
দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীর মরমি কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তারের তাজকিরাত আল-আউলিয়া ফারসি ভাষায় রচিত সুফিদের জীবনীভিত্তিক একটি আকরগ্রন্থ। বাংলায় এর আক্ষরিক অর্থ ‘সাধুদের জীবনী’। মূল বইটির পরিসর অনেক বিস্তৃত, কিন্তু ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ এবং তাসাউফ ও ফারসি সাহিত্যের পণ্ডিত এ জে আরবেরি (১৯০৫–১৯৬৯) এই বইটির একটি অ্যাব্রিজড বা সংক্ষিপ্ত ভার্সন প্রকাশ করেছেন। ২০০০ সালে ইংরেজি ভাষায় এটি মুসলিম সেইন্টস অ্যান্ড মিস্টিকস নামে বের হয়। বইটিতে ৩৮টি অধ্যায়ে ভাগ করে সুফিসাধক ও তাঁদের জীবনের নানা লোকাতীত ঘটনার উল্লেখ করেছেন আরবেরি। এর একটি এপিসোড পারস্যের প্রখ্যাত সুফিসাধক মনসুর আল-হাল্লাজের নামে। সেখান থেকে এই অধ্যায়টি মূলানুগ অনুবাদ করা হয়েছে। এটি সুফি আখ্যানভিত্তিক সাহিত্যিক বয়ান; এতে বর্ণিত অলৌকিক ঘটনাগুলো ঐতিহাসিকভাবে সর্বসম্মত বা ধর্মীয়ভাবে সর্বজনস্বীকৃত নয়।
ইসলামি রহস্যবাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব—আবু আল-মুগিস আল-হোসাইন ইবনে মনসুর আল-হাল্লাজ আনুমানিক ২৪৪ হিজরিতে (৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) পারস্যের ফার্স প্রদেশের আল-বাইজার কাছে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করেছিলেন; প্রথমে তোস্তার ও বাগদাদ, তারপর মক্কায় এবং পরবর্তী সময়ে খুজেস্তান, খোরাসান, মাওয়ারাননহর, সিস্তান, ভারত ও তুর্কিস্তান। অবশেষে তিনি বাগদাদে ফিরে আসেন। সেখানে আল্লাহর সঙ্গে একাত্মতার বিষয়ে তাঁর সাহসী বক্তব্যের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে অবতারবাদের অভিযোগ আনা হয় এবং তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় এবং ৩০৯ হিজরির ২৯ জিলকদ (২৮ মার্চ ৯২২ খ্রিষ্টাব্দ) নির্মমভাবে সেই সাজা কার্যকর করা হয়। বহু গ্রন্থ ও বিপুলসংখ্যক কবিতার রচয়িতা এই সাধক মুসলিম লোকগাথায় আল্লাহর প্রেমে আত্মনিবেদিত এক চিরন্তন প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
হাল্লাজের পরিব্রাজন
হোসাইন-ই মনসুর, যাঁকে হাল্লাজ বা ‘ধুনকর’ বলা হতো, প্রথমে তোস্তারে আসেন। সেখানে তিনি দুই বছর সাহল ইবনে আবদুল্লাহর সান্নিধ্যে সময় কাটান। এরপর তিনি বাগদাদের উদ্দেশে রওনা হন। আঠারো বছর বয়সেই তিনি তাঁর প্রথম সফরে বের হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বসরায় যান এবং আমর ইবনে ওসমানের দরবারে যোগ দিয়ে তাঁর সাহচর্যে আঠারো মাস কাটান। ইয়াকুব-ই আকতা তাঁর কন্যার সঙ্গে হাল্লাজের বিয়ে দেন; যার জেরে আমর ইবনে ওসমান তাঁর ওপর অসন্তুষ্ট হন।
তাই তিনি বসরা ত্যাগ করেন এবং বাগদাদে এসে জুনায়েদ বাগদাদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। জুনায়েদ তাঁকে নীরবতা ও নির্জনতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন। তিনি কিছুকাল জুনায়েদের সাহচর্যে থাকেন, তারপর হেজাজের উদ্দেশে রওনা হন। এক বছর মক্কায় অবস্থান করার পর তিনি আবার বাগদাদে ফিরে আসেন। একদল সুফিকে সঙ্গে করে তিনি জুনায়েদের মজলিসে হাজির হন এবং তাঁকে বেশ কিছু প্রশ্ন করেন; কিন্তু জুনায়েদ তাঁর কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দেননি।
‘সেই সময় শিগগিরই আসবে,’ জুনায়েদ তাঁকে বললেন, ‘যখন তুমি কাঠের একটা টুকরোকে রক্তে রঞ্জিত করবে।’ ‘যেদিন আমি ওই কাঠের টুকরোকে রক্তে রাঙাব,’ হাল্লাজ উত্তর দিলেন, ‘সেদিন আপনি থাকবেন আচারবাদীদের পোশাকে।’
ঘটনা তেমনই ঘটেছিল। যেদিন নেতৃস্থানীয় পণ্ডিতেরা রায় ঘোষণা করলেন যে হাল্লাজকে অবশ্যই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে, সেদিন জুনায়েদ সুফিদের খিরকা পরে ছিলেন; তাই তিনি পরোয়ানায় স্বাক্ষর করলেন না। খলিফা বললেন, ‘জুনায়েদের স্বাক্ষরও আবশ্যক।’ তখন জুনায়েদ পণ্ডিতদের পাগড়ি ও চোগা পরে মাদ্রাসায় গেলেন এবং পরোয়ানাটি অনুমোদন করলেন। ‘আমরা বিচার করি বাহ্যিক রূপ দেখে।’ তিনি লিখলেন। ‘আর অন্তরের সত্য—সেটা কেবল আল্লাহই ভালো জানেন।’
জুনায়েদ যখন তাঁর নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানালেন, হাল্লাজ বিরক্ত হলেন এবং কোনো বিদায় না নিয়েই তোস্তারে চলে গেলেন। সেখানে তিনি এক বছর অবস্থান করলেন এবং মানুষের ব্যাপক প্রশংসা পেলেন। কিন্তু প্রচলিত মতবাদকে কোনো গুরুত্ব না দেওয়ায় ধর্মতাত্ত্বিকেরা তাঁর প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠলেন। এদিকে আমর ইবনে ওসমান খুজেস্তানের মানুষের কাছে হাল্লাজ সম্পর্কে চিঠি লিখলেন, যাতে তাঁদের চোখে তাঁকে কলঙ্কিত করা যায়। হাল্লাজও ওই জায়গায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি সুফিদের পোশাক ছেড়ে সাধারণ চোগা পরিধান করলেন এবং দুনিয়াবি মানুষের সান্নিধ্যে সময় কাটাতে লাগলেন। কিন্তু তাতেও কোনো পরিবর্তন হলো না। এরপর তিনি পাঁচ বছরের জন্য অন্তরালে চলে গেলেন। এই সময়ের একাংশ তিনি খোরাসান ও মাওয়ারাননহরে কাটালেন, আর বাকি অংশ সিস্তানে।
হাল্লাজ এরপর আহওয়াজে ফিরে এলেন, সেখানে তাঁর বক্তব্য অভিজাত ও সাধারণ—উভয় শ্রেণির মানুষেরই প্রশংসা কুড়াল। তিনি মানুষের অন্তর্নিহিত রহস্য নিয়ে কথা বলতেন; এ কারণে তাঁর নাম হয় ‘ভেতর-রহস্যের হাল্লাজ’। এরপর তিনি দরবেশদের জীর্ণ পোশাক পরিধান করলেন এবং একই পোশাক পরিহিত একদল সঙ্গীকে নিয়ে পবিত্র ভূমির উদ্দেশে রওনা হলেন। তিনি যখন মক্কায় পৌঁছালেন, ইয়াকুব-ই নাহরাজুরি তাঁকে জাদুকর বলে আখ্যা দিলেন। তাই তিনি বসরায় এবং পরে আহওয়াজে ফিরে এলেন। ‘এবার আমি শিরকের দেশগুলোতে যাচ্ছি, মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাতে,’ তিনি ঘোষণা করলেন।
এরপর তিনি ভারতে গেলেন, তারপর মাওয়ারাননহরে, তারও পর চীনে। সেখানে তিনি মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকলেন এবং তাদের জন্য গ্রন্থ রচনা করলেন। পৃথিবীর সেই দূরদূরান্তের সফর শেষে ফিরে এলে সেসব অঞ্চলের মানুষেরা তাঁকে চিঠি লিখতে শুরু করল। ভারতীয়রা তাঁকে ‘আবু আল-মুগিস’, চীনারা ‘আবু আল-মুইন’, খোরাসানিরা ‘আবু আল-মুহর’, ফার্সিরা ‘আবু আবদুল্লাহ’ এবং খুজেস্তানিরা ‘ভেতর-রহস্যের হাল্লাজ’ নামে সম্বোধন করত। বাগদাদে তিনি ‘মুসতালেম’ এবং বসরায় পরিচিত হলেন ‘মুখাব্বার’ নামে।
হাল্লাজের দহন
এরপর হাল্লাজকে ঘিরে নানা আখ্যান ছড়াতে শুরু করল। ফলে তিনি মক্কার উদ্দেশে রওনা হলেন এবং সেখানে দুই বছর অবস্থান করলেন। ফিরে আসার পর তাঁর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেল। তিনি তখন এক ভিন্ন মানুষ; এমন ভাষায় মানুষকে ‘সত্যে’-এর দিকে আহ্বান করতে থাকলেন, যা কারও বোধগম্য ছিল না। বলা হয়ে থাকে, তাঁকে পঞ্চাশটি শহর থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
বিভ্রান্ত হয়ে মানুষ তাঁকে নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ল। তাঁর যেমন অসংখ্য নিন্দুক ছিল, তেমনি ছিল অগণিত সমর্থক। লোকে তাঁর বহু অলৌকিক কাণ্ডকারখানা প্রত্যক্ষ করেছিল। মুখে মুখে তাঁর কথা ছড়াতে ছড়াতে খলিফার কানেও পৌঁছাল। অবশেষে সবাই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলো যে ‘আমিই সত্য’— এই উক্তির কারণেই তাঁর মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত।
‘বলো, “তিনিই সত্য”,’ তারা চিৎকার করে তাঁকে বলল। ‘হ্যাঁ, তিনিই সব,’ হাল্লাজ জবাব দিলেন। ‘তোমরা বলছ, তিনি হারিয়ে গেছেন। অথচ হারিয়ে গেছে এই হোসাইন। মহাসমুদ্র কখনো মিলিয়ে যায় না, কমেও না।’ তারা জুনায়েদকে বলল, ‘হাল্লাজ যা বলছেন, তার একটা গূঢ় অর্থ রয়েছে।’ ‘ওকে মেরে ফেলা হোক,’ জুনায়েদ জবাব দিলেন। ‘এখন গূঢ় অর্থ খোঁজার সময় নয়।’
এরপর একদল ধর্মতাত্ত্বিক হাল্লাজের বিরুদ্ধে জোট বাঁধল এবং তাঁর বক্তব্যের একটি বিকৃত রূপ মুতাসিমের কাছে পেশ করল। তারা তাঁর উজির আলী ইবনে ঈসাকেও হাল্লাজের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলল। খলিফা আদেশ দিলেন, ‘তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হোক।’ সেখানে তিনি এক বছর বন্দী ছিলেন। কিন্তু মানুষ তখনো নিজেদের নানা সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে পরামর্শ চাইতে আসত। তাই তাদেরকে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে নিষেধ করা হলো এবং পাঁচ মাস কেউই তাঁর কাছে যেতে পারল না—শুধু একবার ইবনে আতা এবং একবার ইবনে খাফিফ ছাড়া।
এমন সময় ইবনে আতা তাঁর কাছে একটি বার্তা পাঠালেন।
‘শায়খ, আপনি যা বলেছেন, তার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিন, যাতে আপনাকে মুক্তি দেওয়া হয়।’ ‘যিনি এ কথা বলেছেন, তাঁকে গিয়ে বলো, তিনিই যেন ক্ষমা চান,’ হাল্লাজ জবাব দিলেন। এই উত্তর শুনে ইবনে আতা কেঁদে ফেললেন। ‘আমরা হাল্লাজের একটা ভগ্নাংশও নই,’ তিনি বললেন। কথিত আছে, কারাবাসের প্রথম রাতে কারারক্ষীরা তাঁর কক্ষে গিয়ে তাঁকে খুঁজে পেল না। তারা পুরো কারাগার তন্ন তন্ন করে খুঁজল, কিন্তু একটি প্রাণেরও সন্ধান মিলল না। দ্বিতীয় রাতে অনেক খুঁজেও তারা না পেল হাল্লাজকে, না সেই কারাগারকে। তৃতীয় রাতে তারা তাঁকে আবার কারাগারেই খুঁজে পেল।
‘প্রথম রাতে আপনি কোথায় ছিলেন, আর দ্বিতীয় রাতে আপনি এবং এই কারাগার—উভয়েই–বা কোথায় ছিলেন?’ তারা জানতে চাইল। ‘এখন আবার আপনাকে এবং কারাগার—দুইয়েরই দেখা মিলছে। এ কেমন কাণ্ড?’ ‘প্রথম রাতে,’ তিনি জবাব দিলেন, ‘আমি ছিলাম তাঁর সান্নিধ্যে; তাই এখানে ছিলাম না। দ্বিতীয় রাতে স্বয়ং তাঁর উপস্থিতি এখানে ছিল; ফলে আমরা দুজনেই অনুপস্থিত ছিলাম। আর তৃতীয় রাতে আমাকে ফিরিয়ে পাঠানো হয়েছে, যাতে বিধান অক্ষুণ্ণ থাকে। এখন আসো, তোমাদের কাজ করো!’
হাল্লাজকে যখন প্রথম আটক করা হলো, তখন কারাগারে তিন শ জন মানুষ ছিল। সেই রাতে তিনি তাদেরকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘হে বন্দীরা, আমি কি তোমাদেরকে মুক্ত করে দেব?’ ‘আপনি নিজেকেই মুক্ত করছেন না কেন?’ তারা জবাব দিল। ‘আমি আল্লাহর বন্দী; আমি মুক্তির প্রহরী,’ তিনি উত্তর দিলেন। ‘আমি যদি চাই, তবে মাত্র একটা ইশারায় সব বাঁধন খুলে দিতে পারি।’
হাল্লাজ তাঁর আঙুল দিয়ে একটি ইশারা করলেন, আর সব বাঁধন ছিঁড়ে গেল। ‘এখন আমরা কোথায় যাব?’ কারাবন্দীরা জানতে চাইল, ‘কারাগারের ফটক তো তালাবদ্ধ।’ হাল্লাজ আবার ইশারা করলেন, আর দেয়ালগুলোতে ফাটল দেখা দিল। ‘এবার তোমরা নিজেদের পথে যাও,’ তিনি বললেন। ‘আপনিও কি আসছেন না?’ তারা জানতে চাইল। ‘না,’ তিনি জবাব দিলেন, ‘তাঁর সঙ্গে আমার এমন এক গোপন রহস্য রয়েছে, যা ফাঁসির মঞ্চ ছাড়া আর কোথাও বলা সম্ভব নয়।’
‘বন্দীরা সব কোথায় গেল?’ পরদিন সকালে কারারক্ষীরা তাঁকে জিজ্ঞেস করল। ‘আমি তাদেরকে মুক্ত করে দিয়েছি,’ হাল্লাজ উত্তর দিলেন। ‘আপনি কেন গেলেন না?’ তারা জানতে চাইল। ‘আল্লাহর কাছে আমার জবাবদিহি করার আছে, তাই আমি যাইনি,’ তিনি জবাব দিলেন। এই কথা খলিফার কানে পৌঁছাল। ‘দাঙ্গা লেগে যাবে,’ তিনি চিৎকার করে উঠলেন। ‘ওকে হত্যা করো, কিংবা লাঠি দিয়ে পেটাও যতক্ষণ না সে নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করে।’ তারা তাঁকে লাঠি দিয়ে তিন শ বার আঘাত করল। প্রতিটি আঘাতের সঙ্গে একটি স্পষ্ট কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছিল, ‘ভয় পেয়ো না, মনসুরের ছেলে!’
এরপর তারা তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করার জন্য বাইরে নিয়ে গেল। তেরোটি ভারী শিকলে বাঁধা হাল্লাজ দুই হাত দুলিয়ে এক খাঁটি ভবঘুরের মতো বুক ফুলিয়ে হেঁটে চললেন। ‘আপনি এত দর্পভরে হাঁটছেন কেন?’ তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করল। ‘কারণ আমি জবাইখানায় যাচ্ছি,’ তিনি জবাব দিলেন। আর তিনি স্পষ্ট কণ্ঠে আবৃত্তি করলেন—
আমার অন্তরঙ্গ বন্ধুকে নীচ অবিচারের
দায়ে অভিযুক্ত করা চলে না।
তিনি আমাকে নিজের মতোই সেরা পানীয় খাইয়েছেন,
যেমন উদার গৃহকর্তা তাঁর অতিথিকে আপ্যায়ন করেন।
আর যখন সেই পানপর্ব পুরোপুরি শেষ হলো,
তিনি চেয়ে পাঠালেন তরবারি আর কাফনের কাপড়।
গ্রীষ্মের মৌসুমে ড্রাকোর সঙ্গে যে সংযম হারিয়ে
পান করে, তার পরিণতি এমনই।
বাব আত-তাকের ফাঁসির মঞ্চের গোড়ায় যখন হাল্লাজকে নিয়ে আসা হলো, তিনি কাঠটিতে চুমু খেলেন এবং সিঁড়িতে পা রাখলেন। ‘কেমন বোধ করছ?’ তারা তাঁকে উপহাস করে জিজ্ঞেস করল। ‘সত্যমানুষদের ঊর্ধ্বগমন তো এই ফাঁসির মঞ্চের চূড়াতেই,’ তিনি জবাব দিলেন। তাঁর কোমরে একটি লঙ্গোট (কটিবস্ত্র) বাঁধা ছিল, আর কাঁধে ছিল একটি চাদর। মক্কার দিকে ফিরে তিনি তাঁর দুই হাত ওপরে তুললেন এবং আল্লাহর সঙ্গে নিভৃত সংলাপে মগ্ন হলেন। ‘তিনি যা জানেন, কোনো মানুষ তা জানে না,’ তিনি বললেন। এরপর তিনি ফাঁসিকাষ্ঠে আরোহণ করলেন।
‘আমাদের সম্পর্কে আপনার রায় কী,’ তাঁর একদল অনুসারী জানতে চাইল, ‘যারা আপনার শিষ্য; আর তাদের সম্পর্কেই–বা কী, যারা আপনার নিন্দা করছে এবং আপনাকে পাথর ছুড়ে মারতে চায়?’ ‘তারা পাবে দ্বিগুণ পুরস্কার, আর তোমরা পাবে এক গুণ,’ তিনি জবাব দিলেন। ‘তোমরা স্রেফ আমার সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করো। আর তারা—আল্লাহর প্রতি নিজেদের অটুট বিশ্বাস থেকেই বিধানের কঠোরতা বজায় রাখতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।’
শিবলি এলেন এবং তাঁর মুখোমুখি দাঁড়ালেন।
‘আমরা কি তোমাকে জগৎসংসার থেকে নিষিদ্ধ করিনি?’ তিনি চিৎকার করে উঠলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘সুফিবাদ কী, হাল্লাজ?’ ‘এর ক্ষুদ্রতম অংশ হলো এই, যা তুমি দেখছ,’ হাল্লাজ উত্তর দিলেন। ‘এর উচ্চতর অংশ কোনটি?’ শিবলি জানতে চাইলেন। ‘সেখানে তুমি পৌঁছাতে পারবে না,’ হাল্লাজের জবাব। তখন উপস্থিত দর্শকেরা তাঁকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে শুরু করল। শিবলিও, লোকদেখানো নিয়মরক্ষার্থে, একটি মাটির ঢিল ছুড়লেন। হাল্লাজ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
‘এত পাথরের আঘাতেও আপনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন না অথচ একটা মাটির ঢিলের কারণে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন?’ তারা জিজ্ঞেস করল। ‘কারণ যারা পাথর ছুড়ছে, তারা জানে না তারা কী করছে; তাদের অজুহাত আছে। কিন্তু ওর ছোড়া মাটির ঢিল আমার হৃদয়ে আঘাত করেছে, কারণ সে জানে যে আমার দিকে তার কিছুই ছুড়ে মারা উচিত নয়।’
এরপর তারা তাঁর দুই হাত কেটে ফেলল। তিনি হাসলেন। ‘হাসছেন কেন?’ তারা চিৎকার করে উঠল। ‘হাত-পা বাঁধা একজন মানুষের হাত কেটে ফেলা তো সহজ,’ তিনি উত্তর দিলেন। ‘আসল পুরুষ তো সে, যে নিজের সিফাতের (গুণাবলির) হাত কেটে ফেলতে পারে—যে সিফাত আরশের কপাল থেকে সাধনার মুকুটকে ছিনিয়ে আনে।’
‘এমনটা কেন করলেন?’ তারা জানতে চাইল। ‘আমার শরীর থেকে প্রচুর রক্ত বেরিয়ে গেছে,’ তিনি জবাব দিলেন। ‘আমি বুঝতে পারছি, আমার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তোমরা ভাবছ, ভয়ের কারণেই আমার মুখ এমন ফ্যাকাশে। তাই আমি মুখে রক্ত মেখেছি, যাতে তোমাদের চোখে আমাকে রক্তাভ দেখায়। বীরদের প্রসাধন তো তাদের রক্ত।’ ‘মুখে না হয় রক্ত মাখলেন, কিন্তু দুই বাহু কেন রাঙালেন?’ ‘আমি অজু করছিলাম।’ ‘কিসের অজু?’ ‘প্রেমে মগ্ন হয়ে যখন কেউ দুই রাকাত নামাজ পড়ে,’ হাল্লাজ উত্তর দিলেন, ‘রক্ত দিয়ে সম্পন্ন না করলে সেই অজু পূর্ণতা পায় না।’
এরপর তারা তাঁর দুই চোখ উপড়ে ফেলল। উন্মত্ত জনতার মধ্যে থেকে একটা গর্জন উঠে এল। কেউ কেঁদে উঠল, কেউ পাথর ছুড়ল। তারপর তারা তাঁর জিহ্বা কেটে ফেলার উদ্যোগ নিল। ‘একটু ধৈর্য ধরো, আমাকে একটা কথা বলার সুযোগ দাও,’ তিনি আরজি জানালেন। ‘হে আল্লাহ,’ আকাশের দিকে মুখ তুলে তিনি উচ্চকণ্ঠে বললেন, ‘তোমার খাতিরে তারা আমার ওপর যে যন্ত্রণা বয়ে আনছে, তার জন্য তুমি তাদেরকে বঞ্চিত কোরো না; এই পরম সৌভাগ্য থেকেও তাদেরকে বঞ্চিত কোরো না। প্রশংসা আল্লাহর, কারণ তোমার পথে চলতে গিয়েই তারা আমার পা কেটে ফেলেছে। আর যদি তারা আমার ধড় থেকে মাথাটা বিচ্ছিন্ন করে, তবে তোমার মহিমা অবলোকন করতে করতেই তারা আমাকে এই ফাঁসির মঞ্চের শীর্ষে উন্নীত করবে।’
এরপর তারা তাঁর কান ও নাক কেটে ফেলল। কলসি কাঁখে এক বৃদ্ধা সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। হাল্লাজকে দেখে সে চিৎকার করে উঠল, ‘মারো, আরও কষে, আরও মোক্ষম মার মারো। এই চুনোপুঁটি ধুনকর আল্লাহর কথা বলে কোন সাহসে?’
হাল্লাজের শেষ কথাগুলো ছিল এই—‘পরমের প্রেম হলো পরমেরই একাকিত্ব।’ তারপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করলেন: ‘যারা এতে বিশ্বাস করে না, তারা একে ত্বরান্বিত করতে চায়; আর যারা এতে বিশ্বাস করে, তারা একে ভয় পায়, কারণ তারা জানে—এটাই সত্য।’ এটিই ছিল তাঁর শেষ উক্তি। এরপর তারা তাঁর জিহ্বা কেটে ফেলল। যখন তারা তাঁর মাথা কাটল, তখন মাগরিবের নামাজের সময়। এমনকি যখন তারা তাঁর শিরশ্ছেদ করছিল, তখনো হাল্লাজ হাসছিলেন। তারপর তিনি প্রাণত্যাগ করলেন।
জনতার মধ্যে একটা প্রচণ্ড চিৎকার উঠল। হাল্লাজ নিয়তির বলটিকে আত্মসমর্পণের মাঠের সীমারেখা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাঁর দেহের প্রতিটি অঙ্গ থেকে ধ্বনিত হতে লাগল, ‘আমিই পরম সত্য।’ ‘এই কেলেঙ্কারি তাঁর জীবদ্দশার চেয়েও বড় আকার ধারণ করবে।’ তাই তারা তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পুড়িয়ে ফেলল। কিন্তু তাঁর ভস্ম থেকেও আওয়াজ আসতে লাগল, ‘আমিই পরম সত্য’—যেমন তাঁকে হত্যা করার সময় তাঁর রক্তের প্রতিটি ফোঁটা ঝরে পড়তে পড়তে ‘আল্লাহ’ শব্দের অবয়ব ধারণ করছিল। হতবাক তারা তাঁর ছাই টাইগ্রিস (দজলা) নদীতে নিক্ষেপ করল। পানির ওপর ভেসে থাকাকালেও সেই ছাই থেকে অবিরাম ধ্বনিত হতে লাগল, ‘আমিই পরম সত্য।’
হাল্লাজ অবশ্য বলেছিলেন, ‘যখন তারা আমার ভস্ম টাইগ্রিস নদীতে নিক্ষেপ করবে, বাগদাদ তখন পানিতে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হবে। তখন পানির সামনে আমার আলখাল্লাটি মেলে ধরো; তা না হলে বাগদাদ ধ্বংস হয়ে যাবে।’ তাঁর খাদিম যখন দেখলেন কী ঘটেছে, তিনি হাল্লাজের আলখাল্লাটি নিয়ে এলেন আর টাইগ্রিসের তীরে সেটি মেলে ধরলেন। পানি নেমে গেল, আর তাঁর ভস্ম শান্ত হয়ে এল। তারপর তারা তাঁর ভস্ম একত্র করে দাফন করল।
[অনুবাদকের নোট: মনসুর আল-হাল্লাজের জীবন, অলৌকিক ঘটনাবলি এবং তাঁর মৃত্যুদণ্ডের সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ইতিহাসবিদ, মুহাদ্দিস ও সুফিসাধকদের মধ্যে বিস্তর দ্বিমত রয়েছে। ফরিদ উদ্দিন আত্তারের ধ্রুপদি সুফি আখ্যান অবলম্বনে অনূদিত এই লেখাটিকে কঠোর ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় মাপকাঠিতে বিচার না করে, সাহিত্যের নন্দনতাত্ত্বিক জায়গা থেকে পাঠ করাই শ্রেয়।]