভাবেই শব্দটিকে তার কানে ঢুকতে দেবে না—না, কোনোভাবেই না। চেয়েছিল সেটিকে তাড়িয়ে বের করে দিতে, মুখ দিয়ে, ত্বকের প্রতিটি ছিদ্র দিয়ে, চোখ দিয়ে—যেগুলো শব্দ পালিয়ে যাওয়ার সময় কক্ষচ্যুত হয়ে বেরিয়ে আসবে এবং তার ছিন্নভিন্ন অন্ধকারের গভীর থেকে শব্দের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অন্ধ হয়ে যাবে। সে আর কিছুতেই এই ভাঙা কাচের টুকরা, বরফের নক্ষত্রপুঞ্জ, খুলির দেয়াল খোঁচানো শব্দটিকে সহ্য করবে না। এ রকমই ছিল সেই শব্দ।

কিন্তু তার পক্ষে কপালের দুই পাশ চেপে ধরা অসম্ভব হয়ে উঠল। তার বাহুগুলো সংকুচিত হয়ে গেছে—এখন সেগুলো কোনো বামনের বাহুর মতো; ছোট, গোল, মেদযুক্ত। সে মাথা ঝাঁকাতে চেষ্টা করল। মাথা ঝাঁকাল। তখন শব্দটি খুলির ভেতরে আরও প্রবল হয়ে উঠল। খুলিটি যেন কঠিন হয়ে গেছে, বড় হয়ে গেছে এবং যেন আরও বেশি করে মাধ্যাকর্ষণের টানে নিচের দিকে টানছে। শব্দটি ছিল ভারী ও কঠিন। এত ভারী, এত কঠিন যে যদি সে তাকে ধরতে পারত এবং ধ্বংস করতে পারত, তবে তার মনে হতো যেন সে সিসার তৈরি একটি ফুলের পাপড়ি ছিঁড়ে ফেলছে।

সে কফিনের মধ্যে শুয়ে ছিল, কবর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত; তবু সে জানত, সত্যিই সে মারা যায়নি। যদি সে উঠতে চেষ্টা করত, তবে খুব সহজেই উঠতে পারত—অন্তত ‘আত্মিকভাবে’; কিন্তু তাতে কোনো লাভ হতো না। তার থেকে সেখানে পড়ে থেকে ধীরে ধীরে মরাই ভালো

সে আগেও এই শব্দ অনুভব করেছে ‘আগের বারগুলোতে’ও—এই একই জেদ নিয়ে। যেমন সে অনুভব করেছিল প্রথমবার মারা যাওয়ার পর। একটি মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে সে বুঝতে পেরেছিল, সেটি তার নিজেরই মৃতদেহ। সে তাকিয়েছিল। তারপর নিজেকে স্পর্শ করেছিল। অনুভব করেছিল নিজেকে—অস্পর্শ, স্থানহীন, অস্তিত্বহীন। সে সত্যিই একটি মৃতদেহ ছিল এবং তার তরুণ, অসুস্থ শরীরের ওপর দিয়ে মৃত্যুর অতিক্রম সে ইতিমধ্যেই অনুভব করছিল। পুরো বাড়ির বাতাস শক্ত হয়ে গিয়েছিল, যেন ঘরটা সিমেন্ট দিয়ে ভরে ফেলা হয়েছে। আর সেই ঘন পরিবেশের মাঝখানে যেখানে আগে জিনিসপত্রগুলো ছিল মুক্ত বাতাসের মধ্যে—সে পড়ে আছে, খুব যত্ন করে রাখা হয়েছে একটি কফিনের ভেতর, শক্ত কিন্তু স্বচ্ছ সিমেন্টের এক বাক্সে। ‘সেই শব্দ’টা সেই সময়ও তার মাথার ভেতরে ছিল। তার পায়ের পাতাগুলো কত দূরে, কত ঠান্ডা মনে হচ্ছিল! কফিনের একেবারে অন্য প্রান্তে—সেখানে একটি বালিশ রাখা হয়েছিল। কারণ, বাক্সটি তখনো তার জন্য অনেক বড় ছিল। তাই মৃত শরীরটিকে তার নতুন এবং শেষ পোশাকের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাকে ঠিক করে বসাতে হয়েছিল। তাকে সাদা কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। রুমাল দিয়ে চোয়ালের চারপাশ শক্ত করে বাঁধা হয়েছিল। সে কাফনে মোড়া নিজ সৌন্দর্য অনুভব করছিল; মরণসৌন্দর্য।

সে কফিনের মধ্যে শুয়ে ছিল, কবর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত; তবু সে জানত, সত্যিই সে মারা যায়নি। যদি সে উঠতে চেষ্টা করত, তবে খুব সহজেই উঠতে পারত—অন্তত ‘আত্মিকভাবে’; কিন্তু তাতে কোনো লাভ হতো না। তার থেকে সেখানে পড়ে থেকে ধীরে ধীরে মরাই ভালো—সেই ‘মৃত্যু-রোগে’ মরতে থাকা। অনেক আগে এক ডাক্তার তার মাকে শুকনা গলায় বলেছিলেন:

—ম্যাডাম, আপনার ছেলের গুরুতর একটি রোগ হয়েছে, সে মৃত। তবু তিনি বলেছিলেন, আমরা তার মৃত্যুর পরেও তার জীবন যতটা সম্ভব ধরে রাখার চেষ্টা করব। একটি জটিল স্বপুষ্টির ব্যবস্থার মাধ্যমে তার জৈবিক ক্রিয়াগুলো চালু রাখা সম্ভব হবে। শুধু চলাফেরার ক্রিয়াগুলো বদলে যাবে—স্বতঃস্ফূর্ত গতিবিধি থাকবে না। আমরা তার জীবনের অস্তিত্ব বুঝতে পারব তার স্বাভাবিক বৃদ্ধির মাধ্যমে। এটি কেবল একটি ‘জীবন্ত মৃত্যু’। একটি বাস্তব এবং সত্যিকারের মৃত্যু...

সে এই কথাগুলো এলোমেলোভাবে মনে করতে পারছিল। হয়তো–বা সে এগুলো কখনো শোনেইনি। হয়তো টাইফয়েড জ্বরের তীব্রতার সময় তার মস্তিষ্কই এগুলো তৈরি করেছিল। প্রচণ্ড জ্বরের প্রকোপে যখন সে বিভ্রমে ডুবে যেত, তখন মমি হওয়া ফারাওদের ইতিহাস পড়ত। জ্বর বাড়লে সে নিজেকেই সেই গল্পের নায়ক বলে মনে করত। তখন থেকেই তার জীবনে এক ধরনের শূন্যতা শুরু হয়েছিল। তারপর থেকে সে আর বুঝতে পারত না—কোন ঘটনাগুলো তার বিভ্রমের অংশ, কোনগুলো তার বাস্তব জীবনের। এখনো সেই সন্দেহ দূর হয়নি। হয়তো ডাক্তার কখনো সেই অদ্ভুত ‘জীবন্ত-মৃত্যু’র কথা বলেননি। ব্যাপারটি যুক্তিহীন, পরস্পরবিরোধী, প্রায় অসম্ভব। এ কারণেই এখন তার মনে হচ্ছিল—সম্ভবত সে সত্যিই মারা গেছে, ১৮ বছর ধরেই সে মৃত।

অল্প সময়ের মধ্যেই সে সেই বাক্সের ভেতরেই বড় হতে শুরু করল। প্রতিবছর শেষের বালিশ থেকে একটু করে তুলা বের করে দেওয়া হতো, যাতে তার বৃদ্ধির জন্য জায়গা তৈরি হয়। এভাবে কেটে গেছে তার অর্ধেক জীবন—১৮ বছর। এখন বয়স ২৫। পূর্ণ, স্বাভাবিক মানুষের উচ্চতায় পৌঁছেছে।

তার মৃত্যুর সময় বয়স ছিল সাত বছর। সেই সময় তার মা তার জন্য একটি ছোট কফিন বানিয়েছিল—সবুজ কাঠের তৈরি একটি শিশুর কফিন; কিন্তু ডাক্তার নির্দেশ দিয়েছিলেন একটি বড় বাক্স বানাতে—একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য। কারণ, ছোট কফিনটি তার বৃদ্ধিতে বাধা দিতে পারে। সে হয়তো বিকৃত মৃতদেহে পরিণত হবে, অথবা অস্বাভাবিক জীবিত মানুষে; কিংবা বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গেলে বোঝা যাবে না যে সে সুস্থ হচ্ছে কি না। ডাক্তারের সেই সতর্কতার পর তার মা পূর্ণবয়স্ক মানুষের উপযোগী করে একটি বড় কফিন বানাল, পায়ের কাছে তিনটি বালিশ রাখল, যাতে তাকে ঠিকমতো বসানো যায়।

অল্প সময়ের মধ্যেই সে সেই বাক্সের ভেতরেই বড় হতে শুরু করল। প্রতিবছর শেষের বালিশ থেকে একটু করে তুলা বের করে দেওয়া হতো, যাতে তার বৃদ্ধির জন্য জায়গা তৈরি হয়। এভাবে কেটে গেছে তার অর্ধেক জীবন—১৮ বছর। এখন বয়স ২৫। পূর্ণ, স্বাভাবিক মানুষের উচ্চতায় পৌঁছেছে; কিন্তু কাঠমিস্ত্রি আর ডাক্তার হিসাব করতে ভুল করেছিলেন। তাঁরা কফিনটি আধা মিটার বেশি বড় বানিয়েছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, সে তার আধা বর্বর দৈত্যের আকৃতি বাবার মতো লম্বা হবে; কিন্তু আদতে তা হয়নি। শুধু ঘন দাড়িটা বাবার কাছ থেকে সে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল । নীলচে, ঘন দাড়ি। মা তা নিয়মিত ছেঁটে দিত, যাতে কফিনের ভেতর চেহারাটা ভদ্রস্থ থাকে। গরমের দিনে সেই দাড়ি তাকে ভীষণ বিরক্ত করত।

তবু ‘সেই শব্দে’র চেয়েও তাকে বেশি উদ্বিগ্ন করত আরেকটি জিনিস। ইঁদুর। ছোটবেলায় পৃথিবীতে এমন কিছু ছিল না, যা তাকে ইঁদুরের মতো এত ভয় দেখাত। আর সেই জঘন্য প্রাণীরাই এসে জড়ো হচ্ছিল তার পায়ের কাছে জ্বলতে থাকা মোমবাতির গন্ধে। তারা ইতিমধ্যে তার কাপড় কেটে ফেলেছে। জানত, খুব শিগগির তারা তাকে কুরে খেতে শুরু করবে—তার শরীর খাবে। একদিন সে তাদের দেখতে পেল। চকচকে, পিচ্ছিল শরীরের পাঁচটি ইঁদুর। টেবিলের পা বেয়ে বাক্সের ওপর উঠে তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। যতক্ষণে মা বুঝতে পারবে, ততক্ষণে শুধু ভাঙাচোরা অবশেষ, শক্ত ও ঠান্ডা হাড়গুলো ছাড়া তার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। দেহটা খেয়ে ফেলার ভয় তার তেমন ছিল না। কারণ, শেষ পর্যন্ত সে তার কঙ্কাল নিয়েও বেঁচে থাকতে পারত। তাকে বেশি কষ্ট দিচ্ছিল সেই প্রাণীগুলোর প্রতি তার জন্মগত আতঙ্কের বিষয়টি। এই ছোট ছোট লোমশ প্রাণীগুলো তার সারা দেহের ওপর দিয়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে, চামড়ার ভাঁজে ঢুকে পড়েছে, ঠোঁট দিয়ে তার শীতল পা স্পর্শ করছে—এই চিন্তা মাথায় এলেই তার গা কাঁটা দিত। একবার একটি ইঁদুর তার চোখের পাতায় উঠে এসে কর্নিয়া কুরে খেতে চেষ্টা করল। ইঁদুরটাকে বিশাল, বিকৃত এক দানবের মতো দেখাচ্ছিল, মরিয়া প্রচেষ্টায় রেটিনা ভেদ করতে চাইছে। তখন সে আরেকটি নতুন মৃত্যুর কথা ভাবল এবং পুরোপুরি নিজেকে সেই মাথা ঘোরানো অন্ধকারের দিকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করল।

তার মনে পড়ল, সে এখন প্রাপ্তবয়স্ক। বয়স ২৫। এর মানে সে আর বড় হবে না। তার মুখের রেখাগুলো কঠিন ও গম্ভীর হয়ে উঠবে; কিন্তু যদি সে কখনো সুস্থ হয়ে ওঠে, তবে সে তার শৈশবের কথা বলতে পারবে না; কারণ তার কোনো শৈশব ছিল না। নিজের শৈশব কাটিয়েছে মৃত অবস্থায়।

শৈশব থেকে কৈশোরে যাওয়ার সেই সময়টাতে তার মা খুব যত্ন নিয়েছিল। কফিন আর পুরো ঘরটাকে সে ভীষণ পরিষ্কার রাখত। প্রায়ই ফুলদানির ফুল বদলে দিত এবং প্রতিদিন জানালা খুলে দিত, যাতে তাজা বাতাস ঢুকতে পারে। কী আনন্দই না পেত সেই সময় মাপের ফিতা হাতে নিয়ে! মাপার পর তার ছেলে কয়েক সেন্টিমিটার বড় হয়েছে দেখে কী আনন্দই না পেতেন! তখন সে ছেলেকে জীবিত দেখতে পেয়ে মাতৃত্বের তৃপ্তি অনুভব করত। বাড়িতে যাতে অচেনা কেউ ঢুকতে না পারে, সেটিও সে নিশ্চিত করত। শেষ পর্যন্ত বহু বছর ধরে বাড়ির একটি ঘরে কোনো মৃতদেহের উপস্থিতি ছিল অস্বস্তিকর ও রহস্যময়। সে ছিল আত্মত্যাগী এক নারী; কিন্তু খুব শিগগির তার আশা কমতে শুরু করল। শেষ কয়েক বছরে সে দেখেছে—তার মা বিষণ্ণ চোখে মাপের ফিতার দিকে তাকিয়ে থাকে। সন্তান তার আর বড় হচ্ছে না। গত কয়েক মাসে এক মিলিমিটারও বাড়েনি। তার মা জানত এখন তার প্রিয় মৃত সন্তানের মধ্যে জীবনের উপস্থিতি বোঝা কঠিন হয়ে উঠবে। তার ভয় ছিল—একদিন সকালে হয়তো সে সত্যিই মৃত অবস্থায় জেগে উঠবে। সম্ভবত সেই কারণেই একদিন সে লক্ষ্য করেছিল—তার মা চুপচাপ তার বাক্সের কাছে এসে তার শরীরের গন্ধ নিচ্ছিল। সে হতাশার এক সংকটে পড়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সে যত্ন নেওয়া কমিয়ে দিয়েছিল। এখন আর মাপের ফিতাটিও নিয়ে আসে না। মা জানত, তার ছেলে আর বাড়বে না।

শেষ রাতটি সে সুখেই কাটিয়েছিল—নিজের নিঃসঙ্গ মৃতদেহের সঙ্গে। কিন্তু নতুন দিনের শুরুতে, উষ্ণ সূর্যের প্রথম আলো খোলা জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে সে অনুভব করল তার চামড়া নরম হয়ে গেছে। সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। নড়ল না। বাতাসকে তার শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে যেতে দিল।

আর ছেলে জানত—এখন সে সত্যিই মৃত। সে তা বুঝতে পারছিল সেই শান্ত স্থিরতার মধ্য দিয়ে, যার মধ্যে সে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়েছিল। সবকিছু হঠাৎ বদলে গেছে। যে সূক্ষ্ম স্পন্দনগুলো কেবল সে নিজেই অনুভব করতে পারত, সেগুলো এখন তার নাড়ি থেকে মিলিয়ে গেছে। সে ভারী হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছিল কোনো শক্তিশালী টান তাকে মাটির প্রাথমিক উপাদানের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মাধ্যাকর্ষণের শক্তি এখন তাকে এক অনিবার্য ক্ষমতায় টানছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবু সে এই অবস্থায় বেশি শান্ত। এমনকি তার মৃত্যুকে বাঁচিয়ে রাখতে এখন তাকে শ্বাসও নিতে হচ্ছে না।

কল্পনায়, নিজেকে স্পর্শ না করেই, সে তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ একে একে অনুভব করল। একটি শক্ত বালিশের ওপর তার মাথা ছিল—হালকা করে বাঁ দিকে ঘোরানো। সে কল্পনা করল, তার মুখ আধখোলা, ঠান্ডার পাতলা রেখা তার গলা ভরে দিচ্ছে বরফকুচির মতো। সে ভেঙে পড়েছে, ২৫ বছরের একটি গাছের মতো। হয়তো সে মুখ বন্ধ করতে চেয়েছিল। তার চোয়ালের চারপাশে বাঁধা রুমালটি ঢিলে হয়ে গেছে। সে নিজেকে ঠিক করতে পারল না, নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারল না—এমনকি একটি ‘ভদ্র মৃতদেহের ভঙ্গি’ও নিতে পারল না। এখন তার পেশি ও অঙ্গগুলো আর আগের মতো তার স্নায়ুতন্ত্রের ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। সে আর ১৮ বছর আগের সেই স্বাভাবিক শিশু নয়, যে সহজে নড়াচড়া করতে পারত। সে অনুভব করল তার বাহুগুলো পড়ে আছে—চিরতরে পড়ে আছে, কফিনের নরম দেয়ালের সঙ্গে চেপে। আখরোটের খোসার মতো তার পেট শক্ত; আর নিচে তার পা সম্পূর্ণ, নিখুঁত—একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সম্পূর্ণ শরীরের গঠনকে সম্পূর্ণ করছে। তার শরীর ভারী হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে; কিন্তু শান্তভাবে, কোনো অস্বস্তি ছাড়া। যেন পৃথিবী হঠাৎ থেমে গেছে, কেউ নীরবতাকে ভাঙছে না। যেন বাতাসের মৃদু প্রশান্তিকে বিরক্ত না করার জন্য পৃথিবীর সব ফুসফুস একসঙ্গে শ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সে নিজেকে সুখী মনে করছিল—একটি শিশুর মতো, যে তাজা ও ঘন ঘাসের ওপর চিত হয়ে শুয়ে বিকেলের আকাশে দূরে সরে যাওয়া একটি মেঘ দেখছে। যদিও জানত যে সে মৃত, তবুও সুখী ছিল। জানত যে সে কৃত্রিম রেশমে মোড়া একটি বাক্সের ভেতর চিরদিনের জন্য বিশ্রাম নিচ্ছে। তার মন ছিল অদ্ভুত স্বচ্ছ। তবে আগের মতো নয়, প্রথম মৃত্যুর পর যেভাবে সে অবশ, মূঢ় হয়ে পড়েছিল, তেমন নয়। তার চারপাশে যে চারটি মোমবাতি রাখা হয়েছিল, সেগুলো আবার নিভে যাওয়ার আগে প্রতি তিন মাসে একবার বদলে দেওয়া হতো, ঠিক তখনই, যখন সেগুলো সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হতে চলেছে। একদিন সে টের পেল ভেজা বেগুনি ফুলের ঠান্ডা গন্ধ। ফুলগুলো তার মা সেই ভয়াবহ সকালে এনে রেখেছিল। সে টের পেল লিলির গন্ধ, গোলাপের গন্ধও; কিন্তু সেই ভয়ংকর বাস্তবতা তার মধ্যে কোনো উদ্বেগ সৃষ্টি করেনি; বরং সেখানে, একা নিজের নিঃসঙ্গতার মধ্যে সে সুখী ছিল। পরে কি সে ভয় পাবে?

কে জানে! কাঠের সবুজ কফিনে যখন হাতুড়ির আঘাতে পেরেক ঢুকবে, আবার গাছে পরিণত হওয়ার নিশ্চিত আশায় থাকবে কফিনটা—এই ভাবনা কঠিন ছিল। এখন মাটির অনিবার্য টানে তার শরীর আরও শক্তভাবে আকৃষ্ট হচ্ছে। তার দেহ পড়ে থাকবে স্যাঁতসেঁতে, কাদামাটি আর সাদা মাটির তলায়। আর ওপরে—চার ঘনমিটার মাটির ওপারে ধীরে ধীরে নিভে যাবে কবর খনকদের শেষ হাতুড়ির শব্দ। না, সেখানেও সে ভয় পাবে না। সেটি হবে তার মৃত্যুরই আরেকটি দীর্ঘায়ন—তার নতুন অবস্থার সবচেয়ে স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা।

তার শরীরে আর এক ফোঁটা উষ্ণতাও থাকবে না। তার মজ্জা চিরতরে ঠান্ডা হয়ে যাবে। বরফের ছোট ছোট তারকার মতো শীত প্রবেশ করবে হাড়ের মজ্জা পর্যন্ত। কী সহজেই না সে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে তার মৃত জীবনের নতুন রূপে! তবু একদিন সে অনুভব করবে, তার শক্ত বর্ম ভেঙে পড়ছে। তখন সে তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে মনে করার চেষ্টা করবে; কিন্তু খুঁজে পাবে না। সে বুঝবে তার আর কোনো নির্দিষ্ট আকৃতি নেই। সে মেনে নেবে যে তার ২৫ বছরের নিখুঁত দেহের গঠন হারিয়ে গেছে—সে পরিণত হয়েছে এক মুঠো ধুলায়, যার কোনো আকার নেই, কোনো জ্যামিতিক সংজ্ঞা নেই।

মৃত্যুর সেই বাইবেলীয় ধুলায়। হয়তো তখন একটি প্রকৃত, স্পষ্ট দেহের মৃতদেহ না হয়ে কেবল স্মৃতির অস্পষ্টতায় গড়া এক কল্পিত মৃতদেহ হয়ে থাকার জন্য তার মধ্যে হালকা এক নস্টালজিয়া জাগবে। তখন সে জানবে এবং উঠে যাবে এক আপেলগাছের কৈশিক শিরায়। এক শরতের সকালে কোনো ক্ষুধার্ত শিশুর কামড়ে আবার জেগে উঠবে সে। তখন সে বুঝবে এবং যা তাকে সত্যিই দুঃখ দেবে সে তার একক সত্তা হারিয়েছে। সে আর কোনো একক সাধারণ মৃতদেহ নয়।

শেষ রাতটি সে সুখেই কাটিয়েছিল—নিজের নিঃসঙ্গ মৃতদেহের সঙ্গে।

কিন্তু নতুন দিনের শুরুতে, উষ্ণ সূর্যের প্রথম আলো খোলা জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে সে অনুভব করল তার চামড়া নরম হয়ে গেছে। সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। নড়ল না। বাতাসকে তার শরীরের ওপর দিয়ে বয়ে যেতে দিল। তার সন্দেহ করার উপায় ছিল না যে সেই ‘গন্ধ’ এসে গেছে। রাতের মধ্যে লাশের পচন শুরু হয়ে গেছে। তার শরীর পচতে শুরু করেছে—যেমন সব মৃতদেহ পচে। গন্ধটা ছিল স্পষ্ট—অস্বীকার করা যায় না পচা মাংসের এমন গন্ধ, যা কখনো মিলিয়ে যায়, আবার ফিরে আসে আরও তীব্র হয়ে। গত রাতের গরমে তার শরীর পচতে শুরু করেছে। হ্যাঁ। সে পচে যাচ্ছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার মা আসবে ফুল বদলাতে। দরজার দোরগোড়া থেকেই টের পাবে পচা মাংসের দুর্গন্ধ। তখনই তাকে নিয়ে যাওয়া হবে তার দ্বিতীয় মৃত্যুর ঘুমে—অন্য মৃতদের পাশে।

কিছুক্ষণ আগেও সে নিজের মৃত্যুকে নিয়ে সুখী ছিল। কারণ, সে বিশ্বাস করছিল, সে মৃত। একজন মৃত মানুষ তার অনিবার্য অবস্থার সঙ্গে সুখে থাকতে পারে; কিন্তু একজন জীবিত মানুষ কখনো মেনে নিতে পারে না যে তাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হবে। তবু তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না।

কিন্তু হঠাৎ ভয় তাকে পেছন থেকে ছুরির মতো বিদ্ধ করল।

ভয়! কী গভীর, কী অর্থপূর্ণ শব্দ! এখন তার সত্যিই ভয় লাগছে—একটি বাস্তব, শারীরিক ভয়। কেন? সে তা খুব ভালো করেই বুঝতে পারল। তার শরীর কেঁপে উঠল। সম্ভবত সে মৃত নয়। তাকে এই নরম গদিওয়ালা ভয়ংকরভাবে আরামদায়ক বাক্সে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে—যেটা সে এখন স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে। আর সেই ভয়ের অপচ্ছায়া তার সামনে বাস্তবতার জানালাটা খুলে দিয়েছে: তাকে জীবন্ত অবস্থায় কবর দেওয়া হবে!

সে মৃত হতে পারে না। কারণ, সে সবকিছু স্পষ্টভাবে অনুভব করছে। তার চারপাশে ঘুরে বেড়ানো জীবনের শব্দ। খোলা জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া হেলিওট্রোপ ফুলের উষ্ণ গন্ধ—মিশে যাচ্ছে সেই অন্য ‘গন্ধের’ সঙ্গে। সে পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছে পুকুরে ধীরে ধীরে পড়ে যাওয়া পানির শব্দ। আর কোণে আটকে থাকা ঝিঁঝি পোকার গান—এখনো গাইছে, যেন এখনো ভোর শেষ হয়নি।

সবকিছুই তার মৃত্যুকে অস্বীকার করছিল। সবকিছু—শুধু সেই ‘গন্ধ’ ছাড়া; কিন্তু সে কী করে নিশ্চিত হবে যে সেই গন্ধ তার নিজের? হয়তো আগের দিন তার মা ফুলদানির পানি বদলাতে ভুলে গিয়েছিল, ফুলের ডাঁটাগুলো পচে গেছে। অথবা হয়তো বিড়াল যে ইঁদুরটাকে টেনে এনে তার ঘরে ফেলেছিল, সেটা গরমে পচে গেছে।

না। গন্ধটা তার শরীরের হতে পারে না।

কিছুক্ষণ আগেও সে নিজের মৃত্যুকে নিয়ে সুখী ছিল। কারণ, সে বিশ্বাস করছিল, সে মৃত। একজন মৃত মানুষ তার অনিবার্য অবস্থার সঙ্গে সুখে থাকতে পারে; কিন্তু একজন জীবিত মানুষ কখনো মেনে নিতে পারে না যে তাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হবে। তবু তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না। সে কথা বলতে পারছিল না; এটাই তাকে আতঙ্কিত করছিল—তার জীবনের এবং মৃত্যুর সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। তাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হবে। সে অনুভব করবে তার শরীর শূন্যে দুলছে—বন্ধুদের কাঁধে তুলে নেওয়া হয়েছে তাকে; আর প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে তার আতঙ্ক আর হতাশা আরও বড় হয়ে উঠবে শবযাত্রার পথে।

নিরর্থকভাবে সে চেষ্টা করবে উঠে বসতে, তার পুরো ক্ষীণ শক্তি দিয়ে ডাকতে, অন্ধকার ও সরু কফিনের ভেতর থেকে আঘাত করতে—যাতে তারা বুঝতে পারে, সে এখনো বেঁচে আছে, তারা তাকে জীবন্ত কবর দিতে যাচ্ছে। সবই বৃথা যাবে। সেখানেও তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তার স্নায়ুতন্ত্রের শেষ মরিয়া আহ্বানে সাড়া দেবে না।

সে পাশের ঘর থেকে শব্দ শুনল। সে কি ঘুমিয়ে ছিল? তার মৃত জীবনের এসব অভিজ্ঞতা কি তবে এক দুঃস্বপ্ন? কিন্তু বাসনের শব্দ আর হলো না। সে দুঃখ পেল, হয়তো একটু বিরক্তিও। সে চাইছিল পৃথিবীর সব বাসন একসঙ্গে ভেঙে পড়ুক তার পাশেই—যাতে বাইরের কোনো শক্তি তাকে জাগিয়ে তোলে। কারণ, তার নিজের ইচ্ছা ব্যর্থ হয়েছে।

কিন্তু না; এটা কোনো স্বপ্ন ছিল না। সে নিশ্চিত—যদি এটা স্বপ্ন হতো, তবে বাস্তবে ফিরে আসার শেষ চেষ্টা ব্যর্থ হতো না। সে আর কখনো জাগবে না। সে অনুভব করছিল কফিনের কোমলতা। ‘গন্ধ’ আবার ফিরে এসেছে—এবার আরও তীব্রভাবে, এত তীব্র যে সে সন্দেহ করতে শুরু করল এটা হয়তো তার নিজের গন্ধ। সে চাইছিল তার শরীর পচে যাওয়ার আগে আত্মীয়রা আসুক, যাতে সেই পচা মাংসের দৃশ্যে তাদের ঘৃণা না হয়। পাড়ার লোকেরা মুখে রুমাল চেপে ভয়ে কফিন থেকে দূরে সরে যাবে। তারা থুতু ফেলবে। না। তা হতে পারে না। তার থেকে তাকে কবর দেওয়াই ভালো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ‘এই’ অবস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়াই ভালো। এখন সে নিজেই নিজের মৃতদেহ থেকে মুক্তি পেতে চাইছিল। এখন সে জানত—সে সত্যিই মৃত। অথবা অন্তত এত সামান্যভাবে জীবিত যে তা বোঝা যায় না। আসলে দুটিই এক। যা–ই হোক, ‘গন্ধ’ তো রয়েই গেছে।

সে মেনে নেবে শেষ প্রার্থনার শব্দ, সেই লাতিন ভাষার বাক্যগুলো যেগুলোর উত্তর দেবে ভুলভালভাবে পাদরির কিশোর সহকারীরা। কবরস্থানের ঠান্ডা—যেখানে ধুলা আর হাড়ের গন্ধ, সেটি হয়তো তার হাড় পর্যন্ত পৌঁছাবে এবং হয়তো সেই ‘গন্ধ’ কিছুটা মুছে দেবে। হয়তো—কে জানে! শেষ মুহূর্তের তীব্রতা তাকে এই স্থবির অসারতা থেকে জাগিয়ে তুলবে। তখন অনুভব করবে সে নিজের ঘামে ভাসছে—একটা ঘন, আঠালো তরলে—যেমন ভেসেছিল জন্মের আগে মায়ের গর্ভে। হয়তো তখন সে জীবিত হবে।

কিন্তু তখন মৃত্যুকে সে এতটাই মেনে নিয়েছে যে হয়তো মারা যাবে এই সমর্পণের মধ্য দিয়েই।